জ্বলদর্চি

বুকে ধরে তোমার রুমাল : অনাবিল এক মুগ্ধ উচ্চারণআলোচনা/ বাসুদেব গুপ্ত

বুকে ধরে তোমার রুমাল :  অনাবিল এক মুগ্ধ উচ্চারণ

আলোচনা : বাসুদেব গুপ্ত
 

“কুবাই নদীর ধারে অনেকক্ষণ বসে থাকলে
মনে হয়—নদীটা আসলে নদী নয়,”

লিখেছিলেন শক্তি।  সুমন রায়ের ‘বুকে ধরে তোমার রুমাল’ পড়তে পড়তে মনে হয় কবিতা আসলে কবিতা নয়। কুবাই নামের  এক অষ্টাদশী   নদী বয়ে যায় পংক্তির আড়ালে আড়ালে। সেই সিক্ততা শেষে হৃদয়ে এসে লাগে।  

লেখক উৎসর্গ তে লিখেছেন, “বলা না বলা সব কথা।।“ কিই বা বাকী রইল বলার। নদী কি শোনে? তার কি সময় আছে? সে কখনও রুমাল। কখনো শাড়ি। আবার সে সদ্যস্নাত তোয়ালেতে চুল ঢেকে বনলতা সেন।  দুহাতে দোতারায় কাশফুল। সে কুবাই সে কুবাই।
 🍂

সে শুনতে শুনতে চলে যায়।

উপরের প্রায় সব বাক‍্যবন্ধই ৫৬টি কবিতার থেকে নেওয়া। কোটমার্ক দিয়ে কন্টকিত তাদের করলাম না। 

বইটি আসলে  যেন বই নয়।  এক আদ‍্যোপান্ত প্রেমের উপহার। পাঠক বোঝে। কিন্তু পড়তে পড়তে তারো মনে ইচ্ছেগুলো ডাক দেয়   কুবাই কুবাই।  আর কবিতাগুলো নদীর ধারার মতই বয়ে যায় এক থেকে ছাপ্পান্নর দিকে। 
নদীর মতই কবিতাগুলো কখনও ছোট্ট খাঁড়িতে শীর্ণকায়া… 

একা
এক জন্ম আগে
আলপথ ধরে
হেঁটেছিলাম
আশৈশব
এখনও
সে
তেমনি
আছে
আদিগন্ত
নিশ্চুপ
শুধু
জলনূপুরের
ছাপ বুকে ধরে
একা

আবার কখনও শরীর বিছিয়ে প্রশস্ত বালুকাবেলা……

এখানে এইমাত্র এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল। পায়ে পায়ে ছাদে গিয়ে
দেখলাম কয়েকটা সবুজ পাতা উড়ে এসে পড়েছে দরজার ফাঁকে
আকাশের মুখ ভার, সাদা মেঘ ইতিউতি ছড়ানো | একটা চড়ুই
আধভেজা হয়ে একটা বীশের ডগায় গা ঝাড়তে ঝাড়তে বকবক
করে কাকে যেন কথা শোনাচ্ছে। রাস্তাগুলো ভেজা, এক আধটা…

লাইনগুলো যেন বর্ণনা করছে না, তারা নিজেই এক পশলা বৃষ্টিতে ভিজে হেঁটে আসছে আর কখন যে আমরাও কবির দেখার সঙ্গী হয়ে গেছি জানি না। 

চলতে চলতে কবিতা আবার  কখনো যেন মোহনায় এসে দিগন্তের মত উদার বিস্তৃত…

শীতবেলায় সূর্যাস্ত অসংখ্য ধূলিকণা গায়ে, পায়ে মেখে একছুটে নেমে যায় নির্ঘুম অন্ধকারে,
দিগন্তে তখন দেখি যতদূর চোখ যায় একেকটা সবুজ চিরায়ত বনবৈভব, নিকষ কালো,

মৃত্যুরমতো বাদামি কঠিন। 
বিবর্ণ হয়ে যায় সব আবেগ, আহ্লাদ এতো রিক্ত জনপদ কখনও দেখিনি…

পড়তে পড়তে বুক খালি হয়ে যায়, হৃদয়ে এক অপরিসীম শূন্যতা তৈরি হয়ে যায়। পড়তে থাকি আরো। 
সুমনের লেখায় শব্দগুলো নুড়ির মত  ঝমঝমিয়ে বাজে  যেন অদৃশ‍্য নূপুর। নূপুর ছাড়াই সেই মেয়েটি আসে নিঃশব্দে। 


পূর্ণশশী তুমি ক্লাসের সেই মেয়েটি
যে যখন খুশি হেসে উঠতে পারে
কারণে অকারণে কথার বদলে
পূর্ণশশী তুমি বড় সাজিয়ে তোলো
আবিশ্বঝকঝকে জোংস্নালোকে
জানো, যে নূপুর পরেনি পায়
তার অভিসার নিঃশব্দে ঘটে
প্রতি অমাবস্যার রাতে
আবার কখনও এক স্তব্ধতার আড়ালে
তার অভিসার নিঃশব্দে ঘটে
প্রতি অমাবস‍্যার রাতে। 

ছন্দ হীন, গদ্য কবিতার আক্রমণে যখন দিশাহারা, তখন সুমনের কবিতায় কেমন করে ছন্দ ফুটে ওঠে তা বিস্ময়কর। সে ছন্দ কখনও গোপনে আড়ালে, কখনও আবার উচ্ছল প্রকাশে।   কবিতায শরীরে জড়িয়ে থাকে শাড়ীর মত ছন্দ। অনেক গভীর আবেশে বসে না লিখলে এমনটি হয় না। 

সেই ছন্দের চন্দ্রমায় কখনো ফোটে অন‍্য এক ছায়া-

আসলে পালক নয়
ভোকাট্টা ঘুড়ি
মৃত‍্যুর বিজনপথে
একা মুখপুড়ি।

তথন মনে হয় আমরা সবাই ঐ আল ধরে চলে যাই। পাশে চলে কুবাই কুবাই। শান্ত কুবাই নির্লিমেষ চেয়ে থাকে শেষ হলে জীবন নৈথুন। 

যৎসামান‍্য কয়েকটি মুদ্রণ বিভ্রাট চোখে পড়ল। 
কিন্তু পাঠ শেষে মনে থেকে যায় রেশ। বুকের মধ‍্যে জেগে ওঠে সাঁওতালি ছেলে। কুবাইএর বুকে গোটা চাঁদ গলে যায়। প্রেমিক যারা বাসাবাসির শেষ সিঁড়িতে বসে বাসা খুজছে এখনো তাদের হাতে উঠুক এই বইটি- 

আসুক নেবে অবাধ‍্য সব 
অশ্রুধারা, যেমন ছিল
বাক্সেভরা। 

কবির আরেকটা ব‍্যাপার বলতেই হয়। শব্দের অর্থে বা ভাবে শুধু নয় তিনি শব্দের এক স্থাপত‍্য গড়তে ভালেবাসেন। তা কবিতার গড়নেই হোক বা চলনেই হোক। 

ও অন্ধ কানাই
তুমি গান ধরো
এখন গ্রীষ্মের খরতাপ
তবু বালিরশআগুন 
নেভেনি

কোথায় যেন পর্দার আড়ালে বেজে ওঠে তার সানাই। 

তেমনি তিনি আল ধরে যান আর চোখের সামনে দেখা দেয় সীমানা পেরিয়ে চলে যাওয়া এক দীর্ঘতম আল।

যারা কখনো কুবাই নদীতে যায় নি করে নি স্নান তারা এই বই পড়ুক, তারাভরা রাতে শুনতে পাবে ছলাৎ ছলাৎ। কবি প্রতিশ্রুতি দেন-

কথা দিচ্ছি এ বসন্ত পার হয়ে যাবে ঠিক
নদীতীরে অহেতুক ঘুরে
বুকে ধরে তোমার রুমাল

বসন্তে বসন্তে কিন্তু কুবাই ডাক দিয়ে যাবে কবিকে। আমরা এক অনাবিল কবিকে পেলাম, ফিরে ফিরে পেতে চাই আবার। 

পড়া শেষ হলে আবার আবার যখন পড়তে ইচ্ছে করে, তখনি বুঝি বইটি গেঁথে গেছে হৃদয়ে। সেখানে থাকবে। আবার পড়বো, বসন্ত পেরিয়ে গিয়ে বৃষ্টি এলে।

Post a Comment

2 Comments

  1. দু কূল ছাপায়
    সে বয়ে যায়..
    পদ্যে কুবাই
    গদ্যে কুবাই
    মনের ইচ্ছে তাই
    আমি ডুবে যাই।

    ReplyDelete