জ্বলদর্চি

গুচ্ছ কবিতা /গুরুপদ মুখোপাধ্যায়

গুচ্ছ কবিতা 
গুরুপদ মুখোপাধ্যায় 

 ফাঁক


চরের নীচে শুয়ে আছে নদী 
লেপ্টে থাকা ঢেউগুলি মাঝে মাঝে 
নড়ে ওঠে অস্থিরতায়,নীড় নীল মেখে এলোমেলো।

নিস্তরঙ্গ আস্তিনের গভীরে দধিচীর ভঙ্গুর অস্থিগুলি 
সব ছিল সাজানো বাগান জুড়ে,বারুনীর ঘাটে ঘাটে ফুল 
সন্ধ্যার বাতাস কুড়োতে ফাঁক বেয়ে ঢুকে পড়ে 
সিঁধেল চোর,ত্রিনয়ন ভেঙে যায় উজানী নৌকায়।

ঘরময় গোছানো আসবাব,'বিপন্ন বিস্ময় 'ওঁৎ পেতে থাকে 
গল্পের সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে শব্দের গভীরে শুয়ে আছে 
বিষন্ন নদী, এভাবেই চুরি হয়ে যায় গল্পের ক্যাটাসট্রফি 
সারাজীবন শব্দ কুড়োতে শুয়ে থাকে চরের গভীরে।

পেরিয়ে যায় অন্তিম অন্তর্যামী নৈঃশব্দ্যের প্রহর
এই ফাঁকের কথাটুকু শুধু আগুন আর ধোঁয়া জানে।
     

প্রেম দিবস 

পলাশ ডাকছে লালমাটি আর
বুকের গভীরে শুয়ে থাকা চর।

ফল্গুর কিছু কথা বলা হয়নি এখনো 
শরীরের স্পর্শে স্রোত ঘুম ভেঙে নড়ে ওঠে।
বুকভরা বালিয়াড়ি নিয়ে শুয়ে আছে রাত
কত অভিমান ভাঙাগড়া পাশ কেটে চলে যায়।

তবুও প্রবাহ আবর্তমান, শিকড়ের সন্ধানে 
শালিক দম্পতি নিয়মিত ডালে এসে বসে।
রাতচর হয়ে নিশির শূন্য ওম
দুটি চোখ খোঁজে পঙ্কিল আঙিনা হাত।

পলাশ শুয়ে আছে লালমাটির শরীরে।
শুকনো পাতা ঠেলে সকাল আর শব্দ কুড়োয়
গোলাপও বড় ব্যস্ত আজ।
🍂

    
অন্তিম প্রহর

গোলাপ মরে গেলেও বেঁচে থাকে গোলাপের স্বর
কানাগলি পথ ধরে স্বপ্নিল শব্দেরা নড়ে ওঠে 
অবচেতনের ইথারে মাচান গানের সাথে আজান
সরিয়ে রাখি আসবাব,তৈজস, অবচেতনের চৌকাঠ।

বুকের উপর শুয়ে মানুষ, মিছিল,নৈশ কড়িডোর
ছুঁয়ে আছি সাড়ে তিন হাত জমি, ছেঁড়া পাতা 
জীবনানন্দের ফেলে আসা হাজার বছরের দাগ
হৃদয় কি রেখেছো পেতে জলাভূমির শিরায় শিরায়?

তবুও তৃণভূমি পেরোতে থাকে অন্তিম প্রলাপ 
খুঁজে বেড়ায় ভরসার একটি দিগন্ত হাত।
উৎসব মরে গেলেও প্রান্ত ছুঁয়ে থাকে ছাদ
গন্ধে ভরে ওঠে, অপেক্ষায় জ্যোৎস্না  গোলাপ রাত।

                 

বৃত্ত

বৃত্তের ভিতরে ধ্যানমগ্ন আমি 
শালিক দম্পতির মতো
আর কতো ঘোরাবে হে?
বাঁশের পোঁড়ার মতো জল স্রোতে উঁকি ।

বিষন্ন গোল্লাছুট পেরোতে গিয়ে ভোকাট্টা ঘুড়ি 
শূন্য থেকে আরো শূণ্যের অরণ্যে তুমি 
পান পাতায় ঢেকেছিলে মুখ
ঢেউ গুণতে থাকে নৌকা সাঁতার।

লাট্টুর মতো পথ হাঁটে বিষন্ন মেঘ
শুয়ে থাকে মাঠ নির্জন কুয়াশায়।
          

শব্দেরা-২

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে শব্দেরা
আগন্তুক যাপনের উদাসী কড়ি কাঠ। শূন্য নীড়ে
প্রহরী হয়ে নৈঃশব্দ্য পার করে নিঃসঙ্গ বসন্ত
সেই কবে হারিয়ে গেছে সপ্তডিঙা মধুকর।

মোহরকুঞ্জে জেগে ছিল রাত, রামধনু ,কড়িকাঠ
জ্যোৎস্নায় ভিজেছিল কোন এক বিরহী ছাতার ।
সময়ের অযুত স্রোত ছুঁয়ে শালের  মঞ্জরী
পেরিয়ে গিয়েছে সে শূন্যতার অতন্দ্র প্রহর।

সময়ের ঘ্রাণ ছুঁয়ে থাকে মুষ্ঠিবদ্ধ তেপান্তর 
পথে ফেলে আসা ঢেউয়ের ভাঙন, রাতজাগা চর।
ছুঁয়ে দেখেছি বয়স, শরীরের গন্ধ, শ্বাস 
মাথুর চৌকাঠ ভাঙে শূন্যতার কঠিন ডাঙায়।

Post a Comment

0 Comments