সাম্প্রতিক প্রকাশিত কবি সুমন রায়ের ‘বুকে ধরে তোমার রুমাল’ কাব্যটি পড়লাম। বেশ ভালো লাগলো। পঞ্চাশটি নাতিদীর্ঘ কবিতায় শব্দের মূর্ছনা ও প্রকাশভঙ্গীতে আবদ্ধ এ এক অনবদ্য কবিতার সম্ভার। মেদিনীপুরের শ্রীলিপি প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত এই কাব্যের কবিতাগুলি আদ্যপ্রান্ত কিছু সরল ভাবনার সম্ভাবিত আত্ম উন্মোচন।
কাব্যটিকে কবি উৎসর্গ করেছেন কুবাই নামে একটি ছোট্ট নদীকে, খালও বলা যায়। যেটি পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার হুমগড় অঞ্চল থেকে উৎপত্তি লাভকরে চন্দ্রকোনা রোডের পাশ দিয়ে, ঘাটাল ও পাঁশকুড়া শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বেলকথা নামক গ্রামের কাছে রূপনারায়ণ নদীতে গিয়ে মিশেছে। নাতিদীর্ঘ, ক্ষুদ্রপ্রস্থের এই নদীটি কবির মনভূমির একমাত্র আশ্রয়। যাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছেন –
‘বলা না বলা সব কথা আজ
তোমাকে
না বলে
ভাসিয়ে দিলাম
স্রোতে
কুবাই ...’
কুবাইকে যে কবি ভালোবাসেন তা কবিতার এই উৎসর্গ পত্র এবং কাব্যের ১১ টি কবিতার মূল বক্তব্য কুবাইকে কেন্দ্রকরে, তা বোঝার অপেক্ষা রাখেনা। কুবাই নদীর ‘মায়াবী পাড়ে আলো আঁধারে বসোনি’ (তোমরা জানোনা) বলে কবি পাঠকদের অদেখা রূপকে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। কুবাই কবির শৈশবের সাথে, কৈশরের সাথে বেড়ে চলেছে, বয়ে চলেছে। যৌবনের উচ্ছলতায় কবি খুঁজে পেয়েছেন নিজের অস্তিত্বকে (সে কুবাই সে কুবাই)। ঠিক তেমনি হাজারো কথার অভিব্যক্তিতে কুবাই হয়ে উঠেছে কবির ভরসা পাওয়া একমাত্র আশ্রয়স্থল। ‘ও অন্ধকানাই’, ‘অন্তর’, ‘কুহকী কুবাই’, ‘পূর্ণিমা এলে’, ‘সুধাংশুবাবুর গাণিতিক বোধ’, ‘অদৃশ্য দৃশ্যমান’, ‘জীবনের মানে’, ‘অবগাহন’ ইত্যাদি কবিতাই তার প্রমাণ। সুধাংশুবাবুর গাণিতিক বোধে কবির কুবাই ধরা পড়ে না বলে কবি আক্ষেপ করেছেন – ‘আপনার অংকের জটিল তত্ত্ব ছাড়িয়ে কুবাই দূরন্ত গতিতে/মশগুল।
🍂
প্রকৃতির রূপ-বৈচিত্র্যে বর্ষার গুরুত্ব অনেক। বৃষ্টি যেমন তপ্ত ধরিত্রীকে ঠান্ডা করতে পারে, ঠিক তেমনি প্রকৃতিকে সজীব করে তুলতে পারে নিরন্তর বারিধারায়। সমস্ত অসংলগ্নতাকে ধুয়ে দিয়ে নতুন প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। যার বর্ষণে ঝলমল করে ওঠে এই বিশ্বভুবন, নতুন প্রাণের সঞ্চারে সবকিছুই নতুন হয়ে ওঠে। এই বর্ষার মাধুর্যকেও কবি আত্তীকরণ করেছেন, অনুভূতির কথা প্রকাশ করেছেন কবিতায় শব্দের গাঁথুনিতে। ‘শূন্যতা’, ‘বর্ষা’, ‘মেটাফরিক’, ‘একটা চড়ুই’ ইত্যাদি কবিতায় তাই বর্ষা হয়ে উঠেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
বিশেষ ধরণের এই কবিতাগুলি ছাড়াও কিছু কিছু একক কবিতা আপন বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। সেরকমই একটা কবিতা ‘বর্ণে অক্ষরে’। ‘পকেটের খুচরো পয়সার মতো’ তুচ্ছ জিনিস দিয়ে বাঁচা যায় কিংবা আবর্জনা স্তূপ পুড়িয়ে শৈশব কেনা যায়। যে শৈশব কবির কাছ থেকে হারিয়ে গিয়েছে। ‘বর্ণের অক্ষরে’ কবিতার মূল বক্তব্য এই হারিয়ে যাওয়া জীবনের স্মৃতিরোমন্থন। ‘একটা চড়ুই’ কবিতাটি আপাদমস্তক চিত্রগল্পে মোড়া একটি সম্পূর্ণ জীবনের ক্ষণিকের চিত্র। এই কবিতায় কবি ধরতে চেয়েছেন একটা বৃষ্টিভেজা সকালের চিত্র। বৃষ্টির পরের প্রাকৃতিক উন্মুক্ততা কবির মনেও ছড়িয়ে পড়েছে অপূর্ব মায়া নিয়ে। কিন্তু সবকিছু অনুভব করেও চড়ুই পাখির মত সব হারিয়ে যায়। এখানে চড়ুই পাখি আসলে জীবনের আকাঙ্ক্ষার অন্যনাম মাত্র। ‘লিখুন আঁকুন’ কবিতায় কবি অবলীলায় বলতে পারেন ‘সবকিছু মিথ্যার মাঝে সকালের লাজুক রোদটাই চমক’। কি সংবেদনশীল এ বক্তব্য! ‘প্রেমের ক্লাসরুম’ একটি রোমান্টিক কবিতা। কবি আশাবাদী একটা সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য, যে যতি, ছন্দ, লয়ের নিখুঁত গঠনে সাজিয়ে নেবে জীবনটাকে।
এ কাব্যের কবিতাগুলি শুধু বর্তমান নয়, অতীতের পৌরাণিক ঘটনাও ধরা পড়েছে আধুনিক প্রেক্ষাপটে। ‘গৌতমী’ কবিতায় কবি দেখেছেন পুরাণের চরিত্র গৌতম ও মাতা গৌতমীর প্রেমবন্ধন আর উপেক্ষার সমীকরণকে। ঠিক সেরকমই ‘খোয়াব’ একটি আশা আকাঙ্খার নিবিড় মেলবন্ধনের কবিতা। কবি স্বপ্নের নারীকে ওড়নার ভাঁজে হারিয়ে ফেলেও আবার স্বপ্নেই দেখতে চেয়েছেন, স্বপ্নেই ফিরে পেতে চেয়েছেন। ‘অনুভব’ কবিতায় চেতনাকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো একটা প্রশ্ন করেছেন কবি। ‘পৃথিবী যখন ঘোরে নিজের আবর্তে / তখন বিষন্নতা, উচ্ছাস, তিক্ততা / কোথায় যায় এরা ?’ বৃহতের সাথে ক্ষুদ্রের সম্পর্ক, এখানে যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। সেরকমই আরেকটি উল্লেখযোগ্য কবিতা ‘বেআব্রু’। কবিতার নামের সাথে বক্তব্যের মিল রয়েছে ওতপ্রোত। রোদ চশমা আর মেকাপের বিপরীতে কবি খুঁজেছেন ছন্দহীন মানুষগুলোকে। যে মানুষ যুগের চাহিদায় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বেআব্রু করে দিয়েছে নিজের সমস্ত কিছুকে।
‘তোমার রুমাল’ এরকমই আরেকটি কবিতা। কবিতায় কবি প্রেমিকার কথামতো সবকিছুই মেনে নিতে পারেন ও নিচ্ছেন। কথা দিচ্ছেন প্রেমিকার অপছন্দের কোন কিছুই তিনি করবেন না। সমস্ত অত্যাচারকে মেনে নেওয়ার মধ্যে রয়েছে এক রকমের প্রেমের প্রশান্তি। তাই কবিতায় কবি অনুভব করতে চেয়েছেন একান্তে সেই প্রেমের অনুভূতিকে। কবি ভাবনায় ‘সাঁকো’ কবিতাটি একটি অন্য মাত্রা নিয়ে এসেছে। দুই মন হোক, দুই শরীর হোক বা দুই চেতনা হোক, মিলনের মধ্যকার রূপ যেন সাঁকোয় বাঁধা। সাঁকোর মাধ্যমেই একে অন্যের সাথে মিল ঘটে। ‘কবির জন্মদিন’ কবিতাটি কবি রবি ঠাকুরকে জন্মদিনের সম্মান জানিয়েছেন, শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেছেন আপন শব্দের গাঁথুনিতে।
এই কাব্য কেবলমাত্র গদ্যছন্দ বা মুক্তছন্দ নয়, ছড়ার ছন্দেও অনেকগুলো কবিতা স্থান পেয়েছে। যেমন ‘অবকাশ’, ‘কুহকী কুবাই’, ‘বন্দি বন্দি’, ‘হোলি’, ‘ধারাপাত’, ‘সিঞ্চনে সুখ’, ‘এক’ ইত্যাদি।
সবশেষে বলা যায় কবি সুমন রায় এই কাব্যটিতে স্বকীয়তার পরিচয় রেখেছেন আপন বৈশিষ্ঠ্যে। জটিল শব্দ বা বক্তব্যের দূরুহতাকে সরিয়ে রেখে পাঠকের সামনে নিজের অনুভূতিকে তুলে ধরেছেন শব্দের মায়ায়।
0 Comments