পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী
তিন বছর বয়সেই বাবাকে হারিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়।তাঁর বাবা সুকুমার রায় এবং ঠাকুরদা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী দুজনেই ছিলেন বাংলা সাহিত্য ও শিল্পজগতের প্রবাদপ্রতিম মানুষ। বাংলায় ছাপাখানার ইতিহাসে যেমন এই পরিবারের অবদান প্রচুর, তেমনই শিল্প সাহিত্যের চর্চাতেও। ঠাকুরদা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী শুধুমাত্র উন্নত মানের মুদ্রণ ও প্রসেস এনগ্রেভিং-এর পথিকৃৎ ছিলেন না তাঁর 'ইউ রায় অ্যান্ড সন্স' বাংলা মুদ্রণ জগতের ইতিহাসকেই বদলে দিয়েছিল। আর বাবা? হাঁসজারু, বকচ্ছপ, গিরগিটিয়া - বাংলা সাহিত্যে চিত্র শিল্পের অনন্য ভূবন সৃষ্টি করেছিলেন সুকুমার রায়। লন্ডনে ফটোগ্রাফি ও মুদ্রণ প্রযুক্তি নিয়ে পড়াশোনা করে এসে ভারতে তিনি ফটোগ্রাফি ও মুদ্রণ শিল্পের একজন পথিকৃৎ হয়ে উঠেছিলেন। সত্যজিৎ রায় তাঁর স্মৃতিচারণে নিজেই বলেছেন, বাবাকে তিনি চিনেছিলেন তাঁর লেখা আর আঁকা থেকেই। দাদু আর বাবার এই উত্তরাধিকার তাঁর রক্তের সাথে মিশে গিয়েছিল। খুব ছোটবেলা থেকেই শিল্প চর্চায় আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন তিনি।ছোটবেলায় তাঁর দীর্ঘ দুপুরের অলস সময়গুলো কেটে যেত স্কেচ আর পেইন্টিং করেই।
কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে মূলত মায়ের আগ্রহেই সত্যজিৎ রায় চলে গিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে চারুকলার পাঠ নিতে। শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন তিনি মহান শিল্প গুরু তথা শিক্ষক নন্দলাল বসুর কাছ আঁকা শিখতে শুরু করেছিলেন। সেখানেই তিনি পেলেন বিনোদ বিহারী মুখার্জীর সাহচর্য। বিনোদ বিহারীর কাজের শৈলী এবং তাঁর "ইন্ট্রোস্পেক্টিভ" বা অন্তর্মুখী বিশ্লেষণ সত্যজিৎকে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের শিল্পের সমন্বয় বুঝতে সাহায্য করেছিল। বিনোদ বিহারী চীন ও জাপান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের শিল্পভাবনা গভীরভাবে প্রভাবিত হওয়ার নেপথ্যে ছিলেন এই বিনোদ বিহারীই। পাশ্চাত্য রীতির পাশাপাশি ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী ম্যুরাল এবং ভাস্কর্য নিয়ে তাঁর যে গভীর ধারণা তৈরি হয়েছিল বিনোদ বিহারীর সাহচর্যে, সেটিই পরবর্তী জীবনে তাঁর করা স্কেচ ও অলঙ্করণে প্রতিভাত হয়েছিল। সত্যজিৎ রায়ের প্রথম অলঙ্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৪২ সালে 'মৌচাক' পত্রিকায়, কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের 'অ্যাটাচে কেস' গল্পের জন্য। সেখানে তিনি একটি মজার ট্রেনের কামরার দৃশ্য এঁকেছিলেন, যার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ন অন্যরকম।
শান্তিনিকেতনে শিল্পের প্রথম পাঠ নিয়ে কলকাতায় ফিরে ১৯৪৩ সালে 'জুনিয়র ভিজুয়ালাইজার' হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন 'ডিজে কিমার' নামের একটি ব্রিটিশ বিজ্ঞাপনী সংস্থায় , যেটি পরে, ১৯৫৫-৫৬ সালে ক্ল্যারিয়ন অ্যাডভার্টাইজিং-এ রূপান্তরিত হয়েছিল।
'ডিজে কিমার' -এর সদর দপ্তর ছিল লন্ডনে। সত্যজিৎ রায়ের সময়ে এই সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টর ছিলেন মিস্টার ব্রুম। তাঁর তত্বাবধানেই সত্যজিতের নিয়োগ হয়েছিল এবং শুরুর দিকে তিনিই কাজের তদারকি করতেন।ব্রিটিশ কোম্পানি হলেও এখানকার কাজের পরিবেশ ছিল সৃজনশীলতায় ভরপুর। সত্যজিৎ অনেকটাই স্বাধীন ভাবে কাজের সুবিধা পেয়েছিলেন এখানে। ব্রিটিশ সংস্থা হওয়ায় তিনি এখানে আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞাপন এবং আধুনিক ডিজাইনের সাথেও সহজে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। বলা যায়, ডিজে কিমার-এ যোগ দেওয়াটাই ছিল সত্যজিৎ রায়ের শিল্পী জীবনের প্রকৃত 'টার্নিং পয়েন্ট'। এখান থেকেই তাঁর সৃজনশীলতা এক পেশাদার রূপ নিতে শুরু করে।
প্রকাশনা সংস্থাটিতে তাঁর নকশা করা প্রথম বইয়ের মলাটটি ছিল অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘ক্ষীরের পুতুল’ বইটির । বইটিতে অলঙ্করণের জন্য তিনি লিনোকাট চিত্রকলার একটি অনন্য শৈলী ব্যবহার করেছিলেন, যেখানে ব্যবহার করেছিলেন বাংলার লোকচিত্রকলা 'আলপনা'র শৈল্পিক মাধ্যমকে।
শান্তিনিকেতনে তিনি শিখেছিলেন শিল্পের নন্দনতত্ত্ব, কিন্তু ডিজে কিমার-এ এসে তিনি শিখলেন সেই শিল্পকে কীভাবে বাণিজ্যিক ও পেশাদার রূপ দিতে হয়। টাইপোগ্রাফি, লেআউট ডিজাইন এবং ইলস্ট্রেশনের মাধ্যমে তিনি বিজ্ঞাপনের জগতকে নিয়ে গেলেন এক অন্য উচ্চতায়।
এখানে চাকরি করার সময়েই তাঁর পরিচয় হয় ডি.কে. গুপ্তের সাথে। ডি.কে. গুপ্ত ছিলেন একজন অসামান্য দূরদর্শী মানুষ। তিনি সত্যজিতের ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রতিভাটিকে চিনতে পেরেছিলেন। সত্যজিৎকে সিগনেট প্রেসের বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকার সুযোগ করে দিলেন ডি.কে.গুপ্ত। সিগনেট প্রেসে তাঁর পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীসহ অনেক প্রখ্যাত লেখকের বইয়ের অলঙ্করণ করেছিলেন তিনি। সেখানে তিনি প্রায় ৩০০-র বেশি বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছিলেন। তাঁর প্রচ্ছদগুলো ছিল আধুনিক এবং এতে লুকিয়ে থাকতো গভীর একটি প্রতীকী অর্থ। সত্যজিৎই প্রথম প্রচ্ছদকে বইয়ের 'থিম' বা ভাবের প্রতিফলন হিসেবে ফুটিয়ে তোলেন। বইয়ের নামগুলো তিনি কখনও ক্যালিগ্রাফিতে, কখনও কাঠখোদাই হরফে, আবার কখনও বিমূর্ত ঢঙে লিখতেন। তাঁর টাইপোগ্রাফিগুলো বাংলা প্রকাশনা জগতে বিপ্লব এনেছিল। সুকুমার রায়ের 'খাই খাই', জিম করবেটের 'দ্য ম্যান-ইটার্স অফ কুমায়ুন', বা জীবনানন্দ দাসের 'বনলতা সেন'-এর মতো শত শত বইয়ের প্রচ্ছদে তিনি আধুনিকতার ছাপ রেখেছিলেন। সিগনেট প্রেসের সাথে কাজের সময়েই তিনি বহু আন্তর্জাতিক মানের বই ও শিল্পের নকশার সংস্পর্শে আসেন, যা তাঁর নান্দনিক চেতনাকে আরও উন্নত করে।শান্তিনিকেতনে নন্দলাল বসুর কাছে তিনি শিখেছিলেন ভারতীয় শিল্পের মূল নির্যাস—রেখার মিতব্যয়িতা। তাঁর ছবির মূল শক্তিই ছিল তাঁর এই টানের মিতব্যয়িতা। খুব কম রেখা দিয়েই তিনি চরিত্রের আবেগ ও পরিবেশ ফুটিয়ে তুলতে পারতেন। তাঁর ইলাস্ট্রেশন শৈলী এবং ব্যবহৃত আঁকার মাধ্যমগুলো ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং বৈচিত্র্যময়। তিনি মনে করতেন একটি সার্থক স্কেচে অতিরিক্ত রেখার প্রয়োজন নেই। তাঁর গোয়েন্দা চরিত্র ফেলুদা, তার সহকারী তপশে এবং বন্ধু জটায়ুর জন্য তিনি কলম দিয়ে একই রেখাচিত্র ব্যবহার করেছেন।
মাত্র কয়েকটা টানেই তিনি ফেলুদার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি বা জটায়ুর হাস্যকর ভাবটি ফুটিয়ে তুলতেন। তাঁর আঁকা ছবিতে চরিত্রের অভিব্যক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠতো। ফেলুদার গল্পের অলঙ্করণেও তিনি ছায়া এবং আলোর এমন ব্যবহার করতেন যেটি এক ধরণের রহস্যময় পরিবেশ তৈরি করতো। রেখাগুলিতে সামান্য পরিবর্তন এনেই তিনি এই সাসপেন্স বা রহস্য পরিবেশ তৈরি করেছেন।
'বাদশাহী আংটি’ গল্পের ক্লাইম্যাক্সে ফেলুদা ও তপশেকে জঙ্গলের ভেতরে একটি কাঠের কুটিরে নিয়ে যাওয়া হয়। ওয়াইড অ্যাঙ্গেল, ছায়া, সিলুয়েট এবং কলমের অন্যান্য নিপুণ আঁচড়ের মতো কৌশলের ব্যবহারের মাধ্যমে সত্যজিৎ রায় গল্পটির জন্য প্রয়োজনীয় রহস্যময় আবহ ফুটিয়ে তুলেছিলেন। ধীরে ধীরে তাঁর কাজে ন্দলাল বসুর ভারতীয় ঘরানার সাথে ভিক্টোরিয়ান ইলাস্ট্রেশনের প্রভাব মিলেমিশে গিয়েছিল। ভিক্টোরিয়ান ইলাস্ট্রেশনের সূক্ষ্ম 'হ্যাচিং' এবং ছায়ার গভীরতা দেখা যেত তাঁর ছবিতে। সত্যজিৎ রায়ের প্রচ্ছদ শিল্পে অনেক সময়েই দেখা যেত তিনি ভারতীয় মোটিফ যেমন আল্পনা বা লোকশিল্প ব্যবহার করেছেন, কিন্তু তার বিন্যাস বা 'লেআউট' অত্যন্ত আধুনিক এবং সেই ছবিতে আছে পাশ্চাত্য শিল্পের প্রভাব।
আসলে, তাঁর ঠাকুরদা উপেন্দ্রকিশোর এবং বাবা সুকুমার রায়, উভয়েই এই পাশ্চাত্য মুদ্রণ শিল্প ও ইলাস্ট্রেশনের চর্চা করতেন, যা সত্যজিতের মজ্জাগত ছিল। সত্যজিৎ রায় তাঁর অধিকাংশ ইলাস্ট্রেশন করতেন সাধারণ খসড়া কাগজে, কিন্তু তাঁর রেখাগুলো এতই নিখুঁত ছিল যে তা সরাসরি মুদ্রণের জন্য চলে যেত।১৯৬১ সালে সত্যজিৎ রায় যখন পারিবারিক পত্রিকা 'সন্দেশ' পুনরায় চালু করেন, তখন থেকেই এর অলঙ্করণেও এক নতুন যুগের সূচনা হয় তাঁর হাতেই। তিনি প্রত্যেক সংখ্যার জন্যেই আলাদা ও অভিনব প্রচ্ছদ তৈরি করতেন। কখনও লোকশিল্পের আদলে, কখনও জ্যামিতিক নকশায় 'সন্দেশ' নামটিকে সাজাতেন তিনি। তাঁর অলঙ্করণে কালো কালির 'লাইন ড্রয়িং' এবং 'স্ক্র্যাচবোর্ড' স্টাইলের ব্যবহার ছিল অনন্য। শুধু বড় ছবিই নয়, গল্পের ফাঁকে ফাঁকে খুব ছোট ছোট 'টেলপিস' বা অলঙ্করণও ব্যবহার করতেন তিনি যেগুলো পুরো পাতাটিকে একটি শিল্পের রূপ দিত।
বাণিজ্যিক শিল্পকলায় সত্যজিৎ রায়ের ব্যাপক অভিজ্ঞতা, প্রাচীন ভারতীয় শিল্পকলা, প্রাচ্য শিল্পকলা ও সমসাময়িক ইউরোপীয় শিল্পকলার অধ্যয়ন এবং বিপুল কল্পনাশক্তি তাঁর চিত্রনাট্যেও ফুটে উঠেছে বারবার। তাঁর চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লেখার সময়, তিনি কেবল দৃশ্যের বর্ণনা ও সংলাপই লিখতেন না, বরং একটি স্ক্র্যাপবুকে পেন্সিল, কলম, প্যাস্টেল রঙ এবং জলরঙ ব্যবহার করে দৃশ্যগুলির চিত্রাঙ্কনও করতেন। এর ফলে শিল্প নির্দেশক ও চিত্রগ্রাহকদের প্রয়োজনীয়তা কমে যেত এবং সময়ও বাঁচত।
সত্যজিৎ রায়ের ছবি আঁকার যে ক্ষমতা তার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটেছিল সম্ভবত তাঁর এই সিনেমার 'স্টোরিবোর্ড' বা 'খেরোর খাতা'তেই। শুটিং শুরুর আগে তিনি লাল শালু দিয়ে বাঁধানো এই খেরোর খাতায় পুরো সিনেমার প্রতিটি ফ্রেম পেন্সিল বা কলমে স্কেচ করে নিতেন। সেখানে আলোর উৎস, অভিনেতার অবস্থান, ক্যামেরার মুভমেন্ট এমনকি অভিনেতাদের বসার পজিশন পর্যন্ত আঁকা থাকতো। তিনি কেবল কলম বা তুলি নয়, অনেক সময় স্ক্র্যাপবোর্ডে আঁচড় কেটেও অদ্ভুত সব 'আলোর খেলা' তৈরি করতেন, যা মূলত রেখাচিত্রেরই এক উন্নত রূপ। তাঁর প্রথম ছবি ‘পথের পাঁচালী’-র জন্য তিনি কোনো চিত্রনাট্য লেখেননি। পরিবর্তে, তিনি একটি স্ক্র্যাপবুকে কমিক-বুকের ঢঙে প্রতিটি দৃশ্য ক্রমানুসারে এঁকে একটি স্টোরিবোর্ড তৈরি করেছিলেন। এই স্ক্র্যাপবুকটিই তিনি প্রযোজকদের দেখিয়েছিলেন।
পথের পাঁচালীর স্টোরিবোর্ডের সমস্ত ছবি ওয়াশ পদ্ধতিতে কালি ও কলম দিয়ে আঁকা হয়েছিল। আশ্চর্যজনকভাবে, ছবিটি তৈরি হওয়ার পর রায়ের আঁকা ছবিগুলো দৃশ্যগুলোর স্থিরচিত্রের সঙ্গে হুবহু মিলে গিয়েছিল!
পথের পাঁচালী' থেকে শুরু করে 'আগন্তুক' পর্যন্ত তাঁর প্রতিটি ছবির নেপথ্যেই ছিল অসামান্য সব রেখাচিত্র, যা ক্যামেরাম্যান এবং অভিনেতাদের কাজ সহজ করে দিত। তাঁর গোয়েন্দা চরিত্র ফেলুদাকে নিয়ে নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘সোনার কেল্লা’ -র জন্য , রায় সেই দৃশ্যের বৈঠকখানার অলঙ্করণ করেছিলেন যেখানে দর্শকদের কাছে গোয়েন্দা চরিত্রটিকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তিনি দৃশ্যটি এত সূক্ষ্মভাবে এবং প্রয়োজনীয় সমস্ত সাংস্কৃতিক সূক্ষ্মতা সহকারে এঁকেছিলেন যে শিল্প নির্দেশক অশোক বসু পরে মন্তব্য করেছিলেন, “তাঁর করা অলঙ্করণটি অনুসরণ করা ছাড়া আমার আর কিছুই করার ছিল না।”
সত্যজিৎ রায়ের সিনেমার পোস্টার ডিজাইনগুলিও ছিল গ্রাফিক আর্টের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। ক্যালিগ্রাফি এবং ইলাস্ট্রেশনের ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি এই ক্ষেত্রে একটি বিপ্লব এনেছিলেন। দেবাশিস দেব তাঁর ‘রং তুলির সত্যজিৎ’ বইতে বলেছেন, “সত্যজিৎ রায়ের ডিজাইন করা পোস্টারগুলিতে চলচ্চিত্রের আখ্যান প্রতিফলিত হয়েছিল।”
পথের পাঁচালী মুক্তির আগে তিনি সংবাদপত্রে ছবিটির বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর সেই প্রচারপত্রে তিনি ছবিটির একটিও দৃশ্য ব্যবহার করেননি। পরিবর্তে, তিনি ক্যালিগ্রাফির জাদুকরী ব্যবহারে ছবিটির মুক্তির কথা ঘোষণা করেছিলেন । সেই বিজ্ঞাপনটি সংবাদপত্রের একটি উল্লম্ব কলামে রাখা হয়েছিল। লাইনগুলো ছিল উল্লম্বভাবে হেলানো, তারিখগুলো ছিল মোটা অক্ষরে এবং লেখক, সঙ্গীত পরিচালক ও পরিচালকের নামগুলো বড় আকারে লেখা হয়েছিল। একেবারে নিচে, তিনি ছবিটির সেই বিখ্যাত দৃশ্যটি এঁকেছিলেন, যেখানে অপু আর, তার দিদি দুর্গা দৌড়োচ্ছে।
সত্যজিৎ রায় তাঁর ৩৬টি চলচ্চিত্রের প্রতিটির পোস্টার নিজেই ডিজাইন করেছিলেন। এছাড়াও, তিনি সব চলচ্চিত্রের টাইটেল কার্ডের অলঙ্করণও করেছিলেন। তাঁর আঁকা চলচ্চিত্রের পোস্টারগুলো ছিল আধুনিক শিল্পকলার এক অনন্য নিদর্শন। ন্যূনতম কালির ছোঁয়ায় বা ক্যালিগ্রাফিক স্ট্রোকের মাধ্যমে তিনি পোস্টারে গভীর আবেদন সৃষ্টি করতেন। যেমন—'পথের পাঁচালী'র লোগো বা টাইটেল কার্ডে গ্রামীণ সরলতা স্পষ্ট ছিল। ক্যালিগ্রাফিক শিল্পের অসাধারণ ব্যবহার ছিল তাঁর ছবিতে। সত্যজিৎ রায় জানতেন কীভাবে হরফের বাঁক এবং বুনটের মাধ্যমে সিনেমার মূল সুর ফুটিয়ে তুলতে হয়। তাঁর ব্যবহৃত প্রতিটি অক্ষর ছিল ছবির বিষয়বস্তুর পরিপূরক।পোস্টার দেখেই দর্শকরা সিনেমার মেজাজ বুঝতে পারতেন। 'জলসাঘর' বা 'দেবী'র পোস্টারে যে গাম্ভীর্য বা রহস্যময়তা ছিল, তা মূলত তাঁর ক্যালিগ্রাফির অসাধারণ প্রয়োগ থেকেই এসেছিল। তিনি বাংলা বর্ণমালার নিজস্ব কিছু ফন্ট বা লিখনশৈলী উদ্ভাবন করেন (যেমন—'রায় রোমান'), যা পরবর্তীকালে গ্রাফিক ডিজাইনের জগতে পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠে। রেখায় ও রঙে সত্যজিৎ রায় যে আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন,সেটি আজও ভারতীয় শিল্পকলায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
0 Comments