জ্বলদর্চি

খোজা মির্জা দিদার আলি বেগ (জমিদার, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২০৭
খোজা মির্জা দিদার আলি বেগ (জমিদার, তমলুক) 

ভাস্করব্রত পতি

পলাশীর যুদ্ধ। ১৭৫৭ এর ২৩ শে জুন, বৃহস্পতিবার। পলাশীর আমবাগানে বাংলার ভাগ্যাকাশে বিপর্যয় আছড়ে পড়ল। এদিকে মেদিনীপুরের বুকেও তখন বিপর্যয়ের ঘনঘটা। তাম্রলিপ্ত রাজবাড়ির অন্দরমহলে গৃহবিবাদের দামামা। অশান্তির মেঘ। মারা গেলেন রাজা কমলনারায়ন রায়। ফাঁকা ময়দান। দখল হল শাসনভার। দখল হল রাজত্ব। আর রাজত্বের ভার পড়ল খোজা মির্জা দিদার আলি বেগের হাতে। 

মালীবুড়ো তাঁর 'বৃহত্তর তাম্রলিপ্তের ইতিহাস'তে লিখেছেন, "গৃহবিবাদ রাজবংশে প্রবল আকার ধারণ করে। এই গৃহবিবাদের মধ্যেই রাজা কমলনারায়ণ রায় দেহত্যাগ করেন। ইতিপূর্বে নবাব দরবারে নিয়মিত তমলুক থেকে রাজস্বও প্রেরিত হোত না। এইসব নানা কারণে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে নবাব মসনদী মহম্মদ খাঁর প্রিয় বন্ধু খোজা মির্জা দিদার আলি বেগ তমলুক জমিদারী গ্রহণ করেন। ফলে তমলুকের রাজবংশ পদুমবসান অর্থাৎ বর্তমান রাজবাটী পরিত্যাগ করে বাঁহিচবেড়ে গড়ে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন।"

রাজা নরনারায়ন রায়ের (১৭০৪-১৭৩৮) দুই রানী ও দুই পুত্র ছিল। ছোট রানীর পুত্র কৃপানারায়ন রায় সবচেয়ে বড়। আর বড় রানীর ছেলে কমলনারায়ন রায় ছোট ছেলে। কৃপানারায়ন পেয়েছিলেন জমিদারীর ষোলো আনা। ১৭৩৭ এ তাঁর মৃত্যুর পর কমলনারায়ন রায়(১৭৩৮-১৭৫৬) হন ষোলো আনার জমিদার। এই কমলনারায়ন রায়ের দুই পত্নী রানী কৃষ্ণপ্রিয়া (১৭৫৬-১৭৮৩) এবং রানী সন্তোষপ্রিয়া (১৭৬৭-১৭৭০)। ১৭৫৭ সালে কমলনারায়ন রায়ের মৃত্যুর পর খোজা মির্জা দিদার আলি বেগ রাজবাড়ি দখল করেন। ১৭৬৭ সাল পর্যন্ত তিনি নিজের হাতে শাসনভার রাখেন। তাঁর মৃত্যু হলে ইংরেজ গভর্নমেন্টের আদেশে রাজ্য ফেরত পান রানী সন্তোষপ্রিয়া। আজও তমলুক রাজবাড়ির গেটের মুখে খোজা দিদার আলি বেগের সমাধি রয়েছে। সেখানে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজন বিভিন্ন পার্বণ পরবে চাদর চড়াতে আসেন। মেদিনীপুর শহরের বুকে এখনও রয়েছে দিদার আলি বেগের পরিবারের উত্তরসুরীরা। 

খোজা মির্জা দিদার আলি বেগ মোট দশ বছর ধরে তাম্রলিপ্ত রাজবাড়ির জমিদারির দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়কালে তিনি তাঁর জমিদারি এলাকার কৃষির উন্নয়নে বিশেষ নজর দেন। সেসময় তিনি যা করেছিলেন, তাতে আজও মানুষজন তাঁকে মনে রেখেছে। মেদিনীপুরের বুকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, তা সেসময়কালে ছিল অসাধারণ উদ্যোগ। 

তিনি তমলুকের কৃষিপ্রধান এলাকার মানুষজনের কথা ভেবে একটি মহতী উদ্যোগ নেন। আসলে তমলুক হল নিচু এলাকা। ফলে লাগাতার বৃষ্টি, বন্যা হলে পার্শ্ববর্তী কাশীজোড়া পরগণার জমা জল এসে প্লাবিত করত তমলুকের বিস্তীর্ণ এলাকা। ফলে তমলুকের ধান, পান সহ অন্যান্য কৃষিজ পণ্যের দফারফা হয়ে যেত সেই জলে। প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হত। এমতবস্থায় এই সমস্যার সমাধানে তমলুকের পশ্চিমপ্রান্তে একটি উঁচু বাঁধ নির্মাণ করে দেন খোজা মির্জা দিদার আলি বেগ। সেই বাঁধের অস্তিত্ব আজও রয়েছে। যা 'খোজার বাঁধ' বা 'খোজার ভেড়ি বাঁধ' নামে পরিচিত। নিকাশী থেকে ডিমারী পর্যন্ত বিস্তৃত। শোনা যায়, এই উঁচু বাঁধের নির্মাণের সময় বাঁধের মাটি শক্তভাবে জমাট করার জন্য হাতি আনা হয়েছিল। হাতি দিয়ে সেই মাটি মাড়ানো হয়েছিল।

🍂

Post a Comment

0 Comments