আন্তর্জাতিক নিখোঁজ শিশু দিবস
দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ২৫শে মে, আন্তর্জাতিক নিখোঁজ শিশু দিবস। নিখোঁজ শিশু বলতে কি বুঝি, নিখোঁজ শিশুদের নিয়ে সমাজে এক যে খারাপ প্রভাব পড়ে তার তাৎপর্যয় বা কি, আসুন এই সবকিছুই বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
নিখোঁজ শিশু বলতে ১৮ বছরের কম বয়সী যেকোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে বোঝায়, যার বর্তমান অবস্থান তার পিতামাতা, আইনি অভিভাবক বা তত্ত্বাবধায়কের কাছে সম্পূর্ণ অজানা। নিখোঁজ হওয়ার পরিস্থিতি বা কারণ যাই হোক না কেন,হারিয়ে যাওয়া, স্বেচ্ছায় বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, কিংবা অপহরণের শিকার হওয়া,এইসব শিশুই নিখোঁজের সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হয়।
শিশু মানেই পরিবারে আনন্দ, স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের আলো। একটি শিশুর হাসি যেমন একটি পরিবারের সুখের কারণ, তেমনি একটি শিশুর অনুপস্থিতি পুরো পরিবারকে অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারে। প্রতিদিন পৃথিবীর নানা প্রান্তে অসংখ্য শিশু বিভিন্ন কারণে নিখোঁজ হয়ে যায়। কেউ অপহরণের শিকার হয়, কেউ পথ হারায়, কেউ পাচারচক্রের ফাঁদে পড়ে, আবার কেউ পারিবারিক অস্থিরতার কারণে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। এই গভীর উদ্বেগ ও মানবিক সংকটের প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই প্রতি বছর ২৫শে মে পালিত হয় আন্তর্জাতিক নিখোঁজ শিশু দিবস।
এই দিবস পালনের সূচনা একটি মর্মান্তিক ঘটনার সূত্র ধরে। ১৯৭৯ সালের ২৫শে মে আমেরিকার ছয় বছরের শিশু ইটান প্যাটজ হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়। স্কুলে যাওয়ার পথে সে হারিয়ে যায় এবং দীর্ঘ অনুসন্ধানের পরও তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই ঘটনা আমেরিকাসহ বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে শিশুদের নিরাপত্তা বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ১৯৮৩ সালে আমেরিকায় ২৫শে মে “ন্যাশনাল মিসিং চিলড্রেন’স ডে” হিসেবে পালিত হতে শুরু করে। পরে বহু দেশের অংশগ্রহণে এটি আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করে।
আন্তর্জাতিক নিখোঁজ শিশু দিবসের মূল উদ্দেশ্য শুধু হারিয়ে যাওয়া শিশুদের স্মরণ করা নয়,বরং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিভাবকদের সচেতন করা এবং সমাজ ও প্রশাসনের দায়িত্বকে সামনে নিয়ে আসা। একটি শিশু নিখোঁজ হওয়া মানে শুধু একজন মানুষের হারিয়ে যাওয়া নয়,একটি পরিবার, একটি ভবিষ্যৎ এবং অনেক স্বপ্নের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাওয়া।
বর্তমান বিশ্বে শিশু নিখোঁজ হওয়ার কারণ অনেক। মানবপাচার এর অন্যতম ভয়াবহ কারণ। শিশুদের জোরপূর্বক শ্রম, ভিক্ষাবৃত্তি, অবৈধ দত্তক গ্রহণ কিংবা যৌন শোষণের জন্য পাচার করা হয়। এছাড়া পারিবারিক কলহ, দারিদ্র্য, অনলাইন প্রতারণা, অপর্যাপ্ত নজরদারি এবং সামাজিক অস্থিরতাও শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। প্রযুক্তির উন্নতির যুগে যেমন যোগাযোগ সহজ হয়েছে, তেমনি সাইবার অপরাধও বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ কখনও কখনও শিশুদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
একটি শিশু নিখোঁজ হলে পরিবারের মানসিক অবস্থা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সন্তানের অপেক্ষায় দিনের পর দিন কাটানো, অনিশ্চয়তা, ভয়, অপরাধবোধ ও অসহায়তা সব মিলিয়ে পরিবার একটি কঠিন মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যায়। অনেক সময় বছরের পর বছর কেটে গেলেও কোনো সন্ধান পাওয়া যায় না। তাই নিখোঁজ শিশুদের পরিবারগুলোর প্রতি সহানুভূতি ও সহযোগিতা দেখানো সমাজের দায়িত্ব।
🍂
এই সমস্যা মোকাবিলায় পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রথমত, অভিভাবকদের শিশুদের প্রতি যত্নশীল হতে হবে। শিশু কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, অনলাইনে কী করছে,এসব বিষয়ে সচেতন নজর রাখা জরুরি। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই নিরাপত্তা শিক্ষা দিতে হবে,অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে না যাওয়া, বিপদে সাহায্য চাওয়া, নিজের পরিচয় ও পরিবারের ফোন নম্বর জানা ইত্যাদি শেখাতে হবে।
বিদ্যালয়ও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। স্কুলে শিশু নিরাপত্তা, অনলাইন নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষামূলক আচরণ নিয়ে সচেতনতামূলক শিক্ষা চালু করা দরকার। পাশাপাশি প্রশাসনকে দ্রুত তদন্ত, সীমান্ত নজরদারি বৃদ্ধি, মানবপাচার দমন এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমানে অনেক দেশে নিখোঁজ শিশু খুঁজে বের করতে বিশেষ হেল্পলাইন, ডেটাবেস ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা চালু হয়েছে। তবে আইন ও প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক সচেতনতা। কারণ একটি শিশুকে নিরাপদ রাখা শুধু পরিবারের নয়, পুরো সমাজের দায়িত্ব।
আন্তর্জাতিক নিখোঁজ শিশু দিবস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে কখনও উদাসীন হওয়া যাবে না। প্রতিটি শিশুর নিরাপদ শৈশব, শিক্ষা, সুরক্ষা ও ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। শিশুদের জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলাই হোক এই দিবসের মূল অঙ্গীকার।
২৫শে মে আন্তর্জাতিক নিখোঁজ শিশু দিবস কেবল একটি দিবস নয়,এটি আমাদের মানবিকতা, সচেতনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতীক। একটি শিশু হারিয়ে যাওয়ার আগেই যদি আমরা সতর্ক হতে পারি, সচেতনতা বাড়াতে পারি এবং সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করি, তাহলে হয়তো অনেক শিশুকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। কারণ প্রতিটি শিশুই মূল্যবান, প্রতিটি শিশুই একটি পরিবারের স্বপ্ন, আর প্রতিটি শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা আমাদের সকলের কর্তব্য।
0 Comments