অরিজিৎ লাহিড়ী
৮ মার্চ এলে পৃথিবীটা হঠাৎ খুব ভদ্র হয়ে যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় গোলাপের ইমোজি ঝরে পড়ে, কর্পোরেট অফিসে কেক কাটা হয়, আর বিজ্ঞাপনের পর্দায় এক নতুন পৃথিবীর প্রতিশ্রুতি ঝলসে ওঠে—যেখানে নারী স্বাধীন, শক্তিশালী, এবং অবশ্যই ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর।
কিন্তু একটু দাঁড়ান। এই উৎসবের ভেতরেই একটা প্রশ্ন কেমন যেন গুনগুন করে—পুরুষতন্ত্রের প্রকৃত ধারক-বাহক কে?
কারণ বিষয়টা এত সোজা নয় যে বললেই হল, পুরুষ মানেই শত্রু আর নারী মানেই মুক্তির প্রতীক। বাস্তবতা এতটা সরল হলে পৃথিবীটা অনেক আগেই নৈতিকতার বিজ্ঞাপনের মতো পরিষ্কার হয়ে যেত।
সমস্যা হলো, আমরা যে বাস্তবতাকে সত্য বলে ধরে নিই, সেটাও অনেক সময় বানানো। সমাজ একটা বিশাল ভাষার খেলা। এখানে শব্দগুলো শুধু শব্দ নয়—ক্ষমতার অস্ত্র। “সমতা”, “মুক্তি”, “নিরাপত্তা”, “নারীবাদ”—এই শব্দগুলোও তাই। এগুলো কেবল ভাবনা নয়, বরং একটি গল্প, যা কেউ লিখছে, কেউ বিক্রি করছে, আর কেউ বিশ্বাস করছে।
এই ছোট ছোট ছোটগল্পের বড় লেখক এখন গণমাধ্যম, সিলিকন ভ্যালি নিয়ন্ত্রিত সোশ্যাল মিডিয়া আর কর্পোরেট সংস্কৃতি।
দেখুন না, বড় বড় কোম্পানিগুলো নারী দিবসে কী সুন্দর বিজ্ঞাপন বানায়। কর্মক্ষেত্রে নারী নেতৃত্বের গল্প, অনুপ্রেরণার ভিডিও, আর শেষে ব্র্যান্ডের লোগো—যেন মুক্তির পথটা শেষ পর্যন্ত এসে থামে কোনো প্রোডাক্টের প্যাকেটের ওপর।
অদ্ভুত ব্যাপার হল, বছরের বাকি ৩৬৪ দিনে একই অফিসে একজন নারী কর্মীকে কতবার নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়, সেই গল্পটা বিজ্ঞাপনে আসে না। কর্পোরেট বোর্ডরুমে সমতার বক্তৃতা যত জোরে শোনা যায়, বাস্তবে ক্ষমতার চেয়ারগুলো ততটাই নীরব থাকে।
এখানেই শুরু হয় এক অদ্ভুত নাটক।
একদিকে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিদিন খবরের শিরোনাম—দিল্লি, মুম্বই, কলকাতা, কোথাও না কোথাও নতুন এক ভয়াবহ ঘটনা। অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয় হ্যাশট্যাগের ঝড়। কয়েকদিন ধরে সবাই ক্ষুব্ধ, প্রতিবাদী, নৈতিকভাবে উচ্চ। তারপর অ্যালগরিদমের পরবর্তী ট্রেন্ড এসে পড়ে, আর ন্যায়বিচারের উত্তাপ ঠান্ডা হয়ে যায়।
প্রতিবাদ যেন এখন এক ধরনের পারফরম্যান্স।
ফোনের স্ক্রিনে আমরা সবাই নৈতিক। রাগ, ক্ষোভ, সংহতি—সবকিছুই কয়েকটা পোস্ট আর রিলের মধ্যে বন্দি। বাস্তব রাস্তায় দাঁড়িয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার চেয়ে টাইমলাইনে একটি বাক্য লেখা অনেক সহজ।
এই ডিজিটাল প্রতিবাদেরও আবার নিজস্ব রাজনীতি আছে।
কিছু ঘটনা মুহূর্তে ভাইরাল হয়, আর কিছু ঘটনা অদৃশ্য হয়ে যায়। কোন গল্পটা আলো পাবে আর কোনটা অন্ধকারে পড়ে থাকবে—সেটা নির্ধারণ করে এক অদৃশ্য ক্ষমতার খেলা। ফলে ভুক্তভোগিতাও অনেক সময় একটি সামাজিক মুদ্রায় পরিণত হয়।
যার গল্প বেশি শোনা যায়, তার সত্যও যেন বেশি সত্য হয়ে ওঠে।
এই জায়গায় এসে আরেকটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন মাথা তোলে—যে নারীবাদ এত জোরে প্রচারিত হচ্ছে, সেটি কি সত্যিই পুরুষতন্ত্রকে ভাঙছে, নাকি কেবল তার নতুন সংস্করণ তৈরি করছে?
কারণ ক্ষমতা খুব চালাক জিনিস। সে কখনো খালি জায়গা রাখে না। পুরোনো কাঠামো ভাঙলে সে নতুন রূপ নিয়ে ফিরে আসে।
আজ অনেক সময় দেখা যায়, মুক্তির ভাষাটাও ক্ষমতার ভাষা হয়ে ওঠে। যে কাঠামো একসময় নারীদের চুপ করিয়ে রাখত, সেই একই কাঠামো এখন অন্য এক দলকে চুপ করাতে ব্যবহার হয়। কথার মঞ্চ বদলেছে, কিন্তু মঞ্চের নিয়মগুলো খুব একটা বদলায়নি।
মজার ব্যাপার হলো, এই খেলায় সবাই অংশগ্রহণ করে। পুরুষ, নারী, মিডিয়া, কর্পোরেট, এমনকি প্রতিবাদীরাও।
কারণ আমরা সবাই গল্পের ভেতরেই বাস করি। আর গল্পটা যত বেশি আবেগী, তত বেশি বিক্রি হয়।
এই কারণেই নারী দিবসের দিন পৃথিবীটা এত সুন্দর দেখায়। কারণ সৌন্দর্য এখানে এক ধরনের কৌশল। বাস্তবের অসমতা, ভয়, আর অন্যায়কে একটু ঢেকে রাখার জন্য সমাজ মাঝে মাঝে একদিনের ফুলের তোড়া দেয়।
কিন্তু ফুলের গন্ধ যতই ভালো হোক, প্রশ্নটা থেকে যায়।
পুরুষতন্ত্র কি সত্যিই শুধু পুরুষের হাতে টিকে আছে? নাকি এটি এক বৃহৎ সামাজিক যন্ত্র, যেখানে নারী, মিডিয়া, বাজার, এবং মতাদর্শ—সবাই মিলে সেই চাকা ঘোরায়?
হয়তো সমস্যাটা আসলে লিঙ্গের নয়।
0 Comments