সত্যজিৎ রায়ের কল্পবিজ্ঞানের জগৎ ও আনুসঙ্গিক চিত্র
সুমনা পাল
সেদিন ছিল ১৯২৩ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর। কলকাতা; ১০০ নং গড়পাড় রোডের বিখ্যাত রায়-পরিবারে উঠেছে কান্নার রোল। অনেক দিন ধরে কালাজ্বরে ভোগার পর অকালে ঝরে যাচ্ছেন এই বাড়ির এক বিখ্যাত বহুমুখী প্রতিভাধর মানুষ। তিনি উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর দ্বিতীয় সন্তান এবং প্রথম পুত্র সুকুমার রায়; ছিলেন লেখক, সম্পাদক, চিত্রকর, আলোকচিত্রী, লিথোগ্রাফার এবং প্রযুক্তিবিদ। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩৬-৩৭ বছর। রেখে গেলেন স্ত্রী এবং দু'বছর চার মাস বয়সের একমাত্র পুত্র সন্তান মানিককে। অকালে স্বামিহারা সুপ্রভাদেবী কিন্তু হাল ছাড়লেন না। সন্তানকে মানুষ করলেন শক্ত হাতে। বড়ো হয়ে ছয় ফুটের উপরে লম্বা সেই ছেলে শুধু উচ্চতায় নয়, জ্ঞানে-গুণে-খ্যাতিতেও বাবাকে ছাপিয়ে গেল। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ল নাম। হ্যাঁ, ঠিকই; দু বছর চার মাস বয়সে পিতৃহারা সেদিনের সেই ছেলেটি পরবর্তীতে হলেন সত্যজিৎ রায়। সারা পৃথিবী তাঁকে চিনল বিশ্ববরেণ্য চিত্রপরিচালক হিসেবে।
শুধু বিখ্যাত চিত্রপরিচালক নয়, বাপ-ঠাকুরদার মতো সত্যজিৎও ছিলেন বহুমুখী প্রতিভাধর। ছিলেন লেখক, চিত্রশিল্পী, প্রচ্ছদশিল্পী, চিত্রনাট্যকার, শিল্পনির্দেশক, সংগীত পরিচালক আরও কত কী। সারা জীবনের কর্মকাণ্ডের জন্য পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মান। শুধু চলচ্চিত্রের জন্য পেয়েছিলেন ৩২ টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার; ‘পথের পাঁচালী’র জন্য কান চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ পুরস্কার, ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ‘অপরাজিত’র জন্য ‘গোল্ডেন-লায়ন’ এবং কর্মজীবনের জন্য ‘ক্যারিয়ার গোল্ডেন-লায়ন’। পেয়েছেন পদ্মশ্রী (১৯৫৮); পদ্মভূষণ (১৯৬৫); পদ্মবিভূষণ (১৯৭৬); রামেন ম্যাগসেসে পুরস্কার (১৯৬৭); দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার (১৯৮৪)। ফ্রান্স সরকার কর্তৃক ‘লিজিয়ন অফ অনার’ (১৯৮৭) সম্মানে ভূষিত হয়েছেন । সবশেষে ১৯৯২ সালে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে অস্কার এবং ভারতবর্ষের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ভারতরত্ন। এছাড়াও বহুবার তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানান পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন।
সত্যজিৎ রায় বড়োদের জন্য যেমন লিখেছেন, তেমনি লিখেছেন ছোটদের জন্য, মূলত কিশোরদের জন্য। তাঁর বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র ‘ফেলুদা’ এবং কল্পবিজ্ঞান কাহিনির ‘প্রোফেসর শঙ্কু’ বাঙালিদের কাছে আইকনিক চরিত্র। তবে কল্পবিজ্ঞান কাহিনি সম্পর্কে বাঙালির আগে খুব একটা উৎসাহ ছিল না। কিন্তু সত্যজিতের হাত ধরে বঙ্গ-পাঠক কল্পবিজ্ঞানের প্রকৃত স্বাদ পায়। পাঠকের সামনে খুলে যায় এক অদ্ভুত, রোমাঞ্চকর, রহস্যময় নতুন জগৎ; তৈরি হয় এক ঘোর-লাগা অপার্থিব অনুভূতি। সাধারণত কল্পবিজ্ঞান বললেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে মহাকাশ, মহাকাশযান, টাইম মেশিন, এলিয়েন, রোবট, ডাইনোসর-টেরোড্যাক্টাইলের মতো প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী, অদ্ভুতুড়ে সব বিভিন্ন আবিষ্কার… আরো কত কী। কিন্তু সত্যজিৎ রায় এসবের সাথে সাথে তাঁর গল্পগুলিতে পার্থিব এবং অপার্থিব জগতের দারুণ মেলবন্ধন ঘটালেন; শুধু তাই নয় তাতে যোগ করলেন রহস্য, ফ্যান্টাসি, রোমাঞ্চ এবং অ্যাডভেঞ্চারের রস। ১৯৬৬ সালে প্রেমেন্দ্র মিত্র এবং অদ্রীশ বর্ধনের সাথে হাত মিলিয়ে তৈরি করলেন ভারতের প্রথম ‘সায়েন্স ফিকশান সিনে ক্লাব’।
১৯৬১ সাল। স্কটিশ চার্চ কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ‘ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু’ ওরফে তিলু পা রাখলেন বাংলা কল্পবিজ্ঞান কাহিনির আসরে। ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হল শঙ্কু সিরিজের প্রথম কাহিনি ‘ব্যোমযাত্রীর ডায়েরি’। সেই শুরু, শেষ হল একেবারে ১৯৯২ তে গিয়ে। ১৯৬১ থেকে ১৯৯২; এই ৩১ বছরে শঙ্কু সিরিজের ৩৮ টি সম্পূর্ণ এবং দুটি অসম্পূর্ণ গল্প বিরতিহীন ভাবে লিখেছেন সত্যজিৎ।
গিরিডির অপ্রতিদ্বন্দ্বী চিকিৎসক ত্রিপুরেশ্বর শঙ্কুর একমাত্র সন্তান এই আত্মভোলা, সৎ, নির্লোভ বিজ্ঞানী মানুষটি কিন্তু রক্তমাংসে একেবারে খাঁটি বাঙালি। স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করার পর তাঁকে পড়াশোনার জন্য যেতে হয় কলকাতায়। ছাত্র হিসেবে প্রথম থেকে অসম্ভব ব্রিলিয়ান্ট তিলুকে কোনদিনই সেকেন্ড হতে হয়নি ক্লাসে। বারো বছর বয়সে মেট্রিক, চোদ্দো বছর বয়সে আইএসসি, এবং ষোলো বছর বয়সে ফিজিক্স-কেমিস্ট্রিতে ডাবল অনার্স নিয়ে বিএসসি পাস। ডক্টরেট পেয়েছেন ব্রাজিলের রটানটান ইন্সটিটিউশন থেকে। মাত্র কুড়ি বছর বয়সে কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান। তবে কলকাতাতে কর্মক্ষেত্র হলেও বিহারের গিরিডিতে ছিল তাঁর গবেষণা কেন্দ্র। বিয়ে-থা করেননি। সাংসারিক জীবনে পোষ্য বেড়াল ‘নিউটন’ আর চাকর প্রহ্লাদ-ই তার বিশ্বস্ত সঙ্গী। আর ছিলেন ভুল ইংরেজি বলা কাঁচা-মিঠে প্রতিবেশী-বন্ধু অবিনাশবাবু এবং হিতাকাঙ্ক্ষী নকু্ড়বাবু।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী-মহলে সাড়া ফেলে দেওয়া শঙ্কুর আবিষ্কারের তালিকাটি বেশ দীর্ঘ (গল্প থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী তাঁর মোট আবিষ্কারের সংখ্যা ৭২)। কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ ‘সুইডস একাডেমি অফ সায়েন্স’ থেকে তিনি বিশেষ সম্মান লাভ করেছেন। তৈরি করেছেন---------সমনোলিন (ঘুমের অব্যর্থ ওষুধ), এয়ারকন্ডিশনিং পিল (এমন এক প্রকার ওষুধ যা জিভের তলায় রাখলে শরীর শীতকালে গরম আর গরম কালে ঠাণ্ডা থাকে), রিমেমব্রেন (লুপ্ত স্মৃতি ফিরিয়ে আনার ওষুধ), মিরাকিউরল (প্রায় সর্বরোগ-নাশক ওষুধ), ইন্ডিয়া-বটিকা এবং ফিশ-ফিল এর মতো খাদ্য পরিপূরক ওষুধ; স্নাফ-গান (পিস্তলের মত দেখতে একপ্রকার হাঁচিয়ে দেওয়ার যন্ত্র), আনাইহিলিন পিস্তল (এমন একপ্রকার পিস্তল যা শত্রুকে নিহত না করে নিশ্চিহ্ন করে), অমনিস্কোপ, মাইক্রোসোনোগ্রাফ, ইন্টেলেক্ট্রন (বুদ্ধি মাপার যন্ত্র), লুমিনিম্যাক্স (অতি সস্তায় উজ্জ্বল আলো দেবার যন্ত্র), লিঙ্গুয়াগ্রাফ (অচেনা ভাষা ইংরেজিতে অনুবাদ করার যন্ত্র), পাখিকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য অরনিথন-এর মতো যন্ত্র। আর রবু এবং বিধুশেখর নামের দুটি যন্ত্র মানব বা রোবট, সাথে কম্পু নামের একটি কম্পিউটার। জানেন ৬৯ টি ভাষা। গেছেন পৃথিবীর নানাদেশে, নানা দুর্গম প্রান্তে; সমুদ্রের তলদেশে, এমনকি মঙ্গল গ্রহেও।
আমরা মাছে-ভাতে লালিত আর দুপুরে ভাত-ঘুম দেওয়া বাঙালি; এর আগে এত বুদ্ধিমান-অ্যাডভেঞ্চাচারাস চরিত্রর সামনাসামনি করিনি।
শুধু প্রফেসর শঙ্কু নয়, সত্যজিৎ রায় ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’ গল্পে আমদানি করলেন এক ভিনগ্রহের নিরামিষাশী এলিয়েনকে। নাম অ্যাং, বয়স আটশো তেত্রিশ। এসেছে ক্রেসিয়ান গ্রহ থেকে। ঘটনাচক্রে তার পরিচয় হয় কাঁকুড়গাছি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক অতি-নিরীহ বঙ্কুবাবুর সাথে। ফিরে যাওয়ার সময় সহজ-সরল-ভিতু বঙ্কু বাবুকে সে দিয়ে যায় জীবনের পাঠ। বলে----- ‘তোমার দোষ হচ্ছে যে তুমি অতিরিক্ত নিরীহ, তাই তুমি জীবনে উন্নতি করনি। অন্যায়ের প্রতিবাদ না করা বা নীরবে সহ্য করা এসব শুধু মানুষ কেন, কোনও প্রাণীরই শোভা পায় না।’ এর পর থেকে বদলে যায় বঙ্কু বাবুর জীবনদর্শন। এ শুধু বঙ্কুবাবুর নয়, আমাদেরও চোখ খুলে দেওয়ার পাঠ।
এছাড়াও সত্যজিৎ লিখেছিলেন ‘ট্যারোড্যাক্টাইলের ডিম’ (টাইম ট্রাভেলের উপর ভিত্তি করে লেখা), ‘অনুকূল’, ‘প্রোফেসর হিজিবিজবিজ’, ‘সেপ্টোপাসের খিদে’র মতো কল্পবিজ্ঞানের গল্পগুলি।
লেখার পাশাপাশি সত্যজিৎ নিজের হাতে আঁকলেন কল্পবিজ্ঞান-কাহিনিগুলির ছবি। ফলে গল্পের আকর্ষণ আরও বেড়ে গেল। সবক্ষেত্রেই প্রায় সাধারণ কালি-কলম ব্যবহার করে সাদা-কালোতে ছবি আঁকলেন, কখনো বা করলেন শুধুই পেন্সিল স্কেচ। দামি রং নয়, খুব নগণ্য উপকরণ ব্যবহার করেই সত্যজিৎ নিজের হাতে প্রোফেসর শঙ্কুর রূপ দিলেন --- টাঁক মাথা, এক মুখ দাঁড়ি, চোখে চশমা। সেই সাথে শঙ্কুর গবেষণাগার, মঙ্গল গ্রহ অভিযান, শঙ্কুর জীবনের নানান রোমাঞ্চকর মুহূর্ত, শঙ্কুর তৈরি রোবট, মহাকাশযান, বেড়াল নিউটন, আনুসঙ্গিক আরও ঘটনা প্রাণ পেল রেখাচিত্রে। ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’ গল্পে ভিনগ্রহী ‘অ্যাং’-এর রূপ তুলে ধরলেন পাঠকদের সামনে। বলতে দ্বিধা নেই বেশ দ্রুত গতিতে আঁকা কমিক-ট্রিপ বা ইলাস্ট্রেশনের ধাঁচের এই সাদা-কালো স্কেচ বা রেখাচিত্রগুলি বৈজ্ঞানিক রহস্যময়-রোমাঞ্চকর পরিবেশকে ভীষণ ভাবে জীবন্ত করে তুলল। তাই এগুলি কেবল গল্পের চিত্র-রূপ নয়, সত্যজিৎ রায়ের কল্পবিজ্ঞান জগতের ভিসুয়াল ডায়েরিও বটে।
পরিশেষে সত্যজিৎ রায়ের হাতে আঁকা কয়েকটি ছবি:
'শঙ্কুর অভিযান’ গল্পে দেখতে পাওয়া গেল একটি ভয়ংকর হিংস্র টির্যানোসরাস রেক্স (ডাইনোসরের সবচেয়ে হিংস্র প্রজাতি)।
‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’ গল্পে ভিন গ্রহ থেকে আসা
এলিয়েন ‘অ্যাং’
0 Comments