জ্বলদর্চি

সত্যজিৎ এবং সত্যজিৎ/বাসবদত্তা কদম


সত্যজিৎ এবং সত্যজিৎ

বাসবদত্তা কদম

সত্যজিতের কথা ভাবতে গেলে মাথায় আসে সিনেমা। কিন্তু সিনেমার সঙ্গে এক লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে ফেলুদা, প্রফেসর শঙ্কু, তারিনীখুড়ো, বঙ্কুবাবু, অসমঞ্জবাবুর কুকুর, পাপাঙ্গুল, আর লিমেরিকের মত ছোটদের কবিতা, বিভিন্ন গল্পে তাঁর আঁকা স্কেচ। 

বাঙালির দুই অন্যতম সেরা প্রতিভা সত্যজিৎ এবং রবীন্দ্রনাথের দেখা হয়েছিল শান্তিনিকেতনে। শিশু সত্যজিৎকে মা সুপ্রভা নিয়ে গেছিলেন। শিশু সত্যজিতের মনে সাধ তার সদ্য কেনা অটোগ্রাফের খাতায় প্রথম সই দেবেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ সে খাতা চেয়ে নিলেন এক রাতের জন্য, লিখে দিলেন, ‘বহু দিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে…’ বললেন  ‘এ কবিতা ও আরেকটু বড় হয়ে বুঝবে’। নন্দলাল বসু খাতায় এঁকে দিলেন একখানা বাঘ। বাঘের ল্যাজের মাথায় কালো রঙ করে, শিশু সত্যজিৎকে বলেছিলেন বাঘটা রান্নাঘরে ঢুকেছিল, তাই উনুনের আগুনে ওর ন্যাজ পুড়ে গেছে। মাত্র দুবছর বয়সে বাবা সুকুমার রায় চলে গেছেন কালাজ্বরে; উপেন্দ্রকিশোরকে তিনি দেখেননি। গড়পারের বাড়ি ছেড়ে মা তাঁকে নিয়ে চলে এসেছেন ভবানীপুরের বকুলবাগানে মামাবাড়িতে। বড় হছেন সেখানেই এবং মায়ের কড়া শাসনে। 

মায়ের ইচ্ছায় এবং নিজের অনিচ্ছায় প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বেরিয়ে ফাইন আর্টস শিখতে যোগ দিয়েছেন কলাভবনে। শোনা যায়, রবীন্দ্রনাথের করা প্ল্যানচেটে সুকুমার রায়ের আত্মা তাঁর ছেলের শান্তিনিকেতনে ফাইন আর্টস শেখার ব্যাপারে ইচ্ছাপ্রকাশ করেছিলেন। 

কলাভবনের শিক্ষা পদ্ধতির অনেক কিছুই তাঁর পছন্দের না হলেও, শিক্ষক নন্দলাল আর বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের শিক্ষাপদ্ধতি ছিল সত্যজিতের বিশেষ প্রিয়। এর বেশ কয়েক বছর পরে, বিনোদবিহারীকে নিয়ে সত্যজিৎ বানান তথ্যচিত্র ‘ইনার আই’। বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের মুরাল সম্পর্কে সত্যজিৎ বলেছেন, 

‘...কলাভবন। আশ্রমে পৌঁছানোর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই যাঁর ছবি প্রথম চোখে পড়ল তিনি হলেন বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়। কলাভবন হোস্টেলে একটি তিন কামরা বিশিষ্ট নতুন ছাত্রাবাসে আমার থাকার বন্দোবস্ত হয়েছিল। তিন ধাপ সিঁড়ি উঠে বাড়ির সামনের বারান্দায় পা দিতেই, দৃষ্টি আপনা হতেই উপর দিকে চলে যায়। সারা সিলিং জুড়ে একটি ছবি। গাছপালা মাঠ পুকুর মানুষ পাখি জানোয়ারে পরিপূর্ণ একটি স্নিগ্ধ অথচ বর্ণোজ্জ্বল গ্রাম্য দৃশ্য। দৃশ্য না বলে ট্যাপেস্ট্রি বলাই ভালো। অথবা এনসাইক্লোপেডিয়া।’ শ্রদ্ধা, ভালবাসা উপচে পড়ছে ছাত্রের তাঁর শিক্ষক সম্পর্কে মন্তব্যে।

🍂

এবার ফিরি ফেলুদার শ্রষ্টা সত্যজিতে- আমার প্রথম সাক্ষাৎ ‘বোম্বাইয়ের বোম্বেটে’তে। আমার স্কুল ছুটি, মায়ের স্কুল আছে এরকম এক দিনে, বইটা পড়ার সুবর্ণ সুযোগ পাওয়া গেল। শেষ যখন হোল, তখন বিকেল। এ বইয়ে বোম্বাই আছে, সিনেমার শুটিং আছে, বম্বের হাইরাইজ আছে (যা আমার ছোটবেলার কলকাতায় বিরল) আর বোম্বেটে তো আছেই। বম্বের এবং শুটিং এর একটা ছায়াচিত্র আমার মাথায় তৈরি হয়ে গেল। এই বইটার মধ্যে একমলাটে ফাউ ছিল, গোঁসাইপুর সরগরম। গ্রামের সন্ধেবেলা এবং যদি বিদ্যুৎ না থাকে সে চিত্রখানাও বেশ পরিষ্কার হল। এরপর পড়েছিলাম ছিন্নমস্তার অভিশাপ। রাঁচি, হাজারিবাগ, রাজরাপ্পার বর্ণনা অবশ্যই এখনকার বাচ্চারা পড়লে মেলাতে পারবে না। কিন্তু আমি রাঁচি দেখেছি আমার ক্লাস থ্রিতে। বেশ মিলে যাচ্ছিল, চেনা জায়গাগুলো। তাঁর লেখা প্রতিটা ফেলুদা গল্প একটা সাধারণ বুদ্ধিমত্তা, বিচারশক্তি, যাকে আমরা ‘কমনসেন্স’ নামে চিনি; তা যেন কখন তৈরী করে দিয়েছিল। সঙ্গে উপরি পাওনা ছিল সব জায়গার একটা ছোট্ট অথচ স্মার্ট বর্ণনা যা অনেক পরেও সে জায়গায় ঘুরতে গেলে বারবার মনে পড়েছে। 

‘ফেলুদা’ লম্বায় ছয় ফুট চার ইঞ্চি। সত্যজিতের থেকে একটু বেশি হাইট। তার মূল অস্ত্র ‘মগজাস্ত্র’। যদিও রিভলবার তার আছে। থাকতেই হয় একজন গোয়েন্দার। সে জুডো জানে। সকালে উঠে ব্যায়াম করে। বাঙালি হয়েও ভাতঘুম আর ভয় তার চরিত্রে অনুপস্থিত। কিশোর মনে ছায়া ফেলতে সে বাধ্য। স্বাভাবিক ভাবেই ভালো লাগে। পরে শার্লক হোমস পড়ার সময় বারবার ফেলুদাকে মনে পড়েছে। কিন্তু ফেলুদাকে কখনোই শার্লক হোমসের কপি মনে হয়নি। ‘লন্ডনে ফেলুদা’ গল্পে ফেলুদাই বলছে ‘শার্লক হোমস ছিলেন আখেরে সব গোয়েন্দার গুরু’।

‘যখন ছোট ছিলাম’ আবার পড়েছিলাম, অনেকটা বড় হয়ে- বোঝা যায়, গড়পারের ইউ এন রে এন্ড সন্সের বাড়ি এবং ভবানীপুরের মামাবাড়ির যে প্রভাব তাঁর জীবনে পড়েছিল; তা সারাজীবন তাঁর বিভিন্ন কাজের মধ্যে এসেছে বারেবারে। বাবা সুকুমার রায় যখন মারা যান, সত্যজিতের তখন মাত্র দু বছর বয়েস। পাঁচ বছর বয়স অব্দি ছিলেন গড়পারের ঐ বাড়িতে। তারপর মা সুপ্রভা রায়ের হাত ধরে চলে আসেন, মামাবাড়ি ভবানীপুরে। মা গড়পারেরই অবলা বসুর স্কুলে ছিলেন, সেলাইয়ের দিদিমনি। ছোটবেলায় দুপুরগুলো একটি শিশুর কাছে অলস দুপুর কখনোই হয় না; সত্যজিতেরও হয়নি। বকুলবাগানের বাড়ির মেঝে, দুপুরবেলা বারান্দা থেকে দেখা ফিরিওয়ালা, গরমের দুপুরের খড়খড়ি দেওয়া জানলার ফাঁক দিয়ে ঢোকা আলো ছায়ার খেলা। চারুলতা দেখতে গিয়ে খড়খড়ি দিয়ে চারুর বাঁদরওয়ালা দেখার দৃশ্য দেখেই আমার মনে পড়ে গিয়েছিল, ‘যখন ছোট ছিলাম’। 

মা সুপ্রভা রায় খুব ভালো গান জানতেন। ব্রাহ্ম সভাগুলোয় গান গাওয়া, একদম বাঁধা ছিল সুপ্রভা রায়ের। ছোট মাসি কনক দাস ছিলেন বেশ বড় শিল্পী। মায়ের পিসতুত দাদা অতুলপ্রসাদ সেনের বাড়িতে লখ্‌নৌ তে যখন গেছিলেন, দেখেছিলেন নিয়মিত সেখানে আসতেন বাবা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব। 

এক অদ্ভুত পরিমন্ডলে বেড়ে ওঠা তাঁর। গড়পাড়ের বাড়ির ছাপাখানা আর ‘সন্দেশ’ সেই ছোট্টবেলা থেকে তার মধ্যে ছাপ ফেলেছিল। ছাপার ব্লক তাঁর বিভিন্ন লেখায় এসেছে। ‘সন্দেশ’ তাঁর নস্টালজিয়া, সঙ্গীত তাঁর রক্তে। পাশ্চাত্য সঙ্গীতের প্রতি তাঁর আকর্ষণ, সর্বজনবিদিত। 

সঙ্গীত, আরো সহজ শব্দে বলতে গেলে বলতে হয় ‘মিউজিক’ তাঁর ছবিতে কথা বলে। ঘরে বাইরে ছবিতে কিশোরকুমারকে দিয়ে গাইয়েছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত কারণ সন্দীপের বোহেমিয়ান স্বভাবের সাথে এর থেকে বেশি ভালো মিল, কোনো শিল্পীর গলায় হতে পারত না। ‘অপু ট্রিলজি’ তে ‘অপরাজিত’ তে অপুর উচ্চাশা, সর্বজয়ার তাকে নিজের অসুবিধা জানানো, অপুকে কাছে পাবার ইচ্ছের সংঘাতে, ডায়ালগের মাঝে বেজে ওঠেন রবিশঙ্কর। তাঁর বুননে উপন্যাস আর সিনেমা একের থেকে আরেকজন আলাদা হয়েছে অনেকবারই কিন্তু মূল সুরটুকু রয়ে গেছে একতারেতে বাঁধা।

একবার সত্যজিৎ রায় কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সিনেমার দিকে তিনি এলেন কিভাবে? উত্তরে তিনি বলেছিলেন—‘সিনেমায় ইন্টারেস্ট আমার বহুদিন থেকেই। ভালো ছবি বার বার দেখা ও বই পড়া—প্রায় পনেরো বছর ধরে এটা আমার ঝোঁক আছে। ভালো বই পেলেই তার চিত্রনাট্য লেখা আমার বরাবরের অভ্যাস বলতে পারেন। একটি ভালো গল্প বা উপন্যাসের চিত্ররূপ দেওয়া হচ্ছে খবর পেলেই আমি বসে থাকতাম স্বেচ্ছায় সে বইয়ের চিত্রনাট্য রচনায়। তারপর ছবি যখন বের হল, মিলিয়ে দেখতাম আমার আর পরিচালকের চিত্রনাট্যের সঙ্গে। তখনো অবিশ্যি ছবি করার কোনো আইডিয়া আমার মাথায় ছিল না।’       

ফিল্ম করার কোনো আইডিয়া মাথায় যখন ছিল না তখনই তিনি ফিল্ম নিয়ে এবং আরো অনেক কম বয়সে পাশ্চাত্য ক্ল্যাসিকাল মিউজিক নিয়ে মারাত্মক সিরিয়াস ছিলেন। ১৯৪৭ সালে কয়েকজন মিলে গড়ে তুলেছিলেন ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি। সদস্য সংখ্যা নেহাৎ হেলাফেলার ছিল না সে সোসাইটির। তখনই সদস্য দাঁড়িয়েছিল, একশোর উপরে। 

নিজেই এক জায়গায় বলেছেন, ‘আমার মিউজিকাল মেমারি খুব ফিনোমেন্যাল ছিল। একটা পুরো সিম্ফনি আমার তিনবার শুনলে মুখস্থ হয়ে যেত’ 

কিংবা

‘তিনকন্যার পর থেকে, যখন আমি ডিসাইড করলাম যে আমি মিউজিক করবো—তবে ভীষণ কঠিন, প্রথম প্রথম ভীষণ সময়সাপেক্ষ, এখন আস্তে আস্তে একটা ফেসিলিটি এসে যাচ্ছে।’

 

ছিল অসামান্য আঁকার হাত। তাঁর নিজের ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয় ‘...যে জিনিসটা ছেলে বয়স থেকে বেশ ভালোই পারতাম সেটা হল ছবি আঁকা...। ’  

তাঁর সিনেমার প্রতিটি দৃশ্যের স্কেচ তিনি করতেন। 

১৯৫০ সালের এপ্রিল মাসে মানিক কে তাঁর অফিস ‘ডি জে কিমার এন্ড কোং’ থেকে পাঠানো হল কোম্পানির হেড অফিসে, বিলেত।  

বিলেতে যাওয়ার যাত্রা শুরু থেকে প্রচুর সিনেমা দেখেছেন। ফেরার পথে জাহাজে শুরু করলেন আম আঁটির ভেঁপু বই পড়া ও ছবি আঁকার কাজ। 

আম আঁটির ভেঁপু নিয়ে বন্ধু বংশী চন্দ্রগুপ্তর সঙ্গে আলাপ আলোচনা শুরু হল। ছুটির দিন হলেই দুই বন্ধু বেরিয়ে পড়তেন গ্রাম দেখতে। 

আম আঁটির ভেঁপু থেকে পথের পাঁচালি হয়ে ওঠার যুদ্ধর শুরু...। 

নিজেদের জীবনবিমার টাকা, সযত্নে রক্ষিত আর্ট বুকগুলো একে একে বিক্রি, ধার, স্ত্রীর গয়নার বাক্স ধরে বন্ধক। রসদে যে টান পড়ে; কিছুতেই কুলায় না। এক আত্মীয় বন্ধুর সহযোগিতায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর বিধান রায়ের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেলেন। শোনা যায় কাহিনীর শেষ দিকে হরিহর গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছে শুনে বিধান রায় বলেছিলেন ‘কেন বাপু গ্রাম পঞ্চায়েতের সঙ্গে মিলেমিশে গ্রামেই থাক না কেন।’ তা সে যাই হোক; বিধান রায় শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন। বন্ধ হয়ে যাওয়া পথের পাঁচালীর শুটিং আবার চালু হল। 

এরপর জয়যাত্রার গল্প শুরু হল। একের পর এক সিনেমা আর পুরস্কার পৃথিবী জুড়ে। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার -

যখন ছোট ছিলাম - সত্যজিৎ রায়

ফেলুদা সমগ্র – সত্যজিৎ রায় (এ বিষয়ে একটা কথা না বললেই নয়। লেখিকা ছোটবেলায় বইগুলো আলাদা আলাদা পড়েছিল, এখন সেটা সমগ্র। ফেলুদা আর নতুন কেস নেয় না তাই।)

তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম – সত্যজিৎ রায়

বিষয় চলচ্চিত্র – সত্যজিৎ রায়

আমাদের কথা – বিজয়া রায়

আমার শিক্ষক – সন্দীপ রায়

সেরা সত্যজিৎ - সংকলন আনন্দ l

জ্বলদর্চি ৩৪ || ২০২৭ মানে জ্বলদর্চি ৩৫।🖇️
🍂

Post a Comment

0 Comments