দেশে ও দেশান্তরে বিপন্ন ভাষা
প্রসেনজিৎ রায়
পৃথিবীর যেকোনো জনগোষ্ঠীর ভাষাই হল সেই গোষ্ঠীর মানুষ, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের মধ্যে জীবন্ত সেতু। তা সত্বেও হাজার হাজার ভাষা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। কিছু ভাষা ইতিমধ্যেই মৃত ভাষা-র তকমা পেয়েছে, যেগুলি কেবল বইয়েই পড়া হয় আবার অন্যদিকে কিছু ভাষা বিপন্ন বলে বিবেচিত হচ্ছে কারণ সেই ভাষায় আর অল্প সংখ্যক ভাষাভাষী অবশিষ্ট রয়েছে।
সহজ কথায় বিপন্ন ভাষা হল এমন ভাষা যা বিলুপ্তির দিকে চলেছে কারণ সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর শিশুরা আর ঘরে বসে তাদের সেই নিজের ভাষা শেখে না। ইউনেস্কোর দেওয়া ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একবার যদি কোনও ভাষা তার পরবর্তী প্রজন্মের কাছে স্বাভাবিকভাবে স্থানান্তরিত হওয়া বন্ধ করে দেয়, তখন তার টিঁকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আজকাল আর ল্যাটিন বা সংস্কৃত ভাষায় কেউ কথা বলে না, তাই সেগুলো মৃত ভাষা। এমনই অনেক বিপন্ন ভাষা রয়েছে, যেগুলি আজও জীবিত হলেও ব্যবহৃত হয় খুবই কম জনসংখ্যার সম্প্রদায়ের মধ্যে। এগুলির ব্যবহার সীমাবদ্ধ থাকতে পারে হাতেগোনা কয়েকজন ভাষাভাষীর মধ্যে।
🍂
পৃথিবী জুড়ে নানান বিপন্ন ভাষার ক্রমশ: মৃত্যু হচ্ছে বা বলা ভালো, সেই ভাষাগুলি ব্যবহার করার মতো কোনো ব্যক্তি অবশিষ্ট থাকছে না। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনেস্কো-র হিসাব অনুযায়ী, চলতি শতক শেষ হওয়ার আগেই বিশ্বে বর্তমানে প্রচলিত মোট ৭,০০০ ভাষার প্রায় অর্ধেকই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিলুপ্তপ্রায় এই তালিকার প্রথম দিকেই থাকবে ইথিওপিয়ার 'ওঙ্গোটা' ভাষাটি। এই ভাষায় কথা বলতে পারে এমন বয়স্ক মানুষের সংখ্যা এখন ১০-এরও কম। জাপানের 'আইনু' ভাষাটিতে কথা বলার মতো আর মাত্র ৩০০ জন ভাষাভাষী অবশিষ্ট রয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার 'ন্যামল' ভাষাটি ব্যবহারকারী মানুষের সংখ্যাও এখন ১০ জনের কম। একইভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'ভ্যালি ইয়োকুটস' ভাষাটি ব্যবহার করেন এমন মানুষের সংখ্যাও ১২-র বেশি নয়। চীনদেশের 'মাঞ্চু' ভাষায় কথোপকথন করেন মাত্র ১০০ জন মানুষ, যা ভাষাটির অস্তিত্বের বিপন্নতার সূচক। একইভাবে জার্মানির 'ফ্রিসিয়ান' ভাষা ব্যবহারকারী আর মাত্র ৮,০০০ মানুষ অবশিষ্ট রয়েছেন এবং নিজেদের ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।কানাডার আলাস্কা প্রদেশের ভাষা 'ইনুপিয়াক' ২০০০ ভাষাভাষী নিয়ে টিঁকে থাকলেও মারাত্মকভাবে বিপন্ন।
মানুষের মুখের ভাষা অনেক কারণেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে। অভিবাসন, নগরায়ন এবং বিশ্বায়ন মানুষকে শিক্ষা, কাজ এবং মিডিয়ার জন্য কোনো একটি প্রধান ভাষা গ্রহণ করতে উৎসাহিত করে। উপনিবেশ স্থাপন এবং বিভিন্ন অঞ্চলকে বলপূর্বক অধিগ্রহণ করার মতো ঐতিহাসিক ঘটনাগুলিও ছোট ভাষাগুলিকে বিপন্ন করে দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেছে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে রোমান ভাষার ভিত্তি ছিল ল্যাটিন ভাষা এবং এই ভাষা মৃত হওয়া সত্বেও এখনও বিজ্ঞান, আইন এবং ধর্মের নানা বিবরণীতে তার অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। ভারতভূমির ঐতিহ্যের ভাষা অধুনা মৃত হলেও তা সংরক্ষিত রয়েছে বিভিন্ন হিন্দু ধর্মগ্রন্থ ও প্রাচীন দর্শনে। এখন মৃত হলেও প্রাচীন গ্রীক ভাষার নিদর্শন পাওয়া যায় রাজনীতি, দর্শন এবং সাহিত্যের প্রাচীন নানা গ্রন্থে। অতীতে ভাইকিংদের দ্বারা ব্যবহৃত ও কথিত 'প্রাচীন নর্স' ভাষাটি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান সংস্কৃতিতে আজও প্রভাবশালী। 'কপটিক' ভাষাটি মিশরীয় ভাষার একটি চূড়ান্ত রূপভেদ যার চিহ্ন খ্রিস্টান উপাসনায় আজও খুঁজে পাওয়া যায়। এগুলি ছাড়াও 'গথিক', 'আক্কাদীয়', 'ফিনিশীয়', 'হিটাইট', 'সুমেরীয়' ভাষাগুলি বিশ্ববিখ্যাত মৃত ভাষার মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
ভাষা বিপন্ন বা মৃতপ্রায় তা জেনেই নিশ্চেষ্ট হয়ে না থেকে বিপন্ন, বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রাণপণ প্রয়াস চালানো হয়। তারই ফলে ১৯৭০-এর দশকে বিলুপ্ত হিসাবে ঘোষণা হয়ে যাওয়ার পরেও মান দ্বীপপুঞ্জের 'মাঙ্কস' ভাষাটিকে পুনরুজ্জীবিত করা গিয়েছে এবং তা এখন আবার শিশুদের শেখানো হচ্ছে। একই ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'ইউচি' ভাষাটি ভাষা শিবির আয়োজনের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেবার চেষ্টা করা হচ্ছে। লাটভিয়ার 'লিভোনিয়ান' ভাষাটি প্রায় বিলুপ্ত হলেও এই ভাষায় আধুনিক অভিধান তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। বৎসোয়ানা প্রদেশে 'জিক্সা' নামে একটি অত্যন্ত বিপন্ন ভাষা রয়েছে, ভাষাটিকে সেই ভাষা ব্যবহারকারী ছোট সম্প্রদায়ের মধ্যেই জীবিত রাখার প্রবল প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। 'ব্রেটন' ভাষাটি একসময় ফ্রান্সের ব্রিটানিতে প্রচলিত ছিল। এই ভাষাও বিলুপ্তির অপেক্ষায় দিন গুনছে, কিন্তু স্কুলগুলিতে প্রচারের মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে ভাষাটির ব্যবহার চালু রাখার প্রয়াস নেওয়া হচ্ছে।
ভাষা নিশ্চিহ্ন বা বিপন্ন হওয়ার প্রশ্নে আমাদের দেশের পরিস্থিতিও খুব একটা কম চিন্তাজনক নয়। ৭৮০টি এমন ভাষা ভারতে চিহ্নিত হয়েছে যার মধ্যে গত ৬০ বছরে ২৫০ টি ভাষার মৃত্যু ঘটেছে। এছাড়াও অন্তত ৬০০টি মৃতপ্রায় ভারতীয় ভাষা রয়েছে । 'ওয়াদারি', 'কোলহাটি', 'গোল্লা' এবং 'গিসারি' ভাষাগুলি মৃতপ্রায় ভারতীয় ভাষার উদাহরণ।
কর্ণাটক ও আসামের মতো রাজ্যে বিপন্ন ভাষার সংখ্যা যেমন উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, তেমনই এই তালিকায় রয়েছে মণিপুর ও আন্দামান-নিকোবরের মতো জনজাতি-অধুষ্যিত অঞ্চল।
কিছুদিন আগের গণনায় ভারতে বিপন্ন ভাষায় সংখ্যা ছিল ১৯৭ যা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, চীন ও ইন্দোনেশিয়ায় বিপন্ন ভাষার সংখ্যা যথাক্রমে ১৯১, ১৯০, ১৪৪ ও ১৪৩।
ভাষার মৃত্যু আসলে সংস্কৃতির মৃত্যু। দেশীয় জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব টিঁকে থাকে ভাষার ব্যবহারের মাধ্যমেই। তাই যেকোনো ভাষাকে অবলুপ্তির হাত থেকে বাঁচানো দেশের চলমান সাংস্কৃতিক পরিসরে হয়ে ওঠে অন্যতম দায়িত্ব।
1 Comments
তথ্যনিষ্ঠ লেখা। কাজের লেখা।
ReplyDelete