মলয় সরকার
ভারতবর্ষের যে কোন মানুষকে, যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, দুজন শ্রেষ্ঠ বাঙালীর নাম, যাঁরা পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে ভারতবর্ষকে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছেন, তাহলে একবাক্যে উঠে আসবে দুটি নাম, তা হল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সত্যজিত রায়। দুজনেরই মেধা মনীষা এতই উঁচু দরের যে, আম-বাঙালী তাঁদের একেবারে ধরা ছোঁয়ার বাইরে বলেই মেনে নিয়েছে। সব থেকে বড় কথা, দুজনেরই প্রতিভা কেবল একমুখী ছিল না। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের দক্ষতা ছিল সীমাহীন।
আপাততঃ আমরা শুধু একজনকে নিয়েই আলোচনা করি। সদ্য ২৩ শে এপ্রিল গেল তাঁর মহাপ্রয়াণের দিন।তিনি হলেন সত্যজিত রায়।এই উপলক্ষ্যে আমরা তাঁর কথা নিয়েই আজ ভাবি।
তিনি এমন একটি মানুষ যিনি একাই সাহিত্যসৃষ্টি করছেন, ছবি আঁকছেন, গ্র্যাফিক ডিজাইন করছেন, দেশী বিদেশী সঙ্গীতের সুর নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন বা সঙ্গীতের সুর সৃষ্টি করছেন, চিত্রনাট্য লিখছেন, আবার সিনেমার পরিচালনাও করছেন। সিনেমার দৃশ্যভাবনা, পোষাক, আলো সমস্ত কিছু নিয়ে একাই চিন্তাভাবনা করছেন। সাহিত্যেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর বিচরণ।গোয়েন্দাগল্প ও বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী তো একেবারে বাংলা সাহিত্যে কয়েকটি অবিস্মরণীয় চরিত্রসৃষ্টি করে বাঙালীর হৃদয়ে গেঁথে দিয়েছেন, যেমন ফেলুদা, প্রফেসর শঙ্কু, তারিণীখুড়ো। এ ছাড়াও ছোটগল্প, সিনেমা সম্বন্ধেও লেখা ইত্যাদিতেও সহজ সঞ্চরণ তাঁর।
🍂
একটা কথা অবশ্য ঠিক, তাঁর জন্মসূত্রে প্রাপ্ত বংশগত গুণাবলী নিয়েই তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুকুমার রায় ও উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর জিনগত বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর সহজাত। কাজেই তাঁর ধমনীতে ছিল শিল্প ও সাহিত্যের রক্ত।পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী শিশুসাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী, মুদ্রণবিশেষজ্ঞ ও পিতা সুকুমার রায় বাংলা ছড়া সাহিত্যের জাদুকর, ফোটোগ্রাফী বিশেষজ্ঞ। মা সুপ্রভা রায়ের অবদানও তাঁর জীবনে কম নয়। তাঁর ইচ্ছাতেই সত্যজিতের শান্তিনিকেতনের কলাভবনে ভর্তি হওয়া। এইখানেই তিনি পেলেন তাঁর চিত্র শিল্পের নতুন দৃষ্টিকোণ শিল্পগুরু নন্দলাল বসু ও বিনোদ বিহারী মুখোপাধ্যায়ের সান্নিধ্যে। সেই সঙ্গে প্রকৃতিকে দেখার যে শিক্ষা, তার ভিত্তিও প্রতিষ্ঠিত হয় এখানেই।
প্রথম জীবনের চাকুরী ডি জে কিমারএ বিজ্ঞাপন ও প্রচ্ছদ আঁকার শিক্ষার ফল আমরা দেখতে পাই পরবর্তী কালে তাঁর চলচ্চিত্রের পোস্টারে। এগুলি আজও সংরক্ষিত চলচ্চিত্র শিল্পের সম্পদ হিসাবে।
পিতা সুকুমার রায়কে অল্প বয়সে হারালেও তাঁর মা সুপ্রভা রায় ছিলেন তাঁর জীবনে এক স্তম্ভস্বরূপ।
কর্মক্ষেত্রে বিভূতিভূষণের ‘আম আঁটির ভেঁপু’ বইটির প্রচ্ছদ করাই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।এখান থেকেই তাঁর ‘পথের পাঁচালি’র’ ভ্রুণ জন্ম নেয়। যখন অর্থাভাবে এটি জীবনের আলো দেখার অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল, তখন তাঁর মা সুপ্রভা রায়ই তাঁর পাশে দাঁড়ান। সোজাসুজি তিনি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায়ের কাছে দরবার করে, এর জন্য, সরকারী আর্থিক সহযোগিতা লাভের ব্যবস্থা করেন। একজন চিত্রনির্মাতার প্রথম সৃষ্টিতে সরকারি সাহায্যলাভ বড় সোজা কথা নয়। তারপর ১৯৫৫ সালে এটির মুক্তিলগ্ন তো শুধু বাংলা চলচ্চিত্র কেন ভারতবর্ষের চলচ্চিত্র জগতের কাছে ইতিহাস। ভারতীয় সিনেমার ইতিহাস ও গতিপথ বদলে দেয় এটি।প্রথাগত স্টুডিওর বাইরে গিয়ে, নতুন মুখ নিয়ে তৈরী এই ছবি এক নতুন চিত্রভাষার জন্ম দেয়।তাঁর মত এত নতুন মুখ নিয়ে সিনেমা তৈরীর পরীক্ষানিরীক্ষা করার দুঃসাহস আর কেউ দেখিয়েছেন বলে মনে হয় না। যাদের আদৌ কোন চিত্রাভিনয় অভিজ্ঞতা ছিল না, সেই সমস্ত মুখও তিনি স্বচ্ছন্দে ব্যবহার করেছেন।আসলে, গল্পের চিত্রনাট্য লেখার সময়, তাঁর চরিত্রদের আদল তিনি মনশ্চক্ষে কল্পনা করে খাতায় ছবি এঁকে নিতেন। পরে চিত্রের প্রয়োজনে সেরকম মুখ খুঁজে বেড়াতেন। এ ভাবেই খুঁজে পেয়েছেন, অপু, দুর্গাকে, কিংবা ফেলুদা জটায়ু বা তারিণীখুড়োকে। ওদিকে অপর্ণা সেন, মাধবীরাও তাঁর এইরকম সন্ধানেরই ফসল।তাঁর এক একটি চলচ্চিত্র এক একটি মাইলস্টোন বললেও বোধ হয় অত্যুক্তি হয় না। আজও সেগুলি সমানভাবে আদৃত। তাঁর পথের পাঁচালী অপরাজিত, অপুর সংসার,(অপু ট্রিলজী), শাখাপ্রশাখা, আগন্তুক, ঘরে বাইরে, মহানগর, জনঅরণ্য, তিনকন্যা, জলসাঘর, দেবী, অশনি সংকেত, চারুলতা ইত্যাদি চলচ্চিত্রগুলি ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। ওদিকে হাল্কা চালে হাসির মোড়কে রূপকথাধর্মী ‘গুপীগাইন বাঘাবাইন’, কিংবা ‘হীরক রাজার দেশে’ এক গভীর চিন্তার বার্তা তুলে দেয় চিন্তাশীলদের সামনে।
শুধুমাত্র এই নয় ‘সোনার কেল্লা’ ও ‘জয়বাবা ফেলুনাথ' ধরণের গোয়েন্দা গল্পও তিনি সমান দক্ষতায় উপহার দিয়েছেন। কিভাবে শব্দসৃষ্টি করে সিনেমায় তা প্রয়োগ করতে হবে, কত কম বাজেটের মধ্যে সিনেমা করা যায় তার পরীক্ষা সারাজীবনই করেছেন। তাঁর ছবিতে অবধারিত ভাবে রাজনীতি সরাসরি ভাবে থাকবেই এমন ব্যাপারটি নয়। তবে মৃণাল সেন বলতেন সমকালীনতাকে ধারণ করলেও অনেক ছবি কালকে অতিক্রম করতে পারে।এই জন্যই পথের পাঁচালির চেয়েও ‘অপরাজিত’কে তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।তিনি সত্যজিতের সব ছবির চেয়েও এটিকে বেশি পছন্দ করতেন।
আমরা অনেকেই জানিনা, যে সত্যজিত ম্যাজিক খুব ভালবাসতেন। ছোটবেলায় একবার এক বিয়েবাড়িতে ম্যাজিক দেখে এর প্রেমে পড়ে যান। ঝোঁকের মাথায় সেই জাদুকরের কাছে কয়েকটি ম্যাজিক শিখেও নেন। এই ম্যাজিক তাঁর সিনেমা ও গল্পে বার বারই এসেছে।সোনার কেল্লায় কামু মুখার্জীর ম্যাজিক অনেকের মনে দাগ রেখে গেছে।
অবশ্য তাঁর এই যে অসামান্য শিল্পসৃষ্টি এও এক ধরণের ম্যাজিকই, যার প্রেমে আমরা এই সমস্ত সাধারণ মানুষ বার বার নিমজ্জিত হই। আমার নিজের মনে আছে, যখন ‘গুপী গায়েন বাঘা বায়েন’ দেখতে যাই, তাঁর ভূতের ম্যাজিক আমাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল বহুদিন। পরে জেনেছিলাম, কেবল আমার নয়, এই অবস্থা হয়েছিল তৎকালীন যুগে সমস্ত দর্শকের। আমরা এই গল্পের নানা অন্তর্নিহিত অর্থ খোঁজার চেষ্টায় ব্রতী হয়েছিলাম।অর্থাৎ তাঁর গল্প, তাঁর চলচ্চিত্র মানুষকে কিছু চিন্তার খোরাক দেয়।এইখানেই তাঁর গল্প বলার সার্থকতা।
তাঁর মননশীলতা ছিল বৈচিত্র্যময়, গভীর ও জীবনমুখী। এটিই তাঁর চলচ্চিত্র, সাহিত্য, সঙ্গীত ও শিল্পকর্মে প্রতিফলিত হয়েছে।বিশ্বজনীন মানবিক বোধের সঙ্গে তিনি নিজস্ব সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। তাঁর কাজের মূল বৈশিষ্ট্য হল, সুক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ, মানবিক সম্পর্কের গভীর বিশ্লেষণ, নিজস্ব সঙ্গীতে পারদর্শিতা।তিনি কখনও কখনও আধুনিক সমাজ ও অপসংস্কৃতির বিরূদ্ধেও সোচ্চার, যেমন হয়েছে ‘আগন্তুক’ ছবিতে।’পিকু’ ধরণের শিশু মনস্তত্বের ছবিও তিনি অসাধারণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
ওদিকে পারিবারিক পত্রিকা সন্দেশকে পুনরুজ্জীবিত করতে তিনি সচেষ্ট হয়েছিলেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে।
আমাদের কলকাতার নন্দন হলের যে নামের ডিজাইন এটি তাঁরই সৃষ্টি। এ ছাড়া সন্দেশ, এক্ষণ সাহিত্য একাডেমীর নামের ডিজাইন তিনিই করেছিলেন। সিগনেট প্রেসের নানা বইয়ের প্রচ্ছদ তাঁর করা। চিড়িয়াখানা চলচ্চিত্রের পোস্টারে ‘খুন’ শব্দটি রক্তের ফোঁটা দিয়ে এমন এঁকেছিলেন, যা এক টাইপোগ্রাফিক্যাল জাগলারী।
এমন কি ইংরাজী লিপির জন্য চার ধরণের ফন্ট ডিজাইনও তাঁর সৃষ্টি। এগুলির নাম, রে রোমান, (Ray Roman) রে বিজার,( Ray Bizarre) ড্যাফনিস ( Daphnis), ও হলিডে স্ক্রিপ্ট (Holiday Script)।এর মধ্যে রে রোমান ও রে বিজার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়।
আসলে তাঁর মনন ও মেধা ছিল বহুমুখী যা প্রকৃতপক্ষে বলা যায় বিশ্বমানের ও বিশ্বজনীন। এটি বাংলা চলচ্চিত্র ও সাহিত্যকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। অস্কার ও দাদাসাহেব ফালকে বিজয়ী ভারতরত্ন এই মানুষটির চোখে মানুষের মনস্তত্ব, তাদের অন্তর্মুখীনতা, সমাজ জীবনের গভীর অন্তর্নিহিত ছবি এক সুললিত ও সুন্দর ব্যঞ্জনায় ধরা পড়েছে। শুধু ধরা পড়েছে বলেই নয়, তাকে পরম মমতায় নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছেন।
তাঁর বিজ্ঞানমনস্কতাও আমাদের মনে গভীর ভাবে রেখাপাত করে।
১৯২১ খ্রীঃর ২রা মে জন্মগ্রহণ করে ১৯৯২ খ্রীঃর ২৩ শে এপ্রিল মহাপ্রয়াণের আগে পর্যন্ত তিনি সক্রিয় ছিলেন তাঁর সৃষ্টিতে।দেশে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়ে বাংলা মা তথা ভারতমাতার গৌরব বিশ্বের দরবারে বহুগুণ বাড়িয়েছেন।
তাঁর সচেতন মন শিল্প ও জীবনের গভীরতাকে এক সূত্রে গেঁথে কালজয়ী সৃষ্টি উপহার দিয়েছে আমাদের।
আমরা তাঁর এই সমস্ত অবদানকে স্মরণে রেখে শ্রদ্ধায় অবনত হই আর একবার।
0 Comments