কবি অরুণ দাসের প্রেমের চিঠি
দীপশ্রী সেনগুপ্ত
বিনা অনুমতিতে অন্যের প্রেমের চিঠি পড়া সমাজ অনুমোদিত নয়, তবে অনুমতি পাওয়া গেছে, তাই 'চূর্ণী কে লেখা চিঠি' দ্বিধাহীন ভাবে পড়ে ফেললাম। নিজের মনে কবিতা পড়তে যে আনন্দ, আলোচনা করতে বসলে পুরোপুরি সেটা আর থাকেনা; তবে এই মত একান্ত ব্যক্তিগত।
পড়তে বসে মনে হয়েছে এখানে শব্দের শরীরী প্রেমের উত্তরণ হয়েছে রহস্যাবৃত গভীর প্রেমের অনুভূতিতে। শব্দের বর্ণমালা রাত্রির নিভৃতে চোখের জলে মুছতে চেয়ে হয়ে উঠেছে কবিতা। প্রকৃতির সব সৌন্দর্য, বিষণ্ণতা নিয়ে প্রেমিক গড়েছে মানস প্রতিমা; জ্যোৎস্নায়, শিশিরে, মেঘে, গাছের পাতায়, উচ্ছল ঝর্ণায় এই নির্মিতি। প্রেমিকের দৃঢ় বিশ্বাস দীর্ঘ চড়াই উৎরাই পেরিয়ে পরিশ্রম-ক্লান্ত সূর্য সন্ধ্যায় ঘরে ফিরবেই। অবশেষে প্রত্যয়ী প্রেমের স্বীকারোক্তির নির্মিতি রক্তেই, তাই অব্যাহতি নেই।
হৃদয়ের ডায়েরিতে লেখা আছে শরীরী বিভঙ্গের মধুর স্মৃতি । প্রকৃতি আর মানুষ এখানে যেন একাকার হয়ে গেছে। তাই ' নগ্ন নির্জন শরীর জুড়ে অগুনতি চাঁদের চাদর ', তাই চূর্ণীকে ছুঁয়ে 'এক ডুব জংলী কথা '। কবিতার প্রত্যেক লাইনে শব্দ, বর্ণ , স্পর্শকে ছুঁয়ে কোন অতীন্দ্রিয় লোকে গভীর বিচরণ, পড়তে পড়তে অন্তর্লোকে লুকিয়ে থাকা সেই সব স্বপ্নের সন্ধানে ডুবতে চাওয়া মন হঠাৎ ভেসে উঠে উদাস-উধাও।
পরতে পরতে বিন্যাস শেষে উপলব্ধি -' শুধু স্পর্শে নয়, অনুভবেও ভালোবাসা হয় '। ভালোবাসা তো অনুভবেরই কবি, স্পর্শে সে মোহ আবরণ ভেঙে খানখান।
'শরীর মানে পোশাকী সফর'।ভগবদ্গীতার আভাস ? এক শরীর ছেড়ে নিশ্চিন্তে ঘুরে আসা আরেক শরীর? তাই জীবন মরণের খেলায় শতাব্দীর পর শতাব্দী পথ পার হয়ে জাতক নিজের কাছে ধরা দেয়। বারবার জীবন আর মৃত্যুর খেলায় সে বীতস্পৃহ ।
স্মৃতিচারণায় অনিবার্য ভাবে এসেছে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত চূর্ণীর সাথে শরীরী খেলায় অবগাহন শেষে কোনো রহস্যময় পরমলোকে উত্তরণ। 'আগুন ছুঁয়ে যাওয়া কুমারী রোদে' চূর্ণীর কপালে সূর্য -টিকা। কবির উপলব্ধি, ভালোবাসা তুমুল বৃষ্টি রাতে পা ফেলা অন্ধকার পথের স্মৃতি , সে পথে বুনো পাতার মর্মরিত রাতযাপন । প্রকৃতি ও পুরুষের এ এক চিরন্তন সংলগ্নতা, কবিতার ছত্রে ছত্রে তার ইশারা, কখনো সুস্পষ্ট স্বীকারোক্তি। দিনরাত উথাল পাতাল করা তুমুল শব্দহীন , অনুভূত ভালোবাসার সফর শেষে পরম প্রাপ্তি পাঠকের, কবিরও । "উচ্ছাসে ভরে যায় অক্ষর। সূর্যোদয় শেখে কুয়াশা মাখা শূন্য মাঠ। লিখে রাখে নিঝুম গান। বর্ণমালা শেখে অলৌকিক প্রাণ।"
বর্ণমালার প্রত্যেক অক্ষরে এ এক অপূর্ব ভালোবাসার, আত্মনিবেদনের আরতি। শব্দ, বর্ণ, গন্ধ, স্পর্শের জাগতিক সংসারকে ছুঁয়ে থেকেই উড়ন্ত ডানার অবিরাম পথচলা। ক্লান্তিহীন, বিরতিহীন ক্ষর জগতের পারে, অক্ষর জগতের দিকে।
0 Comments