চলচ্চিত্র আলোচনা
LUNANA : A Yak In The Classroom
তনুশ্রী ভট্টাচার্য্য
You can touch the future----as a teacher
হিমালয়ের কোলে ছোট্ট দেশ ভুটান, কিন্তু বেশ প্রাচীন। দেশটির রাজধানী সংলগ্ন এলাকাটিই কেবল আলো ঝলমলে। সবরকম নাগরিক সুযোগ সুবিধা আছে। ছেলেমেয়েরা বড় হচ্ছে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায়। তাদের মনের গঠন আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে। ইয়ং জেনারেশনের নিজের দেশ ছেড়ে অন্যদেশে থিতু হাওয়ার প্রবণতা । কিন্তু সারা দেশটি কি তাই চায় ? দেশের অন্য অংশ কেমন আছে? কেমন তাদের জীবনযাত্রা ? রাজধানীর জীবন থেকে কতটা তারা আলাদা? সারা দেশের জনজীবনে ঐ প্রত্যন্ত গ্রামগুলোর মানুষদের কি প্রভাব আছে বা তারা কতটা প্রভাবিত হতে পেরেছে আলোকিত ভূটানের জীবনযাত্রায় ---- এসব প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয় ভুটানের 'লুনানা :এ ইয়াক ইন দ্যা ক্লাসরুম' চলচ্চিত্র টি।
পরিচালক Pawo Choyning Dorji .
কেন্দ্রীয় চরিত্র ( উগিয়েন)---Sherab Dorji
প্রান্তিক আর কেন্দ্রিক ---এদের মধ্যে সেতুবন্ধন না হলে যে দেশের উন্নতি হয় না তাই দেখায় সিনেমাটি । আরো দেখায় যে রাজধানীর আলোক বৃত্তে থাকা ইয়ং ছেলেমেয়েরা প্রান্তিক অংশগুলি চেনেই না , চিনতে চায় না, দেশের দূরবর্তী স্থানে চাকরি করতে যাওয়ার থেকে বিদেশ চলে যাওয়া ভালো-- এইই তাদের মানসিকতা. তবে শেষে আরো দেখায় যে ধীরে ধীরে ঐ গ্রাম এবং মানুষগুলোর সঙ্গে থাকতে থাকতে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন আসে। তাদের ভালোবাসা যত্ন সম্মান পরিচর্যা সর্বোপরি তাদের ভরসা স্থল হয় ওঠার কারণে যুবকটির মনে পরিবর্তন আসে।
সিনেমাটির কেন্দ্রীয় চরিত্র সদ্য যুবক উগিয়েন। তার মনের তীব্র আকাঙ্খা বিদেশে গিয়ে সিঙ্গার হিসেবে সুনাম কুড়ানো ,তাই সে শেষপর্যন্ত চলে যায় অষ্ট্রেলিয়া কিন্তু সেখানে গিয়ে বুঝতে পারে যে এই আলো ঝলমলের উদ্দাম জীবনের গান সে আর গাইতে পারে না, লোকে শোনেও না। তখন সে সেই গ্রামের মেয়েটির কাছে থেকে শোনা ও শেখা গানটাই গেয়ে ওঠে হোটেলের লনে। অর্থাৎ সে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে সেই দূরবর্তী হদ্দ গ্রামটাকেই ভালোবেসে ফেলেছে এবং গ্রাম জীবনের মাধুর্যেকেই সে জীবনে বরণ করে নিয়েছে।
এটা যেন তার নিজেরও একটা শিক্ষা। জীবনের বৃত্ত পূর্ণ করার গল্প।
চলচ্চিত্রটির স্টোরিলাইন এইরকম-----
উগিয়ন নামে এক যুবক তার ঠাকুমার সঙ্গে থিম্পুতে থাকে। তার চাকরির শর্ত অনুযায়ী তাকে লুনানা নামে এক দুর্গম পাহাড়ি গ্রামে একটি স্কুলের দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হোল।সেটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪৮০০ মিটার উপরে অবস্থিত আর মাত্র ৫৬জন মানুষ যেখানে বাস করে এবং বেশীরভাগ ইয়াক অর্থাৎ চামরী গাই পালক । সে যেতে চাইল না। সে চায় অষ্ট্রেলিয়ায় গিয়ে বড় সিঙ্গার হবে। কিন্তু তার ঠাকুমা জোর করে তাকে পাঠালো। সে বাসে করে কিছুটা গেল। আর বাস যাবে না। ঐ গ্রাম থেকে মিচেন নামে এক সদালাপী ছেলে এলো গ্রামে আসা নতুন টিচার অর্থাৎ উগিয়েনকে যত্ন করে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবার জন্য। ছয় দিন ধরে হেঁটে তারা লুনানায় পৌঁছল।
মিচেন উগিয়নকে সব কিছু শিখিয়ে দিল। সেই গ্রামের সব লোক তাকে টিচার হিসাবে পেয়ে খুব খুশি হোল। বাচ্চারা তার কাছে আনন্দে পড়তে লাগল। গ্রামের পরিবেশে প্রথমটা হতাশ হলেও ধীরে ধীরে উগিয়নের পড়ানো, এই গ্রাম, স্কুল খুব ভালো লাগতে শুরু করল।এখন সে সবার সঙ্গে মিশতে পারছে। বাচ্চাদের লেখাপড়ার নানা সুবিধা করে দিচ্ছে। স্কুলে কোনো ব্ল্যাক বোর্ড নেই। লেখার অসুবিধা হওয়ায় মিচেনের সঙ্গে মিলে কাঠ কেটে চামরী গাইয়ের গোবর পুড়িয়ে ও দেশীয় জিনিস দিয়ে কালো কালি তৈরী করে কাঠে বুলিয়ে উপযুক্ত ব্ল্যাক বোর্ড তৈরী করে দিল বাচ্চাদের জন্য। এরপর শেখার সরঞ্জাম, কাগজ ইত্যাদি যোগান দিতে থাকল। এমনকি তার নিজের ছোট্ট ঘরে জানলায় হাঁটা কাজটিও সে ছেলেমেয়েদের লেখার জন্যে খুলে দিয়ে দিল। গিটারে গান বাজিয়ে বাচ্চাদের আনন্দ দিত। গণিত ইংরেজী ও জংখা ভাষা শেখাত। এই সব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সে গ্রামের ঐতিহ্য আচার আচরণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, সংবেদনশীল, হয়ে উঠতে লাগল। তার প্রাথমিক উদাসীনতা পরিবর্তিত হোল মনোযোগে, অনিচ্ছা পরিণত হোল কর্তব্যবোধে। গ্রামের লোকেরা তাকে উষ্ণসম্পর্কের মধ্যে বরণ করল। উগিয়েনের ওপর তাদের ভরসা যে একজন শিক্ষক নতুন ভবিষ্যৎ পড়ে দেবে তাদের ছেলেমেয়েদের জন্য।
এই সব দৃশ্যে একজন শিক্ষকের উপযুক্ত রূপটি ধরছেন পরিচালক। যখন ক্লাসের পঠনপাঠনের সময় শিক্ষার সরঞ্জামের যোগান নেই বলে আমরা চিৎকার করি বা কর্তৃপক্ষ কে দোষারোপ করি তখন এই সিনেমাটি দেখায় শত প্রতিকূলতার মধ্যেও একাগ্রতা নিষ্ঠা থাকলে সফল হওয়া যায়। দরকার শুধু সদ্দিচ্ছা। একটি শিক্ষণীয় বার্তা আছে সিনেমাটিতে।
🍂
ভূটানের চামরী গাই এই সিনেমায় এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছে। চামরী গাই গ্রামবাসীদের কাছে খুবই পবিত্র। প্রবল ঠান্ডায় ওর গোবর ঘরে জ্বালিয়ে ঘর গরম রাখে ওরা। ওর দুধ খায় ওরা। চামরী গাই ওদের উপকারী বন্ধু । উগিয়ন সেটা শিখে নিল এবং শহুরে ছেলে হয়েও সেই গোবর সে কুড়িয়ে নিয়ে রাখতে লাগল আর পাঁচজন গ্রামবাসীদের মতোই। উগিয়ন যখন শিশুদের লেখাপড়ার জন্য নানারকম চেষ্টা করছিল তখন তারা মনে করতে লাগল যে উগিয়ন হয়তো আগের জন্মে ইয়াক ছিল তাই ওর এত ভালো হৃদয়।
গ্রামের একটি মেয়ে যে পাহাড়ের ওপরে বসে রোজ পাহাড়ের আত্মাদের উদ্দেশ্যে একটা গান গায় ---'ইয়াক লেবি লাদার'----উগিয়ন তার কাছ থেকে গানটা শিখে নেয় ।
মেয়েটি তাকে একটি ইয়াক উপহার দেয় 'নোরবু ' যার মানে 'রিয়েল জেম'। উগিয়ন সেই ইয়াককে শ্রেণীকক্ষেই রাখে, তাকে সব বাচ্চারা ভালোবাসে।ক্লাস ক্যাপ্টেন পেমজাম নামের ছোট্ট মেয়েটি সহ সবাই উগিয়েন কে ভালোবাসে। এরপর শীত নামলে ওদের ক্লাস বন্ধ হয়ে যায়। এখন সবাই গ্রাম থেকে নেমে চলে আসবে সমতলে। বসন্ত এলে আবার ফিরে যাবে। কিন্তু উগিয়েন জানায় পরের বসন্তে সে আর আসবে না। সে অষ্ট্রেলিয়া চলে যাবে। সবাই মন খারাপ করে বিদায় দিল উগিয়েন কে। ওরা উগিয়েন কে বলল---একজন টিচার পারে আগামী ভবিষ্যতেকে স্পর্শ করতে --আপনি সেইরকম মানুষ।
আজ যখন আমাদের চারপাশে স্কুল শিক্ষা ও শিক্ষক নিয়ে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ,যখন সমাজে শিক্ষকদের মানসম্মান কলঙ্কিত হচ্ছে তখন এই সিনেমাটি আমাদের মন ভালো করে দেয়। ভূটানে হলেও ভারতীয় শিক্ষার প্রাচীন রীতিতেই সম্মান দেওয়া হয়েছে চলচ্চিত্রটিতে। একজন শিক্ষকই পারে আগামীকে স্পর্শ করতে ---এই বিশ্বাস ছবিটির পরতে পরতে ছড়ানো আছে।
এরপর উগিয়েন লুনানা ছেড়ে চলে গেলো অষ্ট্রৈলিয়া। দূরদেশে যে উচ্চ আশা নিয়ে গেল গায়ক হবার জন্য সেখানে কিন্তু তার গান প্রিয় হলো না শ্রোতাদের। সে গান গাইছে অথচ কেউ শুনছেই না। সে গান থামিয়ে দিচ্ছে। হোটেল মালিক তাকে তিরস্কার করে বলছে যে তাকে পয়সা দেওয়া হচ্ছে সুতরাং কেউ না শুনলেও তাকে গাইতে হবে।
উগিয়ন খুবই হতাশ হলো। তখন সে লুনানায় শেখা সেই গানটি গাইল ---ইয়াক লেবি লাদার ।
এই হৃদয়স্পর্শী মৌলিক অনুভূতি সমৃদ্ধ পাহাড়ী সুরের গানটি দিয়ে সিনেমাটি সমাপ্ত হয় অর্থাৎ উগিয়েন শারীরিক ভাবে লুয়ানাতে না ফিরলেও অন্তরের টান ভালোবাসা অনুভব, আবেগ আর সুর গান তাল লয় দিয়ে সে লুয়ানাতে ফিরে গেল।
মানুষকে শেষ পর্যন্ত নিজের শেকড়ের টানেই ফিরতে হয় এবং নব্য প্রজন্মের ছেলেমেয়েরাও তাকে অস্বীকার করতে স্পর্ধা দেখায় না---এই বার্তা দিয়ে চলচ্চিত্রটি শেষ হয়।
মূল গল্পের সারল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ক্যামেরার কৃৎকৌশলে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন পরিচালক। হিমালয়ের কোলের পাহাড় ঘেরা কুয়াশার আচ্ছাদন আবার কখনো মন কেমন করা তীব্র নীলাকাশ ঝর্ণা নদী সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক পরিবেশ খুব সরলভাবে ক্যামেরাবন্দী করেছেন পরিচালক অহেতুক কোনো অতিপ্রাকৃত পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাননি ।
খুব সাদাসিধা ভাবেই একটি ইয়াক কে দেখিয়েছেন পার্শ্ব চরিত্র হিসাবে যে ক্লাসরুমে ছেলেমেয়েদের সঙ্গেই খায় শোয়। আদর পায় ছোটো ছোটো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। প্রাণীজগতের প্রতি সহানুভূতিশীলতা দেখানো হয়েছে এর মাধ্যমে। পাহাড়ী সারল্যে মোড়া চরিত্রগুলির অভিনয়ের সঙ্গেও এটি মানানসই হয়েছে। প্রকৃতি নিজেই একটি চরিত্র হয়ে উঠেছে এখানে। মনোরম আবহসঙ্গীত যেন পর্বতের উচ্চতার গাম্ভীর্যকে প্রণাম জানায়। 'ইয়াক লেবি লাদার' গানটি যেন পাহাড়ের আত্মা আর সিনেমার আত্মা টিকে বেঁধে দিয়েছে।
সিনেমাটি 2021তে অস্কার মনোনয়নের দৌড়ে ছিল। বেশ কয়েকটি পুরস্কার জিতেছে।
1 Comments
লেখাটা পড়তে পড়তে ওয়ার্ডসওয়ার্থকে খুব মনে পড়ছিল।
ReplyDeleteদিদি আপনাকে ধন্যবাদ এমন সুন্দর একটি চলচ্চিত্রের সঙ্গে পরিচয় ঘটালেন।