কমলিকা ভট্টাচার্য
চতুর্থ খণ্ড
পর্ব ২: প্রায়শ্চিত্তের পথে অবরোধ
ঘরের ভিতর একটা ভারী নীরবতা নেমে এসেছে। টিমসনের বলা কথাগুলো যেন এখনও বাতাসে ভাসছে—“এটাই হবে আমার প্রায়শ্চিত্ত।” অনির্বাণ অনেকক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। এই মানুষটাকে সে একসময় শ্রদ্ধা করত—একজন অসাধারণ বিজ্ঞানী হিসেবে। পরে সেই মানুষটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আজ তাকে যেন অন্যরকম লাগছে—অহংকার নেই, শুধু ক্লান্তি আর অনুশোচনা। অনির্বাণ ধীরে জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু কেন এখন?”
টিমসন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জানালার দিকে তাকাল। তারপর শান্ত গলায় বলল, “কারণ অনেক দেরি হয়ে গেছে।” ধীরে ধীরে সে বলতে শুরু করল—এলিনা মারা যাওয়ার পর সে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে, যদি বিজ্ঞানকে আরেকটু এগিয়ে নেওয়া যায়, যদি মানুষের সীমা ভেঙে ফেলা যায়, তাহলে হয়তো মৃত্যু থামানো যাবে। প্রথমে সেটা ছিল স্বপ্ন, কিন্তু ধীরে ধীরে তা নেশায় পরিণত হয়। সে ভেবেছিল, সে জীবন তৈরি করতে পারবে, নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, এমনকি ঈশ্বরের মতো হয়ে উঠবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে বুঝতে পারে—বিজ্ঞান যদি মানবিকতা হারায়, তাহলে সেটা আর বিজ্ঞান থাকে না, সেটা অস্ত্র হয়ে যায়।🍂
ইরা ধীরে জিজ্ঞেস করল, “এখন কি করতে চান?” টিমসন সরাসরি বলল, “এখন আমি একটা জীবন বাঁচাতে চাই।” সে টেবিলের ওপর একটি ডাটা-প্যাড রাখল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি বিশাল ভূগর্ভস্থ গবেষণাগারের ত্রিমাত্রিক নকশা—যেখানে embryo সংরক্ষিত আছে। ঋদ্ধিমান দ্রুত সেটি বিশ্লেষণ করে বলল, “তিন স্তরের নিরাপত্তা—biometric gate, AI surveillance, আর cryogenic vault authorization।” ইরা বলল, “মানে সহজ হবে না।” টিমসন মাথা নাড়ল, “সহজ হলে তোমাদের ডাকতাম না।”
অনির্বাণ তখন জিজ্ঞেস করল, “আর আপনি?” টিমসন বলল, “প্রথম দরজাটা আমি খুলতে পারব—biometric authorization আমার ছাড়া কেউ পারবে না।” কিছুক্ষণ নীরবতার পর অনির্বাণ দৃঢ়ভাবে বলল, “এই মিশনে আমরা সবাই যাব।” ইরা অবাক হয়ে তাকালে সে শান্তভাবে বলল, “সে আমার সন্তান।” ঋদ্ধিমান তখন ধীরে যোগ করল, “এই মিশনটা শুধু embryo উদ্ধার নয়—এটা একটা মানুষের পুনর্জন্মও।” সে টিমসনের দিকে তাকাল। টিমসন চোখ নামিয়ে নিলেন।
পরদিন রাত। পাহাড়ের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা গবেষণাগারটা দূর থেকে অন্ধকারে ঢাকা। একটা কালো গাড়ি দূরে এসে থামল, আর চারজন ধীরে নেমে এল। ইরা দূরবীন দিয়ে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করছিল—চারজন গার্ড, প্রতি ঘণ্টায় রুটিন বদলাচ্ছে। ঋদ্ধিমান ট্যাবলেটে তথ্য যাচাই করছিল, হঠাৎ সে বলল, “একটা সমস্যা হয়েছে—facility security alert হয়েছে।” টিমসন অবাক হয়ে বলল, “অসম্ভব!” কিন্তু ঋদ্ধিমান জানাল, “কেউ আপনার গতিবিধি ট্র্যাক করছিল।” মুহূর্তের মধ্যে সবাই বুঝে গেল—পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে গেছে।
ঠিক তখনই দূরে সাইরেন বেজে উঠল, আর গবেষণাগারের চারপাশে আলো জ্বলে উঠল। ইরা দাঁত চেপে বলল, “দারুণ… এখনই জেগে ওঠার ছিল।” অনির্বাণ ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল, “এখন কি করব?” ঋদ্ধিমান বলল, “দুটো পথ—এক, ফিরে যাওয়া; দুই, ওরা পুরো প্রস্তুত হওয়ার আগেই ঢুকে পড়া।” অনির্বাণ বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বলল, “দুই।”
তারা দ্রুত এগিয়ে গেল। প্রথম গেটের সামনে দুইজন গার্ড বন্দুক তুলে দাঁড়াল—“Stop!” একজন বলল, “Dr. Timson, আপনাকে ভিতরে ঢুকতে দেওয়ার কোনো নির্দেশ নেই।” টিমসন শান্তভাবে বলল, “আমি একটা ভুল ঠিক করতে এসেছি।” গার্ডরা সন্দেহভরে তাকাতেই ঋদ্ধিমান সামনে এগিয়ে এসে এক মুহূর্তে তাদের অস্ত্র নিষ্ক্রিয় করে দিল। টিমসন স্ক্যানারে হাত রাখল—কিছু সেকেন্ড পর ACCESS GRANTED দেখিয়ে গেট খুলে গেল।
ভিতরে ঢুকতেই লাল আলো জ্বলে উঠল—“Security breach detected.” টিমসন ধীরে বলল, “এখন থেকে ওরা আমাদের থামাতে সব করবে।” তারা দ্রুত করিডোর ধরে এগোতে লাগল। হঠাৎ ভারী দরজা উপর থেকে নেমে এসে পথ বন্ধ করে দিল। ঋদ্ধিমান কনসোল খুলে দ্রুত কোড ভাঙতে লাগল, কয়েক সেকেন্ড পর দরজা আবার উঠল। তারা দৌড়ে এগোতেই ছাদ থেকে কয়েকটা ড্রোন নেমে এল—auto-defense system সক্রিয়। পরের মুহূর্তেই গুলি শুরু হল, করিডোরে প্রতিধ্বনি। ঋদ্ধিমান একের পর এক ড্রোন ধ্বংস করতে লাগল, ইরা আড়াল থেকে পাল্টা গুলি চালাল।
কিন্তু বিপদ এখানেই শেষ নয়। করিডোরের শেষ প্রান্তে ভারী বুটের শব্দ শোনা গেল। দশজন সশস্ত্র গার্ড সামনে এসে দাঁড়াল, আর তাদের সামনে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ—ডক্টর হারগ্রিভ, টিমসনের পুরোনো সহকারী। সে ঠান্ডা হেসে বলল, “আমি জানতাম আপনি বিশ্বাসঘাতকতা করবেন।” টিমসন শান্তভাবে বলল, “আমি বিশ্বাসঘাতকতা করছি না।” হারগ্রিভ জিজ্ঞেস করল, “তাহলে কি করছেন?” টিমসন ধীরে বলল, “মানুষ হওয়ার চেষ্টা করছি।”
হারগ্রিভ বন্দুক তুলল—“দুঃখিত, কিন্তু আজ সেটা সম্ভব নয়।” মুহূর্তের মধ্যে আবার গুলির শব্দে করিডোর কেঁপে উঠল। আর সেই সময় ঋদ্ধিমান সামনে এগিয়ে এল। তার চোখে তখন অদ্ভুত এক দৃঢ়তা—যেন সে শুধু একটি রোবট নয়, একটি প্রতিজ্ঞা। এই লড়াই এখন শুধু একটি embryo উদ্ধার করার নয়, এটা এক প্রায়শ্চিত্তের পরীক্ষা।
2 Comments
টান টান উত্তেজনা নিয়ে পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।
ReplyDelete🙏
Delete