জ্বলদর্চি

সোনার হরিণ/পুলককান্তি কর

সোনার হরিণ

পুলককান্তি কর


অতীনের হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাসটা দেখতে দেখতে হঠাৎ আনমনা হয়ে গেল নীলেশ। গীতা থেকে একটা শ্লোক এবং তার অর্থ দিয়েই লেখা। ‘কর্মেন্দ্রিয়ানি সংযম্য  য আস্তে মনসা স্মরন্‌/ ইন্দ্রিয়ার্থান্বিমূঢাত্মা মিথ্যাচারঃ স উচ্যতে’ অর্থটা হলো অকারণ ইন্দ্রিয়ের লোখদেখানো সংযম করে লাভ কিছু হয় না। মন যদি স্মরণেও সেই সব ইন্দ্রিয়ার্থ ভোগ করে তবে সংযমের আর কিছু অবশেষ থাকে না। কায়িক বাচিক মিথ্যাচারকে না হয় আটকানো যায়, কিন্তু মন যদি মনে মনে চোখ কান জিভের বিষয় গুলোকে ভোগ করতে থাকে, সে মিথ্যাচারকে ঠেকাবে কী ভাবে? 

একটু আগেই দেবী উকিলের চিঠি পাঠিয়েছে। সেপারেশানের। চার্জটা সাঙ্ঘাতিক কিছু আপাতত লাগছে না, কোর্টে আদৌ কতটা ধোপে টিকবে  কে জানে,  কিন্তু ওর কাছে ব্যাপারটা সিরিয়াসই। ইগনোরেন্স। নীলেশ শরীরের এবং মনে নাকি দেবীকে ততখানি ইমপর্টেন্স এবং রেসপেক্ট দিতে পারছে না যতখানি তাকে দেওয়া উচিৎ ছিল। উকিলের বয়ানের ছত্রে ছত্রে কোথাও সেই মিথ্যাচারের গন্ধ আসছে, অথচ তাকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। বাড়ীতে একগাদা কাজ জমে আছে। ওয়াশিং মেশিনটা চালানো দরকার, বাথরুমটাও নোংরা হয়ে আছে। তিনদিন মিউনিসিপ্যালিটির লোক আসেনি, ঘরের সমস্ত জঞ্জাল পচে কেমন একটা বিজাতীয় গন্ধ ছড়াচ্ছে ঘরে। মালতী দরজার সামনে এসে বলল, ‘ভাতটা বসিয়ে দিয়ে গেলাম। ফ্যানটা গেলে নেবেন। ভুলে যাবেন না যেন।’

–  মালতী তুমি কি এখন নীচে নামবে, নাকি অন্য বাড়ী যাবে? 

–  কেন দাদা, দরকার ছিল? 

–  আমার জন্য এক প্যাকেট সিগারেট এনে দেবে? আমার আর জামাকাপড় পরে নীচে নামতে ইচ্ছে করছে না আদৌ। 

–  ঠিক আছে টাকা দেন। 

–  আর শোন না, নীচে যাচ্ছ যখন, সিকিউরিটিকে বলে ময়লাগুলো নীচে কোথাও রেখে এসো না! গন্ধে থাকতে পারছি না তো! 

–  হ্যাঁ। ওই কাচড়া নিতে আসে যে লোকটা, বিশে’দা, ওকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। অফিসে গিয়ে কমপ্ল্যান জানান। অন্য লোক না এলে এ সমস্যা চলতেই থাকবে। 

–  পুলিশ ধরেছে কেন? 

–  ওর বউ গলায় দড়ি দিয়েছে যে। 

–  বাঃ। তুমি তো অনেক খবর রাখো হে। 

–  দাদা, আমরা দশ বাড়ী কাজ করে খাই। শুনাশুন অনেক খবরই পাই। 

হঠাৎ করে ভীষণ একটা হতাশা বোধ এল নীলেশের। দেবীর ওর সাথে না থাকার খবরটাও নিশ্চই গত দু’মাসে শুনাশুন সারা কমপ্লেক্সে ছড়িয়ে পড়েছে। মান-সম্মানের দফারফা। নিজেকে কিছুটা সামলে নীলেশ বলল, ‘তুমি কি আমার রান্নার বিষয়টা ভাবলে?’ 

মালতী মেয়েটি বেশ বুদ্ধিমতী। এবার গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করলো। ছুটিছাটা থাকলে মায়ের ধরা কাজগুলোয় মাকে হেল্প করতে আসে। ফলে শিক্ষাজনিত বা স্বাভাবিক বুদ্ধি বশেই দেবীর ব্যাপারে কোন কৌতূহল প্রকাশ করল না। শুধু বলল, ‘মা আপনার রুটিন মতো কাজে আসতে পারবে না দাদা। আপনার তো সেই সকালে এসে জলখাবার আর টিফিন করে দিতে হবে।’ 

–  আমি তো তোমার মায়ের ব্যাপারে বলিনি মালতী। তুমি যদি এসে করে দিতে... 

–  আমার কী করে সময় হবে দাদা? আমার যদি এম.এ তে ভর্ত্তি টা হয়ে যায়। 

–  তখন দেখা যাবে। এখন তো রেজাল্ট বেরোতে দেরী আছে। 

–  কিন্তু এখন তো মা এর কাজ গুলোয় আমি ঠেকনা দিই।

–  আমি কি তোমার মায়ের সাথে কথা বলবো?  

–  সে আপনি বলতে পারেন, তবে লাভ হবে না দাদা। 

নীলেশ বড় একটা শ্বাস ফেলল। স্বাভাবিক হয়তো। আমাদের দেশে একটা সোমত্থ মেয়ে একজন একা পুরুষের ফ্ল্যাটে রান্নার কাজ নেবে, দেখতে কেমন লাগে। অবশ্য আজকাল এসবের কে বা পরোয়া করে। ওর উল্টো দিকের ফ্ল্যাটটায় একটি মেয়ে একা একা থাকে। সপ্তাহে দু-থেকে তিন দিন যুবক ছেলেদের আনাগোনা হয় ওই বাড়ীতে। নীলেশ খেয়াল করে দেখেছে, দু একদিন রাতও কাটিয়ে যায় কেউ কেউ। কীই বা আসছে যাচ্ছে কার। হয়তো কানাঘুঁষো হয় এই নিয়ে। তবে মেয়েটি পাত্তা দেয় বলে মনে হয় না। কোনও বেসরকারী অফিসে ভালো চাকরি করে; বেশ ভদ্র মার্জিত ব্যবহার। অন্তত সামনাসামনি দেখা হলে কখনও অসৌজন্য তো দেখায় নি মেয়েটি। আচ্ছা, অনুমানে মেয়েটির ব্যক্তিগত পরিসরে উঁকি মারাটাও কি মিথ্যাচার? এতে কোন ইন্দ্রিয়ার্থের সম্ভোগ হচ্ছে? মন তো উভয়েন্দ্রিয় – ওর বিষয় কি? গুগুলে সার্চ দিল নীলেশ – চিন্তা, বিচার্য … কঠিন কঠিন সব শব্দ, থাক মাথা ঘামিয়ে কাজ নেই।

মালতী ফিরে এল। বেশ মেয়েটি। বেশ ছন্দময়, মাঝারি চেহারা, মোটামুটি ফর্সা। নীলেশের বেশ ভালোই লাগে ওর সপ্রতিভতা, ওর লড়াই। আচ্ছা, মালতীর কি কোনও বয়ফ্রেন্ড আছে? থাকাটাই স্বাভাবিক। স্ত্রী হিসেবে এমন মেয়ে যদি ওর হতো, সেও কি দেবীর মতো হতো? কী যে আবোল তাবোল চিন্তা আসছে মাথায়। অতীনই বা এত সাধু পুরুষ হয়ে গেল কী করে? গীতা পড়ার কি এটা বয়স? সারা জীবনই তো ছিঁছোরি বৃত্তিতেই কেটে গেল ওর। সারা জীবন মেয়েদের পেছনে ছোঁকছোঁকানি আর ঝাড় খেতে খেতে বড় হওয়া অতীন আজ বড় হাসপাতালের মস্ত ডাক্তার। উইক এন্ডে কনফারেন্স ট্যুরের নাম করে নার্সদের সাথে ঘুরে বেড়ানো নইলে কোম্পানিদের দেওয়া দেশী বিদেশী নানা ধরনের শয্যাসঙ্গী উপঢৌকন পেতে অভ্যস্ত অতীন যদি আজ গীতার বাণী দেয় – তার উদ্দেশ্য বুঝে নিতে সময় লাগে বইকি।

আজ আর কোনও কিছুতে মন বসছে না নীলেশের। বারবার ছেলেবেলার কথা মনে আসছে। ওর বাবার কথা, মায়ের কথা, প্রতিবেশী বেলা কাকীমার কথা। প্রত্যেকদিন বিকেলবেলা বেলা কাকীমার ওদের বাড়ী এসে গল্প করা, ক্বচিৎ কখনও মা না থাকলে ও বাড়ী থেকে রান্না পাঠানো সবকিছু কি জলের মতো পরিষ্কার ছিল? কখনও কি কারও মনের তরঙ্গে অন্যের ছায়া পড়তো না? নীলেশ নিজে একদিন ওর বাবার বুকে বেলা কাকীমাকে ফুঁপিয়ে কাঁদতে দেখেছে, আজ এই ছত্রিশ বছরের জীবনে ও একটি বারের জন্যও কাউকে এ কথা মুখ ফুটে বলতে পারেনি, আদৌ কি তার মধ্যে কোনও কামনার গন্ধ ছিল? যতদিন বাবা বেঁচে ছিলেন, নীলেশ কোনওদিন তাঁর মধ্যে নিজের পরিবারের প্রতি, স্ত্রীর প্রতি উদাসীন্য বা অমনোযোগ দেখেনি। মৃত্যুকালেও বারবার নিজের স্ত্রীকেই স্মরণ করেছেন; বেলা কাকীমাও তো ছিলেন পায়ের কাছে বসে। সবই কি সমাজের অধিকারের দাবী মেনে, নাকি সবই ওর অতি কল্পনা? কে জানে। বাবার মৃত্যুর পরও বেলা কাকীমা নাকি এখনও নিয়ম করে ওদের বাড়ী আসেন প্রতিদিন বিকেল বেলা, মায়ের সাথে গল্প স্বল্প করেন, চা খান। মা কতকটা বাড়ীর টানে কতকটা বেলা কাকীমার টানেই কখনও গ্রামের বাড়ী ছেড়ে এসে কলকাতায় চার রাত্তিরের বেশী ওদের কাছে থাকেন নি। সব কিছুই বড় আশ্চর্য লাগে নীলেশের।

কলিংবেলের আওয়াজটা পেয়ে অনেক কষ্টে টলতে টলতে উঠে দরজা খুলে দিল নীলেশ। ‘কে এলে? দেবী, ও এসো এসো! বড় ভালো সময়ে এসেছ গো। খুব জ্বর হয়েছে আমার। বসো চুপটি করে। আমি একটু ঘুমিয়ে নিই।’ 

–  ‘আহা এত গরম লাগছে কেন আমার? তুমি আমায় শিলংএ নিয়ে যেতে এসেছ। আমাদের হানিমুনের স্পটটায়? 

–  হ্যাঁ। চল যাই, আর একবার চেষ্টা করে দেখি। 

–  দেবী চারদিকে, এত লাল লাল ফুল, কিসের এটা? 

–  এ তো চেরী ফুল! ছবি দেখোনি? সারাজীবন খালি পড়ার বইয়ে মুখ গুঁজে রইলে। বাইরের কত কিছু জানো না। 

–  তুমি এখন শিলং এ থাকো বুঝি? 

–  হ্যাঁ। ওখানে একটা স্কুলে পড়াই। 

–  কেন দেবী? কলকাতায় স্কুল পেলে না? এত দূরে একা একা থাকো। একা থাকতে আজকাল ভালো লাগে বুঝি তোমার? 

–  অভ্যেস হয়ে গেছে। তোমার সঙ্গে থাকার সময় গুলোয় তুমি তো কেবল নামেই ছিলে।

–  এমন কথা বলছো কেন দেবী? আমি তোমার প্রতি কোন কর্তব্য কর্ম করিনি? 

–  কর্তব্য করেছ; কর্ম করোনি। ওতে তোমার দেহ ছিল, মন ছিল না। 

–  একথা ঠিক নয় দেবী! কর্ম তো ইন্দ্রিয় করে! মন ছাড়া কি ইন্দ্রিয় কাজ করতে পারে? 

– একশো ভাগ ঠিক নীল। কর্ম  ইন্দ্রিয়ে দ্বারা হয়, ঠিক কথা। কিন্তু সারাদিন আমাদের ইন্দ্রিয় কোটি কোটি কাজ করে। তাদের বিষয়গুলো থেকে তথ্য নেয়। কিন্তু যখন ইন্দ্রিয়ের সাথে মনের যোগ হয়, তখনই সেটা কর্ম হয়ে ওঠে। তুমি কখনও আমাকে মন দাওনি। 

–  আমি আর কোথায় মন দেবো দেবী। তুমি জানো আমার অন্য কোনও অ্যাফেয়ার নেই, অন্য কোথাও যাবার নেই। তোমার তো তাও সুমিত আছে। 

–  কে সুমিত? 

–  তুমি কটা সুমিত কে চেনো দেবী? তোমার মিতা, তোমার প্রাক্তন, ভুলে গেলে? 

–  ও এখন বিবাহিত নীল। 

–  তাতে কী হল? স্মৃতি তো আছে? 

–  তুমি এতটা সন্দেহ বাতিক? হিপোক্রিট একটা! মনে মনে এত জ্বালা তো বিয়ে করেছিলে কেন? 

–  ওই দ্যাখো না চেরী গাছের আড়ালে উঁকি মারছে ঐ লোকটা কে? ন্যাকামো মারছো? ওটা সুমিত না? একি তুমি আমার চোখে মুখে জল ঢালছো কেন? কে, কে আপনি? 

–  আমি মিতিন, আপনাদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকি। ধড়মড়িয়ে  উঠে বসলো নীলেশ। ‘ও মা, আপনি কী করে এলেন?’ 

–  আমি কলিং বেল বাজিয়ে ওয়েট করছিলাম। আপনি দরজাটা খুলেই ধড়মড় করে চেয়ারে বসে এলিয়ে পড়লেন। খুব সম্ভবত আপনার জ্ঞান ছিল না। আপনাকে টেনে তুলতে গিয়ে দেখি আপনার গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। 

–  আমি বিছানায় এলাম কী করে? 

–  সন্ধ্যের সময় আপনার কাজের মেয়েটি এসেছিল।

–  কে, মালতী? 

–  হ্যাঁ, তাইতো বললো ওর নাম। ও আর আমি কোনরকম তুলে আপনাকে এখানে শুইয়েছি। 

–  এখন কটা বাজে? 

–  সাড়ে ন’টা। 

–  ও মা এতক্ষণ আপনি এখানে বসে আছেন? ছি ছি! 

–  আরে ও নিয়ে আপনি ভাববেন না। প্রতিবেশী যদি প্রতিবেশীর উপকারে না আসে তো কে আসবে!

নীলেশ পাশেই জলের বাটি আর জলপট্টি দেখে বলল, ‘এতক্ষণ বুঝি জ্বর ছাড়ানোর এই প্রক্রিয়া চলছিল?’ 

–  কী আর করা? আপনাকে যে একটা প্যারাসিটামল খাইয়ে দেব, সে উপায়ও ছিল না। এতক্ষণ জলপট্টি দিয়ে দিয়ে, জ্বরটা ছাড়লো এবার। 

–  অনেক ধন্যবাদ। আসলে আজকে একটু বাড়াবাড়ি হয়েছে জ্বরটার।

–  কদিন ধরে জ্বর? 

–  আজ দশ দিন হল। 

–  ডাক্তার দেখিয়েছেন? 

–  হ্যাঁ। আমার এক ডাক্তার বন্ধুর সাথে ফোনে কথা বলে ওষুধ খাচ্ছি। 

–  ফোনে হবে না; গিয়ে দেখান; কিছু বাড়াবাড়ি বলেই মনে হচ্ছে। দরকার পড়লে বলবেন, আমি নিয়ে যাব। দেবীদি নেই যখন। 

নীলেশ একটু থতমত খেল। দেবীর না থাকাটা মিতিন জানে? না কি আজ এসে মালতীর মুখে শুনলো? মালতী চাপা মেয়ে, নিজে থেকে বলবে বলে মনে হয় না। হয়ত, এই পরিস্থিতিতে দেবী কোথায় জিজ্ঞেস করে থাকবে মিতিন, তার উত্তর দিতে গিয়েই হয়তো... নীলেশ তাড়াতাড়ি করে বলল, ‘না না ধন্যবাদ। তার দরকার হবে না। আমি এখন সুস্থ বোধ করছি অনেকটা, কাল দরকার পড়লে জ্বর কমার ওষুধ খেয়েই চলে যেতে পারবো।’

–  সে আপনার ইচ্ছে নীলেশবাবু। আমি তো জোর করতে পারিনা। তবে আপনি যদি আমাকে নিয়ে যেতে আপত্তি না করেন, আমার অসুবিধে হবে না। 

–  কিন্তু আপনার অফিস? 

–  একদিন অফিস না গেলে কি আমার চাকরী চলে যাবে, নীলেশবাবু? বেসরকারী অফিস যদিও, তবু আমার বোলবালা চলে। আপনি তা নিয়ে ভাববেন না। আপনি রাতে খাবেন কী বলুন? 

–  মালতী কিছু করে যায় নি? 

–  আমি বারণ করেছি। আপনার তখন যা অবস্থা ছিল, নার্সিংহোমে দেওয়ার কথাই ভাবছিলাম... আর একটু দেখেই হয়তো ডিসিশন নিতাম...। 

–  মুড়ি টুড়ি আছে ঘরে; খেয়ে নেব। আপনি অনেক কষ্ট করেছেন; যান এবার বিশ্রাম করুন গিয়ে। রাত হয়েছে। 

–  আমার কথা ভাবতে হবে না। এমন কিছু দূর থাকি না যে রাতের ভয় পেতে হবে। পাশের ফ্ল্যাট, যখন খুশী যেতে পারি। আজ যা আপনার অবস্থা, তেমন হলে নাও যেতে পারি, আমার কোনও চাপ নেই। তবে আপনার কথা আলাদা... দেবীদির একটা পারমিশন নেওয়া দরকার। ওর খারাপ লাগবে যদিও, কিন্তু আজ যে কন্ডিশন আপনার ছিল আপনাকে ছেড়ে যাওয়াটাও আমার বিবেক সায় দিচ্ছে না। 

–  দেবীর পারমিশন আর দরকার নেই মিস... আপনাকে মিতিন বলেই ডাকবো? তুমি আমার থেকে বেশ ছোট। 

–  তা ডাকুন। কিন্তু দরকার নেই কেন? দেবীদি এখন আসবে না? 

–  না। ও আমাকে ডিভোর্সের নোটিশ পাঠিয়েছে। 

–  স্যরি নীলেশ বাবু। আমি জানতাম না। মালতী বলল, বৌদি বাপের বাড়ী গেছে। ওই কারণে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম। স্যরি। 

–  আরে এতে তুমি স্যরি ফিল করছো কেন? বাইশ দিন আগে ওর উকিলের চিঠি এসেছে।

–  থাক নীলেশ বাবু, আমি শুনতে চাই না। এটা আপনাদের প্রাইভেট ম্যাটার। 

–  প্রাইভেট আর থাকছে কোথায়? লোক ভর্তি আদালতে যখন সাওয়াল জবাব হবে, তখন কি আর গোপন থাকবে কিছু? 

–  তা হোক। আমার শোনার কোনও ইন্টারেস্ট নেই। 

–  আমার যে তোমাকে বলতে ইচ্ছে করছে মিতিন! 

–  থাক না! কী হবে আমায় বলে? 

–  কিছুই হয়তো হবে না। তবে না বললে, জীবনে আর হয়তো বলা হবে না মিতিন! আমার সব কথা আজ কেন জানি তোমাকে বলতে ইচ্ছে করছে। সব যা কিছু আমার পক্ষে, বিপক্ষে... যা কিছু সত্যি, আবার একসঙ্গে মিথ্যাও... সব বলবো তোমায়। শুনবে দয়া করে? 

–  দাঁড়ান! আগে কিছু খাবার ব্যবস্থা করি গে। স্টু খাবেন? আমার বাড়ীতে চিকেন আছে। 

–  খেতে পারি। 

–  বেশ বসুন চুপটি করে। ওষুধপত্র কোথায় আছে বলুন, এনে দিচ্ছি।

জ্বরটা ছেড়ে এখন শরীরটা বেশ ঝরঝরে লাগছে নীলেশের। আধঘন্টা হল মিতিন গেছে ওর ফ্ল্যাটে, রান্না বান্না করেই আসবে। হঠাৎ করে নিজেকে বড় বেশী প্রগলভ এবং করুণা প্রার্থী মনে হল তার। নিজের গোপন কথা বাইরের লোকের কাছে মেলে ধরার কী আছে? মিতিনের সাথে আর কতটুকু আলাপ? নিঃসন্দেহে সে ওর শুশ্রূষা করেছে, আন্তরিকও হয়তো, কিন্তু তার জন্য নিজের গোপন দুর্বলতা গুলোকে নিয়ে ধরা দেওয়ার আদৌ কি কোনও দরকার আছে? নিজেকে ধিক্কার দিল নীলেশ। ভাগ্যিস মিতিন একটা ব্রেক দিল, নতুবা এতক্ষণে হয়তো হাবিজাবি অনেক কথাই বলে ফেলতো ওকে। মিতিন কি জাদু জানে? কী এমন অমোঘ শক্তি আছে তার, শুধুমাত্র কয়েক ঘণ্টার নৈকট্যেই ওর ভেতরের সব স্তরীভূত কথাগুলোকে চৌম্বক কণার মতো টেনে আনছে বাইরে। না হে নীলেশ, হৃদয়ের দরজায় কুলুপ আঁটো, ঠিক যেমনটা এঁটেছিলে ক্লাস টুয়েলভের পরীক্ষার শেষে, অলিদের চিলেকোঠার ঘরে। যেমন করে বি.এস.সি পড়ার সময় শুক্লা আর অসীমাকে। মনে মনে কত হাজার প্রণয় বার্তা আর কামনার ভিড়কে তুমি কখনও মেলে ধরতে পারোনি নন্দার কাছে। হয়তো তার দরজা তোমার জন্য কোনওদিন খুলতো না – এই ভেবে নিজেকে কতখানি বিচক্ষণ ভেবেছো; অথচ সেই ফাঁকে এক এক করে হারিয়ে গেছে তোমার সব ভালবাসার অনুভূতি, কাউকে চাওয়ার অনুভূতি। 

–  চোখ বুঝে কী ভাবছেন এতক্ষণ? মিতিন ফিরে এসেছে। অনেকক্ষণ এসেছে কি? চোখ খুলে নীলেশ বলল, ‘কখন এলে?’ 

–  খানিকক্ষণ।

–  আওয়াজ পাইনি। খুব সন্তর্পনে এসেছ বুঝি? 

মিতিন উঠে এসে নীলেশের কপালে বুকে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ছুঁয়ে বলল, ‘জ্বর নেই এখন।’ 

–  তাই তো মনে হচ্ছে। 

–  খেয়ে নিন; গরম গরম, ভালো লাগবে। 

–  তুমি খাবে না। 

–  খাবো। 

–  ভাত রুটি কিছু করে নাও আমার কিচেনই। 

–  না, না। রাতে আমি ভারী কিছু খাই না; স্ট্যু টাই খেয়ে নেব। 

নীলেশ হেসে বললো ‘ফিগার কনসাস?’ 

–  একদমই না। আসলে আমার হালকা কিছু খেলেই শরীর ফিট লাগে। 

স্ট্যু টা দেবীও খুব ভালো বানাতো; মিতিনের রান্নার হাতটাও বেশ ভালো। এই কদিন জ্বরের তাপে মুখের রুচিটাই চলে গিয়েছিল। গোলমরিচ দিয়ে বেশ গরম গরম খেয়ে খানিকটা স্বস্তি বোধ করল নীলেশ। খানিক প্রশংসাও করল রান্নার। মুখ ধুতে ধুতে বলল, ‘আচ্ছা মিতিন তুমি হঠাৎ আজ আমার বাড়ীর বেল বাজিয়েছিলে কেন, সেটাই তো জিজ্ঞেস করা হয়নি। 

–  একটা দরকার ছিল। 

–  বলো। 

–  না না দরকারটা ইনফ্যাক্ট দেবীদির সাথেই ছিল। 

–  দেবী তো আর ফিরবে না। আমি কি ও বিষয়ে তোমাকে সাহায্য করতে পারবো না? 

–  আরে ছাড়ুন তো। ওটা লেডিস কমোডিটি রিলেটেড। আপনাকে বলা যাবে না; আর তাছাড়া ব্যাপারটা ম্যানেজ হয়ে গেছে। কিছুটা কথা ঘুরানোর জন্যই মিতিন বললো। ‘দেবীদি ফিরবে না আপনি স্যিওর? ফেরানোর চেষ্টা করেছেন?’ 

–  দু চার বার ফোন করেছি, তোলেনি। 

–  দেখা করুন। সামনাসামনি কথা বললে অনেক সমস্যার সমাধান হয়। 

–  ছাড়ো। যে যেমন সুখে থাকতে চায়, থাকুক। 

–  তার মানে আপনিও কি মনে মনে চান, দেবীদি না ফিরুক? আপনার চাওয়াটা যেমন হবে, তেমনিই তো আপনাকে মুভ করতে হবে। নিজে কী চান, পরিস্কার হোন নিজের কাছে। 

–  পরিষ্কার হতে পারছি না মিতিন, সমস্যাটা এখানেই। 

–  আপনি কি দেবীদিকে ভালবাসেন না? 

–  চুপ করে রইল নীলেশ। ও তাকিয়ে দেখল মিতিনের চোখগুলো হঠাৎ করে যেন একশো পাওয়ারের আলোর মতো জ্বলছে। ওর ভেতর থেকে তীব্র একটা জ্যোতি বেরিয়ে এসে যেন এক্স-রের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছে ওর সমস্ত অন্তস্থল। সে ধীরে অথচ পরিষ্কার গলায় বলল, ‘বাসি।’ 

–  তাহলে আর সমস্যা কোথায়? ব্যগ্র শোনালো মিতিনের গলা।

–  সমস্যাটা আমার নয়। দেবীর ভালোবাসার চাহিদার লেভেলটা আমারে লেভেল দিয়ে মিটছে না। 

–  ব্যস? এটা কোনও সমস্যা? 

–  তোমার কাছে নয়; দেবীর কাছে এইটাই মস্ত সমস্যা। 

–  মানুষের কোনও কিছুর অভাব না থাকাটাই মাঝে মাঝে মস্ত অভাবের কারণ হয়ে দাঁড়ায় নীলেশবাবু। গরীব খেটে খাওয়া মানুষদের কাছে বা খুব ব্যস্ত মানুষদের কাছে এসব বিলাসিতা।

–  তা ঠিক। মেটেরিয়ালিটিক বিষয়ের অভাব নিয়ে মানুষ কম দুঃখ পায়, অ্যাবস্ট্রাক্ট জিনিসের অভাবটাই মানুষের আসল সমস্যার কারণ। 

–  ইংরেজীতে অ্যাবস্ট্রাক্ট শব্দের সঠিক দার্শনিক মানেটা কি জানেন? 

–  না। 

–  অ্যাবস্ট্রাক্ট বিষয় মানেই অভাব বস্তু। যার ভাব বা জাগতিক অস্তিত্ত্ব নেই। 

–  জানতাম না তো। 

–  বৈশেষিক দর্শনে অভাবটাকেও একটা পদার্থ বলে স্বীকার করা হয়েছে। কী অদ্ভুত ভাবনা ছিল না মুনি ঋষিদের? 

–  বা বা। তুমি কি দর্শনও পড়েছ না কি? 

–  না, না। বাবা ফিলোজফির অধ্যাপক ছিলেন। বাড়ীতে দলে দলে ছেলেমেয়েরা পড়তে আসতো। শুনে শুনে অনেকটা শিখে গেছি। জানেন নীলেশবাবু, এই যে ইচ্ছা, দ্বেষ, সুখ, দুঃখ, ভালোবাসা, কষ্ট – সব কিছুই অভাব পদার্থ। বাস্তবে এরা নেই, সেজন্যই বোধ হয় এগুলোকে পাওয়ার জন্য মানুষ মরিয়া। 

–  হ্যাঁ... ‘ছুটেছিলে পিয়াস ভরে, মরীচিকা বারির তরে...’। 

–  খুব ভালো বলেছেন রবি ঠাকুর কথাটা। 

–  সবচেয়ে বড় কথা কি জানো মিতিন, এ তৃষ্ণার শেষ নেই – এ তৃষ্ণা মেটেও না। পৃথিবীতে কারো মনে যদি ঘূনাক্ষরেও এই তৃষ্ণা একবার জেগে ওঠে, সে জীবনে পূর্ণ হবে না যত তুমি বিপরীতে চেষ্টা করো। 

–  আপনি কি সত্যি সত্যি কখনও চেষ্টা করেছিলেন? 

–  ছিলাম। কিন্তু কী জানো, যত চেষ্টা করেছি বিপরীতে – তৃষ্ণা তত বেড়ে গেছে। আলটিমেট একদিন খেয়াল করলাম ‘এ কেবল দিবা রাত্রে জল ঢেলে ফুটা পাত্রে বৃথা চেষ্টা তৃষ্ণা মেটাবারে...’ 

–  আপনি রবীন্দ্রনাথ খুব পড়েন বুঝি? 

–  সব ছোটবেলার... এই বয়সে আর পড়াও নেই, শোনাও নেই। তুমিও তো ভালোই পড়ো মনে হচ্ছে।

–  একদমই না। এসব কাব্য-কবিতা আমার বিষয় নয়। আমি একেবারেই গদ্য। রিয়েলিস্টিক। 

–  এখনকার রিয়েলিস্টিক মেয়েদের তো ‘এবার ফেরাও মোরে’ জানার কথা নয়। 

–  সবই সংস্কার। পিতৃ সূত্রে পাওয়া। বাবার এইসব গুণ কিছুটা রক্তে চলে এসেছে। 

–  তুমি বুঝি বাবার খুব ন্যাওটা? 

–  ছিলাম। 

–  মানে? এখন নেই? 

–  ন্যাওটা হওয়ার জন্য বাবাকে পাচ্ছি কোথায়? উনি নানান অভিমান নিয়ে গ্রামের বাড়ীতে থাকেন। 

–  অভিমান কী নিয়ে? তোমার বিয়ে? 

চুপ করে রইলো মিতিন। নীলেশ খানিকটা কথা ঘোরানোর জন্য বলল, ‘মা?’ 

–  উনি মারা গেছেন আমার ছোটবেলায়। 

–  ওহ! স্যরি। তো যা বলছিলাম, চেষ্টা আমি করিনি তা নয় – তবে কি জানো, এটাও যেহেতু অভাব পদার্থ – এর পরিমাণ হয় না – পুরোটাই অনুমানে – তাই কতটা দেওয়া গেল আর কতটা ঘাটতি – এ কেবল পরস্পরের কথার ঠোকাঠুকিতে প্রমাণ হয়। 

–  আপনি নিজের কাছে কি পরিষ্কার হতে পারছেন না ওই কারণে? 

–  কতকটা তাই। আজ যে জায়গায় বিষয়টা পৌঁছেছে – আমি জানি এত অভাববোধকে ধামাচাপা দেওয়ার মতো প্রাচুর্য আমার নেই। যতটুকু টেনে তুলবো তার চতুর্গুণ আবার ডুবে যাবে। তার চেয়ে এই ভালো... প্রত্যাশা করার জায়গাটাই যখন না থাকে, এই অভাববোধ গুলোকে অবয়ব দেওয়ারও যেমন আধার থাকে না, তেমনি অভাব জনিত ক্লেদ-বুদবুদগুলোকে ভাসিয়ে দেওয়ারও না। 

–  আপনি কি ডিভোর্স দিয়ে দেবেন? 

–  আপাতত তাই ভাবছি। লড়বো না। 

–  কিন্তু দেবীদির অ্যাঙ্গেল থেকে ভেবে দেখেছেন কি? ওর বক্তব্যগুলোর সব কি একই অভাব সংক্রান্ত? মেরিটলেস? আপনার প্রচেষ্টাগুলোর মধ্যে সত্যিকারের প্রচেষ্টা ছিল কি? সেটাও খতিয়ে দেখুন। 

হাসলো নীলেশ। আবার সেই মনের গল্প। একটু থেমে বললো, ‘মানুষের প্রকৃতির বিপরীতে গিয়ে যতখানি প্রচেষ্টাই করা যাক না কেন, সেই চেষ্টাতে ফাঁকিই থাকে মিতিন। ওটা আদতে মিথ্যাচার। যারা বোঝে না, তারা ভ্রমে থাকে। আর একটা কথা, আমি আমার এতক্ষণের কথায় একবারও কিন্তু বলিনি দেবী ভুল বা ওর চাহিদা অস্বাভাবিক। ও হয়তো তার অ্যাঙ্গেলে ঠিক। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই ওই অভাবেরই অভাববোধ করছে – আমি সেটুকুই বলতে চাইছি। তুমিও তো একটু আগে তাই বলছিলে। 

মিতিন নিঃশব্দে মাথা নাড়লো। হঠাৎ চারপাশের বাতাসটা যেন বেশী ভারী বোধ হতে লাগলো দুজনেরই। নীলেশ বলল, ‘এখন তো আমি অনেক সুস্থ বোধ করছি মিতিন, তুমি ঘরে যাও, শুয়ে পড়ো গিয়ে। বরং তোমার ফোন নাম্বারটা দিয়ে যাও, আমি অসুবিধে হলে তোমায় ফোন করবো।’ 

–  বেশ। 

–  কাল তো তোমার অফিস আছে? 

–  হ্যাঁ। আপনি যদি আপনার ডাক্তারবন্ধুর কাছে যান তো আমায় জানিয়ে দেবেন, আদারওয়াইজ আমি অফিসে যাবো। 

–  জ্বর যদি নেমে যায়, তবে আর যাবো না ভাবছি। 

–  অ্যাজ ইয়োর উইশ। গুড নাইট। 

দেবী এসেছিল একটু আগে। ওর কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস নিতে। আগে যেসব জিনিস ভীষণ প্রয়োজনের ভেবে কিনেছিল, সাজিয়েছিল এদিক-ওদিক, আজ সে সব কিছুই অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে। হয়তো প্রয়োজনটা সত্যিকারের ছিল না, বা হয়ত প্রয়োজনটা যৌথ যাপনের ছিল। চারপাশে ছড়ানো ছেটানো ওর পছন্দ করা পর্দা, ওয়ার্ড্রোবের রঙ, দেওয়ালের পেইন্টিং। শুধু যাওয়ার সময় শো-কেসে রাখা ওদের যুগল ছবির অর্ধেকটা ছিঁড়ে কুচি কুচি করে ফেলে দিয়ে গেছে ওরই পছন্দ করে কিনে আনা ডাস্টবিনে। নীলেশকে ফোন করেই এসেছিল সে। নীলেশ চুপটি করে বসেছিল ওর ঘরটার লাগোয়া বারান্দায়। যাবার সময় এক ঝলকের জন্য দেবী এসেছিল ওর ঘরে। মুখ দেখে মনে হল, কিছু বলার ছিল ওর। কোনও পক্ষই কিছু শুনতে চায়নি, তাই বলা হয়নি কোনও পক্ষেরই। শুধু সময়ের চলে যাওয়াটা থেমে থাকেনি। দেবী গাড়ী নীচে রেখেই এসেছিল। প্রতীক্ষায় কাউকে রেখে অন্য কারুর সাথে নিশ্চই অনিশ্চিতের পরিকল্পনা সাজানো যায় না। যারা করতে চায়, তারা সাবধানী পক্ষ। তাদের দুকূলই ডোবে! গাড়ীর যাওয়াটা কান পেতে শুনলো নীলেশ। আদালত রায় দিয়ে দিয়েছে। এখন সে স্বাধীন, অবশ্য এই স্বাধীনতাটা ঠিক কিসের থেকে, ভালো মত ঠাওর করতে পারল না সে। 

বাইরে কলিংবেলের শব্দতে অবাকই হলো নীলেশ। এই অসময়ে কেউ আসার নেই। দরজা খুলে দেখলো, মিতিন। 

–  এসো, ঘরে এসো। 

–  দেবীদি এসেছিল? 

–  হুঁ। তুমি কী করে জানলে? 

–  ওই তো বারান্দা দিয়ে দেখলাম, গাড়ীতে উঠলো। 

–  তুমি ঘরে ছিলে? 

–  হ্যাঁ। আমার আজ রাতেই একটা ট্যুর শিডিউলড আছে। তাই অফিস যাই নি। 

–  কোথায় যাবে? 

–  জয়পুর। অফিসের কাজে। 

–  বসো। চা করি। 

–  আপনি বসুন; আপনাকে বড় এক্সহস্টেড লাগছে। 

–  না না, ও কিছু নয়। তুমি বসো একটু। একা একা চা বানিয়ে খেতে ইচ্ছে করছিল না, যদিও চায়ের তেষ্টা পেয়েছে বহুক্ষণ। চা খাবে না কফি? 

–  যা খুশী। আপনি আমায় একটু দেখিয়ে দিন প্লিজ, আমি বানিয়ে আনছি। কড়া করে বানিয়ে দেব। আমার হাতের কফি খেয়ে দেখুন, আপনার এই শৈথিল্য অনেক কেটে যাবে। 

নীলেশ মুচকি হাসলো। কফি খেতে খেতে মিতিন বলল, ‘যা বলুন নীলেশবাবু, আপনি দেবীদির চলে যাওয়াটা ঠিক মেনে নিতে পারছেন না। হয়তো দেবীদিও কষ্ট পাচ্ছে। দুজনের চাওয়াটা ঠিকই ছিল, শুধু তালে লয়ে মিলল না বলে সম্পর্কটা ভেঙে গেল।’ 

–  লয়ে ছন্দে মিললেই তো গদ্য কবিতা হয় মিতিন, আর কবিতা তালে পড়লেই গান। ওটাই আসল জিনিস। বাঁধনে পড়লেই সুরের মুক্তি হয়, অথচ জীবনে দ্যাখো ঠিক উল্টো – বাঁধনে পড়লেই সুর কেটে যায়। 

–  আমি তো সেই ভয়ে নিজেকে বাঁধি না নীলেশ বাবু। জীবনকে তার মতো বয়ে যেতে দিই। বাবার মতো ঘড়ি ধরে দিনের সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করি না। দিন দিনের মতো চলে, আমি আমার মতো। কখনও দিন আমার সাথে মেলে, কখনও আমি দিনের সাথে। 

–  তোমার কখনও নোঙর ফেলতে ইচ্ছে করে না? 

–  না। আমার বিশ্বাস আপনিও নোঙর পছন্দ করেন না। কিন্তু এর বিরুদ্ধে গিয়ে স্রোতে ভাসার উদ্যমটুকু আপনার নেই। যাক গে আপনাকে ঠিক সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য আমি আসিনি। শুধু এটুকু বলার, কখনও খারাপ ভালো কিছু শেয়ার করার ইচ্ছে হলে আমায় ফোন করবেন। আমরা মাঝে মধ্যে একসাথে চা কফি খেতেই পারি। 

–  তা অবশ্যই পারি। তোমার হাতের কফি সত্যিই অসাধারণ। নীলেশ মনে মনে ভাবলো, সাথে বলে – তোমার সান্নিধ্যও, কিন্তু বললো না। এত প্রগলভতা ওকে মানায় না। মিতিন বলল, ‘তবে একটা কথা, আপনি আপনার ওই মালতীকে বলুন দুবেলা রান্না করে দিয়ে যেতে। আপনার এই কদিনে চেহারাটা বেশ ভেঙে গেছে।’ 

নীলেশ ঘরের ভেতর থেকে একটা কাগজ এনে মিতিনের হাতে দিল। 

–  কী এটা? 

–  চিঠি। পড়ো। 

–  আপনার চিঠি আমি পড়বো কেন? 

–  আরে পড়োই না, জীবনের একটা শিক্ষা পাবে। আর তাছাড়া তোমার বক্তব্যের জবাবটাও পাবে। 

–  কার চিঠি? 

–  মালতীর। 

‘শ্রী চরনেষু দাদা, 

সামনাসামনি বলার সাহস পেলাম না বলে চিঠিটা রেখে যাচ্ছি। আমি জানি বউদি আপনাকে সামান্য কারণে ছেড়ে চলে গেছেন। আমি বয়সে ছোট, তাঁর বিচার করছি না। তবু আপনাকে কাছ থেকে দেখে আপনার সম্বন্ধে যা ধারণা জন্মেছে, তাই থেকেই আমার বিশ্বাস আপনার এতে কোনও দোষ নেই। আপনি সারাদিন যেভাবে বউদির কাজে হাত লাগাতেন, তাঁকে সময় দিতেন – আমি আমাদের সমাজ বাদ দিন – এত ঘরে কাজ করি, কারোর ঘরেই দেখিনি। আমি জানিনা আপনার অন্য কোনও ক্ষমার অযোগ্য অপারগতা ছিল কিনা – আমার ধৃষ্টতা মার্জনা করবেন। 

আপনি বহুবার আমাকে আপনার রান্না করার দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করেছিলেন, আমি রাজী হইনি। আমি ছোটবেলা থেকে বস্তিতে যাদের সাথে বড় হয়ে উঠেছিলাম, তাদের মধ্যে রাজু আমার খুব বন্ধু। পড়াশুনো তেমন করেনি, টুয়েলভ ফেল। মদ টদও খায় আজকাল। রাজমিস্ত্রির কাজ করে। ও আমাকে প্রাণের চেয়েও ভালবাসে। আমিও বাসি। তবে কিনা আমি গ্র্যাজুয়েট হয়েছি। মায়ের এবং আমার দুজনেরই সামাজিক অবস্থান উন্নত হয়েছে, আমরা এখন অলীক স্বর্গে বসবাস শুরু করেছি। পড়াশোনা বড় খারাপ জিনিস। মানুষে মানুষে বিভেদ বাড়িয়ে দেয়। আপনাকে দেখে, আপনার বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে আমার স্বপ্ন দেখাটা বড্ড বেড়ে গেছে; আমি আকাশ কুসুম ভাবতে বসেছি। আমার এই ফানুসটা ফাটা দরকার। আমি এম.এ. তে ভর্ত্তি হই নি। আমি জানি আমার মা রাজুর সাথে আমার বিয়ে মেনে নেবে না। তাই আমি আজই আপনাদের থেকে দূরে চলে যাচ্ছি। মুম্বাইতে রাজু একটা কন্ট্রাক্টারি কোম্পানিতে কাজ পেয়েছে। যাকে এতদিন ভালবাসতাম, যার সঙ্গে ঘর বসানোর স্বপ্ন দেখতাম – আজ মিথ্যা মোহে ভুলে যদি তাকে অস্বীকার করি, তবে সে আমার মিথ্যাচার হবে। আমি জানিনা আমি এই ধারণায় আজীবন স্থির থাকতে পারবো কিনা, তবে আমি রাজুকেই আজীবন ভালোবাসতে চাই। আশীর্বাদ করুন, ওর সাথে চলার পথে যেন ভুলেও আপনার ছায়ায় আমি ঢেকে না যাই। ক্ষমা করবেন আপনার আদেশ মানতে পারিনি বলে। ইতি, ক্ষমা প্রার্থী মালতী (শ্রীপর্ণা দাস – এই নামটা আমার বাবা শখ করে রেখেছিলেন – হয়তো কোথা থেকে শুনে ভালো লেগেছিল তাঁর) 

মিতিন চিঠিটা পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। বলল, ‘মেয়েটাকে কিছু টাকা আর আমার তরফ থেকে একটা গয়না উপহার পাঠালে কি ওর বিড়ম্বনা হবে?’ 

–  ওকে দেবার জন্য পাবে কোথায় মিতিন? এ চিঠি গত পরশু লেখা। সেই দিনই ওর বাড়ী ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার কথা। ঠিকানা তো জানা নেই, হয়তো জানা যাবে না কোনওদিন... কোনওদিন যদি ওর মায়ের সাথে ওর মিটমাট হয়েও যায়, আমাদের এই সৌজন্যের ওর হয়তো প্রয়োজনও হবে না। 

–  ঠিক কথা। ওর মায়ের কী রিঅ্যাকশন? 

–  ওই যেমন হয়। পাড়ার মাতম্বরদের নিয়ে রাজুর বাড়ীতে হুজ্জোতি সঙ্গে বিলাপ ‘এত কষ্ট করে বাপ মরা মেয়েটাকে লেখা পড়া শেখালাম, লাভ কী হল! আর সাথে মৃত্যু কামনা করে গালিগালাজ তো আছেই। 

–  দেখুন নীলেশবাবু, মায়ের কথাটা কিন্তু ভুল নয়। 

–  ভুল কেউই নয় মিতিন। মালতীর বক্তব্যটাও কি ভুল? ওর অ্যাঙ্গেল থেকে দেখলে অত্যন্ত সংযমী এবং নীতি-নিষ্ট পদক্ষেপ – যেটা নিতে পারার জন্য যথেষ্ট দম এবং সাহস লাগে। 

‌–  এ তো আইনস্টাইনের থিওরি অফ রিলেটিভটির তত্ত্ব নীলেশবাবু। এক একজন তার তার মতে ঠিক। 

–  এক্সাক্টলি। আমাদের জীবনটা এরকমই মিতিন। প্রত্যেকে তার অ্যাঙ্গলে ঠিক। তোমার বাবা বাবার মতে ঠিক, তুমি তোমার মতে। দেবী দেবীর অ্যাটিটিউডে ঠিক, আমি আমার কর্তব্যে। সবাই ঠিক মিতিন। আমাদের ভুলটা হল নিজেদেরকেই কেবল ঠিক দেখার ইচ্ছাটা। ওটাকে বদলাতে পারলে হয়তো অন্যেরটাও ঠিক দেখাবে। 

–  নীলেশবাবু, এবার আমায় উঠতে হবে। ঘন্টা দেড়েকের মধ্যে আমায় এয়ারপোর্ট পৌঁছাতে হবে। 

–  বেশ তো, চাপ নিও না। তুমি তৈরি হও, আমি তোমাকে এয়ারপোর্টে ড্রপ করে আসবো। 

–  আরে না না। ওলা উবের কিছু পেয়ে যাবো নীলেশবাবু, আপনাকে অযথা কষ্ট করতে হবে না। 

–  আজ আমার এই ঘর থেকে একবার বেরোনো খুব দরকার মিতিন। উপায় থাকলে তোমার সাথে জয়পুর চলে যেতাম। অন্তত এইটুকু যেতে দা… 

মিতিন একটু হাসলো। বললো, ‘ঠিক আছে, তৈরী হয়ে থাকুন। বেরোনোর আগে কল করবো। আমার ঘরে চলে আসবেন। যাবার আগে একবার এক কাপ চা খেয়ে যাব। বাইরে গেলে কলকাতার চা টা বড় মিস করি। এই ফ্লেভার…’ 

নীলেশের মনে পড়লো দেবী এই কথাটা খুব বলতো। পাতালা সোনালী রঙের চা টা খাওয়ার আগে একবার পুরো দমে নাকে টেনে ঘ্রাণ নিত সে। নাইটির উপর এক ঢাল সোনালী চুল বিছিয়ে আর চেয়ারের উপর এক পা তুলে অর্ধেক বাবু হয়ে এমন আয়েষ করে চা খাওয়ার মুড আজ তার আছে কি না কে জানে।

Post a Comment

0 Comments