জ্বলদর্চি

দূর দেশের লোকগল্প— ২৮৩/চাঁদের বুকে খরগোশের ছবি/গুয়াতেমালা (উত্তর আমেরিকা)/চিন্ময় দাশ


দূর দেশের লোকগল্প— ২৮৩

চাঁদের বুকে খরগোশের ছবি

গুয়াতেমালা (উত্তর আমেরিকা)

চিন্ময় দাশ


[কোয়েটজাল—মধ্য আমেরিকার একটি সুন্দর পাখি। উজ্বল সবুজ পিঠ, লাল পেট, আর লম্বা লেজ। অতীতকালের মায়া এবং আজটেক সভ্যতায় ঈশ্বরের প্রতিভু হিসাবে, এই পবিত্র পাখিকে পূজা করা হত। বর্তমানে এটি গুয়াতেমালার জাতীয় প্রতীক।

আকাশে চাঁদের বুকে যে ছবি দেখা যায়, আমরা তাকে বলি—চরকাকাটা বুড়ি। মধ্য আমেরিকার দেশগুলিতে, সেটা এক দয়ালু খরগোশের ছবি বলে মান্য করা হয়। কোয়েটজাল পাখির রূপ ধরে, স্বয়ং বিধাতাপুরুষ সে ছবি এঁকে দিয়েছিলেন।

এবারের গল্প সেই কাহিনী নিয়ে।] 

গোটা দুনিয়াটা তো স্বয়ং বিধাতার সৃষ্টি। মাঝে মাঝেই তিনি বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ঘুরে দেখে বেড়ান। সুন্দর একটা পাখির রূপ ধরেন। এ দেশ, ও দেশ বিদেশ চার দিকে ঘুরে ঘুরে বেড়ান বিধাতা। 

একবার এসেছেন গুয়াতেমালায়। একদিকে মেক্সিকো, আমেরিকা আর কানাডা। অন্যদিকে কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা আর ব্রাজিল সহ গোটা দক্ষিণ আমেরিকা।

মাঝখানের গুয়াতেমালা দেশটার দু’দিকে  দুটি মহাসাগর—ডাইনে আতলান্তিক আর বাঁয়ে প্রশান্ত। উড়তে উড়তে অনেকটা পথ পার হয়ে ডানা দুটো ধরে এসেছে। বড়সড় একটা সেইবা গাছ দেখতে পেয়ে বসে পড়ল পাখিটা। 

আহা, কী রূপ সেই পাখির। উজ্বল গাঢ় সবুজ রঙ ডানা দুটোর। গোটা বুকটা টকটকে লাল রঙ। তার উপর পুরুষ পাখি তো, ইয়া লম্বা একখানা লেজ। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। 

একটু জিরিয়ে নেওয়ার পর, পাখিটা বুঝতে পেরেছে, ভয়াণক খিদে লেগেছে তার।  কিন্তু এই অজানা জায়গা। একেবারেই নতুন এক পাখি। কে তাকে খাবার দেবে। অনেক ভেবে, পাখির চেহারা ছেড়ে দিলেন বিধাতা। এক বুড়ো মানুষের রূপ ধরলেন তিনি।

বনের ভিতর দিয়ে চলেছেন। যেতে যেতে এক ভালুকের সাথে দেখা। বড় একটা মৌচাক ভেঙে এনেছে। তারিয়ে তারিয়ে মধু খাচ্ছে ভালুক। বুড়ো গিয়ে বলল—ভারি খিদে লেগেছে। খানিকটা মধু দেবে আমাকে। 

খাবার সময় হঠাৎ একটা বুড়োকে দেখে, মেজাজ বিগড়ে গেল ভালুকের। কোথা থেকে যে এসব আপদের উদয় হয়, ভগবান জানে। খিঁচিয়ে উঠে, বলল—খাবার সময় ঝুটঝামেলা আমার একদম পছন্দ নয়। ভালোয় ভালোয় কেটে পড়ো এখান থেকে। কিচ্ছুটি দেব না আমি। 🍂

বুড়ো এগিয়ে চলেছে। কিছুদূর গিয়ে একটা শেয়ালের সাথে দেখা। বসে বসে মাংস চিবাচ্ছে। বুড়ো বলল—ভারি খিদে লেগেছে। একটু মাংস দেবে, পণ্ডিত মশাই? 

চোখ টেরা করে বুড়োকে দেখল শেয়াল। আগে তো কখনো দেখিনি মানুষটাকে। তাছাড়া, এই বনের ভিতর এলো কোথা থেকে। সে বলল—ওসব খিদের ধান্দা ছাড়ো। পরের খাওয়া দেখলে, সবারই খিদে চাগাড় দিয়ে ওঠে। ভালোই জানি আমি। কেটে পড় এখান থেকে। 

বুড়ো অনুনয় করে বলল—নাগো, পণ্ডিত। সত্যি কথাই বলছি। অনেক দূরের পথ ভেঙে আসছি তো। খিদের জ্বালায় মরতে বসেছি এখন। দাও আমাকে একটা টুকরো।

--শোন তাহলে। সকাল থেকে ঘুরে ঘুরে, মাত্র দুটো মেঠো ইঁদুর মেরেছি। এতে আমারই পেট ভরছে না ভালো করে। শেয়াল বলল-- ভাগ দেওয়ার উপায় নাই। সরে পড় এখান থেকে। 

যেতে যেতে এবার একপাল হনুমানের দেখা পেল বুড়ো। বুড়ো বলল—তোমাদের থেকে দুটো-একটা ফল দেবে আমাকে। কিচ্ছুটি পেটে পড়েনি এখনও। 

জবাব এলো—আমরাই এতগুলো জীব। আমাদেরই পেট ভরবে  কি না, ভগবান জানে। তোমাকে দেব কোথা থেকে? 

 আবার চলতে শুরু করেছে বুড়ো। এভাবে বেলা গড়িয়ে গিয়েছে। অন্ধকার নেমে এসছে। তারা ফুটে উঠছে একটা একটা করে। খিদেয় পেট জ্বলছে বুড়োর। পা দুটো আর চলতে চাইছে না। একটা গাছে ঠেস দিয়ে বসে পড়ল বুড়ো। 

খানিক বাদে, কুচ-কুচ শব্দ। তাকিয়ে দেখল একটা খরগোশ। ধবধবে সাদা লোমে ঢাকা শরীর। এই আবছা আলোতেও বেশ দেখা যাচ্ছে তাকে। বুড়ো এগিয়ে গেল খরগোশের কাছে।  

বুড়ো বলল—সারাদিন কিছুই পড়েনি পেটে। কিছু একটু খাবার দিতে পারো আমাকে? 

--অন্য কিছুও আমি খাই বটে, কিন্তু এই মূহুর্তে তো এই কচি ঘাস ছাড়া অন্য কিছুই নাই। 

তার কথা শুনে মনে হল, খরগোশ চিন্তায় পড়ে গিয়েছে। গলায় সমবেদনার সুর। বুড়ো বলল—কিছু একটা ব্যবস্থা করে দাও, বাছা। নইলে, সত্যি বলছি, মারা পড়ব আমি। 

এমন কথা শুনে, খরগোশের যেন একেবারে দিশেহারা অবস্থা। কী বলবে বুড়োমানুষটিকে, কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না বেচারা। করুণ গলায় বলল-- এইটুকু একটা জীব আমি। বিধাতা কতটুকুই বা ক্ষমতা দিয়েছেন আমাকে? তাছাড়া, এখন এই রাত। এই গভীর বন। এখানে তোমার খাবারের কী উপায়ই বা করতে পারি আমি? কোন একটা উপায়ই তো মাথায় আসছে না আমার্। 

--আমারও তো একই অবস্থা, বাছা। উপায় নাই বলেই, অনুরোধ করেছি তোমাকে। আজ এখানেই হয়ত মরতে হবে আমাকে। 

এবার এমন একটা কথা বলল খরগোশ, বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল বুড়ো। খরগোশ বলেছে—না, না। তুমি মরবে না। আমার সামনে একজন মানুষ, খেতে না পেয়ে মারা পড়বে, এটা কিছুতেই হতে দেব না আমি। এক কাজ করো। তুমি আমাকে খাও। 

ভালুক, শেয়াল, হনুমান—কতজনের কাছে খাবার চেয়ে এসেছে সে। কিন্তু ছোট্ট একটা জীব, নিজের জীবন দিয়ে দিতে চাইবে, এটা কল্পনাও করতে পারছেন না বিধাতা। জোর গলায় বলে উঠলেন—সর্বনাশ। এসব কী বলছ তুমি! নিজের জীবন বাঁচাবার জন্য, তোমার মত দয়ালু একটি জীবকে মেরে ফেলব আমি! তাই কখনও হয়, বাছা? 

--হয়গো ভালোমানুষের পো, হয়। বনের এত্তোটুকুন পুঁচকে একটা জীব আমি। হাজারো জন রয়েছে এই বনে। আমার জীবন গেলে, এমন কিছু যাবে আসবে না কারও। তুমি নিশ্চিন্তে খেতে পারো আমাকে।

খরগোশের গলায় কেবল আন্তরিকতা নয়, আবেদনও বুঝতে পারছেন বিধাতা। ভারি খুশি হলেন তিনি। এই দুনিয়া তাঁর নিজেরই হাতে গড়া। কিন্তু এমন উদারতা আর কোথাও নাই দুনিয়ায়। 

বিধাতা মনে মনে ভাবলেন, এমন একটি জীবকে চিরজীবি করে রাখতে হবে দুনিয়ার কাছে। 

বুড়োমানুষের বেশ ছেড়ে, আবার পাখির রূপ ধরলেন বিধাতা। খরগোশকে বললেন—তুমি চটপট আমার পিঠে চেপে বসে পড়। 

বুড়োর জায়গায় হঠাৎ এই পাখির উদয়ে, ভড়কে গেছে খরগোশ। তার উপর পিঠে চেপে বসবার কথায়, মাথা তালগোল পাকিয়ে গেল তার। বলল—কেন, পিঠে চাপাতে চাইছ কেন আমাকে?


পাখি হেসে উঠে বলল—তোমার মত উদার, কাউকে দেখিনি এই দুনিয়ায়। সেই কথাটা জানাতে হবে গোটা দুনিয়াকে। অমর করে দেব তোমাকে আমি। যাইহোক, আর কথা নয় কোনও। চেপে বসো আমার পিঠে। 

খরগোশকে পিঠে নিয়ে, ডানা মেলে দিল পাখি। থালার মতো গোল চাঁদ উঠেছে আকাশে। চাঁদের দিকেই উড়ে চলল পাখি। 

বিধাতার কাজ। সাদা চাঁদের বুকে, ছাই-ছাই রঙে খরগোশের ছবি আঁকা হয়ে গেল চিরকালের মতো।

চাঁদ থেকে আবার নীচে নেমে এলেন। যত্ন করে খরগোশকে তার এলাকায় নামিয়ে দিয়ে গেলেন বিধাতা। বললেন—চাঁদের বুকে তোমার ছবি আঁকা রইল। এই চাঁদ আর দুনিয়া যতদিন থাকবে, সবাই মনে রাখবে তোমাকে। মনে রাখবে তোমার দয়ালু মনের কথা।

Post a Comment

0 Comments