গুচ্ছ কবিতা : জ্বর থেকে জ্বর
কমলিকা ভট্টাচার্য
জ্বর
একটা আচ্ছন্ন ভাবের ভিতর আমি—
মনে হয় কোথাও যাওয়ার আছে।
মনটা ঘোর কাটিয়ে বারবার জেগে ওঠে,
ঘড়ির দিকে তাকায়।
কোথায় যাব?
আমার তো কোনো ঠিকানা নেই,
কোনো আশ্রয়ও না।
কিছু কথা
ভিতর থেকে দরজা ঠেলে ওঠে,
আবার নিঃশব্দে
ফিরে যায় অন্ধকারে।
মনে পড়ে—
একজন বন্ধু ছিল,
গলির অন্ধকারে
আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিত।
তখন ভয় পেতাম না।
এখন কেন এত ভয়?
এমন বন্ধুরা কি
এখন আর জন্মায় না?
কেউ বলে—
চুপ, কাউকে বলো না।
কিন্তু চেপে রাখলেও
ভয় কমে না।
কারণ মানুষ
অধিকাংশ সময়
মাঝপথেই ছেড়ে যায়।
শরীরটা হালকা কাঁপে—
মনে হয়
আমার খুব জ্বর।
ভালোবেসো না আমাকে
আমাকে ভালোবেসো না,
খালি আমাকে ভালোবাসতে দাও—
যেমন দুপুরের রোদ
নিঃশব্দে পড়ে থাকে
ঘাসের ওপর,
কাউকে কিছু না বলেও
তার উষ্ণতা দিয়ে যায়।
আমাকে ভালোবেসো না,
তুমি তোমার আকাশেই থাকো—
আমি দূরের মেঘ হয়ে
তোমার নীলের পাশে ভাসব,
বৃষ্টি হব না,
তবু তোমার দিগন্তে
একটু ছায়া রেখে যাব।
ভালোবাসা সবসময়
ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি নয়—
কখনো কখনো
সে শুধু দেওয়া,
একতরফা আলো
যা জানে
কোন জানালায় তার ঢোকা নিষেধ।
তাই আমাকে ভালোবেসো না—
খালি আমাকে ভালোবাসতে দাও।
আমি নীরবে
তোমার দিনের ভেতর
এক ফোঁটা বিকেল হয়ে থাকব,
যার অস্ত যাওয়ার কথা
কেউ মনে রাখে না,
তবু যার রঙে
দিনটা একটু কোমল হয়ে ওঠে।
ওরা কোনোদিন ভালোবাসে না
সব মিথ্যা—
খালি কথার জাদু করে ওরা।
ওরা বলবে, তোমার জন্য আকাশ কিনে দেবে,
তোমার কাঁধে বসাবে নীল ডানার স্বপ্ন,
উড়তে শেখাবে মেঘের ভিতর দিয়ে।
কিছু দূর উড়ে যাওয়ার পর
তুমি দেখবে—
তুমি দলছুট এক পাখি,
আকাশের সব আলো, সব নীল, সব মেঘ
ওরা গুছিয়ে নিয়ে গেছে নিজেদের ঘরে।
তোমার জন্য রেখে গেছে
একটা ফাঁকা দিগন্ত
আর অদৃশ্য বাতাসের দীর্ঘশ্বাস।
ওরা বলবে—
তোমার জন্য নদী কিনে এনেছে,
তোমার হাত ধরে সাঁতার কাটবে জলের ভিতর,
হাসতে হাসতে ডুব দেবে নীল গভীরে।
কিন্তু যেদিন তুমি সত্যিই
গভীরের দিকে তলিয়ে যেতে চাইবে,
যেদিন তোমার চোখ দুটো
হঠাৎই হয়ে উঠবে বন্যার নদী—
সেদিন
অন্ধ হাত বাড়িয়ে খুঁজবে তুমি তাদের।
নদীর ঘাটে তখন
শুধু ঢেউয়ের শব্দ,
মানুষ নেই।
আমি তাদের স্বার্থপর বলি না—
হয়তো তারা শুধু
মূল্য বুঝতে শেখেনি ভালোবাসার।
তুমি তাদের কাছে
একটা অবাধ আকাশ ছিলে,
যেখানে ইচ্ছে হলে উড়েছে তারা,
ইচ্ছে হলে ফিরে গেছে
নিজেদের নিরাপদ খাঁচায়।
কোনো অদৃশ্য কারণের ছায়ায়
একদিন হঠাৎই
তোমায় সরিয়ে রেখেছে দূরে—
যেন রোদে শুকোতে দেওয়া
একটা পুরোনো রঙিন কাপড়।
আর তুমি—
তুমি এখনও বয়ে বেড়াও
তাদের ফেলে যাওয়া ভালোবাসার নাম,
যেন কাঁধে ঝুলছে
একটা অদৃশ্য নদী।
জল নেই তাতে,
তবু ভিজে থাকে মন।
হয়তো একদিন বুঝবে—
যারা সত্যিই ভালোবাসে
তারা দূরে ঠেলে দেয় না কাউকে,
তারা মানুষের ভিতরের আলোটা দেখে।
আর যারা পারে না—
তারা ভালোবাসার গল্প বলে ঠিকই,
কিন্তু তার মানে পড়তে শেখেনি কখনো।
আকাশের কাছে শেখা
আজ আকাশের দিকে তাকিয়ে
মনে হল—
আমি বড্ড নিজেরটুকু নিয়েই ছিলাম।
আমার ছোট্ট নীল,
আমার রোদ,
আমার জ্যোৎস্না।
বুড়ো আকাশটা হেসে বলল—
শুধু তোমার আকাশ দেখলে হবে?
দেখো ওদিকেও—
যেখানে আলো নয়,
ঝরে পড়ে সাদা বারুদ।
দেখো সেই রাতগুলোও
যেখানে শিশুরা
আকাশকে ছাদ ভেবে শোয়,
আর ভোর মানে শুধু বেঁচে থাকা।
লেখো তাদের আকাশ,
তাদের ক্ষুধা,
তাদের ভয়ের গল্প।
আমি চুপ করে শুনি।
জানি—
চোখকে শিখতে হবে
আকাশের মতো বিস্তৃত হতে।
তবু মৃদু স্বরে বলি—
শোনো বুড়ো আকাশ,
তোমার নীল না জ্বললে
আমার কলমে আলো নামে না।
তোমার জ্যোৎস্না না পড়লে
শব্দগুলো
কাগজে জন্মাতে চায় না।
পৃথিবীর জ্বর
আজ পৃথিবীর গায়ে
একটা দীর্ঘ জ্বর—
যুদ্ধ।
একটা অদৃশ্য সুতো
মানুষকে জুড়ে রাখে আতঙ্কে,
তবু সেই সুতোই
দেশে দেশে কেটে দেয় সম্পর্ক।
মেঘও এখন দ্বিধায়—
কোন আকাশে যাবে?
কার মাটিতে ঝরবে?
জলও ধীরে বইতে চায়,
যদি ভুল করে
কারও সীমান্ত ছুঁয়ে ফেলে
একটা নৌকা।
বাতাসও ডানা গুটিয়ে রাখে—
যদি উড়ে গিয়ে
ভুল করে ছড়িয়ে দেয়
ধোঁয়া, বারুদ, মৃত্যু।
কিন্তু যুদ্ধ আসলে
একটা ছোঁয়াচে রোগ—
এক দেশ থেকে আরেক দেশে
শরীর বদলায়,
নাম বদলায়,
তবু একই আগুন জ্বালায়।
প্রকৃতি তখন
এক নার্সের মতো দাঁড়িয়ে থাকে—
হাত খালি।
আর কবিরা
থার্মোমিটার হাতে
শুধু লিখে রাখে
4 Comments
কবিতাগুলো খুব সুন্দর। "ভালোবেসো না আমাকে" কবিতাটা মনে দাগ কেটে গেলো। পৃথিবীর জ্বর ও খুব প্রাসঙ্গিক। প্রত্যেকটাই সুন্দর।
ReplyDeleteঅনেক ধন্যবাদ।🌷
Deleteজ্বর কবিতার মধ্যে একটা অস্থিরতা আছে। খুব চাপা অনুভূতির প্রকাশ।
ReplyDeleteওরা কোনদিন ভস্লোবাসে না কবিতার শেষ লাইনে মানে শব্দটার জায়গায় মন বসালে কেমন হয়?
আকাশের কাছে শেখা বড় সুন্দর সমর্পণ।
পৃথিবীর জ্বর রূপকধর্মী। শেষ্ পংক্তি মন টানে।
এত মন দিয়ে আমার কবিতা কেউ পড়ে জানতে পারলে খুব ভালো লাগে।🌷
Delete