বিশ্ব ওটার দিবস
দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ২৭শে মে ওটার দিবস, ওটার কি, বন্য জগতে এর গুরুত্ব কি, আসুন এই সবকিছুই বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
ওটার বহুবচন ওটার্স। বেজি এবং মিঙ্কের অন্তর্গত বেশ কয়েকটি জলচর স্তন্যপায়ী প্রাণীর যেকোনো একটি, যাদের নখরযুক্ত জালের মতো পা এবং গাঢ় বাদামী লোম রয়েছে এবং যারা জলে বা জলের কাছাকাছি বসবাসকারী অন্যান্য প্রাণী যেমন, মাছ, ঝিনুক এবং কাঁকড়া খেয়ে জীবনধারণ করে। সামুদ্রিক ওটারের সাথে তুলনা করুন।
প্রকৃতির বুকে এমন কিছু প্রাণী আছে, যাদের উপস্থিতি শুধু পরিবেশের সৌন্দর্যই বাড়ায় না,বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তেমনই এক মিষ্টি, চঞ্চল ও বুদ্ধিমান প্রাণী হলো, ওটার বা উদবিড়াল। নদী, হ্রদ, জলাভূমি কিংবা সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী এই প্রাণীটি আজ নানা কারণে বিপদের মুখে। তাই ওটার সংরক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রতি বছর ২৮শে মে বিশ্ব ওটার দিবস পালন করা হয়।
🍂
বিশ্ব ওটার দিবস শুধু একটি প্রাণীকে স্মরণ করার দিন নয়,এটি প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। ওটার এমন একটি প্রাণী,যা সুস্থ জলজ পরিবেশের পরিচায়ক। কোনো নদী বা জলাভূমিতে ওটার থাকলে ধরে নেওয়া যায় যে, সেই পরিবেশ এখনও জীবনের জন্য উপযুক্ত।
ওটার দেখতে অনেকটা বিড়ালজাতীয় প্রাণীর মতো হলেও এরা আসলে মাংসাশী স্তন্যপায়ী প্রাণী। পৃথিবীতে প্রায় তেরো ধরনের ওটার দেখা যায়। কেউ নদীতে বাস করে, কেউ সমুদ্রে। এদের শরীর লম্বাটে, লোম ঘন ও জলরোধী, আর পা ঝিল্লিযুক্ত হওয়ায় তারা অসাধারণ সাঁতারু। মাছ, কাঁকড়া, ব্যাঙ প্রভৃতি জলজ প্রাণী এদের প্রধান খাদ্য।
ওটারদের স্বভাব অত্যন্ত খেলাপ্রিয়। দলবদ্ধভাবে খেলাধুলা করা, পানিতে লাফালাফি করা কিংবা কাদা মেখে গড়াগড়ি খাওয়ার দৃশ্য মানুষকে সহজেই আকৃষ্ট করে। কিন্তু এই হাসিখুশি প্রাণীটির জীবন আজ মোটেও নিরাপদ নয়।
বন উজাড়, নদী দূষণ, জলাভূমি ভরাট, অতিরিক্ত মাছ ধরা এবং অবৈধ শিকার,এসব কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ওটার সংখ্যা দ্রুত কমছে। অনেক সময় মানুষের লোভও তাদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তোলে। সুন্দর লোমের জন্য বা অবৈধ বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বহু ওটার শিকার হয়। ফলে কিছু প্রজাতির ওটার এখন বিলুপ্তির আশঙ্কায় রয়েছে।
ভারতের মতো উপমহাদেশীয় দেশগুলোতেও উদবিড়াল একসময় বেশ পরিচিত প্রাণী ছিল। গ্রামের নদী, খাল-বিল কিংবা জলাভূমির আশেপাশে তাদের দেখা মিলত। কিন্তু বর্তমানে নগরায়ণ, পরিবেশ দূষণ ও আবাসস্থল ধ্বংসের ফলে এদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। তাই এখন ওটার সংরক্ষণ শুধু পরিবেশবিদদের কাজ নয়, এটি আমাদের সবার দায়িত্ব।
বিশ্ব ওটার দিবস আমাদের শেখায় যে প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীরই আলাদা গুরুত্ব আছে। মানুষ যেমন পৃথিবীর অংশ, তেমনি ওটারও এই পৃথিবীরই বাসিন্দা। আমরা যদি নিজেদের সুবিধার জন্য নদী-জলাভূমি ধ্বংস করি, তবে ক্ষতি শুধু ওটারের নয়,শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষতির প্রভাব মানুষের জীবনেও ফিরে আসে,কারণ জীববৈচিত্র্য নষ্ট হলে প্রকৃতির ভারসাম্যও নষ্ট হয়।
ওটার রক্ষার জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, নদী ও জলাভূমিকে দূষণমুক্ত রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, বনাঞ্চল ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ করতে হবে। তৃতীয়ত, অবৈধ শিকার ও বাণিজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে, যাতে সবাই বুঝতে পারে।একটি ছোট প্রাণীকে বাঁচানো মানে একটি পরিবেশব্যবস্থাকে বাঁচানো।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবেশ সংস্থা, গণমাধ্যম ও সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে বিশ্ব ওটার দিবস পালন করলে শিশু-কিশোরদের মধ্যেও প্রকৃতিপ্রেম তৈরি হতে পারে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যদি প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখে, তবে পৃথিবীও আরও নিরাপদ ও সুন্দর হয়ে উঠবে।
আজকের পৃথিবীতে প্রযুক্তির অগ্রগতি যতই হোক, প্রকৃতির বিকল্প কিছু নেই। নদীর জল, সবুজ বন, পাখির ডাক কিংবা উদবিড়ালের দুষ্টুমি সব মিলিয়েই আমাদের পৃথিবী প্রাণবন্ত। তাই বিশ্ব ওটার দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শুধু মানুষ নয়, পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীর বেঁচে থাকার অধিকার আছে।
0 Comments