জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকার/তৃতীয় খণ্ড/পর্ব ১: অপরাধবোধের ছায়া/ কমলিকা ভট্টাচার্য

বাঁচার উত্তরাধিকার
তৃতীয় খণ্ড
পর্ব ১: অপরাধবোধের ছায়া 
কমলিকা ভট্টাচার্য 


বাঁচার উত্তরাধিকার” প্রথম খণ্ডে আমরা জেনেছিলাম অনির্বাণের গল্প—দেশের প্রতিরক্ষা বিভাগের সঙ্গে যুক্ত এক অসাধারণ রোবোটিক্স বিজ্ঞানী, যার নিজেরই সৃষ্টি একটি humanoid robot ধীরে ধীরে কিভাবে নিজস্ব চেতনা অর্জন করে তাকেই ছাড়িয়ে যায় এবং তার অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। সেই সংকট পেরিয়ে, শেষ পর্যন্ত সে নিজের বাঁচার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে।
দ্বিতীয় খণ্ডে, সেই robot-ই ঋদ্ধিমান হয়ে ওঠে—অনির্বাণের সবচেয়ে কাছের সহযোগী, তার ভাইয়ের মতো। তারা একসঙ্গে নতুন আবিষ্কারের পথে এগিয়ে যায় এবং তিলকবাবার দেওয়া চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে। এই সময় নতুন spy হিসেবে ইরার আগমন ঘটে, এবং তার সূত্র ধরেই সামনে আসে নাতাশার সত্য—যে একদিন spy হয়ে এসেছিল, কিন্তু পরে অনির্বাণের ভালোবাসা হয়ে ওঠে। অথচ বিশ্বাসঘাতক ভেবে অনির্বাণই তাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল।
এখন প্রশ্ন—সত্য জানার পর অনির্বাণ কি পারবে তার হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসাকে আবার ফিরিয়ে আনতে?
অনির্বাণ এখন আর ঘুমোতে পারে না।ঘুম তার চোখের কাছে এসে দাঁড়ায়, কিন্তু ভিতরে ঢোকার অনুমতি পায় না। যেন তার মনের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে এক অদৃশ্য প্রহরী—যে তাকে শাস্তি দিচ্ছে।
 ল্যাবরেটরির কাঁচের দেওয়ালে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে অনির্বাণ হঠাৎ বুঝতে পারে—সে ক্ষয়ে যাচ্ছে। বয়সের জন্য নয়। অপরাধবোধের জন্য।

তার চোখের নীচে কালি জমেছে, দাড়ি অগোছালো, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। অথচ তার চারপাশে মেশিনগুলো নির্বিকারভাবে কাজ করে চলেছে। নিউরাল ম্যাপিং স্ক্রিনে একের পর এক তরঙ্গ উঠছে, পড়ছে—যেন মানুষের চেতনার সমুদ্রকে কাঁচের বাক্সে বন্দী করা হয়েছে।

ঋদ্ধিমান আর ইরা পাশের কনসোলে ব্যস্ত। তারা নতুন হিউম্যানয়েড মডেলের সিন্যাপটিক রেসপন্স পরীক্ষা করছে। মাঝে মাঝে ইরা কিছু নোট নিচ্ছে, ঋদ্ধিমান ডেটা ক্রস-চেক করছে।
কিন্তু অনির্বাণের চোখে ভেসে উঠছে অন্য এক মুখ।
নাতাশা।শুয়ে আছে।নিঃশব্দ।
নিস্তেজ।
ইসলামাবাদের সেই অন্ধকার ঘরে।
তার বুকের ভিতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে ওঠে।“আমি কি ওর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি?”প্রশ্নটা হঠাৎ নিজের ভিতর থেকেই উঠে আসে। সে জানে উত্তরটা। হ্যাঁ। সে করেছিল।
দেশের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সে নিজের ভালোবাসাকে শত্রুর হাতে তুলে দিয়েছিল।
তখন সে ভেবেছিল সে ঠিক কাজ করছে। আজ বুঝছে—ঠিক আর ভুলের মাঝখানে একটা তৃতীয় জায়গা আছে। যার নাম অনুশোচনা।
“তুমি আবার সারারাত ঘুমাওনি, তাই না?”ইরার কণ্ঠস্বর তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনে।অনির্বাণ তাকায়। ইরার চোখে উদ্বেগ। সেই উদ্বেগে শুধু সহকর্মীর দায়িত্ব নেই—আছে একজন বন্ধুর অসহায়তা।
“ঘুম আসেনি,” অনির্বাণ ধীরে বলে।ঋদ্ধিমান চুপচাপ তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলে, “নাতাশার কথা ভাবছো?”
অনির্বাণ কিছু বলে না। তার নীরবতাই উত্তর।ঋদ্ধিমান এগিয়ে আসে। তার কণ্ঠে কোনো অভিযোগ নেই, আছে শুধু উপলব্ধি।“তুমি ওকে ফিরিয়ে আনতে চাও, তাই না?”অনির্বাণ এবার তাকায়। তার চোখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।
“হ্যাঁ।”একটা মাত্র শব্দ।
কিন্তু সেই শব্দের ভিতরে আছে এক সমুদ্র।সেদিনই সে সিদ্ধান্ত নেয়।সে যাবে।
ফিরে যাবে সেই মানুষের কাছে—যার কাছে হয়তো এখনও কিছু উত্তর বাকি আছে।মিস্টার গোমেস।
পুরোনো শহরের এক নির্জন গলির শেষে গোমেসের বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। বাড়িটা যেন সময়ের বাইরে আটকে আছে। দেওয়ালের প্লাস্টার উঠে গেছে, জানলার কাঁচে ধুলো জমে আছে।
অনির্বাণ দরজায় কড়া নাড়ে।
কিছুক্ষণ পরে দরজা খুলে যায়।
গোমেস দাঁড়িয়ে আছেন।বয়স্ক। ক্লান্ত। কিন্তু তার চোখ এখনও তীক্ষ্ণ।তিনি কিছুক্ষণ অনির্বাণের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
তারপর ধীরে বলেন—
“ অনির্বাণ ,তুমি এসেছো। আমি জানতাম তুমি আসবে।”অনির্বাণ কিছু বলে না। ভিতরে ঢুকে বসে।
ঘরের ভিতর পুরোনো বইয়ের গন্ধ।
দেওয়ালে কয়েকটা ছবি।একটা ছবিতে—নাতাশা ,অনির্বাণ ও মিস্টার গোমোস একসাথে হাসছে।

অনির্বাণের বুকের ভিতরটা হঠাৎ থেমে যায়।গোমেস সেটা লক্ষ্য করেন।তিনি ধীরে বলেন, “তুমি এখনও ওকে ভালোবাসো।”
অনির্বাণ মাথা নীচু করে।“আমি ওর কথা জানতে চাই।”
গোমেস দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।“অনেক দেরি করে ফেলেছো, অনির্বাণ।”
“ও বেঁচে আছে?” অনির্বাণের কণ্ঠ কেঁপে ওঠে।গোমেস কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর বলেন—
“বেঁচে আছে। কিন্তু যাকে তুমি চিনতে, সে আর নেই।”
অনির্বাণের বুকের ভিতরটা ঠান্ডা হয়ে যায়।“ওরা ওর উপর পরীক্ষা চালাচ্ছে।”“কী পরীক্ষা?”
গোমেস ধীরে বলেন—“ওরা বিশ্বাস করে মানুষের স্মৃতি আলাদা করে সংরক্ষণ করা যায়। তারা চায় মানুষের চেতনা থেকে একটা নতুন সত্তা তৈরি করতে।”অনির্বাণ ফিসফিস করে বলে—
“হিউম্যানয়েড...”গোমেস মাথা নাড়েন।
“হ্যাঁ। কিন্তু এটা শুধু বিজ্ঞান নয়, অনির্বাণ। এটা ক্ষমতার খেলা। তারা এমন সৈনিক তৈরি করতে চায়—যাদের শরীর কৃত্রিম, কিন্তু মস্তিষ্ক মানুষের।”অনির্বাণের হাত মুঠো হয়ে যায়।“ওরা কেন নাতাশাকে বেছে নিল?”
গোমেস এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকান।“কারণ নাতাশা সাধারণ মানুষ ছিল না।”
অনির্বাণ থমকে যায়।“মানে?”
গোমেস ধীরে বলেন—
“ও ছিল ‘সিঙ্ক্রোনাইজার’।”“সিঙ্ক্রোনাইজার?”“হ্যাঁ। খুব বিরল এক ধরনের নিউরাল ক্ষমতা। ওর মস্তিষ্ক খুব সহজে কৃত্রিম নিউরালনেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারত।”
অনির্বাণের মাথার ভিতর ঝড় বয়ে যায়।হঠাৎ তার মনে পড়ে—
তার প্রথম হিউম্যানয়েড প্রোটোটাইপ।সেটা কাজ করেছিল।
শুধু একবার।
আর সেই পরীক্ষার সময়—নাতাশা সেখানে ছিল।“তারা জানে,” গোমেস বলেন, “তোমার গবেষণা অসম্পূর্ণ। আর তারা বিশ্বাস করে—নাতাশার মস্তিষ্কই সেই অসম্পূর্ণতা পূরণ করতে পারবে।”
অনির্বাণের কণ্ঠ শুকিয়ে যায়।“ও কি কষ্ট পাচ্ছে?”গোমেস উত্তর দেন না।তার নীরবতাই উত্তর।
কিছুক্ষণ পরে তিনি বলেন—
“শেষবার যখন আমি ওর সঙ্গে কথা বলেছিলাম, ও শুধু একটা কথাই বলেছিল।”
অনির্বাণের বুক ধকধক করতে থাকে।“কি বলেছিল?”
গোমেস ধীরে বলেন—
“ও বলেছিল—‘অনির্বাণ কি আমাকে ভুলে গেছে?’”এই কথাটা শুনে অনির্বাণের ভিতরটা ভেঙে পড়ে।তার চোখ দিয়ে জল পড়তে থাকে।অনেক বছর পরে।
গোমেস এবার সামনে ঝুঁকে বলেন—“শোনো, আরও একটা কথা আছে।”অনির্বাণ তাকায়।
“সবাই শত্রু নয়।”“মানে?”
“তোমাদের নিজের সিস্টেমের ভিতরেও কেউ আছে—যে এই প্রোজেক্টে সাহায্য করছে।”অনির্বাণের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়।“আমাদের দেশের কেউ?”গোমেস মাথা নাড়েন।
“হ্যাঁ। কেউ একজন—যে তোমার গবেষণার সব তথ্য ওদের কাছে পাঠিয়েছে।”
অনির্বাণের শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়।
বিশ্বাসঘাতকতা।সব জায়গায়।
গোমেস ধীরে বলেন—“যদি তুমি ওকে ফিরিয়ে আনতে চাও, তাহলে শুধু শত্রুর সঙ্গে নয়—নিজের ছায়ার সঙ্গেও লড়তে হবে।”
অনির্বাণ ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
তার চোখে এখন আর দ্বিধা নেই।
আছে শুধু আগুন।“আমি ওকে ফিরিয়ে আনব।”
গোমেস তাকিয়ে থাকেন।
“তুমি হয়তো নিজেও ফিরে আসতে না পারো।”
অনির্বাণ শান্ত গলায় বলে—“তবুও যাব।”বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় আকাশে সন্ধ্যা নেমেছে।
অনির্বাণ জানে—
এই পথ থেকে আর ফিরে আসার উপায় নেই।আজ থেকে তার যুদ্ধ শুরু।শুধু শত্রুর বিরুদ্ধে নয়।
নিজের অপরাধবোধের বিরুদ্ধে।
আর সেই ভালোবাসার জন্য—যাকে সে একদিন নিজের হাতেই হারিয়েছিল।সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে—
“আমি আসছি, নাতাশা।”
তার কণ্ঠে প্রতিশ্রুতি।
তার চোখে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।
আর তার সামনে—অন্ধকার।
যার ভিতরেই লুকিয়ে আছে আলো।

Post a Comment

3 Comments

  1. সাগ্রহে পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।

    ReplyDelete
  2. দারুন, দেখা যাক অনির্বাণের পরবর্তী পদক্ষেপ.....

    ReplyDelete