দর্শনের আলোকে
ষোড়শ পর্ব
স্বাতী ভৌমিক
(আত্মসাক্ষাৎকারের প্রয়োজনীয়তা)
বর্তমান যান্ত্রিক সভ্যতাতে মানুষ এই সভ্যতার সাথে তালে তাল মেলাতে গিয়ে নিজের অস্তিত্ব প্রায়ই হারিয়ে ফেলে।অন্তর দর্শনের মাধ্যমে নিজের মুখোমুখি হওয়াটা খুবই প্রয়োজন। সারাদিনে অন্তত একবার হলেও নিজের সাথে নিজের দেখা ও কথা হওয়াটা খুব প্রয়োজন। কারণ জীবনের যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে যে 'আমি' 'আমাকে' সামলে রাখে, শেষ সান্ত্বনাটুকু যে 'আমি' দেয় তার সাথে সাক্ষাৎ হওয়াটা খুব জরুরী।
পরানুকরনের ঝোঁকে ব্যক্তি প্রায়শই অন্যের মতো হতে চায়। তাতে অনেকটা সফল হলেও অন্তরের আসল 'আমি' কিন্তু অতৃপ্তই থাকে। তাকে না বুঝে-না জেনে গতানুগতিকতার স্রোতে ভেসে চললে জীবনে অনেক সময় সুখ হয়তো আসে কিন্তু শান্তি কখনোই আসে না।
অন্যের অনুমোদনের ওপর জীবনের সব উৎকর্ষ-অপকর্ষ নির্ভর করে না। নিজের অন্তরের 'আমি'র যদি এটা মনে হয় যে,স্বীয় কৃতকর্ম বা সংকল্পকৃতকর্ম ঔচিত্য-অনৌচিত্যের মানদন্ডে সঠিক, অন্যের বিচার জানার পরও যদি মনে হয় যে, স্বীয় বিচার-ই সঠিক, তাহলে শুধুমাত্র ক্ষণিক ভালো-এর তকমা নিতে গিয়ে নিজের বিচারে নীচে নেমে আসাটা কখনোই যুক্তিযুক্ত নয়।
🍂
জাগতিক সুখ-সমৃদ্ধি,চাকচিক্য ব্যক্তির মনে অনেক সময় ক্ষণিক সুখ প্রদান করলেও,সন্তুষ্ট করতে বা শান্তি আনয়ন করতে পারে না। কারণ এই সুখী হওয়াটা বেশিরভাগই জাগতিক ক্ষেত্রে অন্যের কাছে ভালো হওয়া বা বাহবা পাওয়ার বাসনার সাথে সম্পৃক্ত থাকে। তাই জাগতিক পরিবর্তন বা ব্যক্তিমন পরিবর্তনের সাথে সাথে ওই সুখও বিলুপ্তির পথে এগোতে থাকে। শুরু হয় অন্যভাবে অন্যকোন সুখঅন্বেষণ। আর প্রকৃত 'আমি'র কথা ওই উন্মত্তপ্রায় অন্বেষণের অন্তরালেই থেকে যায়।
ধ্যানের মাধ্যমে চিন্তাশূন্য হলে মন ধীরে ধীরে বিষয়শূণ্য হয়ে যায়। এক শান্তির বাতাবরণ মনের মধ্যে তৈরি হয়। মন বিকার মুক্ত হয়ে ওই সময় অপার শান্তি অনুভব করে। এই প্রক্রিয়া সহজ না হলেও অসম্ভব কিন্তু নয়। মন বা চিত্তের এই শান্ত অবস্থায় যে স্থিতিশীল ভাব থাকে, তার প্রভাব জীবনের চলার পথে বিভিন্ন ব্যাপারে উৎকণ্ঠা মুক্ত হয়ে 'প্রকৃত আমি'র সাহচর্য্যে সঠিক পথ নির্বাচন করতে সহায়তা করে ।'ধ্যান' অর্থে এখানে নিজের মনোবৃত্তি তথা নিজের প্রতি সচেতন হওয়া, বাহ্যনিয়ন্ত্রণ মুক্তভাবে নিজের সম্পর্কে নিজের ধারণা গঠন করার কথা বলতে চাইছি।
এই জগতে প্রায়শই ব্যক্তির নিজের সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকে না, অথচ অন্যের সম্পর্কে অতি সহজে ধারণা গঠন করে নেয়। যদিও তা কতটা সঠিক তা সন্দেহের উর্ধ্বে থাকে না। যে 'আমি'কে ব্যক্তি সুখী করতে চায় বা শান্তিপূর্ণ অবস্থায় দেখতে চায়, সেই 'আমি' সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকাটা সর্বপ্রথমে খুব প্রয়োজন। কে এই আমি? যদি চাহিদা নিবৃত্তিতে সুখ-শান্তি নিহিত থেকে থাকে, তাহলে জীবনে সব চাহিদা যে অপূর্ণ থাকে তা তো নয়। অনেক চাহিদা পূর্ণ হওয়ার পরেও ব্যক্তি অসুখী কেন? এই অনন্ত চাওয়ার-এই অনন্ত অতৃপ্তির কি নিবৃত্তি সম্ভব? যদি হয় তাহলে কিভাবে সম্ভব? ইত্যাদি ইত্যাদি আত্মজিজ্ঞাসামূলক প্রশ্ন যখন মনের মধ্যে জাগে,তখন ব্যক্তি বিচলিত হয় না।কিন্তু এই ধরনের প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে খুঁজতে ব্যক্তি নিজের মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ায়। শুরু হয় গভীর অন্তর দর্শনের-গভীর উপলব্ধির শুভারম্ভ। এভাবে ধীরে ধীরে আত্মঅন্বেষণ চলতে থাকলে চিত্তবিক্ষেপ(ক্ষিপ্ত, বিক্ষিপ্ত, মূঢ়)না ঘটলে ব্যক্তির আত্মসাক্ষাৎকার ঘটে। নিজের জীবনের মূল চালিকা শক্তি তখন বাহ্যজগত নয়, অন্তর জগত থেকে আসে। ব্যক্তি মনের তথা অন্তর জগতের সেই শান্তি কোন বাহ্যিক অবস্থার দ্বারা বিঘ্নিত হয় না। সেই স্থির ভাবনাময় আত্মসমৃদ্ধিমূলক শান্ত অবস্থার মাঝে অস্থির বাহ্যবিষয় সম্পর্কিত চিন্তা সমাহিত হয় ও ব্যক্তির চিত্তের শান্ত অবস্থার মাঝে সেই চিন্তা বিলীন হয়ে সুষ্ঠু প্রবহমানতা লাভ করে।
বাহ্যিক কোলাহল মুখরতার মাঝে ব্যক্তি ওই অনন্য অবস্থায় পৌঁছতে পারে না। তাই দিনের মধ্যে সাধ্যমত অন্তত কিছুটা সময় একান্তে নিজের সাথে থাকা খুব প্রয়োজন। বাইরের কোলাহল স্তব্ধ হলেও তখন আর ব্যক্তির অসহায় বা একাকী মনে হয় না। অন্তরের অরূপ রত্নসম্ভারের সন্ধান পেলে ব্যক্তি নিজের মধ্যে পূর্ণতা অনুভব করতে পারে। বিক্ষুব্ধ ভবসাগরের বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতি তখন ব্যক্তি অনায়াসেই পার হয়ে যেতে পারে।
নিজের থেকে নিজেকে ভালো করে আর কে-ই বা জানতে পারে! ভুলবশত সান্ত্বনাকে অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি সম অবস্থানের সাথে এক করে ফেলে। বিচারকে আত্মপরিচয়ের সাথে গুলিয়ে ফেলে। অন্যের ভিড়ে অনন্যতার কথা ভুললে কি করে ব্যক্তির স্বীয় সমস্যার সমাধান হবে! তাই তো ইহজগতে অধিকাংশ মানুষই অসুখী। ভেবে দেখলে জড় জগতে ভালো থাকার মতো বিষয়-আশয় থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তি অসুখী। কারণ জড় জগতে তো আসল বা চির সুখের উপাদান নেই- তার মূল তো অন্তরের অন্তরময়তায় লুকিয়ে আছে। আর সেখানেই রয়েছে আসল শান্তির উৎস।।
0 Comments