ব্রহ্মসূত্র --- শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি
পর্ব ৮
প্রীতম সেনগুপ্ত
ভগবান বুদ্ধের আবির্ভাবের অব্যবহিত পূর্ব-যুগে এবং শ্রী বুদ্ধের সমসাময়িক সময়ে ভারতবর্ষে ধর্মীয় এবং দার্শনিক চিন্তার বিরাট বিপ্লব লক্ষ্য করা যায়। ব্রহ্মজাল সূত্র থেকে জানতে পারা যায় শ্রীবুদ্ধের সময়ে ভারতবর্ষে অন্ততপক্ষে বাষট্টটি বিভিন্ন দার্শনিক মতবাদের প্রচলন ছিল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই ব্রহ্মজাল সূত্র কী? তথ্যসূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, ব্রহ্মজালসূত্র বা ব্রহ্মজালবোধিসত্ত্বশৈলসূত্র হল একটি মহাযান বিনয় সূত্র। তাইশো ত্রিপিটকে চীনা অনুবাদে এটি পাওয়া যাবে। তিব্বতি ভাষায় এটি অনূদিত হয়, তা থেকে মঙ্গোলিয়ান ও মাঞ্চু ভাষায়ও অনুবাদ করা হয়েছিল। সূত্রটিকে ঐতিহ্যগতভাবে সংস্কৃত ভাষায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে এবং তারপর ৪০৬ সালে কুমারজীব চীনা ভাষায় অনুবাদ করেছেন বলে মনে করা হয়। এই সূত্রে বুদ্ধের নৈতিক জীবন ও বিভিন্ন শ্রমন-ব্রাহ্মণের ভ্রান্ত ধারণা সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। উপনিষদ বেদান্ত, গীতা এবং অন্য বহু ধর্ম শিক্ষকের মতে জীবের দেহে স্বতন্ত্র, নিত্য, শাশ্বত, অজর, অমর আত্মা বিদ্যমান। বৌদ্ধশাস্ত্রে একে ‘সৎকায়দৃষ্টি’ বলা হয়। সেই ‘সৎকায়দৃষ্টি’ বা ‘আত্মধারণা’ সচরাচর সর্বসাধারণের কাছে বিদ্যমান বলে এবং দুঃখমুক্তি লাভের একান্ত পরিপন্থী বলে “কথাবত্থু“র সর্বপ্রথম প্রশ্নে সেই বিষয় আলোচিত ও মীমাংসিত হয়।স্থবির নাগসেনের সাক্ষাতে মিলিন্দরাজ কর্তৃক সর্বপ্রথম সেই সম্বন্ধেই জিজ্ঞাসিত ও মীমাংসিত হয়। ঠিক একই কারণে নিকায় গ্রন্থসমূহের প্রথম গ্রন্থের আদিতে ব্রহ্মজাল বা দৃষ্টিজাল সূত্রটি স্থাপিত হয়েছে। বৌদ্ধ সাহিত্য থেকে আমরা তদানীন্তন আর্যাবর্তের বহু শ্রদ্ধেয় ধর্মাচার্য এবং দার্শনিকের নামও জানতে পারি, এদের মধ্যে ছিলেন --- পুরাণকশ্যপ, কাত্যায়ন, মক্কালি গোসাল, জৈন ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা নির্গন্থ নাথপুত্র এবং আরও অনেকে। এইসব মহাত্মারা বেদ বিরুদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারতীয় সংস্কৃতির একটি বিশেষ দিককে অভিব্যক্ত করেছেন। একইভাবে আরও বহু মহানুভব মনীষী ব্যাক্তি ছিলেন যাঁরা ভারতীয় কৃষ্টি ও ধর্মীয় সংস্কৃতির পরম্পরাজাত ভাধারাকেও রক্ষা করেছিলেন।
পুরাণকশ্যপ ছিলেন প্রাচীন ভারতের একজন অন্যতম প্রধান শ্রমণ দার্শনিক এবং অক্রিয়াবাদী মতবাদের প্রবক্তা। তিনি বুদ্ধের সমসাময়িক ( খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক ) এবং মগধের রাজাদের দ্বারা সম্মানিত ছিলেন।
🍂
অক্রিয়াবাদ দর্শন অনুযায়ী তিনি বিশ্বাস করতেন যে, মানুষ ভালো বা খারাপ যে কাজই করুক না কেন, তার জন্য কোনও পুণ্য বা পাপ সঞ্চিত হয় না। তাঁর মতে, কোনও কাজই আত্মার উপর প্রভাব ফেলে না। হত্যা, চুরি, ব্যভিচার বা মিথ্যা কথা বললেও কোনও পাপ হয় না। একইভাবে, দান, আত্মসংযম বা সততার জন্য কোনও পুণ্য হয় না। কর্মফলের তত্ত্বে তাঁর বিশ্বাস ছিল না। তিনি ছিলেন চরম অক্রিয়াবাদী। বুদ্ধ তাঁর এই মতবাদকে ক্ষতিকর বলে মনে করতেন কারণ এটি মানুষকে নীতিহীনতার দিকে পরিচালিত করতে পারে। বৌদ্ধ গ্রন্থ ‘সামান্নফলসুত্ত’অনুযায়ী রাজা অজাতশত্রুকে তিনি তাঁর এই দর্শনের কথা শুনিয়েছিলেন। প্রাচীন ভারতে প্রচলিত ছয়জন প্রধান তীর্থঙ্করের( অ- বৌদ্ধ অথবা অ-জৈন দার্শনিক ) তিনি ছিলেন অন্যতম। ‘অনঙ্গুত্তর নিকায়’ অনুযায়ী তিনি নিজেকে সর্বজ্ঞ বলে দাবি করতেন। ধম্মপদের বর্ণনায় জানা যায় জলে স্বেচ্ছায় ডুবে প্রাণত্যাগ করেন তিনি। অপরদিকে মক্কালি গোসাল সম্পর্কে জানা যায় --- তিনি গৌতম বুদ্ধের সমসাময়িক একজন ভারতীয় অকর্মণ্যতাবাদী দার্শনিক ছিলেন। তাঁর জীবন সম্বন্ধে বৌদ্ধ ও জৈন সূত্রগুলিতে উল্লেখ রয়েছে। জৈন ধর্মাবলম্বীদের ভগবতীসূত্র অনুসারে, তিনি সাবত্থীর নিকটবর্তী সরবণ নামক স্থানে একজন ব্রাহ্মণের গোশালায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতার বৃত্তি গ্রহণ করে প্রথমে প্রথম জীবনে গোসাল চিত্র বিক্রেতা হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করেন। যদিও সুমঙ্গলবিলাসিনী নামক বৌদ্ধ শাস্ত্রে উল্লিখিত আছে যে, মক্কালি গোসাল প্রথম জীবনে একজন পরিচারক ছিলেন এবং তার মনিবের একটি তৈলপাত্র ভেঙে ফেলায় শাসনের ভয় উলঙ্গ অবস্থায় পলায়ন করেন।
ভগবতী সূত্র অনুসারে, তিনি জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীরের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন, কিন্তু বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর সঙ্গে বিরোধ উপস্থিত হয়। তাঁর দর্শনের সঙ্গে মহাবীর সহমত পোষণ না করায় ও জৈন সম্প্রদায়ের বিরাগভাজন হওয়ায় মক্কালি গোসাল সম্প্রদায় থেকে বহিষ্কৃত হন। এরপর তিনি আজীবিক নামক এক নতুন সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠা করেন। বৌদ্ধ সূত্রগুলিতে মক্কালি গোসালকে গৌতম বুদ্ধের সমসাময়িক ছয়জন প্রসিদ্ধ আচার্যের একজন বলে উল্লেখ করা হয়ে থাকে।
1 Comments
অনেক জানার আছে এই ধারাবাহিকে। কিন্তু লেখনশৈলী বড় গুরুভার। আর একটু ভাববার অবকাশ দিতে প্যারাগুলো আর একটু ছোট করলে ভালো হত মনে হয়।
ReplyDelete