তৃতীয় খণ্ড
পর্ব ৫: দেশে ফেরা এবং অদৃশ্য শত্রু
কমলিকা ভট্টাচার্য
বিমানটা যখন মাটিতে নামল, তখন ভোর পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। আকাশের রং ছিল ধূসর, যেন আলো আর অন্ধকারের মাঝখানে আটকে আছে—ঠিক অনির্বাণের শরীরের মতো। সে জানলার পাশে বসে ছিল, কিন্তু বাইরে রানওয়ের আলো, দূরের টার্মিনাল, কিংবা ব্যস্ত গ্রাউন্ড স্টাফ—কিছুই যেন তার চোখে ঢুকছিল না। তার ভিতরটা অদ্ভুত ফাঁকা লাগছিল। ডিসপ্লেসমেন্টের পর থেকে সে বুঝতে পারছে—তার শরীরের ভিতরে কিছু একটা বদলে গেছে। মাঝে মাঝে তার মনে হচ্ছে—সে পুরোপুরি এখানে নেই। যেন তার অস্তিত্বের একটা অংশ এখনও Facility 47-এর সেই ঠান্ডা সাদা ঘরের মধ্যে আটকে আছে, যেখানে সময় থেমে ছিল, আর জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল নাতাশা। “অনির্বাণ,” ঋদ্ধিমানের কণ্ঠস্বর তাকে ফিরিয়ে আনল। “আমরা নেমে গেছি।” অনির্বাণ ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। তার চোখ লাল, গভীর ক্লান্তিতে ভরা। কিন্তু তার পাশেই—স্ট্রেচারে শুয়ে নাতাশা। নিঃশব্দ। দুর্বল। কিন্তু জীবিত। এই মুহূর্তে এটাই তার কাছে একমাত্র বাস্তব সত্য।
বিমান থেকে নামার পর তাদের কোনো ইমিগ্রেশন লাইনে দাঁড়াতে হয়নি। সবকিছু আগেই ব্যবস্থা করা ছিল। কালো কাঁচ ঢাকা একটি অ্যাম্বুলেন্স সরাসরি রানওয়ের পাশ থেকে নাতাশাকে নিয়ে নিল। অনির্বাণ, ইরা আর ঋদ্ধিমান সেই গাড়ির পিছনেই বসল। গাড়ির ভিতরে শুধু মেশিনের মৃদু শব্দ আর নাতাশার শ্বাসের ওঠানামা। অনির্বাণ তার দিকে তাকিয়ে ছিল, যেন চোখ সরালেই সে আবার হারিয়ে যাবে। শহর তখনও ঘুমিয়ে, কিন্তু অনির্বাণ জানত—তাদের যুদ্ধ এখনও ঘুমায়নি। কিছুক্ষণ পর তারা পৌঁছল একটি গোপন মেডিকেল ফ্যাসিলিটিতে। বাইরে থেকে এটা একটা সাধারণ সরকারি ভবন, কিন্তু কাগজে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। ইরা আগেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছিল। কারণ তারা জানত—নাতাশা শুধু একজন রোগী নয়, সে একটা টার্গেট। তাকে বাঁচানো মানে শুধু একটা জীবন বাঁচানো নয়, একটা গোপন সত্যকে বাঁচানো।
ডাক্তাররা দ্রুত নাতাশাকে ICU-তে নিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হয়ে গেল তাদের মুখের সামনে। অনির্বাণ বাইরে দাঁড়িয়ে রইল। তার হাত কাঁপছিল। ঋদ্ধিমান পাশে এসে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “সে শক্ত মেয়ে।” অনির্বাণ ধীরে উত্তর দিল, “আমি জানি।” কিন্তু তার ভিতরে একটা ভয় ক্রমশ বড় হচ্ছিল। যদি সে ফিরে না আসে? যদি সে জেগে উঠে তাকে চিনতে না পারে? অথবা চিনলেও ক্ষমা না করে? ঠিক তখনই হঠাৎ অনির্বাণের চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল। তার শরীর দুলে উঠল। ঋদ্ধিমান দ্রুত তাকে ধরে ফেলল। “কি হয়েছে?” অনির্বাণ শ্বাস নিতে পারছিল না। তার মনে হচ্ছিল—তার শরীরের ভিতরটা আবার ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। যেন সে ধীরে ধীরে এই বাস্তবতা থেকে সরে যাচ্ছে। কয়েক সেকেন্ড পর সব স্বাভাবিক হল। সে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। বলল, “আমি ঠিক আছি।” কিন্তু সে জানত—সে মিথ্যে বলছে। তিলক বাবার কথা হঠাৎ মনে পড়ল—“প্রতিবার শরীরকে সরালে, শরীর তোমাকে একটু একটু করে ছেড়ে দেয়।” তখন সে বিশ্বাস করেনি। আজ সে তার মূল্য দিচ্ছে।
তিন দিন কেটে গেল। প্রতিটি দিন অনির্বাণের কাছে এক একটা বছরের মতো দীর্ঘ ছিল। সে ICU-র বাইরে বসে থাকত, একই জায়গায়, একই চেয়ারে। নাতাশার ব্রেইন অ্যাক্টিভিটি ধীরে ধীরে বাড়ছিল। ডাক্তাররা বলেছিল—এটা অলৌকিক। কিন্তু অনির্বাণ জানত—এটা অলৌকিক নয়। এটা নাতাশা। সে সবসময়ই যোদ্ধা ছিল। হাল ছাড়ার মেয়ে নয়। সেই রাতেই, হাসপাতালের করিডোর প্রায় ফাঁকা ছিল। সাদা আলো, নিঃশব্দ পরিবেশ, আর দূরের কোনো মেশিনের মৃদু বিপ শব্দ—সব মিলিয়ে একটা অস্বস্তিকর শান্তি। অনির্বাণ একা বসে ছিল। ঠিক তখনই তার ফোনে একটা মেসেজ এল। Unknown Number. তার বুকের ভিতরটা ধক করে উঠল। সে খুলল। মাত্র তিনটি শব্দ—WELCOME BACK, ANIRBAN।
তার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। তার আঙুল কাঁপছিল। এই নম্বর কেউ জানে না। কেউ জানার কথা নয়। “কি হয়েছে?” ইরা এসে দাঁড়াল। অনির্বাণ ফোনটা এগিয়ে দিল। ইরার মুখ শক্ত হয়ে গেল। ঋদ্ধিমানও এসে পড়ল। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতার পর ঋদ্ধিমান ধীরে বলল, “তার মানে ওরা জানে।” ইরা ফিসফিস করে বলল, “অসম্ভব… আমাদের মুভমেন্ট ক্লাসিফায়েড ছিল।” ঋদ্ধিমান ধীরে বলল, “যদি আমাদের দেশের ভিতর থেকেই কেউ তথ্য দেয়?” কথাটা বাতাসে ঝুলে রইল। এই সম্ভাবনাটা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। শত্রু যদি বাইরে না থাকে—ভিতরে থাকে।
ঠিক সেই মুহূর্তে ICU-র ভিতর থেকে অ্যালার্ম বেজে উঠল। সবাই দৌড়ে গেল। মেশিনের আলো দ্রুত জ্বলছে নিভছে। ডাক্তাররা ব্যস্ত। নাতাশার শরীর কাঁপছে। তার ব্রেইন সিগন্যাল হঠাৎ বেড়ে গেছে। অনির্বাণ কাঁচের ওপাশে দাঁড়িয়ে। অসহায়। কিছুক্ষণ পর—নাতাশার চোখ খুলে গেল। তার চোখে আতঙ্ক। সে কিছু বলতে চাইছে। ডাক্তাররা বাইরে এসে বলল, “সে জেগে উঠেছে। এক মিনিটের জন্য দেখতে পারেন।” অনির্বাণ ভিতরে ঢুকল। তার হৃদস্পন্দন এত জোরে হচ্ছিল যেন পুরো ঘর শুনতে পাচ্ছে। “নাতাশা…” সে ফিসফিস করল। নাতাশার ঠোঁট কাঁপল। সে কষ্টে বলল, “ওরা…” অনির্বাণ ঝুঁকে এল। “কে?” নাতাশার চোখ হঠাৎ দরজার দিকে চলে গেল। সে ফিসফিস করে বলল, “ওরা এখানেই আছে…”
অনির্বাণ পিছনে তাকাল। করিডোরে একজন দাঁড়িয়ে। হাসপাতালের পোশাক। সাধারণ। অচেনা। কিন্তু তার চোখ—সোজা অনির্বাণের দিকে। ঠান্ডা। সচেতন। সে হালকা হাসল। তারপর ঘুরে চলে গেল। অনির্বাণ দৌড়ে বাইরে এল। করিডোর ফাঁকা। কেউ নেই। যেন কেউ কখনও ছিলই না। তার ফোন আবার কাঁপল। নতুন মেসেজ—YOU CAN’T HIDE।
অনির্বাণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার ভিতরে হঠাৎ একটা নতুন অনুভূতি জন্ম নিল। ভয় নয়। উপলব্ধি। এই যুদ্ধ শেষ হয়নি। এটা শুধু শুরু। আর এবার যুদ্ধটা তার নিজের দেশে। নিজের বাড়িতে। যেখানে শত্রু অদৃশ্য। যেখানে বিশ্বাসই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। সে কাঁচের ওপাশে নাতাশার দিকে তাকাল। সে আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। শান্ত। অনির্বাণ খুব আস্তে নিজের মনে বলল, “এইবার আমি প্রস্তুত।” কিন্তু তার ভিতরের গভীরে সে জানত—এই লড়াই শুধু নাতাশাকে বাঁচানোর নয়। এই লড়াই তার নিজের অস্তিত্ব বাঁচানোর। কারণ কেউ একজন ইতিমধ্যেই তার জীবনের ভিতরে ঢুকে পড়েছে। অদৃশ্য হয়ে। অপেক্ষা করছে। সঠিক সময়ের।
2 Comments
besh dramatic hocche.
ReplyDeleteরহস্য ঘনিয়ে আসছে। টান টান লেখা।
ReplyDelete