বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১২৫
কারি পাতা
ভাস্করব্রত পতি
রান্নাশালের রাজা রাণীদের কাছে এই উদ্ভিদটি অতিশয় প্রিয় উপাদান। খাবারের স্বাদ, গন্ধ এবং গুণমান বৃদ্ধিতে কারি পাতার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কোনও কথা হবে না। এই সুগন্ধি ইউরোপিয়ান উদ্ভিদটি হেঁসেলে সবসময়ই থাকে হাসিমুখেই। রাঁধুনিদের কাছে এটি হল মিস্টি নিম।
খ্রিস্টীয় প্রথম এবং চতুর্থ শতাব্দীতে তামিল সাহিত্যে এই পাতার বহুল ব্যবহারের তথ্য মেলে। প্রাচীনকালে এতদঞ্চলের সঙ্গে ইংল্যান্ডের বিশাল পরিমাণ মশলার বেচাকেনা চলত। ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দিকে এই কারি পাতার প্রচলন বাড়ে ইংল্যান্ডে। এখন সারা বিশ্বে এই পাতার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।
কচি কারি পাতা
ক্যারোলাস লিনিয়াস ১৭৬৭ সালে এটির সম্পর্কে উল্লেখ করেছিলেন প্রথম। দক্ষিণ চিন, ভারত সহ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এর বেড়ে ওঠা। যদিও এটির বৃদ্ধি পরবর্তীতে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া এবং অষ্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় সম্প্রসারিত হয়েছে।
রান্নার কাজে এই সুগন্ধি কারি পাতাই প্রয়োজন
কারি বা Curry হল মশলাদার তরকারি। কিন্তু গবেষকদের অনুমান, এই 'কারি' শব্দটি এসেছে তামিল শব্দ 'কারি' ('মশলাদার সস' বা 'মাংস') থেকে। দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন রেসিপিতে যথেচ্ছভাবে কারি পাতার ব্যবহার দেখা যায়। যা কিনা খাদ্যের স্বাদ বাড়িয়ে আমাদের স্বাদকোরককে তৃপ্তি দেয়। কারি পাতাকে হিন্দি ও উর্দুতে কারি পাতা, কাটনিম, বারসাঙ্গা, কারেপাকু, কন্নড়ে কারি বেভু, বিভারে, তামিলে কারুভেপ্পিলাই, তেলুগুতে কারেপাকু, কারিভেপাকু, মালয়লামে কারুভেপ্পু, কারিভেপু, কারিভেপিলা, ভেপ্পিলা, ওড়িয়াতে বরসান, মিরসিঙ পত্র, ভুরসুঙ্গা, ভেরসিঙ্গা, মারাঠীতে কারিপাত্তা, খাদিলিম্ব বলে।
কারি পাতার ফল
Rutaceae পরিবারের কারি পাতার বিজ্ঞানসম্মত নাম Murraya koenigii। এই Murraya নামটি এসেছে জোহান আন্দ্রেয়াস মারে (১৭৪০ - ১৭৯১) এর নাম থেকে। তিনি ক্যারোলাস লিনিয়াসের অধীনে থেকে উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। এবং পরবর্তীতে জার্মানির University of Gottinge থেকে ভেষজ উদ্ভিদের প্রতি আগ্রহী একজন চিকিৎসা বিজ্ঞানের অধ্যাপক হয়েছিলেন। আর koenigii নামটি এসেছে আর এক উদ্ভিদবিজ্ঞানী জোহান গেরহার্ড কোনিগের নাম থেকে। এছাড়াও আরও যেসব প্রজাতির কারি পাতা পাই --
Bergera koenigii
Camunium koenigii
Chalcas koenigii
Bergera siamensis
Chalcas siamensis
Murraya siamensis
Nimbo melioides
এটি খুব একটা বড় গাছ নয়। মোটামুটি ছোট থেকে মাঝারি ধরনের ক্রান্তীয় গাছ। এর উচ্চতা ৪-৬ মিটার (১৩-২০ ফুট) পর্যন্ত হয়। কখনও কখনও ২৬-৩৩ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। কারি পাতার ফুলগুলি ছোট, সাদা এবং সুগন্ধী হয়। এই ফুলগুলির স্বপরাগায়ন ঘটে। যার ফলে ছোট চকচকে কালো ড্রুপ জাতীয় ফল জন্মায়। ফলের মধ্যে একটিই মাত্র বড় অঙ্কুরোদগমক্ষম বীজ থাকে।
কারি পাতার ফুল
এই গাছের মূল বৈশিষ্ট্য এদের পাতা। অনেকটা ঠিক নিম পাতার মতো গড়ন। কিন্তু এতে বেশ সুগন্ধ পাওয়া যায়। পক্ষল। যাতে ১১-২১ টি পত্রক সাজানো থাকে। রান্নার কাজে পাতাই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। কারি গাছের মধ্যে রয়েছে সিনামালডিহাইড এবং অসংখ্য কার্বাজোল অ্যালকালয়েড তথা মহানিম্বিন, গিরিনিমবিন এবং মহানিন। কারি পাতার সুগন্ধ গুণের পেছনে এর মধ্যে থাকা রজন গন্ধযুক্ত α পিনিন, ইউক্যালিপটল, সাইট্রাস গন্ধযুক্ত লিনালুল, যৌগ সালফার গন্ধযুক্ত 1ফেনাইলইথানেথিওল, ঘাস গন্ধযুক্ত সিস 3 হেক্সেনাল, মেথিওনাল, মাইরসিন, সিস 3 হেক্সেন 1 অল এবং ট্রান্স, সিস 2, 6 নোনাডিয়েনালের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
0 Comments