দূর দেশের লোকগল্প— ২৮৪
ভীরুর জন্যও একজন আছেন
সোমালিয়া (আফ্রিকা)
চিন্ময় দাশ
[আফ্রিকার একেবারে এক কোণের দেশ সোমালিয়া। উত্তর-দক্ষিণে ছড়ানো দেশটার গড়ন লম্বাটে। উত্তর দিকের এলাকা ছোট-বড় পাহাড়ে ঢাকা উপত্যকা। দক্ষিণে নদী-নালার জলপ্রবাহে পুষ্ট উর্বর কৃষিজমি।
মাঝের অঞ্চল মাল্ভূমি এলাকা। খটখটে শুকনো মাটি আর বালুকার প্রান্তর। বাতাস ভারি উষ্ণ। বৃষ্টিপাত একেবারে অনিয়মিত। ম্রুভূমি আর আধা মরুভূমি এলাকা। আমাদের এবারের গল্পটি এই এলাকার একটি বেদুইন পরিবারকে নিয়ে।]
সমালিয়ার মরু এলাকায় বহু বেদুইন (যাযাবর শ্রেণী) লোকজন দেখা যায়। দল বেঁধে থাকে তারা। মাইলের পর মাইল ছড়ানো বালির প্রান্তর। উষ্ণ বাতাস। জলের অভাব। পেটের রুটি জোগাড়ের জন্য ভারি মেহনত করতে হয় মানুষগুলোকে। নইলে টিকে থাকা দায়। ভেড়া আর উট পোষে তারা।
তার উপর আছে, বিভিন্ন গোষ্ঠীর আক্রমণ। দল বেঁধে এসে, আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ে। যা কিছু আছে লুটপাট। নির্বিচার হত্যা। মেয়ে আর বাচ্চাদের তুলে নিয়ে যায়। সমানে টক্কর দিতে না পারলে, মারা পড়তে হয়। এটাই এসব মরুভূমি এলাকার দস্তুর।
তাই বলে, সবাই যে একেবারে বীরপুরুষ তা কিন্তু নয়। অন্তত এবার যারা এসে তাঁবু ফেলেছে, একটা লোক আছে দলে। বীরপুরুষ তো বহু দূরের কথা। সাহসীও বলা যাবে না লোকটাকে। একেবারে ভীতুর ডিম। নিজের মনে সাহস নাই। তাই, এসব লড়াই হানাহানি তার একেবারে না-পসন্দ।
কিন্তু তার পছন্দের উপর তো আর দুনিয়া চলে না। দুনিয়া চলে তার আপন গতিতে। একদিন রাতে সেটাই ঘটে গেল। ঘুম ভারি পছন্দ লোকটার। ঘুমোতে পেলে, আর কিছু চাই না তার। ঘুমের ব্যাঘাত কিছুতেই মানতে পারে না সে। 🍂
সেদিন তখন মাঝরাত। দিব্বি নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে লোকটা। হঠাৎ তার বউ তাকে ঠেলা লাগিয়েছে। অবশ্য সামান্য ঠেলাঠেলিতে তার ঘুম ভাঙবার নয়। অনেক মেহনতের পর চোখ মেলল যখন, প্রথম কথা—তোকে কতদিন বলেছি, সারা দিনভর জ্বালাতন কর, আমার আপত্তি নাই। কিন্তু ঘুমের সময় জ্বালাবি না আমাকে।
--ওসব কথা পরে বলবে। এখন উঠে পড় ঝটপট। মাথায় যে বিপদ।
--কীসের বিপদ হোল আবার?
-- একদল লোক তেড়ে আসছে। তাড়াতাড়ি ওঠো। তোমার সাথে আমরাও মারা পড়ব যে।
তাতেও হেলদোল নাই লোকটার। বলল—তোর এমন গল্প তো অনেক শুনেছি আমি। কাল দিনের বেলায় আর একবার বলিস। এখন একটু ঘুমাতে দে আমাকে। -------আরে না। সেসব তো তোমার সাথে আমি মস্করা করতাম। এখন ওঠ তড়াতাড়ি। ওরা এসে পড়ল বলে। কোনও তাঁবুতে কেউ শুয়ে বসে নাই। সবাই তৈরি হয়ে গিয়েছে।
দুজনে কথা বলছে, এমন সময় হট্টগোল। চিৎকার-চেঁচামেচি, কান্নাকাটি। একেবারে হৈহৈ-রৈরৈ ব্যাপার। তিরিশ-চল্লিশটা তাঁবু পড়েছে মাঠে। একশ’-দেড়শ’ মানুষ। তার উপর আক্রমণকারীরা।
এবার চটক ভেঙেছে লোকটার। শত্রু একেবারে দোরগোড়ায়। কী করা যায়, কী করা যায়। বিদ্যুতের মত ঝলিক দিয়ে উঠল মাথার ভিতর। লোকটা বিবিকে বলল—চটপট আমাকে বিছানা সহ গোল করে জড়িয়ে দে। তুই আমার মাথার কাছে বসে পড়। জোরে জোরে কাঁদতে লেগে যা। কেউ ঢুকে পড়লে বলবি, আমার মরদ মরে গেছে।
অন্য কোনও উপায়ই নাই এখন আর। বউটা তাড়াতাড়ি স্বামীকে বিছানা দিয়ে জড়িয়ে, বসে পড়ে কাঁদতে শুরু করেছে। বিছানার ভিতর থেকে লোকটা খেঁকিয়ে উঠল—গলা ফুটছে না তোর? অন্য সম তো কাক-চিল বসতে পারে তোর গলার চোটে। গলা ছেড়ে কেঁদে যা। থামবি না একেবারে।
বউটা আরও জোর গলায় কাঁদতে লেগেছে। খানিক বাদেই নেমে এল বিপদ। তিন-চারটা লোক ঢুকে পড়েছে তাঁবুর ভিতর। বউটাকে এভাবে কাঁদতে দেখে, একটু থমকে গেল তারা। বলল—এই হতভাগী, চুপ কর। কাঁদছিস কেন তুই?
--হায়, হায় আমার মরদটা মরে গেছে। হায় আল্লা, এই বিপদের সময় আমি কী করি গো?
বেদম একটা ধমক লাগাল লোকগুলো—এক্কেবারে চুপ। টুঁ শব্দটাও যেন আর না বেরোয় মুখ দিয়ে। কখন মরেছে তর মরদ?
একেই এত বড় ধমক। তার উপর এমন বেমক্কা প্রশ্ন। কখন মরেছে, সে তো আগে থেকে আলোচনা করে রাখা হয়নি। এখন কী জবাব দেবে এদের। চুপটি করে আছে। লোকগুলো চেঁচিয়ে উঠল। এতক্ষণ তো বেশ গলা শোনা যাচ্ছিল। এখন উত্তর দিচ্ছিস না কেন? বলছি, কখন মারা গেছে এ?
বউটা বুঝে উঠতে পারছে না কী জবাব দেবে। কাঁথায় জড়ানো লোকটা তো সব শুনছে ভেতর থেকে। আর ধৈর্য ধরল না তার। স্বভাব মত ভেতর থেকেই খেঁকিয়ে উঠল—বলতে পারছিস না হতভাগী, গতকাল মারা গেছে।
আর যায় কোথায়। ভেতরের মরা মানুষের গলা খাঁকারি শুনে, হো-হো করে হেসে উঠল লোকগুলো। সে হাসির তোড়ে তাঁবুর সামিয়ানা উড়ে যাওয়ার জোগাড় হোল। বউটা তো কাঁপছে ঠকঠক করে। এবার দুজনকেই কোতল হতে হবে এদের হাতে। এমন ভীতু লোকের পাল্লায় পড়ে, বেঘোরে জান যাবে এখন।
কিন্তু কথায় বলে না, যার কেউ নাই, স্বয়ং খোদাতালা আছেন তার। তাঁর দয়াতেই এ যাত্রা মরদ-বিবি দুজনেই রেহাই পেয়ে গেল। হাসি থামলে, লোকগুলো বলল—এ হতভাগাটা তো মরার আগেই মরে আছে। এটাকে মেরে হাত গন্ধ করব কেন।
যাবার বেলায় লোকগুলো বলে গেল—তোর মরদ তো মরেই গেছে। কাল দিনের বেলায় ওর দাফন করে দিবি কিন্তু।
বলেই আবার সেই আকাশ ফাটানো হাসি। মরুভূমির রাত্রি কেঁপে কেঁপে উঠল সেই হাসির শব্দে।
0 Comments