জ্বলদর্চি

রুদ্রপলাশ || ভাস্করব্রত পতি

বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১১৩
রুদ্রপলাশ

ভাস্করব্রত পতি

"আঠাশ দিনের মাথায় আমার 
রক্তকলস পূর্ণতা পায়
আঠাশ দিনের মাথায় গাছের
ডগায় ফুটছে রুদ্রপলাশ
এখন আমার সানুদেশ জুড়ে 
কুয়াশা জমছে নীরক্ত শ্বেত
রক্ত নামছে ঊষর মাটিতে 
মাভূমি গুল্মগর্ভা হবেন!"
   --- আমি সিন্ধুর মেয়ে, মল্লিকা সেনগুপ্ত


এটি আমাদের অতি পরিচিত পলাশ ফুল নয়। আকারে আয়তনে এবং বৈশিষ্ট্যের নিরিখে সম্পূর্ণ আলাদা। কমলা ও লাল আগুনের শিখার রঙের অসাধারণ এই ফুলটিকে সবাই চেনে Spathodea campanulata নামে। Bignoniaceae পরিবারের অন্তর্গত সুন্দর দর্শনের এই ফুলটিকে বাংলায় 'রুদ্রপলাশ' বলা হয়। যা নামকরণ করেছিলেন দ্বিজেন শর্মা। 'রুদ্র' হল শিবের প্রলয়ঙ্কর রূপ। অশুভ বিনাশকারী। ঋগ্বেদে রুদ্রকে ঝড় ও বজ্রপাতের দেবতা হিসেবে বলা হয়েছে। যে কিনা পরাক্রমশালীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। 
গাছে ফুটে আছে থোকা থোকা রুদ্রপলাশ

১৮৭৩ সালে ভারতে প্রথম এই গাছটির বসবাস শুরু হয়। বর্তমানে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বলা যায়। বিশেষ করে এলাকার সৌন্দর্য বৃদ্ধিমূলক বৃক্ষ হিসেবে একে লাগানো হয়। গ্রাম এলাকার চেয়ে শহর এলাকায় এই গাছের দেখা মেলে বেশি বেশি। 

কেরালা, মহারাষ্ট্র এবং তামিলনাড়ুতে রুদ্রপলাশকে 'অ্যাভেনিউ বৃক্ষ' হিসেবে রোপন করা হয়। তবে বর্তমানে খোদ কলকাতা শহরের বুকে অসংখ্য রুদ্রপলাশ ফুল ফুটতে দেখা যায়। বসন্তের আগমনে তথাকথিত পলাশ এবং শিমূলের ভিড়ে রুদ্রপলাশ ফুলও সমীহ আদায় করে নিয়েছে কলকাতায় আগত সৌন্দর্যপ্রিয় মানুষদের। আকাশের দিকে মুখ তুলে রুদ্রপলাশ

রুদ্রপলাশকে ইংরেজিতে Fountain Tree, African Tulip Tree, Flame of the Forest, Skuirt Tree, Pichkari Tree, Syringe Tree, Scarlet Bell Flower, Nandi Flame (নন্দী শিখা)ও বলা হয়। তামিলে পাটাডি, কন্নড়ে নিরুকায়ি মারা, লুজ্জেকায়ে, হিন্দিতে রুগটুরা, মারাঠিতে আকাশ শিভগা এবং তেলুগুতে নিটি বুড্ডা, গনুগান্টা নামে একে চেনে। আফ্রিকার মূল বাসিন্দা এই গাছটি 'আফ্রিকান টিউলিপ' নামেও খ্যাত। এই ফুলের কুঁড়ি ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা কুড়িয়ে নিয়ে দুই আঙুলে চাপ দিয়ে ফাটায়। তখন পিচকারির মতো জল বের হয়। তাই এটি 'পিচকারি ট্রি'! অনেকে একে এজন্য Water Pistol বলে। 

সকালে গাছের তলায় পড়ে থাকে ঝরে পড়া অসংখ্য রুদ্রপলাশ। অসাধারণ সুন্দর লাগে দেখতে। ১৫-২৫ মিটার উঁচু গাছটিতে এই বাংলায় বসন্তকাল এলেই থোকা থোকা রুদ্রপলাশের ফুলে ভরে ওঠে। তবে ভারতের বিভিন্ন স্থানে ঋতু বৈচিত্র্যের তারতম্যের দরুন সারা বছর ধরেই এই গাছে ফুল ফুটতে দেখা যায়। ফুল ফুটলে এক অদ্ভুত দৃশ্য তৈরি হয়। আকাশের দিকে মাথা উঁচু করে নিজের অবস্থান প্রতীয়মান করে ফুলগুলি। সূর্যের আলো লেগে তা হয়ে ওঠে আরও চমৎকার, আরও দর্শনীয় এবং আরও প্রলয়ংকর। 
কুঁড়ি

রুদ্রপলাশের বীজগুলি দেখতে কাগজের মধ্যে আটকানো হৃদয় (Heart) যেন। নৌকার মতো সিডপডের খোলের ভেতর থাকে এর বীজগুলি। প্রতিটি সিডপডের মধ্যে পাঁচশোর বেশি বীজ জন্মায়। বীজগুলি খুব হালকা। তাই নিজের অবস্থান থেকে অনেক দূর পর্যন্ত উড়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। এরফলে দ্রুত বংশবিস্তার ঘটে। সাকার রুট থেকেও নতুন গাছ জন্মায়। খুব দ্রুত বাড়তে পারে। চারাগাছ রোপনের কয়েক বছরের মধ্যেই গাছে ফুল ধরে যায়। 
রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রুদ্রপলাশ

এলাকার সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি এই গাছের ভেষজ গুনও রয়েছে। মূলতঃ মূত্র থলির সংক্রমণ, এইচ আই ভি, ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ, ম্যালেরিয়া, আন্ত্রিক রোগের লোকচিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। এই গাছের ছাল ও পাতা একজিমা, হারপিস রোগের চিকিৎসায় লাগে। চামড়ায় আঘাত লাগলে বা পুড়ে গেলেও এটি লাগালে উপশম মেলে। পেটের নানা রোগ থেকে রেহাই পেতে রুদ্রপলাশের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। ডাই টেক্সটাইলে এর ফুল ব্যবহার করা হয়। খুব একটা শক্তপোক্ত বৃক্ষ নয়। ফলে এর কাঠ আসবাবপত্র নির্মাণে লাগেনা। প্লাইউড তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ভূমিক্ষয় রোধ এবং মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে এর ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। 

কিছু কিছু উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদের অভিমত, রুদ্রপলাশ হল Invasive বা আক্রমণাত্মক উদ্ভিদ। ওয়েবারের (২০০৩) মতে, এরা আলো এবং স্থানের জন্য প্রতিযোগিতা করে। এরফলে এরা প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য এবং প্রজাতির সমৃদ্ধি কমিয়ে দেয়। সারা বিশ্বের একশোটি সবচেয়ে খারাপ এলিয়েন আক্রমণাত্মক প্রজাতির মধ্যে একটি চিহ্নিত করা হয়েছে এই রুদ্রপলাশকে। আরও উল্লেখযোগ্য যে, এগুলির মধ্যে যে ৩০ টি স্থলজ উদ্ভিদ রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম এই রুদ্রপলাশ।

Post a Comment

2 Comments

  1. কমলিকাMarch 01, 2026

    ভালো লাগলো জেনে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. ধন্যবাদ আপনাকে।

      Delete