আর্জেন্টিনার ছবি ---Cassendra
পরিচালক : Oliveria Cezar
তনুশ্রী ভট্টাচার্য্য
তৃপ্তির অতৃপ্তি, প্রাপ্তির অপ্রাপ্তি
আর্জেন্টিনা ফুটবলের দেশ। মারাদোনা মেসির দেশ।উন্নয়নশীল দেশটি বৈচিত্র্যপূর্ণ। শহর নগর রাজধানীর নাগরিক জীবন যেমন আছে তেমনি আছে বঞ্চিত আদিবাসী সমাজ যারা এখনো নিজেদের কথা নিজেরা বলতে পারে না। তাদের কথা, জীবন যাপন পদ্ধতির সমস্যা বা তাদের জীবন দর্শন কিছু কিছু মানুষকে কৌতূহলী করে । এরকমই এক কৌতূহল একজন রিপোর্টারকে ধাবিত করেছিল চাকো সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে। ক্যাসেন্ড্রা নামক মুভিটি সেই অনুসন্ধানের চালচিত্র।
Cassandra একজন অল্পবয়সী মহিলা রিপোর্টার। সদ্যই সে তার পড়াশোনা শেষ করে এই রিপোর্টারের চাকরিটা নিয়েছে। তার এডিটর তাকে আর্জেন্টিনার এক দূরবর্তী গ্রামে পাঠায়। সেখানকার কয়েকটি বিশেষ জনজাতি গোষ্ঠী ---চাকো টোবা, উইচি প্রভৃতি দলবদ্ধ মানুষদের জীবনধারণ প্রণালী ও তাদের সংস্কৃতি, তাদের কোনো লড়াই আছে কি না, তাদের কোনো নেতা আছে কিনা, তাদের অভাব অভিযোগ সেই নেতারা শোনে কি না, বা তারা আদৌ ঠিক অভিযোগ জানাতে পারে কিনা এসব বিষয়ে রিপোর্ট করতে বলে।
ক্যাসেন্ড্রা আর্জেন্টিনার বহুদূরবর্তী গ্রামে গিয়ে চাকো সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে দিনের পর দিন তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ,জীবনধারণের মৌলিক চাহিদা রাস্তা, জল, খাবার নর্দমা, শিশু শিক্ষা, চাকরী ইত্যাদি পায় কি না সেগুলির ওপর খোঁজ খবর নিয়ে রিপোর্ট করতে শুরু করে। ছবি পাঠাতে থাকে।
এই আদিবাসী মানুষদের সঙ্গে দিনের পর দিন কথা ও সাক্ষাৎকার নিতে নিতেই সে ঐ মানুষগুলোর প্রতি আবেগতভাবে সংযুক্ত হয়ে পড়তে থাকে। তাদের সুখদুঃখের সাথী হয়ে ওঠে। তারাও এই বহিরাগত রিপোর্টার মেয়েটিকে স্বাগত জানিয়ে নিজেদের মনের কথা ব্যর্থতা হতাশা আশা আকাঙ্খার কথা সুন্দরভাবে জানাতে থাকে। বিশেষ করে মহিলারা তাদের মনের কথা খোলামেলা ভাবে বলতে পারছে। প্রকৃতিগত ভাবে এই পিছিয়ে পড়া আদিম জনগোষ্ঠী তেমনভাবে গুছিয়ে নিজের কথা বলতেও পারে না। ক্যাসেন্ড্রা ধৈর্য ধরে তাদের কথা শুনে ছোটো ছোটো প্রশ্ন করে উত্তরের ভেতর থেকে মূল নির্যাস টি নিয়ে রিপোর্ট লেখে আর ছবি তুলে পাঠায়।
তবে এই সব করতে করতে ক্যাসেন্ড্রার এক অন্তর গভীর অনুভূতি হয় যে এই সোজা মানুষগুলোর সরলতা নষ্ট হয়ে যায় এত অভাব অভিযোগ জানাতে জানাতে। সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে তাদের শান্ত অন্তর সত্তাকে তারা নষ্ট করে ফেলছে। এটা তাদের সরল চাহিদাবিহীন জীবনের সঙ্গে খাপ খায় না। ফলে যেন তাদের হৃদয়ের গভীরে কোথাও একটা শূন্যতা তৈরী হচ্ছে। সেটি এদের পক্ষে শুভ নয়।
🍂
সে একদিন এক স্থানীয় নেতার সাক্ষাৎকার নিল। সেই নেতা আগে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করত কিন্তু এখন সে ওসব ছেড়ে দিয়েছে কারণ সঠিকভাবে এবং স্বাধীন ভাবে সে কাজটি করতে পারছে না , সততার প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে তাই সে অনীহা দেখিয়ে অব্যহতি নিয়েছে। ক্যাসেন্ড্রা উপলব্ধি করল যে প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকা এই মানুষগুলোর কোনো মানসিক দূষণ ঘটে নি। এরা সবেতেই খুশি থাকতে জানে। প্রকৃতির মতোই নীরব কিন্তু উজ্জ্বল, শান্ত ও সৎ। তাঁরা বিশ্বাস করে যার হৃদয়ে গোলাপ ফোটে সেইই পারে প্রতিবাদ করতে। সাবটাইটেল লেখা হয়েছে --- A rebel means a rose
সংবেদীরাই প্রতিবাদী হতে পারে । অন্যেরা নয়। ( মনে পড়ছে আমাদের রাজ্যে বা দেশে প্রতিবাদের ঢালাও বন্দোবস্ত দেখে। আমরা কি একটু শিখব এদের কাছে ? এটাও এক জীবন দর্শন।) শহুরে ক্যাসেন্ড্রা এই উপলব্ধিতে নিজেই খুব খুশি হোল । খুব মৃদুভাবে সে নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথন শেষ করে তার থাকবার হোটেলে খুশিমনে নেচে নেচে বিলিয়ার্ড খেলল। তার পর রাতের অন্ধকারে তার প্রিয় জায়গাগুলো ঘুরতে বেরোল।
এর পরের থেকে আর কোনো ছবি বা রিপোর্ট সে তার এডিটরের কাছে পাঠায় নি। এডিটর চিন্তিত হয়ে কোনো খোঁজ খবর না পেয়ে নিজেই তাকে খুঁজতে বেরোল। এতদিন ক্যাসেন্ড্রা যে যে হোটেলে থেকেছিল সেই সেই জায়গায় খোঁজ করতে লাগল এবং তার একটি অনুভূতি বা ধারণা তৈরী হলে যে ক্যাসেন্ড্রাকে আর হয়তো পাওয়া যাবে না কারণ সে হয়তো অন্য আর একরকম জীবন বেছে নিয়েছে এই গ্রামেই।
এক হোটেলে তার হাতের চেনটা পেল এডিটর, এক টেবিলে রাখা গাছের টবের গোড়া থেকে,-- বুঝল কৃত্রিম বন্ধন খুলে ক্যাসেন্ড্রা প্রকৃতি ও তার সন্তানদের বন্ধনে আটকা পড়েছে। সে এখন নিরুদ্দেশ। আর কখনো ফিরবে না। ক্যাসেন্ড্রার মতো মানুষরা এইভাবেই হারিয়ে যায় সমাজের কল্যাণ কাজে?
ক্যাসেনড্রা কখনো ফিরল না।
এডিটর রোজ রাতে স্বপ্ন দেখে সে যেন আর্জেন্টিনার জঙ্গলের একটা গাছ হয়ে গেছে।
সিনেমাটি এখানেই শেষ হয়। এক তৃপ্তির অতৃপ্তি, প্রাপ্তির অপ্রাপ্তি এবং সমাপ্তির অসমাপ্তি বুকে নিয়ে দর্শক পর্দা থেকে চোখ ফেরান বাস্তবে।
আর্জেন্টিনার গ্রাম্য পরিবেশের লোকেশনে চোখে প্রশান্তি আসে। সিনেমার কাঠামোটিও প্রশান্তির। প্রান্তিক আদিবাসী গোষ্ঠীর বাড়ি ঘরদোর উঠোন আবর্জনা জামাকাপড় শুকনো করতে দেওয়া , শিশুর খেলা, মুরগী কুকুর বিড়াল ঘুরে বেড়ানো ---আমাদের এখানকার গ্রামের ছবি বলে ভুল হয়ে যাবে--- এত হুবহূ মিল। আর্জেন্টিনার এক প্রত্যন্ত গ্রামের সঙ্গে বেলপাহাড়ির গ্রামের কোনো পার্থক্য নেই। দর্শক হিসাবে যুগপৎ বিস্ময়াবিষ্ট ও আনন্দিত হলাম। মনে হোল ---সব দেশে আছে মোর ঘর---
কী আশ্চর্য মিল।
আর মানুষগুলোর মধ্যেও একই বৈশিষ্ট্য,--- কথা বলতে না চাওয়া, নিজেকে মেলে ধরতে লজ্জা, আবার সাহস পেলে সহজেই অপরিচয়ের বেড়া ভেঙে পরকে আপন করে নেওয়া --- আমাদের এখানের যে কোনো আদিবাসী গ্রামে গেলেও একই অভিজ্ঞতা হয় । এই কলমচির সেই অভিজ্ঞতা আছে।
সিনেমাটির এইসব আকর্ষণ ছাড়াও মূল আবেদন এই যে বহিরাগত কোনো একজন রিপোর্টার ক্যাসেন্ড্রা তাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়ে নতুন জগতের সন্ধানে সে নিজেকে মেলে ধরলো । সে আর ফিরল না কেন? সে ঠিক কোথায় গেল? সে কি ওদের মুখে ভাষা জুগিয়ে প্রতিবাদী করতে শেখাল? না কি তার নিজের আত্মোপলব্ধি হল তাই সে প্রকৃতির কোলেই থাকতে চাইল সবার অলক্ষ্যে? না কি অলক্ষ্যে রঙ লাগল তার অকারণের সুখে?----প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছে?
এই প্রশ্নের সঙ্গে কয়েকটি প্রশ্ন যোগ করা যাক। টেকনিক্যাল কিছু বিষয়ে। চলচ্চিত্র টি অত্যন্ত শ্লথ গতি কেন? ক্যামেরার কোনো কৌশল নেই । দৃশ্য জুড়ে জুড়ে মন্তাজ সৃষ্টির প্রচেষ্টাও জোরালো নয়।দর্শক কোনো আগাম আভাস পাবে না পরবর্তী দৃশ্যের। সিনেমার প্লট বা গল্প কাঠামো এড়িয়ে এটা কি অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট ফর্মে পড়ে? ফলে অষ্টআশি মিনিটের ছবিতে সাধারণ দর্শক প্রথম এক ঘন্টা দশমিনিট ধরে শুধুই সাক্ষাৎকার শুনছেন দেখেছেন যা যথেষ্ট বোরিং। তবুও ক্যাসেন্ড্রার হঠাৎ খুশি হয়ে নাচতে নাচতে বিলিয়ার্ড খেলাটি উপভোগ্য কিন্তু কেন যে সে এত আনন্দিত হলো তার কারণ নেই। সিনেমাটির যে দর্শনভিত্তি করে বানানো হয়েছে সেখানে এই উত্তর হয়তো আছে যে ক্যাসেন্ড্রা কি এবার নিজেকে খুঁজে পাবে প্রকৃতির মধ্যে নিরুদ্দেশ হয়ে ? এডিটর ক্যাসেন্ড্রার খোঁজ করে যাচ্ছে। পাচ্ছে না। কেবলই শেষ দৃশ্যে ক্যাসেন্ড্রাকে খুঁজে না পাওয়ার ব্যর্থতা আর ক্যাসেন্ড্রার তোলা আদিবাসী জনজীবন ও প্রকৃতির ছবিগুলো হাতে নিয়ে হোটেলের ঘরে হতাশ হয়ে এডিটরের ঘুমিয়ে পড়ার মধ্যে সিনেমাটিক ডাইমেনশন সিনেমাটিকে মুহূর্তেই অনন্য ক্ল্যাসিক পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
0 Comments