দূর দেশের লোকগল্প— ২৮৫
সাপ রাজকুমার
ইরান (পূর্ব এশিয়া)
চিন্ময় দাশ
সুলতান আর তার উজির (মন্ত্রী) একদিন দরবার শেষে গল্প করছিল। কথার ফাঁকে দুজনে ঠিক করল, তাদের ছেলেমেয়ে হলে দুজনের বিয়ে দেওয়া হবে।
একদিন সুলতানের একটি ছেলে হল। আর নাজিরের হলো একটি মেয়ে। দিন যায়। দুজনে বড় হতে থাকে। অবাক ব্যাপার, সুলতানের ছেলে আস্তে আস্তে মানুষের চেহারার বদলে, সাপের চেহারায় বদলে যেতে লাগল। অবাক হয়ে গেল সবাই। কিন্তু করবার কিছু নেই। খোদাতালা হয়তো এমনটি চান। তাঁর বিরুদ্ধে তো যাওয়া যায় না। মেনে নিল সবাই।
দেখতে দেখতে বড় হয়ে উঠল ছেলেমেয়ে দুটিতে । দুজনের বেশ ভাবসাব। মিলমিশ তাদের বেশ ভালই। বয়স হয়েছে, এবার তাদের শাদি দেওয়ার ব্যাপার। সুলতান উজির কেউই আপত্তি করল না। ছেলেমেয়ে দুটির বিয়ে হয়ে গেল।
প্রথম বাসর রাত্রি। মেয়েটি অবাক হয়ে দেখল, সুলতানের ছেলে তার সাপের খোলস খুলে ফেলেছে। সামনে দাঁড়িয়ে আছে অপূর্ব সুন্দর এক যুবা পুরুষ। চোখ ফেরানো যায় না তার দিক থেকে। আনন্দে বুক ভরে গেল মেয়েটির। এত আনন্দ, এত খুশি তার জীবনে আর কখনো আসেনি।
একসময় আনন্দের রাত্রি কেটে ভোর হল। দিনের আলো ফুটে উঠবার আগেই, সুলতানের ছেলে আবার তার সাপের চেহারায় ফিরে গেল।
এইভাবে দিন যায়। মেয়েটির মনে কোনও ক্ষোভ নাই। আনন্দেই দিন কাটে দুজনের। কিন্তু একদিন সুলতানের বেগমের কানে গেল তার ছেলের আসল রহস্য। বেগম তার ছেলের বউকে ধরে পড়ল-- রহস্যটা তোমাকেই উদ্ধার করতে হবে। কী করে এই সাপের খোলসটাকে চিরতরে বিদায় করা যায়। এটা কিন্তু আর কারও পক্ষে সম্ভব নয়। একমাত্র তুমিই পারবে। তোমাকেই এই ভার নিতে হবে।
🍂
মেয়েটিরও বেশ মনে ধরল কথাটা। সত্যি যদি এর একটা উপায় করা যায়। তাহলে দিনের বেলায় আর সাপের চেহারায় থাকতে হবে না তার স্বামীকে।
সেদিন রাতেই সে স্বামীকে জিজ্ঞেস করল-- হ্যাঁ গো, তোমার এই সাপের খোলসটাকে কী করে বিদায় করা যায় বলো তো? দিনের বেলা সাপের চেহারায় থাকো, ভালো লাগে না কারও।
ছেলেটি বলল-- ব্যাপারটা তেমন কিছু কঠিন নয়। কয়েকটা গমের দানা হাতে থাকলেই, কাজটা তুমি করে ফেলতে পারবে। তবে, কাজটা সহজ, ফলাফলটা কিন্তু খুব কঠিন হয়ে যাবে।
মেয়েটি বলল-- কাজটা যদি অতই সহজ, তাহলে ফলাফলটা কঠিন হবে কেন? কী এমন কঠিন, তুমি বলো আমাকে। আমি সামলে নিতে পারবো।
ছেলেটি বলল-- যদি আমি এই সাপের খোলস নষ্ট করে মানুষের চেহারায় ফিরে যাই, তাহলে আমরা দুজনে চিরকালের জন্য পৃথক হয়ে যাব। কেউ কারও সঙ্গে আর থাকতে পারবো না। পারবে তুমি সেটা মেনে নিতে? আমি কিন্তু পারব না।
এমন ভয়ানক পরিণতির কথা শুনলে, কার না ভয় লাগে? মেয়েটাও থমকে গেল। একটু ভেবে বলল-- কিন্তু তার কি কোন উপায় নেই? তুমি সাপের চেহারায় থাকবে না, অথচ ছাড়াছাড়ি হবে না আমাদের দুজনের। এমন কিছু যদি উপায় বের করা যেত।
ছেলেটি বলল-- সে উপায়ও আছে। মানুষের চেহারা ফিরে পাওয়ার পর, আমি তো আর এখানে থাকব না। তখন তুমি সাত জোড়া লোহার জুতো বানাবে। আর, কাগজ দিয়ে বানানো সাতটা আলখাল্লা। সেই পোশাক পরে, আমাকে খুঁজতে বেরোবে। তখন যদি দেখা হয়, তাহলেই দুজনে এক হতে পারব আমরা।
মেয়েটির তো আর তর সইছে না। সকাল হতেই শাশুড়িকে গিয়ে বলেছে সমস্ত কথা। সে তো শুনে আহ্লাদে আটখানা। বলল-- আজ রাতেই সমস্ত ব্যবস্থা করে ফেলতে হবে। তারপর ছেলেকে কী করে ফিরিয়ে আনতে হয়, সে ব্যবস্থা আমি করব। আমি আছি তোমার সাথে, কিছু চিন্তা করো না।
সেদিন রাতে অনেকক্ষণ গল্পগুজব করলো মেয়েটি তার স্বামীর সাথে। মাঝরাত তখন। ছেলেটি ঘুমিয়ে পড়েছে। মেয়েটি উঠে তার সাপের খোলস নিয়ে চুপিচুপি ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলো।
শাশুড়ি ছিল বাইরে। দুজনে মিলে সাপের খোলসে কয়েক দানা গম মিশিয়ে, আগুন ধরিয়ে দিল। দাউ দাউ করে পুড়তে লাগলো সাপের খোলস।
আগুন নিভে যেতেই, সে কী আনন্দ দুজনের। দুজনে দৌড়ে গিয়ে ঘরে ঢুকে পড়েছে। অমনি তাদের চোখ ছানাবড়া। গোল গোল চার খানা চোখ তাকিয়ে দেখল, বিছানা শূন্য। ছেলেটার চিহ্ন কোত্থাও নাই। এদিক ওদিক তাকিয়ে, কোথাও দেখা পাওয়া গেল না ছেলের। যেন কর্পূরের মত বাতাসে উবে গিয়েছে।
চারদিকে লোক পাঠিয়ে দিয়েছে সুলতান। তারা খুঁজে আনবে ছেলেকে। কিন্তু দিনের পর দিন গেল। ছেলের কোন খোঁজই পাওয়া গেল না।
সব শেষে, একদিন মেয়েটি নিজে বের হল। সে একবার চেষ্টা করে দেখবে, স্বামীকে ফিরে পায় কি না। কাগজের আলখাল্লা গায়ে। পায়ে লোহার জুতো। স্বামীকে খুঁজতে বেরিয়েছে মেয়েটি।
কতদিন গেল, কোথাও চোখে পড়ল না। কারোর মুখে খোঁজ পেল না স্বামীর। লোহার তৈরি জুতো, সেও ক্ষয়ে গেল একদিন, তখন পরের জোড়া পায়ে গলাল। এইভাবে ৭ নম্বর জোড়াও যখন ফেলে দেওয়া জোগাড় হয়েছে, একটা নদীর পাড়ে পৌঁছেছে মেয়েটি।
এক ধোপানি কাপড় কাচছে নদীতে। মেয়েটি জিজ্ঞেস করল—হ্যাঁ গো, তুমি এক সুলতানের ছেলেকে দেখেছ?
সব শুনেটুনে, ধোপানি বলল-- আছে তো। এখানে এক বণিকের বাড়িতেই আছে একটি ছেলে। নতুন এসেছে কিছুদিন হোল। তুমি বোধ হয় তাকেই খুঁজছো। বণিকের বাড়ি গেলে, তাকে দেখতে পাবে।
মেয়েটি হাতের আংটি খুলে, ধোপানিকে দিয়ে বলল-- তুমি এক কাজ কর। এই আংটিটা নিয়ে গিয়ে ছেলেটিকে দেখাও। তাহলেই কাজ হবে। কিছু প্রশ্ন করলে, জানাবে আমি নদীর পারে তার জন্য অপেক্ষা করছি।।
মেয়েটি বলল-- ঠিক আছে। আমি গিয়ে দেখাবো। তুমি একটু সবুর কর এখানে। এমনিতেই খানিক বাদে ছেলেটি আসবে এখানে নদীতে নাইতে।
সত্যি সত্যি কিছুক্ষণ বাদে ছেলেটি এসেছে স্নান করতে। সামনে তার স্ত্রীকে দেখে তো অবাক। বেশ খুশিও। মেয়েটি তাকে বাড়ি ফিরে যেতে বলল। ছেলেটি বলল-- না গো, ফিরে যাওয়া অত সহজ নয়। এটা আমার পিসির বাড়ি। এই পিসিই তো সাপ বানিয়ে রেখেছিল আমাকে। এখন পিসি ঠিক করেছে, তার মেয়ের সাথে আমার শাদি বসাবে।
দুজনে মিলে একটা ফন্দি এঁটে নিল তারা। নিজের বিবিকে চাকরানী সাজিয়ে, পিসির বাড়িতে ফিরে এসেছে ছেলেটি। বলল— দু’দিন বাদে বাড়িতে শাদি। অনেক কাজের চাপ। একে নিয়ে এলাম। কাজকর্মে সাহায্য করবে তোমাকে।
কারো মনে কোন কু গাইল না। মেয়েটি থাকলো বাড়িতে।
কিন্তু পিসি তো ডাইনি। স্বভাবে বদমাস। নানান উৎপাত শুরু করল মেয়েটির উপর। সবচেয়ে কঠিন কাজগুলো চাপায়। খেতেও দেয় না ভালো করে। কোনদিন আপত্তি করে না মেয়েটা। মুখ বুজে সব সহ্য করে।
দেখতে দেখতে শাদির দিন এসে গেল। ধুমধাম করে শাদি হয়েও গেল। তখন মাঝরাত। চারদিক নিঝুম। ন্তুন বউটিও ঘুমিয়ে পড়েছে। নতুন বিবিকে গলা টিপে মেরে ফেললো ছেলেটি। চুপিসারে বাইরে বেরিয়ে, নিজের বউকে নিয়ে পালিয়ে গেল বাড়ি ছেড়ে।
সকাল হতেই হই হই সারা বাড়িতে। বাসর ঘরে নতুন বউ মরে পড়ে আছে। এরা দুজন উধাও। পিসি তো ডাইনি। সে বেরিয়ে পড়ল দুজনের খোঁজে।
ছেলে-মেয়ে দুটোও পালাচ্ছিল। কিন্তু পিসি আসছিল ঝড়ের গতিতে। এক সময় কাছাকাছি পৌঁছেও গেল পিসি।
একবার ধরতে পারলে, জীবনে আর মুক্তি হবে না, এটা ভালই বুঝতে পেরেছে ছেলেটি। জোরে দৌড়তে শুরু করেছে বউয়ের হাত ধরে। কিন্তু পিসির সাথে পারবে কেন? পিসি যখন প্রায় এসে পড়েছে, বড় একটা গাছ টেনে রাস্তায় ফেলে দিল ছেলেটা। পিসির পথ আটকাতে।
কিছুই সুবিধা হল না। অবলীলায় গাছটি ডিঙিয়ে চলে এসেছে পিসি। এবার একটা পাহাড় টেনে ফেলে দিল ছেলেটা। সুবিধা হল না তাতেও। উড়তে উড়তে পাহাড় ডিঙিয়ে চলে এলো পিসি।
কী করা যায়, কী করা যায়? অনেক ভেবে, ছেলেটি সমুদ্রের ছেনা ছড়িয়ে দিল নিজেদের সামনে। অমনি দেখতে না দেখতে, গহীন সমুদ্র গড়ে উঠল সামনে। সে কী গর্জন সমুদ্রের। আর, কী বিশাল বিশাল ঢেউ তার।
মেয়েটি তো থমকে গিয়েছে ভয়ে-- এই সমুদ্র এখন পার হবো কী করে? তুমি পেছন দিকে এটা তৈরি করলে না কেন? নিজেদের সামনেই কেন তৈরি করলে গো?
ভয়ে কেঁদে ফেলেছে সে। কথার জবাব দিল না ছেলেটি। শক্ত করে হাত ধরল মেয়েটির। ঝাঁপ দিয়ে দিল সমুদ্রে। ডুবসাঁতার দিয়ে সরে পড়তে লাগল বড় বড় ঢেউয়ের তলা দিয়ে। পিসি সমুদ্রের পাড়ে এসে, দাঁড়িয়ে পড়েছে। বিশাল সমুদ্র সামনে। যেন অন্ত নাই সেই জলরাশির। একে পার হবার কোন উপায় আসছে না মাথায়। হতভম্ব হয়ে সাগরের পাড়ে দাঁড়িয়ে রইলো ডাইনি পিসিটা।
আর, ছেলেমেয়ে দুটি?
জল ছেড়ে, তারা যেখানে ভুস করে ভেসে উঠল, সামনেই সুলতানের প্রাসাদ। হাত ধরাধরি করে, হাসিমুখে বাড়ির পথ ধরল দুটিতে।
0 Comments