জ্বলদর্চি

ব্রহ্মসূত্র --- শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি /পর্ব ৭/প্রীতম সেনগুপ্ত


ব্রহ্মসূত্র --- শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি 

পর্ব ৭

প্রীতম সেনগুপ্ত 


শ্রীমতী লতিকা চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘চার্বাক দর্শন (রূপরেখা)’ গ্রন্থে আরও লিখছেন --‘এই যজ্ঞাদির অনুষ্ঠান সংহিতোত্তর ‘ব্রাহ্মণের’ যুগে অত্যন্ত প্রাধান্য পায় এবং প্রধানতঃ এই অনুষ্ঠানগুলিকে কেন্দ্র করেই ‘ব্রাহ্মণের’ যুগের রূপায়ণ।

ক্রিয়াকর্মের খুঁটিনাটিবহুল এই সব বৈদিক যজ্ঞের যথাযথ ফল প্রদানের ক্ষমতা বৈদিক নির্দেশনা অনুসারে মন্ত্রাদির বিশুদ্ধ উচ্চারণ এবং বিভিন্ন ক্রিয়ার অনুষ্ঠানের বিশুদ্ধতার উপর নির্ভরশীল ছিল। এ ধরণের বিশুদ্ধতা পালন সাধারণ লোকের পক্ষে কোনক্রমেই সম্ভব নয়; ফলে, একটা দুর্বোধ্যতার আবরণে এই যাজ্ঞিক অনুষ্ঠানগুলিকে সাধারণ লোকের বুদ্ধির জগৎ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক করে রাখত। অনুষ্ঠানের জটিলতা সম্বন্ধে অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের যজ্ঞানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হতে নিষেধ করা হয়েছে। অনভিজ্ঞ অথচ যাজ্ঞিক ক্রিয়ায় রত ব্যক্তির শোচনীয় অবস্থার এক বর্ণনা ‘শতপথ ব্রাহ্মণে’ পাওয়া যায়। অন্তর্বর্তী পথগুলির বিবরণ সম্বন্ধে অজ্ঞ হয়েও যে ব্যক্তি গভীর অরণ্যে প্রবেশ করে তার দশার সঙ্গে এই অবস্থা তুলনীয়। এইভাবে অরণ্য প্রবেশকারীকে যেভাবে ক্ষুধা, তৃষ্ণা,দুর্জনের প্রতারণা ইত্যাদি প্রতিকূলতার কাছে পরাভব স্বীকার করতে বাধ্য হতে হয়, অনভিজ্ঞ যজ্ঞকারীরও সেইভাবে নানা ধরনের দুর্বিপাকের সম্মুখীন হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। অপর পক্ষে, যজ্ঞ সম্বন্ধে ‘বিস্তারিত জ্ঞান’ যাঁদের আছে, সেই ব্যক্তিদের দ্বারা যজ্ঞ পরিচালিত হলে যজ্ঞানুষ্ঠানের মাধ্যমে সব রকম বিপদ থেকে পরিত্রাণ এবং পরিশেষে সুখ, শান্তি ও স্বর্গলাভ হয়। 

🍂

যজ্ঞের ব্যাপারে এই ‘বিস্তারিত জ্ঞানের’ যাঁরা অধিকারী, স্বাভাবিকভাবেই বৈদিক সমাজে তাঁদের সর্বাধিক প্রতিপত্তি ছিল; কারণ, সাধারণ মানুষের সুখ, সমৃদ্ধি এবং স্বর্গের চাবিকাঠি ছিল তাঁদের হাতে। এই অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে পুরোহিত বা যাজক সম্প্রদায় নামে বিশেষ এক শ্রেণীর উদ্ভব হয় এবং যজ্ঞ পরিচালনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব বিশেষ এই শ্রেণীর অধিকারে আসে। যজ্ঞাদির অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে সাধারণ ব্যক্তিদের এই পুরোহিত বা যাজকদের উপর নির্ভর করতে হত, কারণ যজ্ঞের জটিল ক্রিয়াপদ্ধতির জ্ঞান একমাত্র এঁদেরই অধিগত ছিল; যাঁর কামনাপূর্তি যজ্ঞানুষ্ঠানের লক্ষ্য, সেই যজমান বস্তুতঃপক্ষে যাজ্ঞিক অনুষ্ঠান থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতেন। এই পুরোহিত বা যাজক সম্প্রদায়ের ব্যক্তিরা জাতিগতভাবে পৌরহিত্যকেই বৃত্তি হিসেবে অবলম্বন করতেন। এ সম্বন্ধে Radhakrishnan বলেন: the highly elaborate nature of the sacrificial ceremonial demands special training for the priestly office. The patriarchal head of the family could no more conduct the complex and minute system of the sacrificial ceremony. Priesthood became a profession and a heriditary one. The priests who possesed the vedic lore became the accredited intermediaries between god and men and the dispensers of the divine grace. The yajamana or the man for whom the rite is performed, stands aside. He is a psssive agent supplying men, money and munitions, the priest does the rest for him.

বৈদিক সাহিত্যে বহু অংশেই এই যাজক শ্রেণীভুক্ত ব্যক্তিরা দেবতা হিসেবে বর্ণিত হয়েছেন। ‘শতপথ ব্রাহ্মণে’ দেবতাকে দু'শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে ---স্বর্গের দেবতা আর  মানুষ দেবতা বা পুরোহিত, যাঁরা বৈদিক শাস্ত্রে অভিজ্ঞ এবং যজ্ঞ পরিচালনার ভার যাঁদের উপর অর্পিত।

এই পুরোহিতেরা সমাজজীবনে যে বিশেষ ধরনের সুযোগ সুবিধার অধিকারী ছিলেন বৈদিক সাহিত্যের বিভিন্ন জায়গায় সে সম্বন্ধে বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। পুরোহিতদের স্থান অপর ব্যক্তির তুলনায় উচ্চতর স্তরে নির্দেশিত ছিল এবং এঁদের সঙ্গে ব্যবহারে এই বিশেষ ব্যবধানটির অস্তিত্ব সম্বন্ধে সকলেই সচেতন থাকতেন। এই যাজকদের সব সময়ে সম্মান দেখাতে হত, উপহার দিতে হত এবং এদের হত্যা বা উৎপীড়ন করার অধিকার কারও থাকত না। এঁদের সঙ্গে ব্যবহারের সময় দেশের রাজাকেও এই একই নিয়ম পালন করতে হত। এই যাজকদের সম্পত্তিতে রাজা কোন পরিস্থিতিতেই হস্তক্ষেপ করতে পারতেন না। সাধারণ লোকের সঙ্গে বিরোধের ব্যাপারে বিচারক সব সময় যাজকদের পক্ষে রায় দিতেন, কারণ, এই যাজকদের কোন কাজে ত্রুটির সম্ভাবনা অকল্পনীয় ছিল।’

Post a Comment

0 Comments