সত্যজিৎ রায়ের অসম্পূর্ণ প্রকল্পের ইতিহাস
বিজয় চক্রবর্তী
একজন পরিচালকের অসম্পূর্ণ প্রকল্পগুলো তাঁর সম্পূর্ণ কাজের মতোই ঐতিহাসিক দলিল। এগুলি থেকে জানা যায় তিনি কি ভাবছিলেন, কোন দিকে যেতে চাইছিলেন এবং কোন বাধায় থমকে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের কাজ করার পদ্ধতি নিয়ে যাঁরা কাছ থেকে লিখেছেন,তাদের থেকে জানা যায় তিনি কোনো ছবি তৈরির আগে তাঁর নোটবুকে সমস্ত প্রস্তুতি নামিয়ে রাখতেন. শট বিন্যাস, চরিত্রের স্কেচ, পোশাকের নকশা, এমনকি সংলাপের খসড়া — সব কিছু লিখিত আকারে আগেই তৈরি থাকত. তাঁর দীর্ঘকালীন জীবনীকার আন্দ্রু রবিনসন লিখেছেন যে,সত্যজিত রায়ের এই নোটবুকগুলো কেবল কাজের অংশ ছিল না, ছিল তাঁর চিন্তা ভাবনার জীবন্ত দলিল।
'দ্য এলিয়েন': সবচেয়ে বড় বিতর্কের উৎস
সত্যজিত রায়ের অসম্পূর্ণ প্রকল্পগুলোর মধ্যে 'দ্য এলিয়েন' সবচেয়ে বেশি আলোচিত এবং বিতর্কিত। ১৯৬৭ সালে সত্যজিত রায় এই ছবির চিত্রনাট্য লেখেন। গল্পটি বাংলার একটি গ্রামে ভিনগ্রহের প্রাণীর আগমন এবং একটি স্থানীয় শিশুর সঙ্গে তার বন্ধুত্বকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। কলম্বিয়া পিকচার্সের সঙ্গে প্রাথমিক চুক্তি এবং পিটার সেলার্সকে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে নেওয়ার আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি এগোয়নি।
🍂
প্রযোজক মাইক উইলসনের সাথে চিত্রনাট্যের মালিকানা ও লেখকস্বত্ব নিয়ে বিরোধ এবং হলিউডে নির্মাণ প্রক্রিয়ার উপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কায় সত্যজিত রায় এই প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ান। ১৯৮২ সালে স্টিভেন স্পিলবার্গের 'E.T.' মুক্তি পাওয়ার পর বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন ওঠে যে এই ছবির মূল ধারণা কি সত্যজিত রায়ের 'দ্য এলিয়েন' থেকে নেওয়া? বিজ্ঞান-সাহিত্যিক আর্থার সি. ক্লার্ক স্বীকার করেছিলেন যে তিনি সত্যজিত -এর চিত্রনাট্যটি পড়েছিলেন এবং পরে স্পিলবার্গকেও পড়তে দিয়েছিলেন।
মহাভারত: সুপ্ত ইচ্ছা
সত্যজিত রায় নিজে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে মহাভারত নির্মাণ করা তাঁর দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন মহাভারতকে ধর্মীয় চলচ্চিত্র হিসেবে নয়, একটি মানবিক নাটক হিসেবে দেখানো উচিত। কিন্তু জনগণের প্রত্যাশা, ধর্মীয় অনুভূতির চাপ এবং বাজেটের অভাব এই নির্মাণের সবচেয়ে বড় বাধা ছিল।সত্যজিত রায় কখনো এমন ছবি বানাতে রাজি ছিলেন না, যেখানে কোন কিছুর জন্য বিষয়টি দুর্বল হয়ে যায়।
ঘরে বাইরে ও সম্রাট অশোক
ঘরে বাইরে: ১৯৪৮ সালেই তিনি এই উপন্যাসের চিত্রনাট্য প্রস্তুত করেছিলেন, কিন্তু প্রযোজক পাননি।শেষ পর্যন্ত ছবিটি ১৯৮৪ সালে তৈরি হয়, কিন্তু ছত্রিশ বছরের ব্যবধানে সত্যজিত রায়ের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক পরিবর্তিত হয়েছিল।
সম্রাট অশোক: সত্যজিত রায়ের আর একটি প্রকল্পের কথা জানা যায় । তিনি সম্রাট অশোকের কলিঙ্গ যুদ্ধ পরবর্তী রূপান্তর নিয়ে একটি ঐতিহাসিক ছবি করার কথা ভেবেছিলেন। তবে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পুনর্নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট ও লজিস্টিক প্রস্তুতি না থাকায় এটি পরিত্যক্ত হয়।
অসম্পূর্ণতার ঐতিহাসিক মূল্য
সত্যজিত সত্যজিত রায়ের অসম্পূর্ণ প্রকল্পগুলো তার অক্ষমতা প্রতীক ছিল না, ছিল তাঁর সচেতন সিদ্ধান্ত এবং নিখুঁত থাকার প্রতি ঐকান্তিক ইচ্ছা । লস অ্যাঞ্জেলেসের অ্যাকাডেমি অফ মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেসে মূল নথিপত্র, স্কেচ এবং হাতে লেখা নোট সংরক্ষিত আছে । এগুলি গবেষকদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান । ইতিহাসের দৃষ্টিতে এই অসম্পূর্ণতা কেবল ব্যর্থতা নয়, বরং একজন শিল্পীর সততার গল্প — যিনি জানতেন কখন 'না' বলতে হয়।
তথ্যসূত্র
Andrew Robinson, Satyajit Ray: The Inner Eye (1989; revised 2004).
Satyajit Ray, The Alien (unpublished screenplay, 1967).
Satyajit Ray, Our Films Their Films (1976).
Arthur C. Clarke, Greetings, Carbon-Based Bipeds! (1999).
Udayan Gupta, "The Politics of Humanism: An Interview with Satyajit Ray," Cineaste (1982).
Satyajit Ray, My Years with Apu (1994).
Darius Cooper, The Cinema of Satyajit Ray (2000).
Soumitra Chatterjee, interview in Satyajit Ray (Documentary by Shyam Benegal, 1984).
Bert Cardullo (ed.), Satyajit Ray: Interviews (2007).
🍂

0 Comments