দুটি অণুগল্প
পিকনিক
কাকিমা, অ কাকিমাআআআ
রান্নাঘর থেকে সহায়িকা মেয়েটির ডাকে ব্যালকনির গাছের দেখভাল ফেলে তাড়াতাড়ি রান্না ঘরে ঢুকলো রুচি।
মাস দুয়েক হলো হাসব্যান্ড এর বদলী হয়েছে এই শহরে। নতুন করে সংসার গুছিয়ে নিয়েছে রুচি শহরের একপ্রান্তে আকাশ ছোঁয়া হাইরাইজের নয় তলের একটি ফ্ল্যাটে। সহায়িকাও পেয়ে গেছে সিকিউরিটি গার্ডের মাধ্যমে। আসলে শহরের নতুন নতুন হাইরাইজে কাজের লোক সহজেই পাওয়া যায় কারণ উঠোন সিঁড়ি বাগান ছাদ এসব সাফের ঝামেলা নেই। ছোট ছোট সংসার, তিন বা চার কামায় আবদ্ধ। এরম দুটি সহায়িকা নিয়ে সংসার ভালোই গুছিয়ে চলছে রুচি'র। এই মেয়েটি বেশ স্মার্ট এবং চটপটে। এতে রুচির সুবিধাই হয়েছে।
রান্নাঘরে ঢুকে রুচি সপ্রশ্ন চোখে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে।
বুঝতে পেরে মেয়েটি বলে, তোমার সাথে কথা ছিল কাকিমা।
হ্যাঁ বল কি বলবি...
শুক্রবার পিকনিক আছে, আমি আসব না কাজে
সে কি!! ছুটির দিন ছাড়া পিকনিক!! তা কোথায় যাবি পিকনিক করতে?? পাড়া থেকে না কি শ্বশুর বাড়ি বাপের বাড়ির আত্মীয়স্বজন??
একটা অদ্ভুত দেহ ভঙ্গিমা এবং হাসি ছুঁড়ে দিল মেয়েটি তার নতুন মালকিন কাকিমা'র দিকে..
রাগে গা জ্বলে গেলেও কিছু না বলে রুচি তাকিয়ে রইলো ওর দিকে।
🍂
ওড়নার প্যাঁচ ঠিক করে কোমরে বেঁধে বললো, কোথাও যাব না কাকিমা। চারতলায় যে কাকুর রান্না করি ওনার বাড়িতে পিকনিক হবে।
ফ্ল্যাটে পিকনিক!! কতজন আসবে??
হেসে বলে, তিনজন গো কাকিমা, আমি, ঝাড়পোছের রমা আর কাকু। আমরা তিনজনই একটা করে আইটেম বানাব। যার রান্না সবথেকে ভালো হবে কাকু তাকে প্রাইজ দেবে গো কাকিমা।
রুচি এই মেয়েটির মুখেই শুনেছিল চারতলায় এক ভদ্রলোকের রান্নাও ও করে। ওনার স্ত্রী কর্মসুত্রে দিল্লি থাকেন। ভদ্রলোক সরকারি অফিসার।
সব শুনে থমকে গেল রুচি। এমন পিকনিক এই জীবনে প্রথম শুনলো সে। আরো কি কি শোনা জানা বাকি আছে কে জানে....
একটা শ্বাস ফেলে বললো, আচ্ছা...
ছুটিতে মোহরা পড়লো।
আশীর্বাদ
আজকেই হাত বদল হয়ে গেল দত্তভিলা। মালকিন শ্রীমতী মিনতি দত্ত নিজ দায়িত্বে এই কাজটি সারলেন রামকৃষ্ণ মঠের সাথে। এই দত্ত ভিলার সম্পূর্ণ অধিকার এখন মিশনের।
আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে পোর্ট ট্রাস্টের উচ্চ আধিকারিক শ্রী চঞ্চল দত্ত বোটানিক্যাল গার্ডেনের পাশেই জমি কিনে এই বসতবাড়ি তৈরি করেন। মাসের পর মাস স্বামী স্ত্রী দুজনে পরিকল্পনা করেন বাস্তু শাস্ত্র মতে কিভাবে সুখ শান্তি ঘেরা নীড় করবেন যেখানে কোনো 'অ' প্রবেশ করতে পারবে না। কলকাতার নামী বাস্তুবিদের পরামর্শ অনুযায়ী তৈরি হলো বাড়ি। বড় সুন্দর করে গড়ে তুললেন স্বামী স্ত্রী মিলে নিজস্ব আবাস। স্কুল পড়ুয়া মেধাবী দুই ছেলে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় সফল হয়ে দুই বছর আগে পরে চান্স পেয়ে গেল বেসু'তে। তখন শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়ে কিছুদিন দেশে চাকরি করে দুজনেই বিদেশে সেটলড্।
রিটায়ার্ড শ্রীমতী মিনতি এবং শ্রী চঞ্চল দত্ত দীক্ষা নিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ মঠে। ওখান যোগাযোগ বাড়িয়ে নিমগ্ন হলেন সমাজসেবায়। সময় গড়াতে লাগলো। বার্ধক্য ভালোবেসে জড়াতে লাগলো। শরীরে তার ছাপ স্পষ্ট।
ওদিকে ছেলেদের ব্যস্ততায় দেশে আসা কমলো। বিশাল দোতলা বাড়িতে দুই বৃদ্ধ বৃদ্ধা। পাড়া প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় ভালোই কাটছিল দিন।
সেই ভালো দিনের মাঝেই এলো কালোদিন। দত্ত বাবু চলে গেলেন না ফেরার দেশে। দুই ছেলে সপরিবারে এসে শ্রাদ্ধ শান্তির কাজ সেরে আলোচনা মা'কে নিয়ে। একা কিভাবে থাকবে এখানে.... বয়সজনিত সমস্যা আছে। মা'কে *বারবার* অনুরোধ করা সত্ত্বেও ঠাঁই নাড়া করতে অপারগ হলো ছেলেরা। ফিরে গেল তারা তাদের কাজের জায়গায়।
অনেক ভেবে স্বামীর ছবির সামনে বসে নিজের মনের কথা জানালেন মিনতি দেবী। ওনার মনে হলো ওনার ইচ্ছায় ওনার স্বামীর মত আছে। আর দেরি না করে যোগাযোগ করলেন রামকৃষ্ণ মিশনে। দানপত্র করে তুলে দিলেন বাড়ি মিশন'কে।
দুই বছর হলো মিনতি দেবীও শ্রীরামকৃষ্ণ চরণে ঠাঁই নিয়েছেন।
দত্ত বাড়িটা ভেঙে ধীরে ধীরে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দেবের বাড়ি গড়ে উঠেছে। তৈরি হয়েছে মঠের শাখা। কোণার দিকে একটা ঘরে কর্তা গিন্নির ছবি সরিয়ে রাখা।
সারা বাড়িতে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস, শ্রী সারদা মা এবং স্বামী বিবেকানন্দ হাসিমুখে বিরাজ করছেন। নিত্য সেবার সাথে সাধারণ মানুষ ভোগ প্রসাদ পান।
0 Comments