ঘুমিয়ে গেছে গানের পাখি
(৩৫পর্ব)
চিত্রা ভট্টাচার্য্য
(নজরুলের আধুনিক গান )
কাজী নজরুল ইসলাম আধুনিক বাংলা গানের অন্যতম প্রধান স্রষ্টা ও রূপকার। আধুনিক গানের দীপ্তিময় বিস্তৃতি ও সমৃদ্ধি সাধনে তাঁর অবদান চিরঅমলিন। আঠারো শতকের শেষভাগে মর্তবাসী নর-নারীর মিলন-বিরহের প্রেমানুষঙ্গ নিয়ে রামনিধি গুপ্ত যে আধুনিক গানের সূচনা করেছিলেন , সেই গানেরই এক সফল রূপকার কাজী নজরুল ইসলাম। বাঙালি শ্রোতাদের কাছে হৃদয়গ্রাহী সংগীতরূপে বিবেচিত তাঁর রচিত আধুনিক সংগীত, গানের ভুবনের আনন্দ ধারায় সমৃদ্ধি ও ঐতিহ্যের বিশাল প্রসারতা ঘটালো।বাণীর বিশিষ্টতায় ও অনন্য সুরের বৈভবে নজরুলের আধুনিক গান বাঙালী শ্রোতাদের মনে প্লাবন তুলেছিল। তাঁর সঙ্গীতের মধুময় বাণী, সুরম্য সুর আর যথার্থ জীবনানুভূতিতে রচিত আধুনিক গান এক গৌরবময় সংগীতধারায় উপনীত করেছে।
সংগীতের জগতে সতেজ কণ্ঠস্বরে রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ে ভুবন মাতিয়ে নজরুল প্রবেশ করলেন একথা যেমন সত্য তবুও তাঁর রচিত নিজস্ব সংগীতে কালক্রমে সংগীত জগৎ মেতে উঠেছিল সে কথাও তেমনি সত্য। মূলত গানের মাধ্যমে তাঁর কলকাতা জীবনের শুভারম্ভ এবং সেই গানের তরীর উজান বেয়েই কবি নজরুলের বিপুল প্রতিষ্ঠা ও জনপ্রিয়তা। তিনি মর্মস্পর্শী আবেগে স্বরচিত কবিতা পাঠ করতেন যা সহজেই মানুষকে মুগ্ধ করে মাতিয়ে রাখতো । বাংলা আধুনিক গানের সাঙ্গিতিক বিশ্লেষণ এবং সার্থক অবস্থান আলোচনায় বসে অনায়াসে বলা যায় গানের সুরের ধারায় তিনি আত্মস্থ হতে পেরেছিলেন।গানের উৎপত্তি থেকে আধুনিক গান যেভাবে নান্দনিক রূপ লাড করেছে নজরুলের লেখা আধুনিক গান ও তার ব্যতিক্রম নয়- বাণী, সুর এবং রাগ সংমিশ্রণে যা শ্রবণের অনুভূতি স্পর্শ করে বারেবারে মর্মে দোলা দিয়ে গিয়েছে ।
সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর যাত্রী পত্রিকায় লিখলেন ; ''নজরুলের সঙ্গে আলাপ জমে গেলো। সে কবিতা পড়লো গান গেয়ে শোনালো। আমিও তাকে গান শোনালাম। কি ভালোই লেগেছিলো নজরুলকে সেই প্রথম আলাপে। সবল শরীর; ঝাঁকড়া চুল, চোখ দুটি যেন পেয়ালা, কখনো পেয়ালা খালি নেই, প্রাণের অরুণ রসে সদাই ভরপুর।… গলার স্বরটি ছিলো খুব ভারী… কিন্তু সেই মোটা গলার সুরে ছিলো যাদু। ঢেউয়ের আঘাতের মতো, ঝড়ের ঝাপটার মতো তার গান আছড়ে পড়তো শ্রোতার বুকে।… প্রাণ ছিল তার ঐ হাসির মতোই প্রবল ও দরাজ।… প্রবল হতে সে ভয় পেত না। রবীন্দ্রনাথের পরে এমন শক্তিশালী কবি আর আসেনি বাংলাদেশে। এমন সহজ গতি, আবেগের আগুন-ভরা কবিতা বাংলা সাহিত্যে বিরল।… 'লাঙ্গলে' বের হলো নজরুলের 'নারী' কবিতাটি। একদিনের মধ্যে 'লাঙ্গল' সব বিক্রি হয়ে গেলো, সেই সংখ্যাটা আমাদের আবার ছাপতে হলো। নজরুলের কবিতাই ছিলো 'লাঙ্গলে'র প্রধান আকর্ষণ।' (পৃ. ১০৮, 'কাজী নজরুল ইসলাম/জীবন ও সৃষ্টি', রফিকুল ইসলাম)।
এ কথা ধ্রুব সত্য যে সাহিত্য বা সংগীতের শিল্প কর্মের নেপথ্যে ভাষা, ছন্দ, আঙ্গিক ও রূপরীতির সমন্বয়েই কবিতা ও গান নামক শিল্প প্রস্ফুটিত হয়ে তার সৌরভে দিগন্ত মাতিয়ে তোলে। কবিতা ও গান রচনার ক্ষেত্রে চিন্তা-ভাবনা, কল্পনা, আবেগ অনুভূতি, এমন অনেক কিছুই প্রয়োজন হলে ও সাহিত্য বা সংগীতের অপরিহার্য অবলম্বন হল ভাব, ভাষা ও তার রূপ। বাংলা সঙ্গীতের ক্রমবিবর্তনের ধারায় নজরুল সঙ্গীত তথা নজরুলের আধুনিক পর্যায়ের গান সার্বিকভাবে সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে বৈচিত্র্যে বৈশিষ্ট্যে পরিপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে ভাব ও বক্তব্য ছাড়া কবিতা বা গান রচনা হতে পারে না-- ভাবকে অবলম্বন করেই এবং ভাষা বা বক্তব্যের সাহায্যেই কবিতা বা গান আত্মপ্রকাশ করে।কিছুকিছু আধুনিক গানের রূপক অর্থ ব্যথিত হৃদয় বা মনকে ছুঁয়ে যায়। অনেক নজরুল গবেষকদের মতে ' নজরুল একম এবং অদ্বিতীয়ম গীতিকার যিনি বাণী ও সুরের মালা দিয়ে আধুনিক গানকে নিখুঁত সুন্দর করে সাজিয়েছেন। আধুনিক গানের সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও রাগাশ্রিত সুর সংযোজন বলিষ্ঠ বাণী, সুরকারের বিভক্তি, সুন্দর পরিবেশনা নজরুলের গানের মূল বৈশিষ্ট্য। '
'বাংলার গীতিকার ও বাংলা গানের নানা দিক গ্রন্থে ' অধ্যাপক রাজ্যেশ্বর মিত্র এ প্রসঙ্গে বলেছেন : ‘বস্তুত বাংলার সঙ্গীতে নজরুলের যখন অভ্যুদয় হলো তখন দেশের জনসাধারণ এই রকম একটি প্রতিভার জন্য উন্মুখ হয়েছিল। উপযুক্ত প্রতিভার অভাবে এই সময়ে বাংলার সাধারণ্যে প্রচলিত সঙ্গীত এক গতানুগতিক নিয়মে চলছিল এবং তার অধোগতি ও সূচিত হয়েছিল খানিকটা- এমন সময় বিচিত্র সম্ভার নিয়ে উপস্থিত হলেন নজরুল ইসলাম। সেই বৈচিত্র্য, নতুনত্ব এবং রচনার সারল্য সকলের হৃদয়গ্রাহী হলো নিতান্ত অল্প সময়ের মধ্যেই।’ কাজী নজরুল ইসলামের আধুনিক বা প্রেমের গান যথার্থই সাধারণ মানুষের হৃদয়ের সঙ্গীতে পরিণত হয়। মর্মে মর্মে সে গান অনুভব করার কারণে সে গানের সুর সহজেই শ্রোতার মনে আনন্দের হিল্লোল তুলে হৃদয় কে চঞ্চল করে এক আশ্চর্য সুখানুভূতিতে ভরিয়ে দেয়। সর্বজনীন হওয়ার সকল উপাদানই তাঁর গানে বর্তমান তাই প্রচার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নজরুলের আধুনিক গান প্রবল বেগে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছিল। যেমন --কবির একটি অন্যতম প্রচলিত রোমান্টিক গান ---
‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়, সে কি মোর অপরাধ ?
চাঁদের হেরিয়া কাঁদে চকোরিণী বলে না তো কিছু চাঁদ।'
প্রেম পর্যায়ের প্রশস্তি মূলক এই গান টি ,দয়িতের অপরূপ সৌন্দর্যে সন্দর্শনে কোনো অপরাধ হয় কিনা ,তা খোঁজার চেষ্টা করেছেন কবি নানা ধরণের প্রাকৃতিক উপকরণের উপমায়।
আবার আরেকটি বহুল প্রচলিত গানে
‘আমায় নহে গো ভালোবাস শুধু’
ভালোবাসো মোর গান
বনের পাখিরে কে চিনে রাখে গান হলে অবসান '---
একটি বিখ্যাত আধুনিক নজরুল গীতি যা শিল্প ও স্রষ্টার সম্পর্কের চিরন্তন সত্য প্রকাশ করে। এখানে মূলত শিল্পী সত্তার অমরত্ব এবং ব্যক্তিগত জীবনের নশ্বরতার প্রতি এক দর্শনিক উপলব্ধির প্রকাশ যেখানে কবি বলেছেন প্রেমিক বা স্রষ্টা হিসেবে নিজেকে নয় বরং তার সৃষ্টি --গান ও শিল্প কে ভালোবাসতে।
আধুনিক গানের আলোচনায় মনে পড়ছে কবির অসংখ্য বিখ্যাত আধুনিক গানের তালিকা যা সারা জীবন এক সংগীত প্রেমিকের জীবনের পরম নির্ভর ভরসার স্থল হয়ে বিবেচিত হতে পারে।
' তুমি কি আসিবে না
বলেছিলে তুমি আসিবে আবার ফুটিবে যবে হেনা।
সেদিন ঘুমায়ে ছিল যে মূকুল
আজি সে পূর্ণ বিকশিত ফুল
সেদিনের ভীরু অচেনা হৃদয় আজি হতে চায় চেনা।'
বিখ্যাত এই রোম্যান্টিক গান টি নজরুলের গীতি-- বিরহ প্রতীক্ষা ও প্রেমের এক অনবদ্য সৃষ্টি। এখানে কবির কল্পনায় প্রিয়তম,প্রিয়তমার ফিরে আসার প্রতীক্ষায় সাঁঝের বেলায় পথ চেয়ে আছেন। গানটিতে প্রকৃতির রূপান্তরের সাথে মানুষের হৃদয়ের আবেগের মিল তুলে ধরেছেন।
অথবা সেই যে তাঁর প্রিয়াকে সাজানোর ঐশ্বরিক চিন্তায় অনুপম প্রেমের গানটি ;--
'মোর প্রিয়া হবে এসো রানী দেব খোঁপায় তারার ফুল
কর্ণে দোলাব তৃতীয়া তিথির চৈতী চাঁদের দুল॥
কণ্ঠে তোমার পরাব বালিকা
হংস-সারির দুলানো মালিকা
বিজলি জরীণ ফিতায় বাঁধিব মেঘ রঙ এলো চুল॥''
এই গানে কবি তাঁর প্রিয়াকে সাজানোর এমন কিছু অসামান্য উপাদান গ্রহণ করেছেন ,মানব জীবনে যা চিরন্তন সৌন্দর্য ময় এক অপার্থিব উপকরণ। কিন্তু যাকে কল্পনায় অনুভব করা গেলে ও কখনো স্পর্শ করা যায় না। এই গানের উপকরণ গোলাপ, পদ্ম, হীরা,মণি মাণিক্য ইত্যাদির মতো অর্থ বা সম্পদের বিনিময়ে সংগ্রহ করার মতো নয়। কল্প-বাস্তব জগতের তৈরি নান্দনিক রসবোধ থেকে এ সকল উপকরণ সংগ্রহ করে অকৃপণ হাতে কবি তাঁর প্রিয়াকে সাজিয়েছেন। বাস্তবতার নিরিখে এ সকল উপকরণ কল্পনার, তাই বাস্তব হয়ে ফুটে উঠেছে কল্পনার চোখে গানে।কবি রচিত অজস্র গানের কাব্যিক সংস্পর্শে মন
উদ্বেলিত হয়ে ওঠে যে আলোচনার সহজে শেষ হয় না।
আরো একটি বিখ্যাত আধুনিক গান মনে পড়ছে কবি রচনা করলেন এই বিশ্ব জগতের জাগতিক রূপ রস গন্ধ স্পর্শ নিয়ে।
খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে।
প্রলয় সৃষ্টি তব পুতুল খেলা
নিরজনে প্রভু নিরজনে॥
শূন্যে মহা আকাশে
মগ্ন লীলা বিলাসে,
ভাঙিছ গড়িছ নিতি ক্ষণে ক্ষণে॥
শিশু যেমন তার খেলনা নিয়ে আপন খেয়ালে নানা রকম ভাঙা-গড়ার খেলা খেলে, জগৎস্রষ্টা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড নিয়ে তেমনি আপন খেলায় মগ্ন।এই বিরাট শিশু সঙ্গীহীন, তাই তার খেলা চলে নির্জনে।আপন আনন্দের এই খেলা বিরমাহীন ভাবে চলেছে মহাবিশ্বের অনন্ত আকাশ জুড়ে। সেখানে মহাকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের সৃষ্টি ও লয়, সুশৃঙ্খল গতিপথ সবই তাঁর খেলার অংশ। তার পরম যত্নের সৃষ্টিই যেন পড়ে থাকে চরম অবহেলায় তাঁর পায়ের কাছে। বিশ্বরাজ তাঁর আপন খেলায় নির্বিকার থাকেন। জাগতিক কোনো সুখ-দুঃখ তাঁকে স্পর্শ করে না। সৃষ্টি এবং ধ্বংসের ভিতর দিয়ে তাঁর লীলা ও তার মাধ্যমে ই তিনি বিরাজ করবেন সদা আনন্দময় রূপে।
প্রকৃতির রূপ নিয়ে তাঁর আর একটি মন স্পর্শ করা গান , সংবেদন শীল চেতনায় আঘাত করে। বৃষ্টি ঘন শ্রাবণের দিনে মন কে উদাসী করে ভারাক্রান্ত করে তোলে ।
''শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে
বাহিরে ঝড় বহে, নয়নে বারি ঝরে॥
ভুলিয়ো স্মৃতি মম, নিশীথ-স্বপন-সম
আঁচলের গাঁথা মালা ফেলিয়ো পথ পরে॥''
'শাওন রাতে যদি' প্রকৃতির ঝড় ও বৃষ্টির সাথে মনের ভেতরের কান্নাকাতর আবেগের এক অপূর্ব মিল এখানে দেখানো হয়েছে। বৃষ্টি ঝরা এক রোমান্টিক শ্রাবণ রাতের ছবি আঁকলেন কবি কথার মালা গেঁথে।একটি কালজয়ী বিরহের নজরুল গীতি। গানটি বর্ষার একাকী রাতে প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা এবং অতীতের স্মৃতি রোমন্থন নিয়ে রচিত হলো ।
জনপ্রিয়তার দিক থেকে আকাশ স্পর্শী চাহিদা আজো সমান আছে নজরুলের আধুনিক কাব্যগীতির।গান সৃষ্টির ক্ষেত্রে কথা ও সুরের অপূর্ব সমন্বয় গড়ে তুলেছিলেন। সংগীতশাস্ত্রের বিভিন্ন রাগের স্পর্শে কবির রচিত এই ধরনের অসংখ্য জনপ্রিয় গান কথা ও সুরের অপূর্ব সমন্বয় গড়ে তুলেছিলেন যা আজও এক মায়া ময় প্রেমের ঐকান্তিক স্পর্শে মধুরের ছোঁয়া দিয়ে যায় । সংগীতশাস্ত্রের বিভিন্ন রাগের স্পর্শে এই ধরনের গান বাংলা গানের ইতিহাস রচনাকালে তাঁর কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করবে। সৃষ্টির মৌলিকতা ও ব্যাপকতায় বর্তমানকালের বাংলা গানের ইতিহাসে নজরুল উচ্চাসন অধিকার করে আছেন। নতুন ধারা প্রবর্তন এবং প্রবর্তিত ধারায় নতুন প্রাণসঞ্চার করে তিনি বাংলা গানে যে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই এবং তা বাঙালীর হৃদয়ের গভীরে উজ্জ্বলরূপে চিরকাল জাগ্রত থেকে এক আবেগের পবিত্র প্রেমের প্রদীপ জ্বালাবে।
জীবনের জমা খরচের ক্লান্তি ও নৈরাশ্য থেকে হঠাৎ কোনো এক স্বপ্নালুমায়াবী ও ভালোবাসাময় নতুন ঠিকানার সন্ধান পেলেন কবি। লিখলেন ;--
' আমার কোন্ কূলে আজ ভিড়লো তরী
এ কোন সোনার গাঁয়
আমার ভাটির তরী আবার কেন
উজান যেতে চায়--
এ গানে নতুন আশ্রয়ে এসে পৌঁছানোর বিস্ময় প্রকাশ করেছেন কবি। ভাটির দিকে ভেসে যাওয়া তরীকে উজান বা ভালোবাসার পথে ফিরিয়ে আনার এক অদৃশ্য "স্বপ্ন-পুরী"র হাতছানি , প্রেমের অনুভূতির ছোঁয়া পেলাম তাঁর গানের তরী সাজিয়ে গান গেয়ে সোনার গাঁয়ে ফেরার ইঙ্গিতে।
আবার শ্রোতা মন গভীর মর্ম বেদনায় তাঁর সাথে সমব্যাথী হয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে যখন তিনি সন্তান হারানোর বেদনায় হতাশায় ভেঙে পড়েন। নিবিড় শোকার্ত কণ্ঠে গেয়ে ওঠেন -- ''শূন্য এ-বুকে পাখি মোর আয় ফিরে আয় ফিরে আয়!
তোরে না হেরিয়া সকালের ফুল অকালে ঝরিয়া যায়॥
তুই নাই ব'লে ওরে উন্মাদ
পাণ্ডুর হ'ল আকাশের চাঁদ,
কেঁদে নদী-জল করুণ বিষাদ ডাকে : 'আয় ফিরে আয়' ॥
কবির রচিত অত্যন্ত বেদনাদায়ক এই গানটি যা মূলত তাঁর অকালমৃত পুত্র বুলবুলের প্রতি শোক ও সন্তান হারা পিতৃ হৃদয়ের ব্যাকুলতা থেকে সৃষ্টি হয়েছিল। প্রিয়জনের কাছে পাওয়ার তীব্র আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে গানের প্রতিটি পংক্তিতে। প্রিয়জন নেই বলে বিষাদময় কবির পৃথিবীতে সকালের ফুল অকালে ঝরে যাচ্ছে আকাশের চাঁদ পান্ডুর নদীর জলে ও একরাশ কান্না মিশে গিয়েছে ।
রাগপ্রধান বাংলা গানে রাগসঙ্গীতে সুরধারা কে নজরুল উজাড় করে এনে গ্রথিত করতে সমর্থ হন। ফলে বাংলা গানে ঐতিহ্যের বহুমুখীকরণ ঘটেছে । এখানেও নজরুলকে আমরা এক ঐতিহাসিক ভূমিকায় দেখতে পাই। এর আগে রাগসঙ্গীতের ধারাবাহিক আলোচনায় বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করেছি তাঁর গানে যেমন আলাপ, বিস্তার, তান, সরগম রয়েছে, তেমনি আধুনিক বাংলা গানে ও সেসবের সমন্বয় ঘটিয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ও সুনিপুণভাবে তিনি রচনা করেছেন- ‘মেঘ মেদুর বরষায়’ (রাগ : জয়জয়ন্তী, তাল : ত্রিতাল), ‘গগনে সঘন চমকিছে দামিনী’ (রাগ : মেঘ, তাল : ত্রিতাল), ‘ভোরে ঝিলের জলে’ (রাগ : জিল্ফ্, তাল : ত্রিতাল), ‘নীলাম্বরী শাড়ি পরি’ নীল যমুনায় কে যায়’ (রাগ : নীলাম্বরী, তাল : ত্রিতাল) ইত্যাদি।
কাজী নজরুল ইসলামের বিশ্বাস সঠিক ছিল যে, বাংলা গানের ইতিহাস রচনাকালে তাঁর কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করা হবে। সৃষ্টির মৌলিকতা ও ব্যাপকতায় বর্তমানকালের বাংলা গানের ইতিহাসে নজরুল উচ্চাসন অধিকার করে আছেন। নতুন ধারা প্রবর্তন এবং প্রবর্তিত ধারায় নতুন প্রাণসঞ্চার করে নজরুল গানে গানে যে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন, সন্দেহ নেই যে, তা বাঙালীর হৃদয়ের মণিকোঠায় চির উজ্জ্বল আসনে প্রতিষ্ঠিত থাকবে ।
তথ্য সূত্র :---১)নজরুল জীবনী / করুণা ময় গোস্বামী
২)নজরুল গবেষক ও অনুবাদক / পীযুষ ভট্টাচাৰ্য
৩)নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ মালা
৪) নজরুল রচনাবলী, বাংলা একাডেমি।
৫) নজরুল / রফিকুল ইসলাম
0 Comments