জ্বলদর্চি

গুচ্ছ কবিতা /দুলাল কুমার দে

গুচ্ছ কবিতা
দুলাল কুমার দে

অপেক্ষা

সফল কাজেও ব্যর্থ মনোরথ হতে হয়,
যখন তার গ্রহণযোগ্যতা থাকে না;
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আর যুক্তিগ্রাহ্য সমালোচনা,
যখন বোঝাতে অপারগ হয় তার যথার্থতা।
তখন খুব কষ্ট লাগে,
ভবিষ্যতের সুদূরপ্রসারী কুপ্রভাব ভেবে!
কখনো ধর্মীয় ভাবাবেগ, কখনও ব্যবসায়িক স্বার্থ,
কখনো রাজনৈতিক চালাকি,
কখনো অন্ধ কুসংস্কার,
কখনো আবার সুশিক্ষার অভাব;
সব কিছুই কোনো না কোনোভাবে,
অযৌক্তিক ও অবৈজ্ঞানিক ক্রিয়াকলাপ কে 
বাঁচিয়ে রেখে,
সমাজকে ভবিষ্যতের অন্ধকারে
নিমজ্জিত রাখার চেষ্টা করে,
প্রকাশ করতে বাধা দেয় আসল সত্য ও তথ্য।
কুসংস্কারের বিভীষিকাময় আলোর দিকে,
পালক গজানো পতঙ্গের মতো ধাবিত হয় মানুষ!
কোনো সাবধানবাণী, সতর্কতা, নিষেধাজ্ঞার
তোয়াক্কা করতে চায় না;
কুসংস্কারের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে
জীবন উৎসর্গ করতেও পিছপা হয় না!
তখন একটাই ভাবনা আসে মনে—
যতটা সহজ নিজে বোঝা ও জানতে পারা,
তার চেয়েও জীবনের সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো,
অপরকে আসল সত্য বোঝানো।
যার সাফল্যের জন্য চাই—
ধৈর্য, সময় ও অপেক্ষা।

         
কিছু আছে

সব কিছু  এখনও শেষ হয়ে যায়নি,
কিছু ছিল, কিছু আছে, কিছু রবে চিরকাল।
সব আলো এখনও নিভে যায়নি,
কিছু আছে ,আঁধার কেটে তাই হয় যে  সকাল।
সব মানুষ এখনও খারাপ হয়ে যায়নি,
কিছু ভালো আছে তাই জগৎ চলছে এতকাল।
🍂
      
ঢাকনা

সেদিন হঠাৎ বাজারে গিয়ে দেখি 
এক কোণে বহু মানুষের ভিড়। 
কৌতূহলবশত সেখানে গেলাম। 
দেখি, একটি ঢাকনা কে ঘিরে এত উৎসুক জনতা। 
ঢাকনা টি খুবই সুন্দর!
আকর্ষণীয় এবং মূল্যবান ধাতু দিয়ে তৈরি। 
এত মূল্যবান ধাতু দিয়ে যে বস্তুটি ঢাকা আছে, 
 না জানি আরও কত মূল্যবান!
কেউ কেউ বলল, “ঢাকনাটা খুলে দেখা হোক।” আবার কেউ বলল, “না, দামী ঢাকনার আড়ালে ভয়ঙ্কর কোনো মারণ বোমা থাকতে পারে!” 
সাহস করে এগিয়ে গেল না কেউই।
থানায় খবর গেল। পুলিশ এল। 
আমরা সবাই অধীর আগ্রহে দাঁড়িয়ে রইলাম। 
বোম্ব স্কোয়াড প্রস্তুত হলো।
 সবাইকে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হলো।
অতঃপর ঢাকনা টি খোলা হলো। 
দেখা গেল, একটি ছেঁড়া ময়লা কাপড়ের মোড়ক। সেই মোড়কের ভেতরে একটি ভাঁজ করা কাগজ। কাগজের ভেতরে কিছু লেখা আছে। 
সবাই জানতে চাইলাম, “কি লেখা আছে?”
পুলিশ মহাশয় পড়ে শোনালেন—“বাহিরের রূপ দেখে ভেতরের রূপের বিচার করা ঠিক নয়। 
এটি তারই একটি মডেল মাত্র।”
     
 
এই বাঙালি

এই বাঙালি গর্ব করে বাংলা ভাষায় কথা বলে,
মধুমাখা বাংলা ভাষা আকাশ, বাতাস, জলে, স্থলে।
এই বাঙালি কাজ করে দেশ-বিদেশের প্রতি কোণায়,
এই বাঙালি সর্বস্তরের উন্নয়নের বাণী শোনায়।
এই বাঙালি দেশপ্রেমিক, দেশের জন্য করেছে লড়াই,যাদের জন্য হয়েছি স্বাধীন,তাদের জন্য করি বড়াই।
সাহিত্য,বিজ্ঞানে পেয়েছে নোবেল এই বাঙালি আবার কে?
আকাশ জয়েও এই বাঙালি, বাঙালির ক্ষমতা দেখে নে।
এই বাঙালি লড়তে জানে, লড়াই করে বাঁচতে জানে,
সকল জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে ভালোবাসে মনে-প্রাণে।
কেউ যদি মনে করে বাঙালিকে নিয়ে খেলবে খেলা,
মনে রেখো, করবে ভুল—পরিশেষে বুঝবে ঠেলা।
   

দুয়ারে ভগবান

হঠাৎ কলিং বেলটা বেজে উঠতেই
দরজা খুলে দেখি—এ কী!
“ভগবান! আপনি?”
“হ্যাঁ, আমি চলে এলাম।
ভাবলাম, এখন অনেকেই 
মন্দিরে গিয়ে পূজা দেওয়ার সময় পায় না।
অপরের হাতে বা পুরোহিতকে টাকা দিয়ে
নিজের পূজা সারে।
ভক্তের দুয়ারে এলে আমি নিশ্চিত ও নিশ্চিন্ত—
আমি পূজা পাবই।
তারপর, অনেকের অনেক কিছু আছে,
তবুও আমার কাছে গিয়ে ‘এটা নেই’, ‘ওটা চাই’—
মিথ্যের জাল বুনে
কত রকম প্রার্থনা করে।
তাই দুয়ারে এসেছি সব দেখতে,
বুঝতেও পারব—আসল আর নকল।
তাছাড়া ভক্তদের দ্বারাই আমি প্রতিষ্ঠিত,
ভক্তদের দ্বারাই যুগ যুগ ধরে
প্রচার পেয়ে আসছি।
কিন্তু এখন ধর্মকে অনেকে অন্যভাবে দেখে;
ধর্মের মুখ্য উদ্দেশ্য থেকে সরে এসে
ধর্ম নিয়ে স্বার্থসিদ্ধি করতে চায়।
অনেকেই তাই ধর্মের ব্যাপারে বীতশ্রদ্ধ,
এমনকি ভীত ও সন্ত্রস্ত।
তাই আজ আমি ভক্তের দুয়ারে—
ভক্তের মন জয় করতে চাই,
বুঝাতে চাই আসল সত্য:
প্রতি জীবে ই আমি বিরাজমান।
ভক্তির ভক্তি, সততা, নিষ্ঠা—
জীব সেবাই আসল ধর্ম,
যা সমাজকে ধারণ করে।
প্রত্যেকের নিজস্ব সত্তাই ‘আমি’,
প্রত্যেকের নিজস্ব বিবেকই ‘আমি’।
বিবেক হল সকল কৃতকর্মের বিচারক;
তাকে যতই উপেক্ষা, অবহেলা, অস্বীকার করি,
কখনোই ফাঁকি দেওয়া যায় না।
অবশেষে জবাবদিহি করতেই হবে।”
হঠাৎ ঘুম ভেঙে যেতেই দেখি,
সূর্য মামা অনেকক্ষণ আগেই উঠে পড়েছেন,
জানালা দিয়ে কিরণ এসে পড়েছে বিছানায়।

Post a Comment

0 Comments