গাজন: বাংলার লোকসংস্কৃতির এক অনন্য উৎসব
পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী
বাংলার লোকসংস্কৃতির এক অনন্য উৎসব হলো 'গাজন'। মূলত শিবকে কেন্দ্র করে পালিত এই উৎসব গ্রামবাংলার কৃষিভিত্তিক সমাজ, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং লৌকিক আচারের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। বসন্তের শেষে প্রকৃতি যখন রুদ্র রূপ ধারন করতে শুরু করে , তখন শিবলোকের যাত্রী হয়ে ওঠা সন্ন্যাসীর উচ্চকিত গর্জনে মুখরিত হয়ে ওঠে বছরের শেষ প্রহর। অনেকেরই ধারনা সন্ন্যাসীদের এই গর্জন থেকেই সম্ভবত 'গাজন ' শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। অবশ্য কেউ কেউ বলেন , 'গ্রাম' ও ‘জন’ -এর সম্মিলিত উৎসব বলেই এর নাম হয়েছে 'গাজন'। তবে , গাজন যে গ্রামের সাধারণ মানুষের উৎসব সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি অনন্য অঙ্গ হয়ে ওঠা চৈত্র শেষের এই শিবের গাজন আজও চৈত্র সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদেই পালিত হয়। গ্রামবাংলার ধুলোবালি আর তপ্ত দুপুরের রোদে এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক শিহরণ জাগিয়ে তোলে ঢাকের বাজনা আর ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনি।
প্রাচীনকালে শিবকে কেন্দ্র করে যে বাৎসরিক উৎসব হত, তার নাম অবশ্য 'গাজন' ছিল না। প্রাচীন সাহিত্যে তাকে বলা হয়েছে ‘মহ’ বা ‘যাত্রা’। যেমন রুদ্রমহ বা শিবমহ। ‘মহ’ শব্দটি এসেছিল বৈদিক শব্দ ‘মখ’ থেকে। পরে শব্দটির অর্থ বদলে গিয়ে উৎসবে পরিণত হয়। রুদ্রমহ বা শিবযাত্রার পাশাপাশি নাগমহ, মুকুন্দমহ, যক্ষমহ বা ভূতমহও প্রাচীনকালে সর্বভারতীয় উৎসব ছিল।
🍂
গাজন প্রধানত শিবের উৎসব হলেও বাঁকুড়া, বীরভূম ও বর্ধমান অঞ্চলে ধর্মঠাকুরের গাজনও অত্যন্ত জনপ্রিয়। তবে চৈত্রসংক্রান্তির শিবের গাজনই জনমানসে সর্বাধিক পরিচিত। শিব এখানে কেবল পৌরাণিক দেবতাই নন, বরং কৃষিজীবী মানুষের ‘কৃষি দেবতা ’। শিবায়ণকাব্য অনুসারেও, মর্তে কৃষিকাজ প্রবর্তন করেছিলেন স্বয়ং মহাদেব। সেই কৃষিদেবতা বা কৃষক শিবের তুষ্টির জন্য এবং বৃষ্টির কামনাতেই হয় এই উৎসবের আয়োজন। গাজনের সময়ে শিব কোনো ধ্যানমগ্ন হিমালয়বাসী দেবতা হয়ে থাকেন না, বরং তিনি সাধারণ মানুষের মতোই ভাঙড়, চাষী এবং ঘরের লোক হয়ে ওঠেন। গাজন, আসলে কখনোই উচ্চবর্গের শাস্ত্রীয় বা বৈদিক আচার ছিল না, বরং এটি মূলত প্রান্তিক ও শ্রমজীবী মানুষের নিজস্ব সামাজিক পরিচয় প্রতিষ্ঠার এক লোকজ উৎসব হিসেবেই পরিচিত । গবেষকেরা বলেছেন, গাজন মূলত চৈত্র শেষের দহন আর বর্ষার প্রতীক্ষায় থাকা কৃষিজীবী মানুষের কাছে প্রকৃতির রুদ্ররূপকে তুষ্ট করারই এক প্রাচীন আরাধনা। এখানে শিব কেবল দেবতা নন, তিনি বৃষ্টির প্রতীক। চৈত্রসংক্রান্তির তপ্ত দুপুরে সূর্যের তেজ (অগ্নি) শান্ত করে বৃষ্টির আবাহন করাই গাজনের মূল লক্ষ্য। গাজন প্রকৃতপক্ষে একটি বিকল্প সামাজিক পরিসর, যেখানে শাস্ত্রীয় রীতিনীতির চেয়ে লৌকিক আচারই প্রধান হয়ে ওঠে। কোনো সংস্কৃত মন্ত্র বা পুরোহিতের কঠোর শাসনের বদলে এখানে প্রাধান্য পায় ঢাকের বাজনা, লৌকিক গান এবং নিজেদের তৈরি করা শারীরিক কসরত। যদিও , সব জায়গাতেই হুবহু একই ভাবে গাজনের আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয় না। যেখানেই গাজন পালিত হোক না কেন, সেখানকার স্থানীয় পরিবেশই এর আচারের কাঠামো নির্ধারণ করে দেয়।
গাজন উৎসবের মূল কারিগর হলেন ‘ভক্ত্যা’ বা সন্ন্যাসীরা। সমাজের নিম্নবর্গের মানুষেরাই সাধারণত এই ব্রত পালন করেন। চৈত্র মাসের শেষ কয়েকদিন তারা কঠোর নিরামিষ আহার, খালি পায়ে চলা এবং শিবের আরাধনার মাধ্যমে সন্ন্যাস ধর্ম পালন করেন। যদিও , এই সন্ন্যাস বৈদিক ব্রাহ্মণ্য ধর্মের মতো নয়, যেখানে সন্ন্যাসকে জীবনের চতুর্থ এবং শেষ পর্যায় হিসাবে বিবেচনা করা হয়, যার আগে থাকে ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য এবং বানপ্রস্থ। চতুরাশ্রম ব্যবস্থা নামে পরিচিত এই ব্যবস্থায়, সন্ন্যাস জীবনে প্রবেশ করার আগে নিজের মৃত্যু-অনুষ্ঠান পালন করা বাধ্যতামূলক, কারণ একজন ব্যক্তি সন্ন্যাস গ্রহণ করে তাঁর পার্থিব জীবন চিরতরে ত্যাগ করে যান। উচ্চতর বর্ণের কোনো একটিতে জন্মগ্রহণকারী একজন সন্ন্যাসীর জন্য তার পূর্বাশ্রম বা জীবনের পূর্ববর্তী পর্যায়ে ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই । অন্যদিকে, একজন গাজন সন্ন্যাসী কেবল সাময়িকভাবে এই সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। এই অস্থায়ী সন্ন্যাসের সময়কালে, তিনি পৈতা ধারণ করেন, পারিবারিক জীবন এবং অন্য সব ধরনের পার্থিব সুখ ত্যাগ করেন এবং ঈশ্বরকে জাগরণের জন্য প্রচণ্ড শারীরিক কষ্ট সহ্য করেন। গাজন উৎসবের মাধ্যমে সমাজের 'অন্ত্যজ' বা নিম্নবর্ণের মানুষরা সন্ন্যাস ধর্মের মধ্য দিয়ে ব্রাহ্মণ্যতান্ত্রিক পূজা পদ্ধতির বাইরে গিয়ে নিজেদের দেবতাকে পূজা করার অধিকার পায়। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে এই উৎসবে শামিল হওয়া বাংলার অসাম্প্রদায়িক চেতনারই প্রতিফলন।
তবে 'গাজন' মানেই শুধু শিবের বা ধর্মের আরাধনা নয়, এটি বাংলার এক বিশাল লৌকিক ক্যানভাস যেখানে আর্য-অনার্য এবং বৌদ্ধ সংস্কৃতির এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ ঘটেছে। গাজনের আচার-বিচারে বৌদ্ধ ‘তান্ত্রিক’ সাধনার গভীর ছাপ লক্ষ্য করা যায়।
অনেক গবেষক মনে করেন, গাজনের 'ধর্মঠাকুর' আসলে বৌদ্ধদের 'ধর্ম' (ত্রিরত্নের একটি) এবং তার আরাধনার ধরন অনেকটা বৌদ্ধ শূন্যবাদের অনুসারী। গাজনে পিঠে বড়শি গাঁথা (চড়ক), আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটা বা কাঁটার ওপর ঝাঁপ দেওয়ার মতো চরম শারীরিক কৃচ্ছ্রসাধন বৌদ্ধ তান্ত্রিক ও সহজিয়া সিদ্ধাচার্যদের কঠোর যোগসাধনারই লৌকিক রূপান্তর। সেন যুগে এবং পরবর্তী সময়ে বৌদ্ধধর্ম যখন কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল, তখন নিম্নবর্গের অনেক বৌদ্ধ অনুসারী হিন্দু ধর্মের কাঠামোর মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ফলে তাদের তান্ত্রিক আচারগুলো শিবের গাজনের সাথে মিশে যায়। সন্ন্যাসীদের মস্তক মুণ্ডন, হবিষ্যি গ্রহণ এবং তান্ত্রিক সন্ন্যাসের কঠোরতা আসলে বৌদ্ধ শ্রমণদের জীবনধারারই অবশিষ্টাংশ। পরবর্তীকালে নাথ ধর্মের প্রভাবে এখানে বৌদ্ধ, শৈব এবং লোকদেবতারা মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছেন। নাথপন্থীরাই শিবকে হিমালয় থেকে নামিয়ে এনে গ্রামবাংলার মানুষের কাছে 'আদি নাথ' বা পরম গুরু হিসেবে পরিচিত করান। তাদের প্রচারেই শিব একজন যোগী থেকে সাধারণ মানুষের 'চাষী শিব' বা লৌকিক দেবতায় রূপান্তরিত হন। নাথপন্থীরা জাতিভেদ প্রথা মানতেন না। গাজনে নিম্নবর্গের মানুষের যে আধিপত্য এবং ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের বাইরে গিয়ে যে নিজস্ব উপাসনা পদ্ধতি, তার পেছনে নাথধর্মের এই অসাম্প্রদায়িক দর্শনের বড় ভূমিকা আছে। মীননাথ এবং গোরক্ষনাথের মতো নাথ গুরুদের ধর্ম ছিল বৌদ্ধ সহজযান এবং শৈব ধর্মের এক অদ্ভুত সন্ধিস্থল। এই সমন্বয় বাংলার ধর্মীয় বিবর্তনের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিব্বতি পরম্পরায় মীননাথকে বৌদ্ধ মহাসিদ্ধ 'লুইপা' হিসেবেও গণ্য করা হয়। নাথরা শিবকে 'আদিনাথ' বা পরম গুরু হিসেবেই মানতেন। তবে তাঁদের শিব কেবল পৌরাণিক দেবতা নন, তিনি যোগীরাজ এবং পরম চেতনার প্রতীক।
গাজনের বিশেষ রাতে আজও অনেক জায়গায় ‘শ্মশান জাগরণ’ বা ‘শ্মশান ভ্রমণ’ হয়। মূল সন্ন্যাসী বা দলপতি শ্মশানে গিয়ে তান্ত্রিক আচার পালন করেন। বৌদ্ধ তান্ত্রিকরা যেমন শ্মশানে বসে সাধনা করতেন, গাজনের সন্ন্যাসীদের শ্মশান জাগরণ বা প্রতীকী মৃতদেহ নিয়ে নৃত্য সেই প্রাচীন তান্ত্রিক রীতিরই অবশিষ্টাংশ বলে অনেকেই মনে করেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বা ক্ষিতিমোহন সেনের মতো পণ্ডিতেরাও মনে করতেন, গাজন আসলে 'বৌদ্ধদের ছদ্মবেশে হিন্দু হয়ে ওঠার একটি প্রক্রিয়া।'
ফলে , গাজনকে কেবল একটি হিন্দু উৎসব বলা যাবে না। এটি বাংলার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের একটি জীবন্ত ফসিল।
গাজনের ধুনুচি নাচ আর তপ্ত বাণ ফোঁড়ার কঠোর আচারের অন্তরালে বৌদ্ধদের শূন্যবাদ, নাথপন্থীদের গূঢ় যোগসাধনা এবং শিবের লৌকিক রূপ—এই তিন ভিন্ন স্রোত এসে এক মোহনায় মিশেছে। গাজনে আর্য সংস্কৃতির উচ্চমার্গীয় দেবতাতত্ত্ব পরাজিত হয়েছে ব্রাত্য ও অন্ত্যজ শ্রেণির লৌকিক বিশ্বাসের কাছে। ফলে, গাজনের আসরে শিব আর কেবল কৈলাসের অধিপতি থাকেননা, তিনি হয়ে ওঠেন সাধারণ মানুষের ঘরের লোক, যিনি একই সঙ্গে বুদ্ধের মতো শান্ত আবার নাথযোগীর মতো অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন।
গাজন উৎসব কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এটি গ্রামবাংলার মিলন মেলা। গাজন উপলক্ষে বিভিন্ন স্থানে মেলা বসে, যেখানে লোকসংগীত (যেমন গাজনের গান), ঝুমুর নাচ এবং যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হয়। এটি কৃষি সমাজের দুঃখ-কষ্ট ভুলে নতুন বছরকে আবাহন করার একটি মাধ্যম। প্রকৃতির সাথে মানুষের গভীর সম্পর্ক এবং লৌকিক দেবতার প্রতি সাধারণ মানুষের অগাধ ভক্তি এই উৎসবের প্রাণ। গাজনের সময় যে মুখোশ নাচ বা কালীর নাচ হয় ও গান পরিবেশিত হয়, সেগুলো বাংলার লোকশিল্পের অমূল্য সম্পদ। বিশেষ করে শিব-পার্বতীর সাজে যে সঙ বা বহুরূপীরা পথে বের হন, তা আজও লোকরঞ্জনের প্রধান মাধ্যম। বীরভূম, বাঁকুড়া বা মেদিনীপুরের গাজনে এই বহুরূপীদের নাচের ধরন আলাদা। কোথাও তাঁরা ঢাকের তালের সঙ্গে 'শিবের বিয়ে'র পালা অভিনয় করেন, আবার কোথাও কালিকা বা ডাকিনী-যোগিনী সেজে ভয়ংকর সুন্দর নাচ পরিবেশন করেন। চৈত্রের উতপ্ত দুপুরে খালি পায়ে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে বেড়ানো তাঁদের কাছে কেবল জীবিকা নয়, এক প্রকার ভক্তি ও সাধনা।
0 Comments