প্রসেনজিৎ রায়
‘শিশুসাহিত্য’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । ১৩০১ বঙ্গাব্দে তাঁর ‘মেয়েলি ছড়া’ প্রবন্ধে প্রথমবার এই শব্দটির ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায় । শিশুদের কল্পনা ও জ্ঞানের জগৎ সাহিত্যের আঙ্গিনাতেই পল্লবিত হওয়ার সুযোগ পায় সবচেয়ে বেশি। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ও সুকুমার রায়-এর সার্থক উত্তরসূরী সত্যজিৎ শিশুসাহিত্যের সৃষ্টিতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে ওঠেন, হয়ে ওঠেন বাঙলা ভাষা ও বাঙালীর গর্ব।
গোয়েন্দা ফেলুদা যদি তাঁর সৃষ্টির সৌরজগতে বৃহস্পতি গ্রহের জায়গা পান, প্রফেসর শঙ্কুও কাছাকাছি শনিগ্রহের মর্যাদা পাবেন। পাঠকপ্রিয়তায়, সার্বিক আকর্ষণে সমসাময়িক বাঙালী শিশু-কিশোরদের মনের দখল নিয়েছিল চরিত্রদুটি। সেই দখলের প্রাবল্য অদ্যাবধি ফিকে হয় নি।
কল্পনার আশ্রয় নিয়ে শিশুসাহিত্য রচনা করতে হয় একথা ঠিক, কিন্তু সত্যজিতের মতো সার্থক শিশুসাহিত্যিক শিশুমনস্তত্বের গভীর পর্যবেক্ষণে সফল ছিলেন বলেই তাঁর কল্পনা কখনো 'আজগুবি'র তকমা পায় নি। গোয়েন্দা ফেলুদার কাছে একটি রিভলভার থাকলেও তার গর্জে ওঠার সুযোগ ছিল না, রহস্য সমাধানে প্রয়োগ হয়েছে একটিই অস্ত্র, মগজাস্ত্র। এমনিতে গল্পের বই পড়াকে সমসাময়িক রক্ষণশীল অভিভাবকেরা 'সময় নষ্ট'-এর উপকরণ বলে মনে করলেও, সত্যজিতের লেখা ছিল ব্যতিক্রম, কারণ তাঁর গল্প বা উপন্যাসের পাতায় ছত্রে ছত্রে পাওয়া যেত শিক্ষণীয় তথ্য, ইতিহাস-ভূগোল-বিজ্ঞানের সাধারণ জ্ঞান, ক্লাসের পাঠ্যপুস্তকের চেয়ে অনেক বেশি মুন্সিয়ানায় সে সব দরকারী তথ্য ও জ্ঞান তাঁর গল্প প্রবেশ করিয়ে দিতে পারত শিশু-কিশোরদের মনন ও চিন্তনে।
স্রষ্টা সত্যজিৎ একটি সাক্ষাৎকারে নিজেই স্বীকার করেছেন যে শিশুকিশোরদের জন্য সাহিত্যসৃষ্টিতে ব্রতী হওয়ার কাজে তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্য তাঁকে প্রেরণা দিয়েছে। তিনি বলেছেন-
" তবে আমি গল্প লেখা শুরু করি অনেক বেশি বয়সে। ৪০ বছর বয়সে। সন্দেশ পত্রিকার তাগিদেই লেখা শুরু করা"।
🍂
ঐ সাক্ষাৎকারের তিনি জানিয়ে দেন তাঁর লেখা ছোটবড় সবার জন্য। ছোটদের জন্য লেখা মানে তাঁর কাছে কিশোরদের জন্য লেখা। তিনি নিজের মুখে বলেছেন
" আমি শিশু সাহিত্যিক নই। আমি কিশোর সাহিত্যিক। ছোটদের জন্য, যাকে বলে শিশুদের জন্য লেখা আর পারব না। উপেন্দ্রকিশোর পেরেছেন। সে ক্ষমতা আমার নেই।"
বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে 'সন্দেশ' পত্রিকা এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক এবং কালের গতিকে সেই জ্যোতিষ্কটিকে জ্বাজল্যমান রাখার ভার বর্তায় উপেন্দ্রকিশোর-সুকুমারদের সার্থক উত্তরসূরী সত্যজিতের উপর। 'সন্দেশ' প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১৩ সালে এবং সেই পর্যায়ে একটানা ১৩ বছর একাদিক্রমে প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯২৩-এ সুকুমার রায়-এর দুর্ভাগ্যজনক অকালমৃত্যুর পর ১৯২৬ সালে 'সন্দেশ' বন্ধ করে দিতে হয়।
বছর পাঁচ-ছয় পর, ১৯৩১-৩২ নাগাদ সুকুমার রায়-এর কনিষ্ঠ ভ্রাতা, সত্যজিতের পিতৃব্য সুবিনয় রায় পুনরায় 'সন্দেশ'-এর পুনরুজ্জীবন ঘটান। তবে এই পর্যায়ে তিন-চার বছর প্রকাশিত হওয়ার পর 'সন্দেশ' আবার বন্ধ হয়ে যায়।
একথা সহজেই বোঝা যায় যে যতবারই বন্ধ হয়ে যাক না কেন, 'সন্দেশ'-এর প্রতিটি সংখ্যাই ছিল শিশুকিশোর মনের কাছে অত্যন্ত রুচিশীল ও উপাদেয় ভোজ্য। 'সন্দেশ'-এর গ্রাহক বা পাঠক সর্বকালেই এর একটি সংখ্যা প্রকাশের জন্য অধীর আগ্রহে যেভাবে অপেক্ষা করে থাকেন তাতে একথা বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না যে বাঙালী রুচিশীল পাঠকের মনে এই ঐতিহ্যশালী পত্রিকা পাঠের অভিলাষ পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেই একটুও কমে নি।
পাঠকের মনের চাহিদার পাশাপাশি, স্রষ্টা পরিবারের উত্তরসূরী হিসাবে সত্যজিৎ এবং অন্যান্যদের মনেও পত্রিকাটি পুনরায় প্রকাশ করার অভীপ্সা স্থান পেয়ে থাকবে, তা অত্যন্ত স্বাভাবিক- বিশেষ করে উদ্দেশ্য যেখানে যত না ব্যাবসায়িক, তার চেয়ে অনেক বেশি বাঙালীর শৈশবকে পরিচয়দান ও সুস্থ রুচির জগতে বাঙালীর শিশুকিশোর মনের সংবাহন।
কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সাথে এক রবিবার আড্ডা দেওয়ার সময়ে 'সন্দেশ' পুনরায় প্রকাশের প্রসঙ্গ ওঠে এবং সেই আড্ডাতেই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়ে মাত্র ছ'মাসের মধ্যে নবরূপে 'সন্দেশ' প্রকাশ করে ফেলা সম্ভব হয় ।
১৯৬২ সালের একটি বিজ্ঞাপন থেকে দেখা যায়, তখন প্রতিটি সংখ্যার মূল্য ছিল ৭৫ পয়সা এবং বার্ষিক গ্রাহক চাঁদা ছিল ৯ টাকা। 'সন্দেশ'-এর প্রকাশনা ছিল সাদামাটা এবং মূলত: অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় তেমন পেশাদারিত্ব ফুটে না ওঠার কারণেই বোধহয় এমন দিকপাল স্রষ্টার স্পর্শ থাকা সত্বেও 'সন্দেশ' প্রচারের শীর্ষদেশে পৌঁছাতে পারে নি। হতাশ সত্যজিৎ মাঝেমাঝেই 'সন্দেশ' বন্ধ করে দেওয়ার কথা ভেবেছেন যদিও তাঁর উপস্থিতির কারণেই তিন দশকের বেশি নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছিল 'সন্দেশ' এবং মননশীল শিশুসাহিত্যের রসদে পরিণত হতে পেরেছিল অর্থাভাবে আধুনিক মুদ্রণ-প্রযুক্তিতে তেমনভাবে সঙ্গী করতে না পেরেও।
শিশুসাহিত্যিক সত্যজিৎ রায় সম্পর্কে আলোচনার প্রসঙ্গে এই 'সন্দেশ' পত্রিকা প্রকাশের সাথে তাঁর সংযুক্তির প্রসঙ্গ ওতপ্রোত যুক্ত থাকবে, যদিও তাঁর সৃষ্টির ঔজ্জ্বল্যে তাঁর গল্প, উপন্যাসের জগৎ এই প্রকাশনার বৃত্তে সীমাবদ্ধ ছিল না, তাঁর নামটি যুক্ত থাকাই 'সন্দেশ'-এর টিঁকে থাকার পক্ষে যথেষ্ট ছিল।
১৯৯১-এর ২১শে এপ্রিল কলকাতার নামকরা প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয় সত্যজিৎ রায়-এর সৃষ্টির সংকলন সেরা সত্যজিৎ। তার ভূমিকায় তিনি স্বহস্তে লিখেছিলেন,
"আমার চল্লিশ বছর বয়সে আমি প্রথম লিখতে শুরু করি। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ-কিছুই লেখার কোনো তাগিদ আমি এর আগে অনুভব করিনি। বিজ্ঞাপনের নকশা করি, বইয়ের মলাট আঁকি, ছবি আঁকি, বছরে একটা করে ফিল্ম করি-এই ছিল কাজ। এই সময় একদিন আমার বন্ধু কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় আড্ডার ফাঁকে প্রশ্ন তুললেন সন্দেশ পত্রিকা নতুন করে বার করলে কেমন হয়। আমি প্রস্তাবটা সোৎসাহে সমর্থন করি। কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন পর্যায়ের প্রথম সংখ্যা সন্দেশ প্রকাশিত হল। আমার মাথায় তখনো নতুন কিছু আসেনি, অথচ দুজনের একজন সম্পাদক হিসাবে আমার কিছু লেখা দরকার তাই এডওয়র্ড লিয়রের ছড়া অনুবাদ করলাম। সন্দেশের চাহিদা মেটাতেই আমি গল্প লেখা শুরু করি। ফেলুদার গল্প, শঙ্কু'র ডায়রি, সবই প্রথম সন্দেশেই বেরোয়। সেই সঙ্গে ছড়া, প্রবন্ধ ইত্যাদিও লেখা শুরু হয়। সেই থেকে আর থামিনি। গত ত্রিশ বছরে যা লিখেছি তার থেকেই এই সংকলনের মালমশলা বাছাই করেছি। নামকরণও আমার। যদিও সব রচনা সেরার পর্যায়ে পড়ে কিনা সে নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আর কিছু না হোক, এ বই হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করলে বাইসেপ-ট্রাইসেপের উন্নতির সম্ভাবনা আছে তাতে সন্দেহ নেই।"
১৯৬১ সালের প্রথম সংখ্যায় তিনি অন্য কোনো লেখা দিতে পারবেন না বলে কেবল বিদেশী ছড়া অনুবাদ করেছিলেন কিন্তু তাঁর পরেপরেই বিশ্বের শিশুসাহিত্য তাঁর কাছ থেকে উপহার পেতে শুরু করে ফেলুদা, প্রফেসর শঙ্কু, তারিণীখুড়োর মতো কালজয়ী চরিত্রগুলি। ফেলুদাকে নিয়ে তাঁর উপন্যাস ও বড়োগল্পের সংখ্যা মোট ৩৫। এছাড়াও 'বাক্স রহস্য', 'তোতা রহস্য' এবং 'আদিত্য বর্ধনের আবিষ্কার' লেখাগুলি তিনি শেষ করে যেতে পারেন নি।
সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যের আলোচকরা মনে করেন, 'ফেলুদা' চরিত্রটির মাধ্যমে স্রষ্টা সত্যজিৎ একটি বাঙালি পরিবারের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, সাধারণ কৃষ্টি এবং জীবনচর্যার মতো বিষয়গুলির উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের ধারাবিবরণী প্রদানের চেষ্টা করেছেন। তিনি অত্যন্ত প্রাঞ্জল অথচ বলিষ্ঠ ভাষায় সামাজিক ভালোমন্দের নানা দিকও তাঁর লেখার মধ্যে তুলে ধরেছেন। কিশোরপাঠ্য গল্পে অত্যন্ত সতেতনভাবে কোনো রাজনৈতিক বিষয় বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকলেও, অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সাথে তাঁর কলম কলকাতা এবং বাংলার নানা শহরের চিত্র এঁকেছেন এবং সেগুলির পটভূমিতে তাঁর উপন্যাসের নায়ককে দিয়ে নানা মামলার সমাধান করিয়েছেন। ভ্রমণকাহিনীর চেহারা নিয়েছে তাঁর উপন্যাসে বর্ণিত লখনউ, রাজস্থান, বারাণসী, আগ্রার ঐতিহাসিক এবং সংস্কৃতিসমৃদ্ধ নানা ভারতীয় স্থান। এই বিশদ উপস্থাপন হয়ে উঠেছে একাধারে নান্দনিক এবং বিনোদনমূলক উপাদানে সমৃদ্ধ। এককথায় শিল্পসমৃদ্ধ সংলাপ, চরিত্র ও প্রেক্ষাপটের ঠাসবুনোটে অনন্য হয়ে উঠেছে গোয়েন্দাগল্পের সাসপেন্স, অ্যাকশন এবং হাস্যরসের সহাবস্থান।
পাঠকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখার উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর নায়ককে কোনো চটকদারি ‘সুপার-হিরো ইমেজ’ দেন নি বলেই কিশোর পাঠকরা মূল চরিত্র এবং পার্শ্বচরিত্রগুলোর সাথে একাত্ম হতে পেরেছে, তাদের অনুভূতিতে তৈরি হয়েছে শিক্ষণীয় দৃশ্যকল্প।
বাংলার শিশুকিশোরদের কাছে একটি অন্যতম আকর্ষণীয় চরিত্র 'প্রফেসর শঙ্কু'। ১৯৬১ সালে নবরূপে সত্যজিৎ রায়-এর সম্পাদনায় প্রকাশিত 'সন্দেশ' পত্রিকায় প্রফেসর শঙ্কুর "ব্যোমযাত্রীর ডায়রি" গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল। প্রফেসর শঙ্কুর ডায়েরিতে তাঁর ৭২টি আশ্চর্য আবিষ্কারের কথা উল্লেখ আছে এবং এগুলির মধ্যে বেশ কয়েকটি তিনি তাঁর অভিযানগুলিতে ব্যবহার করেছিলেন। সত্যজিৎ রায় প্রফেসর শঙ্কুর মোট ৩৮টি পূর্ণাঙ্গ গল্প সৃষ্টি করেছিলেন এবং এর বাইরে দুটি অসমাপ্ত গল্প রয়েছে। কল্পবিজ্ঞানের বিশ্বসাহিত্যে প্রফেসর শঙ্কু বিশিষ্ট স্থান পেয়েছে কারণ কল্পনাশক্তির চরম প্রয়োগ ঘটাতে গিয়ে রচয়িতা এতোটাই সাবধানী ছিলেন যে কোনো স্থানেই কল্পনা 'ছেলেভুলানো' অবাস্তবতার তকমা পায় নি, যেন চিত্রকল্প সদা স্মরণে রেখেই বিজ্ঞানের মূল নীতির ধাত্রে অতি সাবধানে বর্ণিত হয়েছে ঘটনা-পরম্পরা।
সত্যজিৎ রায়-এর সৃষ্ট তারিণী খুড়ো এক গল্প-বলিয়ে খুড়ো যাঁদের দেখা সেই সময়ে অনেক পরিবারেই পাওয়া যেত। তিনি আক্ষরিক অর্থেই একজন গ্লোব-ট্রটার যাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলি আকর্ষণীয় সত্যিতে ভরপুর যেগুলো গল্প হলে শিশুকিশোর মনকে আর অন্য কাজে আটকে রাখা যাবে না। ভূগোল, বিজ্ঞান, ইতিহাসের নানান আকর্ষণীয় তথ্য গল্পের মোড়কে হাজির হয়ে অতি অমনোযোগী ছাত্রকেও মেধাবী শ্রোতা ও ক্রমে পড়ুয়া করে গড়ে তোলে। তারিণীখুড়োকে নিয়ে সত্যজিৎ রায় সৃষ্ট গল্পের সংখ্যা ১৫। এছাড়াও আছে অজস্র ছোটগল্প যেগুলির মাধ্যমে নতুন-পুরোনো মূল্যবোধকে নানান ভঙ্গিতে স্পর্শ করতে চেয়ে পাঠকের আকর্ষণ পূর্ণমাত্রায় অর্জন করেছেন রচয়িতা সত্যজিৎ।
'ক্লাস ফ্রেন্ড', 'নকুড়বাবু ও এল ডোরাডো', 'বৃহচ্চঞ্চু', 'অনুকূল', 'ভূতো', 'বাতিকবাবু'-র মতো গল্পগুলি মানবিক বার্তা, বিজ্ঞানমনস্কতা থেকে শুরু করে সৌজন্যবোধের গুরুত্ব- সবকিছুকে স্পর্শ করে সমৃদ্ধ করে পাঠকের মনোজগতকে।
গল্পের প্রয়োজনে সত্যজিতের বানানো পার্শ্বচরিত্রগুলি সব আমাদের সমাজের আনাচকানাচ থেকেই নেওয়া। আমরা যেন অভদ্রতায় সিদ্ধপুরুষ পাশের বাড়ির বয়স্ক ভদ্রলোককে পেয়ে যাই একটি যন্ত্রমানব পরিচারককে নিয়ে লেখা গল্প 'অনুকূল'-এর মাধ্যমে।
" নিকুঞ্জবাবুর বন্ধুদের অনুকূলকে মেনে নিতে একটু সময় লেগেছিল-
বিশেষত বিনয় পাকড়াশি নিজের বাড়ির চাকরদের তুই বলে এমন অভ্যস্ত যে, অনুকূলকেও একদিন তুই বলে ফেলেছিলেন। তাতে অনুকূল গম্ভীর ভাবে বলে, 'আমাকে তুই বললে কিন্তু তোকেও আমি তুই বলব।'
এরপর থেকে বিনয়বাবু আর কোনোদিন এ-ভুলটা করেননি।"
ফেলুদা, শঙ্কু, তারিণীখুড়োর সিরিজগুলো বাদ দিলে সত্যজিৎ রায় পৃথকভাবে ছোটগল্প লিখেছেন শতাধিক। এছাড়া অনুবাদের কাজ তো আছেই।
গল্পের চেয়েও সত্য মনে হয় তাঁর আত্মবিবরণী ' যখন ছোট ছিলাম।' গল্প বলার ঢঙে এই গ্রন্থের মুখবন্ধে তিনি লিখেছেন,
"ছেলেবেলার কোন্ ঘটনা মনে থাকবে আর কোনটা যে চিরকালের মতো মন থেকে মুছে যাবে সেটা আগে থেকে কেউ বলতে পারে না। মনে থাকা আর না-থাকা জিনিসটা কোনো নিয়ম মেনে চলে না। স্মৃতির রহস্য এখানেই।"
এই উপলব্ধি বলে দেয় শিশুসাহিত্য রচয়িতাকে প্রথমেই অধিগত করতে হয় শিশুমনের অন্ধিসন্ধির সন্ধান। শিশু মনস্তত্বের ফলিত বিদ্যার প্রয়োগ হয়তো সবচেয়ে বেশি ঘটে শিশুদের জন্য মনোগ্রাহী রচনায় হাত দিতে গিয়ে। সে কাজে সত্যজিৎ চরমভাবে সফল হয়েছিলেন, কারণ সমসাময়িক শিশুমনকে তিনি হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন। ঐ স্মৃতিকথার মুখবন্ধেই তাঁর অপর বিবৃতি,
" সাধারণ-অসাধারণের প্রভেদ বড়দের মতো করে ছোটরা করে না; তাই তাদের মেলামেশার কোনো বাছবিচার থাকে না। এ ব্যাপারে গুরুজনের বিচার যে ছোটরা সব সময় বোঝে বা মানে তাও নয়।"
ছোটরা যা বোঝে বা মানে, তাকে গুরুত্ব দেওয়ার মানুষ বড়ো কম। আমাদের রাষ্ট্র-ও তো সামগ্রিকভাবে শিশুদের মন বা অধিকার কোনোটাকেই গুরুত্ব দেয় না। আশি বছরের স্বাধীন দেশে ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের পড়াশুনোর অধিকার বাধ্যতামূলক হয়েছে মাত্র সতেরো বছর আগে।
চলচ্চিত্র তথা চিত্রকলার সৃষ্টিজগতে অবিসংবাদী ভূমিকার কথা যদি বাদও দেওয়া যায়- কেবলমাত্র শিশুসাহিত্যেই স্রষ্টা হিসাবে কালজয়ী হয়েছেন বহুমুখী প্রতিভাধর সুকুমার-তনয় সত্যজিৎ।
0 Comments