ঘুমিয়ে গেছে গানের পাখি
৪২ পর্ব
চিত্রা ভট্টাচার্য্য
কবি নজরুলের জীবনের শেষ অধ্যায়
'এত সুর আর এত গান যদি কোনো দিন থেমে যায় ' সেইদিন তুমি ও তো ওগো জানি ভুলে যাবে যে আমায় ' একালের শিল্পীর কণ্ঠের মর্মস্পর্শী গান বাতাসে ধ্বনিত হয়ে ওঠে --- সেই সুরের জাদুকর নজরুলের উদাত্ত গলায় এত সুর এত কথা এত গান থেমে যাওয়া ---অসময়ে চিরতরে সব স্তদ্ধ হয়ে যাওয়ার করুণ কাহিনি মন কে এমনি ভারাক্রান্ত করে তোলে । নজরুলের জীবনের শেষের পর্বে ' এসে আজ লিখতে বসেছি আমার ঘুমিয়ে গেছে গানের পাখির গানের পালা হঠাৎ কেমন থেমে গিয়েছিল।
কবি সয়েছিলেন নির্মম নিষ্ঠুর বাস্তবের,ইহ জগতের একরাশ বঞ্চনা অপমান অসহনীয় দুঃখ ব্যথা। এই পৃথিবীর মানুষ প্রাণ ঢেলে ভালবাসার পরিবর্তে একরাশ অভিমানের বোঝা বুকে বয়ে চিরতরে কবরের মাটিতে বিলীন হলো মরমী প্রেমিক কবি।
কিন্তু এই প্রজন্মের সংগীত কাব্য প্রেমী মানুষ সেই অনুপম স্রষ্টার মহান কীর্তি সত্যিই কখনো ভোলেনি।বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ কবি কে আগামী কয়েক শতাব্দীতে ও হয়তো বাঙালি ভুলতে পারবে না। কারণ কবির অনন্য সেই রাশিরাশি সৃষ্টির লয় নেই ক্ষয় নেই ,সে যে চিরঅমলিন অক্ষয় অব্যয়।
বাস্তবের এই মানবজীবন অমর নয়। কিন্তু তার অনুপম কীর্তি কাব্যধারা ,গজল রাগ রাগিনী সুর সংগীত লয় তাল ছন্দ ! সব তাঁর বাঙময় সৃষ্টির উজ্জ্বল দলিল অমরত্বের দাবি রাখে । যে নজরুল সুগঠিত দেহ, অপরিমেয় স্বাস্থ্য ও প্রাণখোলা হাসির উদ্দাত্ত কণ্ঠস্বরের জন্য বিখ্যাত ছিলেন, ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নিলেন।
তবে অনায়াসে বলা যায় এই মহাপ্রয়ানের অনেক আগেই ১৯৪২সালে আকস্মিকভাবে কাব্য ও সুরলোক থেকে তাঁর মানস মৃত্যু ঘটেছিল।
🍂
তাঁর যে কবিতা,ও গান একদিন আপামর জনগণ কে দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ করেছিল যা এখনো বীরত্বপূর্ণ ও নিঃস্বার্থ কাজে আত্মনিয়োগ করতে কোটিকোটি মানুষকে প্রাণিত করে। তাঁর এই অবর্ণনীয় চরম পরিণতিতে মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে ।কলকলরোলে সমৃদ্ধ কবি সুদীর্ঘ ৩৪টি বছর সাহিত্যকর্ম থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকলেন নির্বাক বোধবুদ্ধিহীন জড়পদার্থের মত। স্থবিরের মত শুধু ভাষা হারা চোখে তাকিয়ে রইলেন।
দীর্ঘ দশ বছর , ১৯৪২থেকে ৫২সাল পর্যন্ত -এই নিপুন সুরের জাদুকরের সময় কাটে এঁদো ঘরের কোণে একাকী নীরব শয্যায় পড়ে থেকে প্রায় বিনা চিকিৎসায় । যে কণ্ঠ একসময় ব্রিটিশ রাজের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল ভিতে কাঁপন তুলেছিল, সেই কণ্ঠ আজ নীরব বাণী সংগীতহারা। নজরুলের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডির সময় অতিবাহিত হয়ে চলেছে কিন্তু কেউ খবর রাখেনি কেউ আসেনি আন্তরিক সুহৃদ হয়ে রোগগ্রস্থের পাশে। এমনকি তাঁর নিকটাত্মীয়রা ও তাঁর চিকিৎসার ব্যাপারে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিলেন না। শুধু পাশে পক্ষাঘাতে পঙ্গু অসুস্থ স্ত্রী প্রমীলাদেবীই একমাত্র সহায় সেবিকা।যখন কবি সুস্থ ছিলেন তখন তাঁকে ঘিরে থাকত বিশাল বন্ধুবৃত্তের আড্ডা গানের সাথে চায়ের আসরে নজরুলের উপস্থিতি ছিল বাধ্যতামূলক। কিন্তু কবির দুর্দিনে সেই ‘সুসময়ের বন্ধুরা’ সবাই ছেড়ে চলে গেছে। বিনা চিকিৎসায় ভাষাহীন চোখে চেয়ে থাকেন বোধ বাকশক্তি হীন কবি।
দীর্ঘ এক দশকের অবহেলার পর ড;শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর উদ্যোগে চিকিৎসার সুযোগ পাওয়া গেলেও রোগীর আরোগ্য লাভের ক্ষেত্রে সে অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে। সময়মত যথাযথ চিকিৎসা হলে হয়তো কবি সুস্থ হয়ে উঠতেন। ভারতের স্বাধীনতার পর ‘নজরুল চিকিৎসা কমিটি’ গঠিত হলে সংগৃহীত অর্থে ১৯৫৩ সালে প্রমীলাদেবী সহ কবি কে চিকিৎসার জন্য লন্ডন ও ভিয়েনায় পাঠানো হলে ও বিদেশের বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করে স্পষ্ট বলে দেন, এক দুরারোগ্য মস্তিষ্কের ব্যাধিতে কবি ভুগছেন। যে রোগ থেকে নিষ্কৃতি বা মুক্তি পাওয়া অসম্ভব। ব্যর্থ মনোরথ হয়ে কবি কে সাত মাস পরে দেশে ফিরিয়ে আনাহলে অসুস্থ প্রমীলা দেবীও দারিদ্র্য ও একের পর এক দৈহিক ধকল হতাশায় কঙ্কালসার শরীর নিয়ে আরো ভেঙে পড়লেন। ১৯৬২ সালে প্রমীলা দেবীর মৃত্যুর পর কবির অস্থিরতা ছিল অবর্ণনীয়। স্ত্রীর বিছানার শূন্য জায়গায় হাত চাপড়াতেন আর নিঃশব্দে কাঁদতেন। প্রমীলার প্রতি নজরুলের এই ভালোবাসা পৃথিবীর যেকোনো প্রেমের উপাখ্যানকে হার মানায়।
একটি দিনের ঘটনা , কাজী সব্যসাচীর সাথে অটোগ্রাফ শিকারী এসেছে কবি নজরুল কে সই দিতে বলা হলে তিনি ফ্যাল ফ্যাল করে তাঁর দিকে তাকালেন। কিছুই বুঝতে পারছেন না তাকে কি করতে বলা হচ্ছে। সব্যসাচী তাঁর হাতে জোর করে কাগজ কলম গুঁজে দিয়ে সই করতে বললে নজরুল কাঁপাকাঁপা হাতে কাগজ কলম নিয়ে অনেক ক্ষণ ধরে আঁকাবাঁকা অক্ষরে নিজের নাম লেখেননি; বরং লিখেছেন “প্রমীলা দেবী ইসলাম”। নিজের অস্তিত্ব ভুলে গেলেও প্রিয়তমা স্ত্রীর নাম তিনি ভোলেননি। (নজরুল জীবনের শেষ পর্যায় / বাঁধন সেনগুপ্ত, পশ্চিমবঙ্গ পত্রিকা)
নজরুলজীবনী কারদের মতে কবির শেষের বেলায় তাঁর দুই ছেলে কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধর ভূমিকা নিয়ে ও অনেক বিতর্ক রয়েছে। সরাসরি অভিযোগ উঠেছে যে, নজরুলের রয়্যালটির মোটা অঙ্কের টাকা তাঁদের হাতে আসত, কিন্তু কবির সুচিকিৎসার চেয়ে বিলাসিতা বা আমোদ-প্রমোদেই সেই টাকা বেশি খরচ হতো। এখানে চাঞ্চল্যকর তথ্য টি হলো যে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের আগে পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার নজরুলের নামে মোটা অঙ্কের ভাতা পাঠাত। কেন পাকিস্তান সরকার এই টাকা দিত আর ভারত সরকারই বা কেন তা অনুমোদন করত, তার কোনো সঠিক ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায়নি।তবে ১৯৭১ সালে নজরুলের ছেলেরা সেই টাকা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান।' কিন্তু পাঠক মনে প্রশ্ন থেকেই যায় কারণ এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক এবং মানবিকপ্রশ্ন গুলো নিয়ে কখনোই কোনো নতুন আলোচনা বা গবেষণার প্রমান পাওয়া যায়নি।
এরপরে ১৯৭১ সালে ইতিহাসের পট পরিবর্তনে বাংলাদেশ স্বাধীনতা পেলেও সে দেশের রাষ্ট্রিক পরিস্থিতি তখন গিরগিটির চেয়েও দ্রুত রং বদলাচ্ছিল। শুরু থেকেই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির স্বীকার ছিল এই স্বাধীন রাষ্ট্র টি। সেনাবাহিনীর একাংশের ক্ষমতার লোভ আর পাকসমর্থনের চোরাস্রোতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র মিলেমিশে চূড়ান্ত অশান্ত করে রেখেছিল বাংলাদেশের রাজনীতিকে।
নজরুল জীবনীকারদের প্রদত্ত তথ্য থেকে জানা গেল ,১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে নজরুলকে স্বাধীন বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। তাঁকে দেওয়া হয় ‘জাতীয় কবি’র মর্যাদা। ১৯৭২ সালের ২৪ মে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে কবিকে আমন্ত্রণ করে আনাহলো ঢাকায়। জীবনের শেষ চারবছর কবি এখানেই ছিলেন। নজরুলসংগীতশিল্পী প্রয়াত ধীরেন বসু কবির সম্বন্ধে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, '' ঢাকায় কবির ৭৩ তম জন্মবার্ষিকীতে আমন্ত্রিত শিল্পী হিসেবে কাজী সব্যসাচী, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, কল্যাণী কাজী, ধীরেন বসু সবাই কবিকে মাল্যদান করতে গেছেন, কিন্তু কবি কিছুতেই মাথা তুলছেন না। এমতাবস্থায় কাজী সব্যসাচী ধীরেন বসুকে বললেন, ‘ধীরেন তোমার গাওয়া সেই গানটি ধরো।’ হারমোনিয়াম টেনে নিয়ে ধীরেন বসু গাইলেন, ‘ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি।’ গান শেষ হলো, কবি মাথা তুলে সবাইকে দেখলেন, মাল্যদানের পালা শেষ হলো।"
প্রত্যক্ষদর্শীর এক সংবাদ পরিবেশনকারী সংস্থা থেকে জানা যায় সেদিন ১৯৭২ সালের ২৪ মে নজরুলের তিয়াত্তরতম জন্মদিনের ঠিক আগের দিন ভারত সরকারের বিশেষ অনুমতি নিয়ে সম্পূর্ণ বোধরহিত, কার্যত নিশ্চেতন কবিকে বাংলাদেশ সরকার বিপুল সমারোহে ঢাকায় নিয়ে আসে। বিমানবন্দরে কয়েক লক্ষ অনুরাগীর প্রবল উচ্ছ্বাস, রাজকীয় সংবর্ধনা, বিলাসবহুল বাসভবন, স্বাচ্ছন্দ্যের সতর্ক আয়োজন - এসব কিছুই তিনি টের পাবার অবস্থায় ছিলেন না। ডঃ নুরুল ইসলাম, ডঃ ইউসুফ আলির মতো সে সময়ের ঢাকার শ্রেষ্ঠ চিকিৎসকদের নিয়ে গড়া চার সদস্যের একটি মেডিক্যাল বোর্ড নজরুলের স্বাস্থ্য বিষয়ে সদাসতর্ক ছিল। পরের বছর তাঁকে কলকাতায় ফিরিয়ে দেবার কথা ছিল। কিন্তু কোনও কারণে বাংলাদেশ সরকার সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার কথা ভাবেননি। বাংলাদেশে কবিকে নিয়ে এই অভূতপূর্ব উন্মাদনা ও সম্মান দেখে ভারত সরকারের ও কোনো উদ্যোগ ছিলনা কবি কে ফেরানোর। কবির পরিবার ও ছিল নির্লিপ্ত।' ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয় এবং ২১ ফেব্রুয়ারি তাঁকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান একুশে পদকে ভূষিত করা হয়েছিল। ''
ইতিহাসে প্রমাণিত ,১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিব আর তাঁর পরিবারকে গুপ্তঘাতকেরা রাতের অন্ধকারে হত্যা করার পর জিয়াউর রহমানের সেখানে সন্ত্রাসের শাসন শুরুহয়, আর সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে ঘুরে যায় কবির ভাগ্যলিপিও। শুরুতে ধানমন্ডির এক বিশাল দোতলা বাড়িতে তাঁকে রাখা হয়েছিল। নজরুলের আগমনে সারা দেশ জুড়ে বিশাল উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল, কিন্তু অভিযোগ ওঠে যে, সেই সময়ে নজরুলকে মানুষের কাছে একটি ‘শোপিস’ বা প্রদর্শনীর বস্তু হিসেবে তুলে ধরা হতো। ক্রমশঃ মানুষের আগ্রহ ক্ষীণতর হলো কারণ তারা যে দেখতে চায় ' প্রতাপ শালী রাজকীয় চেহারার বিদ্রোহী বীর নজরুল কে। তার পরিবর্তে এই মূকবধির জড় পদার্থের মত বৃদ্ধ নজরুল কে দেখতে চায় না । এরপর কবিকে সেই দোতলা বাড়ি থেকে সরিয়ে অপেক্ষাকৃত একটি ছোট এবং কম সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন বাড়িতে স্থানান্তর করা হয়।
অসুস্থতার দোহাই তুলে কবিকে হঠাৎ স্থানান্তরিত করা হয় সরকারি হাসপাতালে। শোনা যায়, অসুস্থতার সেরকম কোনও লক্ষণ নাকি সেবক ও পরিচর্যাকারীদের চোখে ধরা পড়েনি। জড়বৎ মানুষটিকে হাসপাতালের অপরিসর কেবিনে এনে সিল করে দেওয়া হয় তাঁর সরকারি বাসভবনটিকে। আচমকা এই অভ্যেস-বদলে নজরুলের শারীরিক বিপর্যয় অনেকটা বেড়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, নজরুল সেই বড় বাড়িটি ছেড়ে যেতে চাননি; তিনি সিঁড়ির রেলিং আঁকড়ে ধরে অব্যক্ত প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। এর কিছুদিন পরই ১৯৭৬ সালে ৭৭ বছর বয়সে এই মহান কবির মহাপ্রয়াণ ঘটে। চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে থাকলেও ক্রমশ অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে।তারপর জীর্ণ শরীরটাকে আক্রমণ করে জ্বর ও নিউমোনিয়ার মতো সংক্রমণ।
'' নজরুল প্রমীলার শেষ ইচ্ছার ও অপমৃত্যু ঘটেছিল স্বার্থান্ধ কিছু রাজনীতি ব্যক্তিত্বের হীন চক্রান্তে। যদিও তিনি গানে লিখেছিলেন “মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই”। তাঁর সেই ইচ্ছা পূরণ হলেও আরেকটি মানসিক আকুতি অপূর্ণ থেকে গেছে। নজরুলের অন্তিম ইচ্ছে ছিল মৃত্যুর পর তাঁকে যেন তাঁর স্ত্রীর পাশে সমাধিস্থ করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, প্রমীলা দেবীর সমাধি ভারতের চুরুলিয়ায় আর নজরুলের সমাধি বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে। রাজনীতির কাঁটাতার আর ভৌগোলিক সীমারেখা দুই চিরন্তন প্রেমিককে মৃত্যুর পর আর এক হতে দেয়নি। "
" আমাদের ঋণ ও দায়বদ্ধতা কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জন্য যা রেখে গেছেন, তার বিনিময়ে আমরা তাঁকে কেবল ‘অবহেলার বিষ’ দিয়েছি। তাঁর শেষ জীবনের করুণ দৃশ্যগুলো আমাদের জাতীয় লজ্জা। বাঙালি জাতি হিসেবে আমরা আজ বর্তমান নিয়ে এতটাই মশগুল যে, ইতিহাসের কারিগরদের কষ্টার্জিত জীবনগাথা আমাদের স্পর্শ করে না। নজরুলের জীবন আমাদের শেখায় যে, প্রতিভার কদর আমরা দিতে পারলেও, মানুষের কদর দিতে বারবার ব্যর্থ হই। নজরুল বেঁচে থাকবেন তাঁর বিদ্রোহে, তাঁর প্রেমে। কিন্তু তাঁর শেষ জীবনের এই অব্যক্ত বেদনাগুলো ইতিহাসের পাতায় এক একটি জ্বলন্ত প্রশ্ন হয়ে চিরকাল ঝুলে থাকবে। '' (ইত্তেফাক সাময়িকীতে প্রকাশিত) .
''১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট রবিবার, সকাল দশটা দশ মিনিটে কবির জীবন্মৃত দেহটিকে এসে অধিকার করে নেয় মৃত্যু। বেঁচে থাকতে জিয়াউর- সরকার ফিরে তাকায়নি। কিন্তু কবির মরদেহকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জ্ঞাপনে আড়ম্বরের ত্রুটি রাখা হল না। কবিকে ঘিরে লক্ষলক্ষ অনুরাগীর আবেগকে নিজেদের অনুকূলে ব্যবহার করে নেবার সুযোগ ছাড়লেন না রাষ্ট্রনেতারা। তাঁকে তাঁর জন্মভূমি বা জন্মভিটেয় ফিরিয়ে দেবার কথা ভাবার প্রয়োজনবোধই করল না বাংলাদেশ সরকার। ''
বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনারের অফিস থেকে নজরুলের প্রয়াণের খবর পেয়ে তাঁর পুত্র কাজী সব্যসাচী ও পুত্রবধূ কল্যাণীদেবী ঢাকায় পৌঁছানোর আগেই নজরুলের শবাধারের ওপর মাটি চাপা দিয়ে কবির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া তড়িঘড়ি শেষ করে দিলে সেখানে পৌঁছে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন ক্রুদ্ধ, শোকার্ত সব্যসাচী। তিনি শুধু বিফল মনোরথ হয়ে কবরের থেকে এক মুঠো মাটি নিয়ে কলকাতায় ফিরে এসে মায়ের সমাধির পাশে ছড়িয়ে দিলেন।ন।জীবিত অবস্থায় বহু মানুষ, বহু প্রতিষ্ঠান নজরুলকে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির কাজে ব্যবহার করেছে। মৃত্যুর দিনেও অভিশাপ থেকে কবি মুক্তি পেলেন না। উপরন্তু জীবনের শেষ কয়েকটা বছর রাজনৈতিক পাকেচক্রে লাঞ্ছিত হতে হয় তাঁর চেতনাহীন জীর্ণ শরীরটিকে। সেই অপমান গায়ে মেখেই কবি চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণের মসজিদ-সংলগ্ন কবরস্থানে। আমাদের সম্বল শুধু অন্নদাশঙ্কর রায়ের কবিতার অসহায় বিষণ্ণতা - “কেউ জানল না ইতিহাসে ফের ভুল হয়ে গেল বিলকুল এতকাল পরে ধর্মের নামে ভাগ হয়ে গেল নজরুল।”
ঋণ : ১) অরুণকুমার বসু/ নজরুল জীবনী/ আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।
0 Comments