জ্বলদর্চি

বিশ্ব কিশোর মানসিক সুস্থতা দিবস/দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে

বিশ্ব কিশোর মানসিক সুস্থতা দিবস
দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

আজ ২রা মার্চ বিশ্ব কিশোর মানসিক সুস্থতা দিবস। মানসিক সুস্থতা কি,এর গুরুত্ব ও তাৎপর্যই বা কি? আসুন বিস্তারিত ভাবে সবকিছু জেনে নিই।

মানসিক সুস্থতা হলো, আবেগীয় মনস্তাত্ত্বিক এবং সামাজিক ভালো থাকার একটি অবস্থা, যেখানে ব্যক্তি নিজের ক্ষমতা বুঝতে পারে,জীবনের স্বাভাবিক চাপ মোকাবিলা করতে পারে,উৎপাদনশীলভাবে কাজ করতে পারে এবং সমাজে অবদান রাখতে পারে। এটি কেবল মানসিক রোগ বা ব্যাধির অনুপস্থিতি নয়,বরং ইতিবাচক মানসিক স্বাস্থ্যের উপস্থিতি।

বিশ্ব কিশোর মানসিক সুস্থতা দিবস হলো এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন, যা সারা বিশ্বের তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব তুলে ধরার জন্য পালন করা হয়। সাধারণত প্রতিবছর ২রা মার্চ এই দিবসটি পালন করা হয়। কিশোর-কিশোরীদের জীবনের এই সংবেদনশীল সময়ে শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মানসিক ও আবেগগত পরিবর্তনও ঘটে। তাই এই সময়ে তাদের মানসিক সুস্থতা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
বর্তমান যুগে প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি, পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক ও সামাজিক প্রত্যাশা, বন্ধুত্ব ও সম্পর্কের জটিলতা,এসব বিষয় কিশোর-কিশোরীদের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। অনেক সময় তারা নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না বা কাউকে বিশ্বাস করে বলতে দ্বিধাবোধ করে। ফলে উদ্বেগ, হতাশা, আত্মবিশ্বাসের অভাব, একাকীত্ব ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা World Health Organization (WHO) এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার হার ক্রমেই বাড়ছে। তাই এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

এই দিবস পালনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো,কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা,তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, এবং প্রয়োজনে সহায়তা প্রদান করা। পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পরিবার হলো শিশুর প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বাবা-মা যদি সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং তাদের অনুভূতি ও সমস্যাগুলো গুরুত্ব সহকারে শোনেন, তাহলে অনেক মানসিক সমস্যা সহজেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বিদ্যালয় ও শিক্ষকদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক শিক্ষা নয়, মানসিক সুস্থতা সম্পর্কিত আলোচনা, কাউন্সেলিং ব্যবস্থা এবং সহানুভূতিশীল পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি। অনেক দেশে বিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞানী বা কাউন্সেলর নিয়োগ দেওয়া হয়, যারা শিক্ষার্থীদের মানসিক সমস্যায় পরামর্শ দেন। আমাদের দেশেও এ ধরনের উদ্যোগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিশোর-কিশোরীদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একদিকে এটি জ্ঞান ও যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত ব্যবহার মানসিক চাপে রূপ নিতে পারে। অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা করা, অনলাইন বুলিং বা কটূক্তি, লাইক-কমেন্টের উপর নির্ভরশীলতা—এসব বিষয় তাদের আত্মসম্মানবোধে আঘাত হানতে পারে। তাই প্রযুক্তির সঠিক ও পরিমিত ব্যবহার শেখানো জরুরি।
বিশ্ব কিশোর-কিশোরী মানসিক সুস্থতা দিবসে বিভিন্ন দেশ ও সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে। সেমিনার,র‍্যালি, আলোচনা সভা, সচেতনতামূলক প্রচারণা ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষকে এই বিষয়ে সচেতন করা হয়। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা UNICEF-ও শিশু ও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করে থাকে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হয়।
মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে কিশোর-কিশোরীদের কিছু ইতিবাচক অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন যেমন,নিয়মিত ব্যায়াম করা, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য গ্রহণ, প্রিয় কাজ বা শখের চর্চা করা, এবং প্রয়োজনে বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে মনের কথা ভাগ করে নেওয়া। বন্ধুদের সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং নিজের লক্ষ্য নির্ধারণ করে এগিয়ে যাওয়াও মানসিক শক্তি বাড়ায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো,মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে লজ্জা বা ভয় না পাওয়া। অনেকেই মনে করেন, মানসিক সমস্যার কথা বলা দুর্বলতার লক্ষণ। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি স্বাভাবিক ও মানবিক বিষয়। শারীরিক অসুস্থতার মতো মানসিক অসুস্থতারও চিকিৎসা ও সহায়তা রয়েছে। সময়মতো সাহায্য নিলে সুস্থ জীবনযাপন সম্ভব।

বিশ্ব কিশোর-কিশোরী মানসিক সুস্থতা দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়,এটি একটি দায়িত্বের প্রতীক। আমাদের প্রত্যেকের উচিত কিশোর-কিশোরীদের মানসিক বিকাশে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা। তাদের কথা মন দিয়ে শোনা, তাদের অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানো এবং প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো,এসব ছোট ছোট উদ্যোগই বড় পরিবর্তন আনতে পারে। একটি সুস্থ, সচেতন ও আত্মবিশ্বাসী তরুণ প্রজন্মই পারে আগামী দিনের সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক সুস্থতা রক্ষায় সচেতন হই এবং তাদের জন্য একটি নিরাপদ ও সহানুভূতিশীল পৃথিবী গড়ে তোলা প্রয়োজন।

Post a Comment

0 Comments