জ্বলদর্চি

যুদ্ধের রূপকথা /কমলিকা ভট্টাচার্য


যুদ্ধের রূপকথা 

কমলিকা ভট্টাচার্য

রাকা এখন একা। যুদ্ধ তার কাছ থেকে মা–বাবা, ঘর, উঠোন, দরজা, জানালা—সব কেড়ে নিয়েছে। তার বয়স চার।
কিন্তু তার চোখের ভেতর অভিজ্ঞতার বয়স অনেক দূর পর্যন্ত হেঁটে গেছে।

ধ্বংসস্তূপের পাশে সে যেদিন আধ পোড়া একটা গল্পের বই কুড়িয়ে পেল, সেদিন থেকেই সেই বইটাই তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়। বইটায় আর কোনো অক্ষর নেই, শুধু কালো দাগ, ছাই, আর পোড়া পাতার গন্ধ। রাকা পড়তে জানে না, কিন্তু এই বইয়ের গল্পগুলো তার মুখস্থ—কারণ এগুলো তার মা বলত।

সন্ধে নামলেই আশেপাশের আরও কয়েকটা শিশু রাকার কাছে জড়ো হয়। ওদের কারও মা নেই, কারও বাবা নেই, কারও দুজনেই নেই। কেউ পায়ে কাপড় বেঁধে খুঁড়িয়ে হাঁটে, কারও কপালে সেলাইয়ের দাগ, কেউ তিনদিন ধরে ঠিকমতো কিছু খায়নি। ওরা গোল হয়ে বসে রাকার সামনে। রাকা বইটা খুলে আঙুল বুলিয়ে পড়ার ভান করে। তারপর খুব আস্তে বলে, “Once upon a time…”
শিশুগুলো একদম চুপ হয়ে যায়।
🍂

রাকা বলতে শুরু করে—একটা রাক্ষস ছিল, যে পুরো পৃথিবীটা নিজের করে নিতে চাইত। সে সবার বাড়ি ভেঙে দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, সে পৃথিবীর সব মানুষের হৃদয় পাথর করে দিয়েছে। তারপর নিয়ম করে সবাইকে জেলের মধ্যে আটকে রেখেছে।
 একটা বাচ্চা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “তাহলে আমরা বেঁচে আছে কী করে?” রাকা খুব স্বাভাবিক গলায় বলে, “কারণ আমরা এঞ্জেল।” আরেকজন প্রশ্ন করে, “তবে আমরা উড়তে পারি  না কেন?” রাকা পোড়া পাতায় আঙুল বুলিয়ে বলে, “রাক্ষস আমাদের ডানাগুলো কেটে দিয়েছে।”
দূরে বিস্ফোরণের শব্দ হলে শিশুগুলো কেঁপে ওঠে, কেউ কান চেপে ধরে, কেউ রাকার গায়ে লেগে বসে। কিন্তু রাকা গল্প থামায় না। কারণ গল্প থামলে ভয়টা বড় হয়ে যায়।
দিনে ওরা বাঁচে কী করে? সকালে সূর্য উঠলে ওরা ধ্বংসস্তূপে খাবার খোঁজে। ভাঙা ঘরের নিচে শুকনো রুটি, ফাটা দূর প্যাকেট, পুরনো টিন। তৃষা নামে দশ বছরের একটা মেয়ে জানে কোথায় একটা ভাঙা পাইপ থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ে। সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে হাত পেতে সেই জল খায়। 
রাকা গল্পে বলে, এঞ্জেলগুলো গুপ্তধন খুঁজতে বেরিয়েছে। গুপ্তধন মানে আধখানা বিস্কুট, একটা আলু, অথবা প্লাস্টিকের বোতলে আধ বোতল জল।
একদিন ওরা একটা টিনে শুকনো দুধ পায়। তৃষা সেটাকে যত্ন করে ভাগ করে দেয়। সবাই আঙুল ডুবিয়ে একটু করে খায়। সেদিন রাকা বলে, এঞ্জেলরা জাদুর গুঁড়ো পেয়েছে, যা খেলে পেট ভরে যায়। রাতে ঠান্ডা পড়লে ওরা একটা ভাঙা দেয়ালের আড়ালে গা ঘেঁষে শোয়। আলাদা শুলে ভয় বেশি লাগে। ইমন নামে ছোট্ট একটা ছেলে ঘুমের মধ্যে কাঁদে, “মা…” তৃষা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। রাকা বলে, এক এঞ্জেল কাঁদলে আরেক এঞ্জেল তার মাথায় জাদুর হাত রাখে।
কখনও সাহায্যের ট্রাক আসে। বড়রা ভিড় করে। এই শিশুরা দূরে দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ দয়া করে একটা পাউরুটি ছুড়ে দিলে তারা সেটা কয়েক টুকরো করে ভাগ করে খায়। রাকা বলে, রাজা এঞ্জেলদের জন্য রুটি পাঠিয়েছে। বৃষ্টির দিনে একটা ছেঁড়া ত্রিপল মাথার উপর ধরে তারা দাঁড়িয়ে থাকে। রাকা বলে, এঞ্জেলরা আকাশের কান্না থেকে বাঁচতে নীল ডানা পেয়েছে।
একদিন তৃষা জল আনতে গিয়ে আর ফেরে না। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও না। সেদিন রাকা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, এক এঞ্জেল তারা হয়ে গেছে। সবাই আকাশের দিকে তাকায়। কেউ কাঁদে না—কাঁদার শক্তিও যেন ফুরিয়ে গেছে।
আরেকদিন ইমন জ্বরে পড়ে। ওষুধ নেই। রাকা তার কপালে হাত রেখে বসে থাকে অনেকক্ষণ। মায়ের মতো করে। গল্পে বলে, এঞ্জেলদের জাদুর হাত আছে। ইমন ধীরে ধীরে সেরে ওঠে।
দিন যায়, যুদ্ধ থামে না, খিদে থামে না, ভয় থামে না। আর গল্পও থামে না।
একদিন খুব কাছে বোমা পড়ে। ধোঁয়া, আগুন, চিৎকারে সব ছড়িয়ে যায়। ধুলো সরে গেলে দেখা যায়, একটা ছোট মেয়ে আর উঠছে না। সেদিন রাকা গল্প বলতে গিয়ে থেমে যায়। তার গলা দিয়ে শব্দ বেরোয় না। শিশুগুলো চুপ করে তাকিয়ে থাকে। তারপর সে খুব আস্তে বলে, রাক্ষস খুব রেগে গেছে, কারণ এঞ্জেলরা এখনও গল্প শোনে।
একটা শিশু জিজ্ঞেস করে, “রাক্ষসটা মরবে?”
রাকা বলে, “রাক্ষস তখনই মরে, যখন এঞ্জেলরা একে অপরের হাত ধরে।”
সবাই হাত ধরে।
ধোঁয়া, আগুন, ক্ষুধা আর অনাথ হয়ে যাওয়া শৈশবের মাঝখানে রাকা প্রতিদিন পোড়া বইয়ের কালো দাগে আঙুল বুলিয়ে নতুন রূপকথা লেখে। তার দেখা সত্যি দিয়ে, তার হারানো মানুষ দিয়ে, তার মায়ের কণ্ঠস্বর দিয়ে। কারণ সে জানে—বাড়ি নেই, খাবার নেই, নিরাপত্তা নেই, কিন্তু গল্প আছে। আর সেই গল্পই ওদের বাঁচিয়ে রাখে।
রাকা যখন আধ পোড়া বইটা বুকে চেপে আবার বলে, “Once upon a time…”, তখন যুদ্ধ থামে না, কিন্তু কয়েকটা শিশুর বুকের ভিতর পাথর হয়ে যাওয়া হৃদয় আবার একটু নরম হয়ে আসে। আর কোথাও, অদৃশ্য অন্ধকারে, রাক্ষসটা বুঝতে পারে—ডানা কেটে দিলেও, গল্প বলা আটকানো যায় না।

Post a Comment

2 Comments

  1. এঞ্জেলরা এক সময় বোবা হয়ে যায়।

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাMarch 30, 2026

      হ্যাঁ,এঞ্জেলরা শুধু বোবা হয়না,তাদের মনটাও মরে যায়।
      যখন এই পৃথিবীর সব মানুষ আবেগহীন বোবা হয়ে যায়।

      Delete