কমলিকা ভট্টাচার্য
চতুর্থ খণ্ড
পর্ব ৪: প্রত্যাবর্তন
Cryogenic vault-এর ভিতরটা হিমশীতল। সারি সারি ক্যাপসুল নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে—যেন সময়ের ভিতর আটকে থাকা অসংখ্য জীবনের সম্ভাবনা। কাঁচের ভিতরে জমাটবাঁধা নীরবতা, আর সেই নীরবতার মাঝখানে এক অদৃশ্য অপেক্ষা—যেন কেউ ফিরে আসবে, কেউ আবার শুরু করবে। কিন্তু এখন সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে একটাই শব্দ বারবার ভেসে আসছে—সাইরেন।
ঋদ্ধিমান স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলল, “Lockdown সম্পূর্ণ হয়েছে।” তার কণ্ঠে কোনো আতঙ্ক নেই, কিন্তু সময়ের চাপ স্পষ্ট। ইরা বিরক্ত হয়ে বলল, “মানে আমরা এখন বরফের ঘরে আটকে আছি।” তার চোখ চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে—কোথাও কোনো বিকল্প পথ আছে কি না খুঁজে দেখছে।
অনির্বাণ তখনও কন্টেইনারটা শক্ত করে ধরে আছে। যেন সেটাই তার পৃথিবী, সেটাই তার সবকিছু। তার চোখে অদ্ভুত দৃঢ়তা। “না,” সে ধীরে বলল, “আমরা বের হব।”
টিমসন কনসোলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। স্ক্রিনে একের পর এক ডাটা ভেসে উঠছে, আর তার চোখ সেই তথ্যের মধ্যে ডুবে আছে। সে ধীরে বলল—“একটা উপায় আছে।”
সবাই তার দিকে তাকাল।
“কিন্তু সেটা খুব ঝুঁকিপূর্ণ।”
ইরা তৎক্ষণাৎ বলল, “এই মুহূর্তে নিরাপদ কোনো পথ নেই।”
টিমসন স্ক্রিনে একটা ম্যাপ দেখাল। “এই vault-এর পেছনে একটা পুরোনো সার্ভিস টানেল আছে। মূল নিরাপত্তা ব্যবস্থা সেটাকে নজরদারি করে না।”
ঋদ্ধিমান দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ করল। “টানেলটা সরাসরি পাহাড়ের অন্য পাশে বের হয়েছে,” সে বলল।
অনির্বাণ বলল—“তাহলে সমস্যা কোথায়?”
টিমসন চুপ করে রইল। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য দ্বিধা দেখা গেল। তারপর ধীরে বলল—“সেটা খুলতে হলে এখানকার power grid কয়েক মিনিটের জন্য বন্ধ করতে হবে।”
ইরা বলল—“তাতে কি হবে?”
ঋদ্ধিমান শান্ত গলায় বলল—“Power grid বন্ধ হলে পুরো facility অন্ধকার হয়ে যাবে… কিন্তু একই সঙ্গে সব দরজাও স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।”
অনির্বাণ বুঝে গেল। তার হাত আরও শক্ত হয়ে উঠল। “মানে যে grid বন্ধ করবে… সে বের হতে পারবে না।”
ঘরের ভিতর নীরবতা নেমে এল। যেন সময় থেমে গেছে।
টিমসন ধীরে হাসল। “ঠিক তাই।”
অনির্বাণ তৎক্ষণাৎ বলল—“না।”
টিমসন মাথা নাড়ল। “এই সুযোগটা আমাকে নিতে দাও।”
ইরা ধীরে বলল—“তুমি নিশ্চিত?”
টিমসন ধীরে বলল—“আমার জীবনে অনেক ভুল হয়েছে।”
সে অনির্বাণের দিকে তাকাল। “তোমরা আমাকে শাস্তি দাওনি। আমাকে আরেকটা সুযোগ দিয়েছ।” তার কণ্ঠ একটু কেঁপে উঠল। “এই সুযোগটা যদি আমি ব্যবহার না করি… তাহলে আমি কখনও নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না।”
এক মুহূর্তের জন্য তার চোখ যেন অনেক দূরে চলে গেল—একটা ছোট্ট মেয়ের দিকে, যে হয়তো এখনও হাসছে তার স্মৃতিতে।
“আমি আমার মেয়েকে বাঁচাতে পারিনি,” সে বলল। তার চোখে জল চিকচিক করছিল। “কিন্তু তোমাদের সন্তানকে বাঁচানোর জন্য যদি আমি কিছু করতে পারি… তাহলে হয়তো আমার জীবনের একটা অর্থ থাকবে।”
ঋদ্ধিমান ধীরে বলল—“মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি কি জানেন?”
টিমসন তাকাল।
“ভুল করার ক্ষমতা নয়,” ঋদ্ধিমান বলল, “ভুল স্বীকার করার সাহস।”
টিমসন হালকা হাসল। “তাহলে আজ আমি সেই সাহস দেখাতে চাই।”
সে কনসোলের সামনে দাঁড়াল। আঙুলগুলো স্থির, কিন্তু সিদ্ধান্ত অটল। “তোমরা টানেল দিয়ে বের হও।”
ইরা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
“কিন্তু—”
টিমসন হাত তুলে থামাল। “সময় নেই।”
ঋদ্ধিমান দ্রুত একটা লুকোনো দরজা খুলে ফেলল। সেখানে সরু একটা টানেল—অন্ধকার, অজানা, কিন্তু একমাত্র পথ।
অনির্বাণ এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হচ্ছিল—এই মুহূর্তটা হয়তো জীবনের সবচেয়ে ভারী মুহূর্তগুলোর একটা।🍂
তারপর সে এগিয়ে এসে টিমসনের দিকে হাত বাড়াল। “ধন্যবাদ।”
টিমসন হাতটা ধরল। তার চোখে অদ্ভুত শান্তি—যেন এতদিন পরে সে নিজের সঙ্গে একটা সমঝোতায় পৌঁছেছে। “তোমার সন্তানের ভালোভাবে জন্ম হোক।”
ঋদ্ধিমান বলল—“আমরা তোমাকে ভুলব না।”
টিমসন হালকা হাসল। “আমাকে মনে রাখার দরকার নেই। শুধু মনে রেখো—বিজ্ঞান মানুষের জন্য।”
ইরা, অনির্বাণ আর ঋদ্ধিমান টানেলের দিকে এগিয়ে গেল। তাদের পেছনে রয়ে গেল একটা মানুষ—যে নিজের ভুলের কাছে হার মানেনি, বরং সেই ভুলকে ঠিক করার পথ বেছে নিয়েছে।
ঠিক তখন টিমসন কনসোলের বোতাম চাপল।
পুরো ভবনটা কেঁপে উঠল। সব আলো নিভে গেল। একটা গভীর অন্ধকার সবকিছু গ্রাস করল। দূরে বিস্মিত গার্ডদের চিৎকার শোনা গেল—হঠাৎ সব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গেছে।
টানেলের ভিতর দৌড়াতে দৌড়াতে ইরা বলল—“সে কি সত্যিই…”
অনির্বাণ ধীরে বলল—“হ্যাঁ।” তার কণ্ঠে অদ্ভুত ভার—দুঃখ, শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতার মিশ্র অনুভূতি।
তার হাত এখনও কন্টেইনারটা শক্ত করে ধরে আছে—যেন সে জানে, এই ছোট্ট জিনিসটার মধ্যেই ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে।
অনেকক্ষণ পরে তারা টানেলের শেষ প্রান্তে পৌঁছাল। ধীরে ধীরে অন্ধকার পাতলা হয়ে এল।
পাহাড়ের বাইরে রাতের ঠান্ডা হাওয়া তাদের মুখে লাগল। সেই হাওয়ায় মুক্তির গন্ধ—একটা দীর্ঘ বন্দিত্বের পর প্রথম নিঃশ্বাসের মতো। দূরে আকাশে ভোরের প্রথম আলো ফুটছে। অন্ধকার ভেঙে আলো আসছে—ঠিক যেমনটা তাদের জীবনে ঘটছে।
ঋদ্ধিমান ধীরে বলল—“আমরা পেরেছি।”
অনির্বাণ কন্টেইনারটার দিকে তাকাল। তার চোখে তখন অদ্ভুত কোমলতা—একজন বাবার প্রথম অনুভূতি, যে এখনও তার সন্তানকে দেখেনি, তবু তাকে অনুভব করছে।
“না,” সে বলল, “এটা শুধু শুরু।”
তার কথায় ভবিষ্যতের ভার ছিল।
কারণ সামনে আরও বড় সিদ্ধান্ত অপেক্ষা করছে। এই embryo-টা কি সত্যিই নাতাশার শরীরে বসানো হবে? আর যদি হয়… তার জীবনের কি হবে?
ভোরের আলো একটু একটু করে ছড়িয়ে পড়ছিল, কিন্তু সেই আলোয়ও একটা অজানা ছায়া রয়ে গেল—একটা প্রশ্ন, যার উত্তর এখনও সময়ের কাছে বাকি।
1 Comments
টিমসনের ছোট অথচ মন ছুঁয়ে যাওয়া চরিত্র এ পর্বের প্রাপ্তি।
ReplyDelete