জ্বলদর্চি

‘নধরের ভেলা’: মন্থরতার নন্দন নাকি আত্মমগ্নতার ফাঁদ?/অরিজিৎ লাহিড়ী


নধরের ভেলা’: মন্থরতার নন্দন নাকি আত্মমগ্নতার ফাঁদ?

অরিজিৎ লাহিড়ী 

বাংলা চলচ্চিত্রের তথাকথিত মুক্তধারার মসিহা প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের কাজ নিয়ে সমালোচনা করা মানেই একদল পনিটেল বুদ্ধিজীবীর রোষানলে পড়া, কিন্তু কাজগুলি ব্যবচ্ছেদ করলে যে নিরেট সত্যটি বেরিয়ে আসে তা হলো একঘেয়ে আঞ্চলিকতা এবং শৈল্পিক অহমিকার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। প্রদীপ্ত বাবুর চলচ্চিত্রের জগতটি মুর্শিদাবাদের বহরমপুর আর নদীয়ার তেহট্টের গণ্ডিতে এমনভাবে আটকে আছে যে মনে হয় পৃথিবীর মানচিত্র বোধহয় ওই জলঙ্গী নদীর পাড়েই শেষ হয়ে গেছে। পরিচালকের এই রুরাল ফেটিশ বা গ্রাম্যতার প্রতি অতি-আসক্তি এখন আর শৈল্পিক সততা নয় বরং একটি ক্লান্তিকর ফর্মুলায় পরিণত হয়েছে। তাঁর প্রতিটি কাজে সেই একই ধূলোবালি মাখা রাস্তা, সেই একই আধপাগল গ্রামীণ চরিত্র আর সেই একই একঘেয়ে ল্যান্ডস্কেপ দেখতে দেখতে দর্শকের মনে হওয়া স্বাভাবিক যে পরিচালক কি নদীয়া বা মুর্শিদাবাদ জেলার পর্যটন দপ্তরের অলিখিত অ্যাম্বাসেডর হতে চাইছেন?

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের চলচ্চিত্র 'নধরের ভেলা' সমকালীন বাংলা চলচ্চিত্রে একটি  সংযোজন। ছায়াছবিটি তাঁর উদ্ভাবনী নির্মাণশৈলী এবং মন্থরতার জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিত হলেও, একটি শিল্পকর্ম হিসেবে এর প্রতিটি বিভাগ নিয়ে গভীর, নিরপেক্ষ এবং বিশ্লেষণাত্মক সমালোচনার অবকাশ রয়েছে।

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য নিজেই এই ছবির সম্পাদক হওয়ার কারণে চলচ্চিত্রের গতি এবং দৈর্ঘ্যের ওপর তার ব্যক্তিগত দর্শনের প্রভাব পারম্পরিক ভাবেই অত্যন্ত প্রকট । ১৮২.৩৭ মিনিটের এই দীর্ঘ ছবিটি সাধারণ দর্শকের ধৈর্যের সীমা পরীক্ষা করে । যদিও মন্থরতাকে পরিচালক একটি স্টেটমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করেছেন। যখন একটি ছবির নায়ক স্লথের চেয়েও ধীরে হাঁটে এবং পরিচালক সেই মন্থরতাকে বিবৃতি হিসেবে প্রচার করেন তখন বুঝতে হবে চিত্রনাট্যে আসলে দেওয়ার মতো কিছুই নেই।  নিজেই সম্পাদক হওয়ার ফলে নিজের শটের প্রতি মায়া ত্যাগ করতে না পেরে তিনি ছবিকে এমন এক দৈর্ঘ্যে নিয়ে যান যা কোনো আধুনিক সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের পক্ষে একবারে দেখা সম্ভব নয়। এই মন্থরতা কোনো দার্শনিক গভীরতা তৈরি করে না বরং এক প্রকার অসহায় ছটফটানি আর একঘেয়েমির জন্ম দেয় যা দর্শককে স্ক্রিন থেকে বিচ্যুত করে ফেলে । 🍂

সম্পাদনার মন্থর হিমবাহের মত ধীর গতি ন্যারেটিভ আর্কে এক ধরণের স্থবিরতা তৈরি করে । গতির এই অস্বাভাবিক অভাব অনেক সময় দর্শককে গল্পের প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। যখন একটি চলচ্চিত্রের দৈর্ঘ্য তিন ঘণ্টা ছাড়িয়ে যায় এবং তাতে নাটকীয় ঘটনার ঘনঘটা অত্যন্ত কম থাকে, তখন সাধারণ দর্শকের পক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে পর্দায় নিবিষ্ট থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। নধরের চরিত্রে অমিত সাহার চলন যখন একটি স্লথের চেয়েও ধীর হয়, তখন দর্শকের মনে প্রশ্ন জাগে যে, বাস্তব জীবনের এই রূপকটি চলচ্চিত্রে অতিরিক্ত টেনে লম্বা করা হয়েছে কি না।

প্রধান চরিত্র নধরের পুরো ছবিতে সংলাপের সংখ্যা মাত্র পাঁচটি । একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মূল চরিত্র যখন প্রায় নির্বাক থাকে এবং তার শারীরিক গতির অভাবের কারণে সে কোনো বড় ধরণের অ্যাকশন নিতে পারে না, তখন স্ক্রিপ্টের ভার বহন করতে হয় পার্শ্বচরিত্রগুলোকে। কিন্তু নধরের এই অস্বাভাবিক মন্থরতা কেন বা এর উৎস কী, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা চিত্রনাট্যে পাওয়া যায় না, যা দর্শককে এক ধরণের অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়। নধর চরিত্রে অমিত সাহার অভিনয় মূলত শরীরী ভাষার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু তাঁর মুখের পেশির চলন অত্যন্ত সীমিত এবং সংলাপের অভাব তাঁর অভিনয়ের ব্যাপ্তিকে এক ধরণের খাঁচার মধ্যে আটকে ফেলে। পরিচালক বারবার দাবি করেন যে তিনি বাণিজ্যিক শোষণের বিরোধী কিন্তু তাঁর ছবিতে নধর চরিত্রটিকে যেভাবে একটি সার্কাসের খাঁচায় পুরে প্রদর্শনী করা হয়েছে তা কি নৈতিকভাবে সঠিক? মানুষকে এভাবে 'ফ্রিক শো'-এর বস্তু বানিয়ে কি পরিচালক নিজেই সেই শোষণের কারিগর হয়ে উঠছেন না?নধরকে তার মা যখন দেবতার অবতার হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং গ্রামবাসীরা তাকে পূজা করে, তখন এটি অন্ধবিশ্বাস এবং কুসংস্কারের একটি প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় । এটি নধরের মতো একজন অসহায় মানুষকে তার পরিবারের মাধ্যমেই শোষিত হতে দেখায়। মা এবং পুত্রের এই সম্পর্কটি কেবল ভালোবাসার নয়, বরং এক ধরণের বাণিজ্যিক লেনদেনের ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে । গ্রামীণ মানুষের অন্ধবিশ্বাসকে পুঁজি করে নধরকে দেবতা বানানো এবং তারপর তাকে সার্কাসে বেচে দেওয়া—এই পুরো ন্যারেটিভের মধ্যে এক ধরণের নিষ্ঠুরতা আছে যা পরিচালক বেশ উপভোগ করেন বলেই মনে হয়।

ঋত্বিক  চক্রবর্তী অবশ্যই সু-অভিনেতা কিন্তু প্রদীপ্ত বাবুর ছবির একই ধরণের উসকো-খুসকো চরিত্রে তাঁকে দেখতে দেখতে এক ধরণের অ্যাক্টিং ফ্যাটিগ তৈরি হয়েছিল। নধরের ভেলায় অবশ্য খল চরিত্রে ঋত্বিক ম্যানেজার হারাধনের চরিত্রে ভাল অভিনয় করলেও, চরিত্রটি অত্যন্ত একরৈখিক এবং শোষকের একটি গতানুগতিক ছাঁচে তৈরি। এই ধরণের চরিত্রে ঋত্বিককে আগে দেখা গেলেও,এখানে তাঁর নিষ্ঠুরতার মধ্যে কোনো সূক্ষ্মতা ছিল না। এটি কেবলই একটি স্বার্থপর ম্যানেজারের চিত্রায়ন যা অনেক সময় অতি-অভিনয় বলে ভ্রম হতে পারে। চরিত্রটির বাণিজ্যিক নিষ্ঠুরতা এবং সিস্টেমের প্রতি আনুগত্য অনেক সময় চিত্রনাট্যকে অতি-সরলীকৃত করে তোলে । এছাড়া, নধরকে একটি ‘ফ্রিক শো’ বা অস্বাভাবিক প্রদর্শনীর বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করার যে কৌশল পরিচালক নিয়েছেন, তা সংবেদনশীল দর্শকদের কাছে এক্সপ্লয়টেটিভ মনে হলে অস্বাভাবিক নয়। পুরাতন আমেরিকার সার্কাসে যেভাবে শারীরিক বৈচিত্র্যকে পুঁজি করে অর্থ উপার্জন করা হতো, নধরের এই মন্থরতাকেও পরিচালক সেই একইভাবে ব্যবহার করেছেন। 

এই চিত্রনাট্যে নধর এবং শ্যামার ( প্রিয়াঙ্কা সরকার ) সম্পর্কের মধ্যে যে ইথারিয়াল প্রেম দেখানো হয়েছে, তা শৈল্পিক দিক থেকে সুন্দর হলেও কাহিনীর অগ্রগতির ক্ষেত্রে খুব একটা গতি প্রদান করে না । বরং দর্শককে একটি পরাবাস্তব জগতে নিয়ে যায় যা বাস্তব জগতের কাঠিন্যের সাথে অনেক সময় অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়।

প্রিয়াঙ্কা সরকার ভালো অভিনয় করলেও চিত্রনাট্যের সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁর ভূমিকা কেবল নধরের প্রতি মমতা বা শোষকের প্রতি আনুগত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। তাছাড়া পার্শ্বচরিত্রগুলো অনেক সময় কেবল একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, যা তাঁদের অভিনয়ের নিজস্ব সত্তাকে ক্ষুণ্ণ করে। এছাড়া বেশিরভাগ পার্শ্বচরিত্রগুলোর মধ্যেই অকারণে অস্বাভাবিকতা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা প্রায় সমস্ত কাজে করে পরিচালক আসলে এক ধরণের কৃত্রিম জগত তৈরি করেন যা বাস্তবের সাথে কোনোভাবেই মেলে না।

সার্কাসের যে তাবু এবং আলোকসজ্জা দেখানো হয়েছে, তা অত্যন্ত কৃত্রিম এবং অনেক ক্ষেত্রে অগোছালো। সার্কাসের অভ্যন্তরে যে লাল এবং সবুজ রঙের উগ্র ব্যবহার করা হয়েছে, তা দর্শকদের জন্য একটি অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করে যা চলচ্চিত্রের দীর্ঘস্থায়ী দর্শনের জন্য অনুকূল নয়। এছাড়া, গ্রামের দৃশ্যগুলোতে যে ধূসর এবং নিস্তেজ রঙের প্রয়োগ করা হয়েছে, তা দর্শকদের মনে এক ধরণের বিষণ্ণতা তৈরি করে যা কাহিনীর মূল সুরের সাথে অনেক সময় সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে ।

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের ছবির অন্যতম প্রধান যন্ত্রণা হলো সাত্যকি বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই তথাকথিত 'লোকগান' বা 'আর্তি'র চিৎকৃত অতি-ব্যবহার। সাত্যকি বাবুর কণ্ঠস্বরকে অনেক সময় মনে হয় এক প্রকার শ্বাসরুদ্ধকর যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ যা কানের পর্দা ফাটিয়ে দর্শকদের মনে 'শৈল্পিক অস্বস্তি' তৈরি করার জন্য পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা হয় । যে দৃশ্যে নীরবতা থাকার কথা সেখানেও সাত্যকি বাবুর সেই চিৎকৃত গোঙানি বা বিষণ্ণ আর্তনাদকে এমনভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয় যে সংলাপ শোনা দায় হয়ে পড়ে। এটাকে পরিচালক হয়তো আত্মিক সুর বলেন কিন্তু সাধারণ শ্রবণেন্দ্রিয়ের জন্য এটি এক প্রকার শ্রুতিকটু অত্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়। নধরের ভেলা ছবিতে এই শব্দদূষণ এক অনন্য মাত্রায় পৌঁছেছে যেখানে সঙ্গীত কাহিনীর সহায়ক না হয়ে বরং দর্শকদের ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়ার আরেকটি হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাত্যকি বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই মন্থর এবং বিষণ্ণ আবহসঙ্গীত এই পরিচালকের সিনেম্যাটিক নিষ্ঠুরতাকে আরও ভারাক্রান্ত করে তোলে যা সব ধরণের দর্শকের জন্য সুখকর নয়।

এই পরিচালক এবং তাঁর স্তাবকগোষ্ঠী এক ধরণের ইন্ডিপেন্ডেন্ট সিনেমার ইগো নিয়ে চলেন যা তাঁকে সৃজনশীলভাবে স্থবির করে দিয়েছে। একই নদীয়া মুর্শিদাবাদ জেলার পটভূমি, একই সাত্যকি বাবু লোকগান আর একই ধরণের মন্থরতা নিয়ে তিনি আসলে একটি বৃত্তের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছেন যেখান থেকে বেরিয়ে আসার কোনো লক্ষণ নেই। এই তথাকথিত স্বতন্ত্র সিনেমার নামে তিনি যা পরিবেশন করছেন তা আসলে বাংলা সিনেমার উত্তরণের পথে কোনো নতুন দিগন্ত নয় বরং এক ধরণের আদিখ্যেতা যা কেবল এক ক্ষুদ্র বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীর ড্রয়িংরুম আলোচনায় শোভা পায়। 

সাধারণ দর্শক যখন সিনেমা দেখতে গিয়ে এক অসহ্য মন্থরতা এবং চিৎকৃত সুরের অত্যাচারে আক্রান্ত হয়ে হল থেকে বেরিয়ে আসেন তখন সেই সিনেমাকে আর যাই হোক জনগণের সিনেমা বলা চলে না। প্রদীপ্ত বাবুর উচিত তাঁর এই তেহট্ট-বহরমপুর মোহ ত্যাগ করে একটু বৃহত্তর জগতের দিকে নজর দেওয়া এবং সাত্যকি বাবুর সেই গোঙানি থামিয়ে একটু প্রকৃত চলচ্চিত্রের ভাষার দিকে মনোযোগ দেওয়া। নতুবা তাঁর এই ভেলাটি কোনো এক মন্থর নদীর চরেই চিরকাল আটকে থাকবে কোনো কুলকিনারা পাবে না। তাঁর কাজে চিত্রনাট্যের চেয়ে মেজাজ আর মেজাজের চেয়ে মন্থরতা বেশি যা আসলে একটি শিল্পকর্মের মৃত্যুঘণ্টাই বাজিয়ে দেয় বারবার।

Post a Comment

1 Comments