প্রসেনজিৎ রায়
বর্ষ বা দ্বিবর্ষ ঘুরে আবার নির্বাচনের মরশুমে আমরা এসে পড়লাম। উত্তপ্ত প্রেক্ষাপট তৈরি করল গতবছরের পুজোর সময় থেকে একটু একটু করে ঘনীভূত ভোটার তালিকার এস আই আর বা বিশেষ নিবিড় পর্যালোচনা। একাধিক রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন যেমন দেশের মিনি সাধারণ নির্বাচনের চেহারা নিয়ে আসে, তেমনই তা ভোটপ্রিয় বাঙালির চিন্তা ও চর্চায় আনে ভোট-বিষয়ক নানা চেনা অচেনা তথ্য।
সরকার গঠনের জন্য বিশ্বের প্রাচীনতম নির্বাচন কোন দেশে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ? এ প্রশ্নের উত্তরে প্রাচীন এথেন্সের নাম আসাটাই স্বাভাবিক। প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যেও ধর্মগুরু বা পোপ নির্বাচন অথবা সার্বভৌম সম্রাট বেছে নেওয়ার পন্থা হিসাবে নির্বাচনের উল্লেখ পাওয়া যায়।
তবে প্রকৃত অর্থে নির্বাচন বলতে যা বোঝায়, শাসনতন্ত্রে ক্রমে সেই প্রথা সর্বাগ্রে চালু হয় খ্রীষ্টিয় সপ্তদশ শতাব্দের ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার নানা দেশে।
আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিশারী এথেন্সে মোট প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারতেন বলে কথিত আছে। এই নির্বাচকমন্ডলীর হাতেই গঠিত হতো একলেসিয়া বা প্রশাসক আইনসভা। চিত্রিত কলসের মধ্যে নুড়ি প্রক্ষেপণ করে নিজেদের পছন্দের প্রার্থী বেছে নিতেন নির্বাচকমন্ডলী এবং ধারণা করা যায় তাঁরা হতেন এথেন্সের অভিজাত শ্রেণির প্রতিনিধি। এথেন্স এবং প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের ভোটাররা অবশ্যই অভিজাত বা প্রভাবশালী পুরুষ-ই হতেন, সেই সমাজে মহিলা এবং দাসসমাজভুক্ত পুরুষের ভোটাধিকার ছিল না। এখনও গাম্বিয়ায় নাগরিকরা প্রার্থীদের ছবি লাগানো নির্দিষ্ট রঙের ধাতব ড্রামে মার্বেল ফেলে ভোট দেন। প্রতিটি ড্রামে লাগানো থাকে এক একটি ঘণ্টা, মার্বেল ফেলার সাথে সাথেই যা বেজে ওঠে। যদি ঘণ্টাটি একবারের বেশি বাজে, তাহলে ভোটকর্মীরা বুঝতে পারেন যে কোনো নিয়ম ভঙ্গ হয়েছে।
🍂
জানা যায়, কলসের মধ্যে পাথরের টুকরো ফেলে ভোটাধিকারের ব্যবস্থাটি ছিল গোপনীয়। গ্রীক ভাষায় পাথরের টুকরোকে বলা হয় 'সেফোস' এবং পাথরের টুকরো ফেলে ভোটাধিকার প্রয়োগের সেই ইতিহাসের পথ ধরেই আজ
নির্বাচনের ধরণ ও সংখ্যাতত্ত্ব সংক্রান্ত বিজ্ঞানের ইংরাজী নাম"সেফোলজি"।
জনগণের সার্বিক সম্মতি থেকেই সরকারকে তার ক্ষমতা লাভ করতে হবে এবং নিয়মিতভাবে সেই সম্মতি সুনির্দিষ্টভাবে অর্জন করতে হবে, এই ধারণার ভিত্তিতেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা বর্তমান রূপ পেয়েছে।
অষ্টাদশ শতাব্দের পৃথিবীতে রাজনীতির আঙ্গিনায় অভিজাত সম্প্রদায়ের মানুষই প্রবেশ করতে পারতেন। আমেরিকান
ও ফরাসি দেশে সংঘটিত দুটি বিপ্লব পৃথিবীবাসীকে একটু একটু করে সার্বিক ভোটাধিকারের দিকে এগিয়ে দিয়েছিল বললেও অত্যুক্তি করা হয় না। সর্বস্তরের মানুষের সমানতার আক্ষরিক অর্থে ক্রিয়াশীল হওয়ার পূর্বে ভোটাধিকার ছিল মুষ্টিমেয় মানুষের রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের হাতিয়ার।
সর্বজনীন ভোটাধিকার বাস্তবায়নের পরেও, “এক ব্যক্তি, এক ভোট” এর আদর্শ সব দেশে অর্জিত হয়নি। কিছু দেশে একাধিক ভোটাধিকার ব্যবস্থা বজায় রাখা হয়েছিল, যা নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠীকে নির্বাচনী সুবিধা দিত। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাজ্যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক এবং নিজেদের বসবাসের এলাকার বাইরে অন্য নির্বাচনী এলাকার ব্যবসার মালিকরা ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত একাধিক ভোট দিতে পারতেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে, অস্ট্রিয়া এবং প্রুশিয়া উভয় দেশেই তিন শ্রেণীর ভারযুক্ত ভোট ব্যবস্থা ছিল, যা কার্যকরভাবে নির্বাচনী ক্ষমতাকে উচ্চ সামাজিক স্তরের হাতেই রেখেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৬৫ সালে ভোটাধিকার আইন পাস হওয়ার আগ পর্যন্ত, আইনি বাধা এবং ভীতি প্রদর্শনের কারণে অধিকাংশ আফ্রিকান আমেরিকান—বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দারা—নির্বাচনে ভোট দিতে কার্যত বঞ্চিত ছিলেন।
পূর্ণ গণতন্ত্রের সমর্থকরা সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিলেন। পশ্চিম ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকা জুড়ে ১৯২০ সালের মধ্যে প্রায় সমস্ত দেশেই প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছিল, যদিও নারীদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে সময় লেগে গিয়েছিল আরও বেশ কয়েক বছর। ব্রিটেনে ১৯২৮ সালে, ফ্রান্সে ১৯৪৪ সালে, বেলজিয়ামে ১৯৪৯ সালে এবং সুইজারল্যান্ডে ১৯৭১ সালে নারীদেরও ভোটাধিকারের আওতায় নিয়ে আসা হয়।
ভোট দেওয়ার ন্যুনতম বয়সের নিরিখে আমরা কোনো কিশোর প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে কি না তা বিচার করি। তবে পৃথিবীর সমস্ত দেশে এই মাপকাঠি সমান নয়। ১৯৮৮ সাল থেকে ব্রাজিলের নাগরিকরা ১৬ বছর বয়সে ভোট দেওয়ার অধিকার পেয়েছেন। অস্ট্রিয়া, নিকারাগুয়া এবং আর্জেন্টিনাতেও ১৬ ও ১৭ বছর বয়সীরা ভোট দেওয়ার যোগ্য।
ইন্দোনেশিয়া ও সুদানের মতো দেশেও ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরা ভোট দিতে পারে। জার্মানির কয়েকটি নির্বাচিত প্রদেশ সেখানকার স্থানীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনগুলিতে ১৬ বছর বয়সীদের ভোটাধিকারের সংস্থান করেছে। স্কটল্যান্ডেও ১৬ বছর বয়স হলেই সেখানকার মানুষ স্কটিশ পার্লামেন্টের সমস্ত নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন।
জানলে অবাক লাগে, ১৮ বছর বয়স হওয়া সত্বেও যদি নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ না করেন, তাহলে অষ্ট্রেলিয়ান নাগরিকদের জরিমানার মুখে পড়তে হয়। জরিমানা দিতে না পারলে তা হয় দেওয়ানি বিধিভঙ্গের শামিল।
ব্রাজিলে ভোটদানের ন্যুনতম বয়স ১৬ হলেও ১৮ থেকে ৬৯ বছর বয়সী প্রায় সকলের জন্যই ভোট দেওয়া বাধ্যতামূলক, এবং যাঁরা ভোট দেন না তাদের জরিমানা করার বিধান আছে ।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বাসিন্দাদের ভোটাধিকার যেখানে নিজের পাড়াতেই সুরক্ষিত নয়, সেখানে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে থাকা আমেরিকান নভোচারীরা মহাকাশ থেকেই ভোট দেওয়ার সুযোগ পান। ১৯৯৭ সাল থেকে তাঁদের এইভাবে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা চালু হয়। বছর টেক্সাস প্রদেশে পাস হওয়া একটি একটি আইনের বলে সেখানকার হিউস্টনে অবস্থিত মিশন কন্ট্রোল থেকে মহাকাশে সুরক্ষিত ব্যালট পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হয় এবং মেইলের মাধ্যমে সেগুলি পাঠিয়ে দেওয়া হয় । মহাকাশচারী নির্বাচকেরা ভোটদান করার পর, তাঁদের ব্যালটগুলি পৃথিবীতে ফিরে আসে আর নির্বাচনী কর্মকর্তারা গণনার জন্য নভোচারীদের ব্যালটের এক একটি করে হার্ড কপি জমা দেন।
'গণতন্ত্র' শব্দটি আধুনিক ও আকর্ষণীয় মনে হলেও পৃথিবীর সমস্ত দেশে কিন্তু এর প্রচলিত প্রয়োগ নেই। এক নিঃশ্বাসে আট-দশটি এমন দেশের নাম বলা যায় যেখানে কোনো নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রয়োজন হয় না, নেই উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক দলও।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমীরশাহী, ওমান, কুয়েত, আফগানিস্তান, পালাউ, ন্যুয়ে, তুভালু, মাইক্রোনেশিয়ার মতো রাষ্ট্রে নির্বাচন হয় না এবং এগুলির মধ্যে কোথাও কোথাও রাজনৈতিক দল গঠন করাও নিষিদ্ধ। তবে সারা পৃথিবীতে রাষ্ট্রের মোট সংখ্যা যেখানে কমবেশি ২০০ সেখানে অন্তত: ১৩০টি দেশে আনুপাতিক জনপ্রতিনিধিত্বের পদ্ধতি চালু আছে, যেখানে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
নির্বাচনের মাধ্যম হিসাবে বৈদ্যুতিন ভোটিং যন্ত্র বা ই ভি এম আমাদের দেশ ভারতের ক্ষেত্রে যেমন ব্যবহৃত হয় তেমনই ব্রাজিল, ফিলিপাইনস,বেলজিয়াম,এস্তোনিয়া, ভেনেজুয়েলা, মালদ্বীপ, নামিবিয়া, মিশর, নেপাল-এর মতো বিশ্বের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গণতন্ত্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন ব্যবহৃত হয়।
ভারতের পক্ষ থেকে এগুলির মধ্যে বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রকে বৈদ্যুতিন ভোটিংযন্ত্র সংক্রান্ত কারিগরি সহায়তা দেওয়া হয়েছে।এই দেশগুলির মধ্যে ভুটান,নেপাল এবং নামিবিয়া ভারতে তৈরি ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন ব্যবহার করে থাকে ।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, ভারতে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন পুরোনো ব্যালট পেপারের জায়গা পুরোপুরি দখল করে নিলেও ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশ কিন্তু ইভিএম ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। এর একটি অন্যতম কারণ হলো বর্তমান দিনে বিশ্বের অনেক দেশেই ইলেকট্রনিক মেশিনের মাধ্যমে নির্বাচনের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
পৃথিবীর প্রযুক্তির ক্লাসে ফার্ষ্টবয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ই-ভোটিংয়ের একমাত্র মাধ্যম হলো ইমেল বা ফ্যাক্স। ভোটারকে পাঠানো ব্যালট ফর্ম ভোটারের মাধ্যমে পূরণ হয়ে ইমেলের মাধ্যমে ফেরত এলে, অথবা পূরণ করা ব্যালটের একটি ডিজিটাল ছবি ফ্যাক্সের মাধ্যমে ফিরে এলে এক্ষেত্রে ভোটদান সম্পন্ন হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়, যেভাবে মহাকাশ থেকেও নভোচররা ভোট দিয়ে থাকেন।
দেশে দেশে নির্বাচন এক এক রঙ নিয়ে মানুষের কাছে আসে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল বিশ্বের মানুষকে যখন খুব কায়ক্লেশে নির্বাচনী ব্যবস্থার মধ্যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাফল্য সন্ধান করতে হয় তখন গিনেস রেকর্ডধারী জন সি. টারমেল আমাদের অবাক করে দেন। কানাডার রাজধানী অটোয়ার বাসিন্দা টারমেলের দখলেই রয়েছে সবচেয়ে বেশিবার নির্বাচনী লড়াই-এ অংশ নেওয়ার রেকর্ড। ১৯৭৯ সালের মে মাস থেকে ২০১৬ সালের ১৭ই নভেম্বর পর্যন্ত কানাডায় ৯০টি ফেডারেল, প্রাদেশিক ও পৌরসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি গিনেস বুকে নাম তোলেন । ৯০ বার নির্বাচনে লড়ে একবারই তিনি হারেন নি। ২০০৮ সালে, যখন একটি ফেডারেল নির্বাচনের কারণে গুয়েলফ প্রদেশের উপনির্বাচনটি স্থগিত হয়ে যাওয়ায় ঐ ভোটে তাঁকে হারতে হয় নি । ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি মোট ১০৬টি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
রাষ্ট্রসংঘের একটি প্রতিশ্রুতিমূলক ঘোষণা অনুযায়ী,যেকোনো বছরেই প্রায় একশটি পর্যন্ত দেশ নির্বাচন আয়োজন করতে পারে। অনেক সময় এই নির্বাচনগুলি পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনে রাষ্ট্রসংঘ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে থাকে। সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের জাতীয় নির্বাচনী প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় অংশীদারদের সাথে সহযোগিতার ভিত্তিতেই রাষ্ট্রসংঘ যেকোনো নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ, সার্বজনীন ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে উৎসাহ দেয়। এ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে একশটিরও বেশি দেশে এই ভূমিকা পালন করেছে বলে রাষ্ট্রসংঘ দাবি করেছে।
0 Comments