জ্বলদর্চি

কেন লিখি/বিশ্বজিৎ ঘোষাল

কেন লিখি

বিশ্বজিৎ ঘোষাল

কথায় বলে নিজের ঢাক নিজেকেই পেটাতে হয়। এই ক্ষুদ্র নিবন্ধে আমি সেই কাজটাই করছি। মানুষের লেখার প্রয়োজন কেন দরকার হয়? না লিখলেই বা কী ক্ষতি হতে পারে এ নিয়ে দীর্ঘ তর্ক-বিতর্ক চলতে পারে। আমাদের দেশে বহু শিক্ষিত মানুষ লেখেন না, তাদের চিন্তা ভাবনা লেখনির মাধ্যমে আর পাঁচজনের মতো সর্বজনের কাছে প্রকাশ করেন না; তাতে সমাজ বা সংসারের কোনো সমস্যা হয় না। অনেকে প্রয়োজনবোধে লেখেন, লেখাকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করেন এ রকম মানুষও সমাজে কম নয়। আবার অনেকে লেখেন চুপিসারে, লোকচক্ষুর অগোচরে। যখনই কোন ব্যক্তি লেখনি ধারণ করেন কিছু না কিছু উদ্দেশ্য তার থাকে। নিজ প্রয়োজন বা সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা তার লেখনির মধ্যে ফুটে ওঠে। আমিও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নই। কিন্তু লেখার বিষয়ের মধ্যে ব্যক্তি আমির উপস্থিতি কতটা থাকে এ নিয়ে বাগবিতন্ডা চলতে পারে।

লেখার বিষয় যা খুশি হতে পারে। শিক্ষামূলক রচনা বা সৃজনমূলক গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধই হোক সব লেখকই নিজের চিন্তা-চেতনা, যুক্তি, ভাবাদর্শ সর্বোপরি তার মননকে সবার সামনে আনার চেষ্টা করে। সে চায় তার যুক্তিবোধ কোথায় আর পাঁচটা ব্যক্তির থেকে আলাদা এবং কেন তার মতকে সাধারণ পাঠক নিজের বলে মনে করবে। যে চিন্তাভাবনা সবাই করে এমনকি আমিও করি তার সঙ্গে কোথায় বিরোধ বা কোথায় একমত সেটাই লেখনি ঠিক করে। মধ্যযুগের কবিরা বেশিরভাগ রচনায় নিজের সৃষ্টিশীল কর্মকে দৈবী আদেশ বা ইচ্ছা বলে ব্যক্ত করেছেন; তাঁদের নিজের মতকে স্বাধীনভাবে বলার পরিসর সেই যুগে ছিল না, তাই দেবতার ছলনাটুকুর আশ্রয় নিতে হয়েছিল। কিন্তু সমাজ বা মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁদের কোনো অংশে কম ছিল না। আধুনিক সময়ে দাঁড়িয়ে যেকোনো লেখকের সমাজের প্রতি দায়িত্ব সবচাইতে বেশি। আমার লেখনিও তার বাইরে নয়। ধরুন, আমি যদি একটা প্রণয়মূলক গল্পও লিখি, তাতেও সমাজ ব্রাত্য নয়।

যেটি লিখছি তার গুরুত্ব কতখানি বা কতটা তার গ্রহণযোগ্যতা সেটি নির্ভর করে বিষয় অনুযায়ী দৃষ্টিভঙ্গির উপর। আমার লেখনিতে সেই বিষয় যখন সদর্থক ভূমিকা নেয় তখনই আমি তাকে পাঠকের সামনে আনার ব্যবস্থা করি। হতেই পারে সেই লেখাটির সমঝদার পাঠক জুটলো না বা লেখা কেউ পড়তেই চাইলো না। আবার এও হতে পারে লেখাটি পড়ে কিছু মানুষের ভালো লাগল। আমার লেখার ক্ষেত্রে সবথেকে বড় বিষয় হল নিজের ভালো লাগা। আমার আমিটাকে সবার সামনে এনে ফেলা এবং প্রশ্ন করা- দেখো তো বাপু, আমি ঠিক না ভুল।

যা লিখছি তা যেমন নিজের দায়ে লিখছি আবার তেমনি পরের জন্যেও লিখছি। নিজের আমিকে লেখার মাধ্যমে যত পাঠকের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করতে পারব ততই আমার জিৎ। কারোর মনে হতেই পারে লিখে আমি কাগজের অপচয় বাড়াচ্ছি, তাতে কিছু লাভ নেই। হ্যাঁ একদিক দিয়ে দেখতে গেলে তা ঠিক। নিজেকে লেখক বলার চাইতে বাক্যবাগীশ বলাই সবচেয়ে শ্রেয়। কথা চেপে রেখে তো লাভ কিছু হয় না বরং সবার মধ্যে তা ভাগ করে নিলে নিজের মনের বোঝাটা কিছুটা হালকা হয়। সেটাই করা আমার মূল উদ্দেশ্য। 

🍂

Post a Comment

0 Comments