জ্বলদর্চি

জ্যোতিপ্রসাদ জানা (স্বাধীনতা সংগ্রামী, সুতাহাটা) /ভাস্করব্রত পতি

মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২০৪
জ্যোতিপ্রসাদ জানা (স্বাধীনতা সংগ্রামী, সুতাহাটা) 

ভাস্করব্রত পতি

তখন ভারত ছাড়ো আন্দোলন চলছে। মেদিনীপুরের বুকে তখন ইংরেজদের বিরুদ্ধে এক প্রলয়ঙ্কর বিপ্লব শুরু হয়েছে। সেইপর্বে সুতাহাটা, কাঁথি, খেজুরী এবং পটাশপুর থানা সম্পূর্ণ বিনা রক্তপাতেই বিপ্লবীদের দখলে চলে এসেছে। সেসময় সুতাহাটা থানা দখলকালে ১৯৪২ এর ২৯ শে সেপ্টেম্বর ৮ নং ইউনিয়নের জনতার একেবারে সামনের সারিতে ছিলেন জ্যোতিপ্রসাদ জানা, ব্যোমকেশ অধিকারী সহ তাঁর গ্রামের আরও অনেক বিপ্লবী। সেদিন দেশপ্রেমের চূড়ান্ত নিদর্শন দেখিয়েছিলেন অকুতোভয় জ্যোতিপ্রসাদ। 

তবে তাঁর নাম জেনে গিয়েছিল ব্রিটিশ পুলিশ। প্রায়। প্রায় একমাস পর ২৪ শে অক্টোবর পুলিশ আক্রমণ করে তাঁর বসতবাড়ি। আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় সেই বাড়িটি। সেইসাথে গ্রেপ্তারও করা হয়। যথারীতি হাজতবাসও করতে হয় তাঁকে।

১৮৯০ সালের ১০ ই ফেব্রুয়ারি পূর্ব মেদিনীপুর জেলার সুতাহাটা থানার গুয়াবেড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ভারত ছাড়ো আন্দোলনের অন্যতম সেনানী জ্যোতিপ্রসাদ জানা। বাবা গিরিশচন্দ্র জানা এবং মা মোক্ষদা দেবী। ম্যাট্রিক পাশ করার পর হিন্দু ধর্মশাস্ত্রে স্বশিক্ষিত হন। 

তাঁর জ্ঞান, বিদ্যাচর্চার দরুন আর্যসমাজ থেকে তাঁকে 'বিদ্যাভূষণ' এবং 'বেদান্তবিদ' সম্মানে সম্মানিত করা হয়। একদিকে শাস্ত্র আলোচনা, অন্যদিকে দেশভক্তির রসে নিমজ্জিত হওয়া - তিনি ছিলেন অনন্য এক ব্যক্তিত্ব। 

স্বাধীনতা সংগ্রামী এই অখ্যাত মানুষটি নিজেকে পরিশীলিত করেছিলেন মহাত্মা গান্ধির আদর্শে একজন গঠনকর্মী হিসেবে। ছিলেন অন্যতম একজন সুচারু যাত্রাশিল্পী এবং সুকণ্ঠের অধিকারী কীর্তন গায়ক। 

সুতাহাটা থানার বিখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী ও জননেতা কুমারচন্দ্র জানার অনুগামী ছিলেন জ্যোতিপ্রসাদ জানা। ব্রিটিশ তাড়ানোর সংগ্রামে নিজেকে সক্রিয়ভাবে এবং ওতপ্রোতভাবে যুক্ত করার ভাবনায় কলকাতার মেটিয়াবুরুজের চাকরি ছেড়ে দেন। ফিরে আসেন নিজের গ্রাম গুয়াবেড়িয়াতে। 

শুরু হল নতুন ভাবে পথচলা। এখানে এসে গড়ে তুললেন একটি যাত্রাগোষ্ঠী। লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ এই লোকঘরানা যাত্রার মাধ্যমে জনগনের মধ্যে সংগ্রামের বীজ পুঁতে দেওয়া।যাত্রার মাধ্যমে সহজেই পৌঁছে যেতেন জনগনের কাছে। ব্রিটিশ বিরোধী প্রচার এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য অর্থ সংগ্রহ - এই দুটি কাজই তিনি করতেন যাত্রাকে সামনে রেখে। 

তিনি তাঁর প্রত্যুৎপন্নমতিত্বকে পাথেয় করে সুতাহাটা থানার বহু মানুষকে লবণ সত্যাগ্রহে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিলেন। এমনকি নিজের ভাইঝি রেণুকা জানাকেও মহিলা বাহিনীর নেতৃত্বে তুলে এনেছিলেন। 

জ্যোতিপ্রসাদ জানা ছিলেন একজন যথার্থ সংগ্রামী নেতৃত্ব। একজন আদর্শ গঠনকর্মী হিসেবে সুতাহাটা থানায় চরকা বিস্তারের নিষ্ঠাবান কর্মী হিসেবে তিনি ছিলেন সর্বজনবিদিত। তাঁর সাংগঠনিক শক্তি এবং জনকল্যাণ ভাবনার অন্যতম নিদর্শন হয়ে রয়েছে গুয়াবেড়িয়া অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়। নিজেই উদ্যোগে নিয়েছিলেন এটির প্রতিষ্ঠার জন্য। মামাবাড়ির দেওয়া জমিতেই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭০ এর ২৩ শে ফেব্রুয়ারি মেদিনীপুরের এই রত্নটির জীবনাবসান ঘটে।
🍂

Post a Comment

0 Comments