ভাস্করব্রত পতি
১৯৭১ সালের আশ্বিন মাসে ময়নার গড়সাফাৎ গ্রামের বিদ্যাসাগর পাঠাগারের সামনে এসেছিলেন পরিচালক সত্যজিৎ রায়। সঙ্গে ছিলেন তাঁর পুত্র সন্দীপ রায়, আলোকচিত্রী সৌমেন্দু রায় এবং তমলুকের ব্যাবসায়ী অনিল দে। লক্ষ্য ছিল, ময়নাগড়ে নতুন কোনও সিনেমার লোকেশন পছন্দ করা। সেদিন সত্যজিৎ রায়কে স্বাগত জানিয়েছিলেন ময়নাগড় রাজবাড়ির পক্ষে জ্যোতির্ময়ানন্দ বাহুবলীন্দ্র। সেসময় 'সোনার কেল্লা' ছবির প্রস্তুতি চলছিল। সম্ভবত তারই জন্য স্পট খু্ঁজছিলেন বলে অনেকের অভিমত থাকলেও আসলে তিনি 'অশনি সংকেত' (মুক্তি : জুন, ১৯৭৩) সিনেমার শুটিং স্পট খুঁজতে এসেছিলেন। সেদিন গোটা ময়না ঘুরে দেখেন। কিন্তু এখানে দুর্বল বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা এবং থাকার ব্যবস্থার অপ্রতুলতার জন্য ময়নাগড়কে শুটিং স্পট হিসেবে বাতিল করেন। ১৯৭২ সালে সত্যজিৎ রায় মেদিনীপুর শহরেও এসেছিলেন। এখানেও তিনি তাঁর এই 'অশনি সংকেত' সিনেমার শুটিং লোকেশন খুঁজতে খুঁজতে একরাত কাটিয়ে গিয়েছিলেন। যদিও এখানেও এই সিনেমার কোনও শুটিংয়ের জন্য লোকেশন পছন্দ হয়নি। তবে পরবর্তীতে, এই অস্কারজয়ী পরিচালক সম্পূর্ণ অন্যভাবে পূর্ব মেদিনীপুরের ময়নাগড় এবং তৎসংলগ্ন এলাকার সাথে চলচ্চিত্রকে সম্পৃক্ত করেছিলেন।
🍂
সেটা আশির দশকের শুরু। সেসময় ময়নাগড় রাজপরিবারের সদস্য পুলকানন্দ বাহুবলীন্দ্র অভিনেতা বিমল চট্টোপাধ্যায়ের সহায়তায় বিখ্যাত পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের সংস্পর্শে আসেন। তিনি সত্যজিৎ রায়ের বিশপ লেফ্রয় রোডের বাড়িতে গিয়ে ময়নার জনপ্রিয় লৌকিক উপাদান 'গয়নাবড়ি' উপহার হিসেবে তুলে দেন। সেদিন এই উপহার পেয়ে উদ্বেলিত হয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। ছবিও তুলেছিলেন গয়নাবড়ির। পরবর্তীতে এহেন 'লোকশিল্প'টিকে চলচ্চিত্রে ব্যবহার করেন অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে। যা সারা বিশ্বের মানুষের কাছে চিনিয়ে দিয়েছিল মেদিনীপুরের মহিলাদের হাতের তৈরি এই সুস্বাদু খাবারটিকে।
১৯৯১ সালে ভারতে মুক্তিপ্রাপ্ত (মুক্তি : আমেরিকা ২২/০৫/১৯৯২, ফ্রান্স ২৬/০৮/১৯৯২, ইংল্যান্ড ১৯/১১/১৯৯৩) সত্যজিৎ রায় পরিচালিত বাংলা সিনেমা 'আগন্তুক'-এর সংলাপে আমরা পাই --
"অনিলা - আপনাকে একটা নতুন জিনিস দেখাই।
মনোমোহন- সর্বনাশ, এ আবার কি?
অনিলা - গয়নাবড়ি। মেদিনীপুরের বৌ ঝিয়েরা নিজেরা বাড়িতে তৈরি করে।
মনোমোহন - বাঃ, আহারের এত বাহার, এ শুধু বাংলাদেশেই সম্ভব।
বাবলু - আমাকে একটা দাও মা।"
এই সিনেমাটি মহান চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পরিচালিত শেষ চলচ্চিত্র। এখানে তিনি কাহিনি বিন্যাসে বেছে নেন ৩৫ বছর ধরে নিরুদ্দিষ্ট এক মামার ভাগ্নীবাড়ি আসাকে কেন্দ্র করে আবিষ্ট কাহিনি। সাজানো ডাইনিং টেবিলে খেতে বসা প্রৌঢ় মামা মনোমোহনকে বাড়ির গৃহিনী খেতে দিয়েছেন সবজান্তা মামার একেবারেই অচেনা আইটেম। মেদিনীপুরের বউদের হাতের তৈরি সুচারু গয়নাবড়ি।
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এই 'আগন্তুক' সিনেমাটি ছিল সত্যজিৎ রায়ের নিজের লেখা 'অতিথি' গল্পের অবলম্বনে তৈরি। এতে অভিনয় করেছিলেন উৎপল দত্ত, মমতাশঙ্কর, দীপঙ্কর দে, ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়, রবি ঘোষ প্রমুখ। কিন্তু এই সিনেমায় গয়নাবড়ির বিষয় এবং ছবি ব্যবহারের পেছনে পুলকানন্দ বাহুবলীন্দ্রের অবদান উল্লেখ্যনীয়।
প্রকাশক গবেষক অরিন্দম ভৌমিক মেদিনীপুরের গয়নাবড়ির সাথে সত্যজিৎ রায়ের সম্পর্ক নিয়ে এক দুর্লভ অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন "১৯৯৮ সালের শুরুর দিকে একদিন বন্ধুদের সঙ্গে নৃত্যগ্রাম ঘুরতে গিয়েছিলাম (ব্যাঙ্গালোর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্য শেখার আধুনিক গুরুকুল)। সেই নৃত্যগ্রামে বি. মোহন নামে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হয়। তখন উনার বয়স ৬৩, আর আমার ২৩। ভদ্রলোক ডকুমেন্টরি ফিল্ম করেন। সত্যজিৎ রায়ের অনেক সিনেমা দেখেছেন। আমার বাড়ি মেদিনীপুরে শুনে তিনি জিজ্ঞেস করলেন 'Have you ever tasted the famous Goynabori of Medinipur? I want to try it'।
আমি তো প্রথমে উনার 'গয়নাবড়ি' উচ্চারণ শুনে বুঝতেই পারিনি উনি কীসের কথা বলছেন। পরে যখন উনি বললেন যে, সত্যজিৎ রায়ের আগন্তুক সিনেমায় উনি উৎপল দত্তকে খেতে দেখেছেন। তখন বুঝতে পারলাম। আমার সঙ্গে বন্ধুদের কারও বাড়ি ছিল কাশ্মীরে, কারও অন্ধ্রপ্রদেশে, তো কারও আসামে। সেদিন তাঁদের সামনে আমার বুকটা গর্বে দশ গুণ বেড়ে গিয়েছিল। মোহনবাবুর সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুরাও গয়নাবড়ি খেতে চেয়েছিল। তাই পুজোর ছুটিতে বাজকুল থেকে পার্বতী সামন্তর তৈরি গয়নাবড়ি নিয়ে গেছিলাম। মোহনবাবু এতো খুশি হয়েছিলেন যে, সবগুলি না খেয়ে কয়েকটি বড়ি ফ্রেমে বাঁধিয়ে তাঁর ড্রইংরুমে সাজিয়ে রেখেছিলেন। মোহনবাবু আজ আর নেই, সেই ফ্রেমবন্দি গয়নাবড়িও হয়তো নষ্ট হয়ে গিয়েছে, কিন্তু সেদিনের অনুভুতিটা এখনও তাজা"।
পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি শহরে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত 'প্রতিদ্বন্দ্বী' (মুক্তি: ২৭ শে অক্টোবর, ১৯৭০) সিনেমার কিছু দৃশ্যের শুটিং হয়েছিল। মেদিনীপুরের বুকে সত্যজিৎ রায়ের পরিচালিত চলচ্চিত্রের প্রথম শুটিং লোকেশন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে এটি চিত্রায়িত হয়। যা সত্যজিৎ রায়ের 'কলকাতা ত্রয়ী' বা 'কলকাতা ট্রিলজি' সিরিজের প্রথম চলচ্চিত্র। বাকি দুটি চলচ্চিত্র হল সীমাবদ্ধ (১৯৭১) এবং জনঅরণ্য (১৯৭৬)। কলকাতা শহরের বেকারত্ব, মধ্যবিত্তের জীবনের লড়াই, মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং কর্পোরেট সংস্কৃতির কদর্য রূপ প্রতিভাত করা হয়েছে এই তিন ছায়াছবিতে।
'প্রতিদ্বন্দী' সিনেমার একটি দৃশ্যের শুটিং হয়েছিল কাঁথির 'নিউ জনপ্রিয় হোটেল'এ। সিনেমাটির কৃতজ্ঞতা স্বীকার অংশে এই হোটেলটির নাম ছাড়াও উল্লেখ করা হয়েছে কাঁথির টাউন বোর্ডিং এবং হিজলি কো অপারেটিভ ট্রান্সপোর্টস লিমিটেডের নাম। ১৯৬৯ এর ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে এখানে সিনেমাটির শুটিং হয়েছিল।
কাঁথি শহরের রাজাবাজার অঞ্চলের কালীমন্দির পেরিয়ে অনেকটা এগিয়ে গেলে মিলবে বন্ধ হয়ে যাওয়া শ্রীরূপা সিনেমা হল। এখানকার রাস্তার ক্রশিংয়ের ঠিক আগে রাস্তার বামপাশে রয়েছে এখনকার 'জয়গুরু হোটেল'। এটিই আসলে সেদিনের 'নিউ জনপ্রিয় হোটেল'। এটি প্রতিষ্ঠিত করেন মহেশ্বর দাস। এখন তাঁর ছেলে বিষ্ণুপদ দাসই দেখাশোনা করেন। তখন এটি ক্রেতাদের কাছে 'দু আনার হোটেল' নামেও পরিচিত ছিল।
'প্রতিদ্বন্দী' সিনেমায় নায়ক সিদ্ধার্থ চৌধুরী (ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়) একটি ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে ধৈর্য হারিয়ে রেগে ইন্টারভিউ বোর্ডের ঘরদোর ভাঙচুর করেন। তারপর সেখান থেকে বেরিয়ে ট্রেনে চেপে চলে যান বালুরঘাটের উদ্দেশ্যে। সেটি একটি চিঠিতে প্রেমিকাকে জানান। ওঠেন একটি হোটেলে। সেই হোটেলে ওঠার দৃশ্যেরই শুটিং হয় কাঁথি শহরের দুটি এলাকায়। একটি এই নিউ জনপ্রিয় হোটেলে এবং অন্যটি টাউন বোর্ডিংয়ে। দ্বিতীয়টি অবশ্য এখন আর নেই। সেখানে বিছানার সামগ্রীর দোকান 'শয্যাশ্রী' হয়েছে। ছায়াছবিতে দেখা গিয়েছে 'হোটেল' লেখা বোর্ড। এর পাশে যিনি বসে টাকা পয়সা নিচ্ছিলেন বলে দেখা গিয়েছে, তিনি ছিলেন তখনকার বোর্ডিংয়ের মালিক সতীশচন্দ্র দাসশর্মা।
নিউ জনপ্রিয় হোটেলের সিঁড়িতে নায়কের সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠবার ছবি তোলা হয়। তখন তাঁর সাথে ব্যাগ নিয়ে ওঠার দৃশ্যে অভিনয় করেন এই হোটেলের রান্নার কাজ করা রামনগরের একটি ছেলে বিষ্ণুপদ দাস। ছবির কৃতজ্ঞতা স্বীকারে তাঁর নামও রয়েছে। উল্লেখ করা যায়, হোটেলের তৎকালীন মালিক মহেশ্বর দাসের ছেলের নামও বিষ্ণুপদ দাস। তবে এঁরা দুজনেই আলাদা ব্যক্তিত্ব। কাঁথি ছাড়াও এই ছায়াছবির অন্যান্য কিছু দৃশ্যের শুটিং হয়েছিল দীঘাতেও। সেখানে শুটিংয়ের সময় সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সন্দীপ রায়ও।
সিনেমায় দেখা যায়, হোটেলে ব্যাগ রেখে ফিরে আসার সময় ছবির নায়ক (ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়) ঐ হোটেল কর্মচারীকে জিজ্ঞাসা করে, "এই যে, এক কাপ চা হবে?' তখন হোটেলের লোকটি (বিষ্ণুপদ দাস) উত্তর দেয়, 'হবে'। এরপর সিগারেট ধরাতে গিয়ে নায়ক কিছু একটা শব্দ শুনে হোটেলের ঘর থেকে বারান্দায় বেরিয়ে আসে। তখন শোনা যায় কয়েকজন মৃতদেহ নিয়ে যেতে যেতে বলছে, 'রামনাম সত্য হ্যায়'। এখানেই নায়কের ছবি স্থির হয়ে যায়। পর্দায় ভেসে ওঠে লেখা -- 'ইতি সিদ্ধার্থ'।
মেদিনীপুরের বুকে আরও একটি সিনেমার শুটিং স্পট খুঁজতে এসেছিলেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায়। এবারের সিনেমাটির নাম ছিল 'ঘরে বাইরে' (মুক্তি : ২২ শে মে, ১৯৮৪)। সেই সিনেমাটির শুটিং লোকেশন পছন্দ করতে যখন তিনি মহিষাদল এসেছিলেন, তখন তাঁর সঙ্গে সারাদিন কাটিয়েছিলেন মহিষাদল কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক হরিপদ মাইতি। তিনি তাঁর 'মহিষাদল রাজপরিবার' বইতে (পৃষ্ঠা : ৩১৯-৩২০) সত্যজিৎ রায়ের আগমনের বিবরণে লিখেছেন, "১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দের ৭ ই ফেব্রুয়ারি। প্রখ্যাত পরিচালক সত্যজিৎ রায় মহিষাদলে আসেন তাঁর 'ঘরে বাইরে' ছবির শুটিংয়ের স্থান নির্বাচনের জন্য। তিনি চেয়েছিলেন, নদীর ধারে একটি গ্রাম্য হাট, যেখানে একটি বটগাছ থাকবে। যেটি ব্যবহৃত হবে সন্দীপের স্বদেশি বক্তৃতার জন্যে। প্রথমে গিয়েছিলেন হরিখালি। জায়গাটা পছন্দ হয়নি। দুপুরে সিনেমামোড়ে পি. ডব্লিউ. ডি. বাংলোয় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন। সঙ্গে ছিলেন একজন ফোটোগ্রাফার এবং একজন চিত্রশিল্পী। বিকালে গেলেন গেঁওখালিতে নদীর পাড়ে যেখানে হাট বসে। সেখানে একটা বটগাছও আছে। এক লহমায় জায়গাটা পছন্দ হয়ে গেল। কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মত বদলে গেল, হাটের উপর দিয়ে বিদ্যুতের তার থাকার জন্যে। তারপর গাড়ি করে আশ্রমের দিকে কিছুটা গিয়ে ফিরে এলেন।
গেঁওখালি থেকে ফিরে তিনি প্রথমে গেলেন রঙ্গিবসান প্রাসাদে। সমস্ত প্রাসাদটি ঘুরে ঘুরে নিখুঁত মনোসংযোগে দেখলেন। ফটোগ্রাফারকে নির্দেশ দিলেন কোন কোন ছবি তুলতে হবে। একতলা, দোতলার প্রায় প্রত্যেকটি রুমে ঘুরলেন। তারপর তিনি গেলেন ফুলবাগ প্রাসাদে কুমার দেবপ্রসাদ গর্গ বাহাদুরের সঙ্গে দেখা করতে। তাঁকে বসানো হল দরবার হলে। দুজনের মধ্যে নানা বিষয়ে অনেক কথা হল। সত্যজিৎবাবু তুললেন, বাহাদুরের দেশ পত্রিকায় সদ্য প্রকাশিত দীর্ঘ প্রবন্ধ, 'সঙ্গীত সঙ্গ ও প্রসঙ্গ' এর কথা। রাজ পরিবারের পক্ষ থেকে সত্যজিৎবাবুকে আন্তরিকভাবে আপ্যায়িত করা হয়। লেখক সারাক্ষণ তাঁর ভ্রমণসঙ্গী ছিলেন। সন্ধ্যায় সিনেমামোড় থেকে সত্যজিৎবাবুকে বিদায় জানানো হয়"।
সত্যজিৎ রায় পরিচালিত 'অরণ্যের দিনরাত্রি' (মুক্তি : ১৬ ই জানুয়ারি, ১৯৭০) ছায়াছবিতে অভিনয় করেছিলেন পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুক শহরের বিখ্যাত অভিনেতা শমিত ভঞ্জ। এতে তিনি 'শেখর' নামের এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন। এটিই তাঁর অভিনয় জীবনের অন্যতম একটি মাইলফলক বৈকি।
মেদিনীপুরের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের সখ্যতা, সম্পর্কের উদাহরণ হিসেবে আরও এক ব্যক্তিত্বের প্রসঙ্গ আসবে। তিনি পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গড়বেতার বিখ্যাত মুঘল চিত্রকলাবিদ অশোক কুমার দাস। তাঁর সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের পরিচালিত বিভিন্ন সিনেমা তৈরির কাজে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল সেসময়। এই অশোক কুমার দাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল ইতিহাসবিদ নীহাররঞ্জন রায় এবং অভিনেতা বসন্ত চৌধুরীর সঙ্গেও। সত্যজিৎ রায় পরিচালিত কয়েকটি ছায়াছবিতে মেদিনীপুরের এই অশোক কুমার দাস খুব সামান্য হলেও সাহায্যকারী ভূমিকায় ছিলেন। সেইসব কাজের জন্য অসংখ্য চিঠিপত্র চালাচালি হত। সেগুলি এখনও তাঁর সংগ্রহে রয়েছে।
সত্যজিৎ রায় যখন 'শতরঞ্জ কি খিলাড়ি' (মুক্তি : ১১ ই মার্চ, ১৯৭৭) সিনেমা তৈরি করছিলেন, তখন একটা গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যের শুটিং নিয়ে কথা বলেছিলেন এই অশোক কুমার দাসের সঙ্গে। তিনি তখন জয়পুরে সোয়াই মান সিংহ মিউজিয়ামের ডিরেক্টর। সেসময় শুটিংয়ের জন্য সত্যজিৎ রায় অশোক কুমার দাসকে উট বন্দুক নামে এক প্রকার সুইভেল বন্দুক, চাকাযুক্ত কামানের গাড়ি, তরোয়াল, বেয়নেট, পুরানো পালকি, বারুদের বাক্স ইত্যাদি জোগাড় করে দিতে বলেছিলেন। সিনেমার প্রয়োজনে সেসব সামগ্রী জোগাড় করে দিয়েছিলেন মেদিনীপুরের অশোক কুমার দাস। ফলে ঐ সিনেমার অনেক দৃশ্য জয়পুরেই শুটিং করতে পেরেছিলেন তিনি। এরপর 'হীরক রাজার দেশে' (মুক্তি : ১৯ শে ডিসেম্বর, ১৯৮০) ছবিতেও সাহায্য করেছিলেন অশোক কুমার দাস। ১৯৭১ সালে তৎকালীন যুগোশ্লাভিয়াতে যখন সত্যজিৎ রায়কে 'স্টার অফ যুগোশ্লাভিয়া' খেতাব দেওয়া হয়, তখন সেই অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন মেদিনীপুরের এই অশোক কুমার দাস। তিনি সত্যজিৎ রায়ের সম্পাদিত 'সন্দেশ' পত্রিকাতেও লিখতেন বলে জানা গিয়েছে।
🍂

0 Comments