কমলিকা ভট্টাচার্য
আজ সত্যজিৎ রায়-এর জন্মদিন। আমি ঠিক করেছিলাম, তাঁকে নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখব। কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি বুঝলাম—তাঁকে বাইরে দাঁড়িয়ে লেখা যায় না। তাঁকে বুঝতে হলে তাঁর সৃষ্ট জগতের ভিতরে ঢুকতে হয়। কারণ তিনি নিজেকে সামনে আনেননি; সামনে এনেছেন মানুষকে। আর একজন স্রষ্টা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠেন তাঁর চরিত্রের ভিতর দিয়ে। তাই আজ আমি বেরোলাম এক অদ্ভুত সাক্ষাৎকার নিতে—মানুষটির নয়, তাঁর চরিত্রদের।
হঠাৎ যেন আমার চারিদিক কেমন অন্য রকম লাগতে লাগল। শহর, শহরতলি, গ্রাম, ট্রামলাইন, পুরনো বাড়ির বারান্দা, কাশফুলের মাঠ, কফি হাউসের ভিড়—সব যেন গল্পের পৃষ্ঠা হয়ে উঠেছে, আর আমি তার ভিতর দিয়ে হাঁটছি।
আমি ট্রেনের কামরায় বসে। বাইরে কাশফুলের ভেতর দিয়ে হঠাৎ মনে হলো, দু’টি ছায়া দৌড়ে গেল। আমি ট্রেনের চেন টেনে নেমে গেলাম। কাছে যেতেই চিনলাম—অপু আর দুর্গা; জন্ম তাদের পথের পাঁচালী-তে, আর বিস্তার পথের পাঁচালী-র পর্দায়।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তোমরা কে? তোমরা কি অপু আর দুর্গা?”
দুর্গা বলল, “হ্যাঁ।”
“তোমরা তো বিভূতি বাবুর বইয়ের পৃষ্ঠায় ছিলে। বাইরে এলে কী করে?”
অপু বলল, “মানিকবাবুই তো আমাদের বাইরের জগতের সঙ্গে সবার পরিচয় করিয়ে দিলেন।”
আমি বললাম, “তিনি কেমন ছিলেন, আমাকে বলবে?”
দুর্গা হেসে বলল, “তিনি আমাদের বানাননি। তিনি শুধু দেখেছিলেন।”
অপু বলল, “তিনি আমাদের দৌড় থামাননি।”
আমি বুঝলাম, এই ‘না থামানো’-র মধ্যে যে শিল্পবোধ, তা-ই প্রথম শিক্ষা। দারিদ্র্য আছে, কিন্তু তার প্রদর্শনী নেই; আবেগ আছে, কিন্তু তার নাটকীয় ঘোষণা নেই। স্রষ্টা দূরে দাঁড়িয়ে জীবনকে নিজস্ব ছন্দে বাঁচতে দিয়েছেন। পর্যবেক্ষণের এই সততাই তাঁর কাজের ভিত।
উত্তর কলকাতার এক পুরনো বাড়ির জানালায় দেখি এক নারী দূরে তাকিয়ে। হাতে দূরবীন নেই, আছে মোবাইল; তবু চোখে সেই একই নিঃসঙ্গতা। তিনি যেন চারু—রবীন্দ্রনাথের নষ্টনীড় থেকে উঠে এসে চারুলতা-র ফ্রেমে স্থির।
আমি বললাম, “কী দেখছেন?”
তিনি মৃদু হেসে বললেন, “বাইরে অনেক শব্দ, কিন্তু আমার ভিতরে খুব নীরবতা।”
রবীন্দ্রনাথের নীরব চারুর এই নীরবতাকে শোনার ক্ষমতা ছিল তাঁর। সংলাপের চেয়ে ফ্রেম, দৃষ্টি, বিরতি—এই সব দিয়ে তিনি মনের ভাষা বলেছেন, যাতে গল্পের চারু এক জীবন্ত মানবী হয়ে ওঠে। একজন নারীর অন্তর্জগৎকে এত সংবেদনশীলতায় চিত্রনাট্যে ফুটিয়ে তোলা এক বিরল ক্ষমতা। আর যখন চরিত্রের সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, তখন তার সঠিক উপস্থাপনার দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়।
ক্লান্ত পথে হঠাৎ কফি হাউসের সামনে এক তরুণ মানুষের চোখে চোখ পড়ল। তার চোখে তীক্ষ্ণ মনোযোগ। মনে হলো, এ তো ফেলুদা—যার জন্ম সত্যজিৎ রায়-এর কলমে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী দেখছেন?”
সে বলল, “মানুষ নিজের অজান্তেই অনেক কথা বলে ফেলে।”
এই পর্যবেক্ষণ, এই বিশ্লেষণী মন—স্রষ্টার নিজের কাজের ধরন। নিঃশব্দে দেখা, তথ্য জড়ো করা, তারপর স্পষ্ট সত্য তুলে ধরা। বাড়াবাড়ি নেই, শোরগোল নেই—আছে সংযমী বুদ্ধি।
স্টেশনের বাইরে গান আর ঢোলের শব্দে দু’জন পথশিল্পীকে দেখলাম। তাদের সরল উচ্ছ্বাসে দেখি গুপি গাইন আর বাঘা বাইন, যেমন দেখা যায় গুপি গাইন বাঘা বাইন-এ।
আমি বললাম, “তোমরা এত আনন্দ পাও কীভাবে?”
ওরা হেসে বলল, “ভালো মানুষ হওয়া খুব কঠিন নয়।”
ফ্যান্টাসির মোড়কে এখানে গভীর মানবতাবাদ। এদের মতো সাধারণ মানুষের রূপকথা দিয়ে তিনি যুদ্ধবিরোধিতা, লোভের সমালোচনা, শান্তির স্বপ্ন দেখিয়েছেন। কল্পনা তাঁর কাছে বাস্তবতা থেকে পালানো নয়; বাস্তবতাকে অন্য আলোয় দেখা।
বিকেলের পার্কে এক কোণে এক লাজুক মানুষ আকাশের ছবি তুলছে। সে যেন বঙ্কুবাবু।
আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম, “কী দেখছেন?”
সে হেসে বলল, “সবাই বাস্তব দেখে, আমি ভাবি—যদি অন্য কিছু হয়!”
এই ‘যদি’-র জায়গাটুকুই কল্পনার দরজা। শিশুসুলভ বিস্ময়কে তিনি কখনও হারাতে দেননি।
চায়ের দোকানে এক বৃদ্ধ গল্প জুড়েছেন বেশ অচেনা লোকেদের সঙ্গে। তিনি তারিণী খুড়ো।
বললেন, “গল্প না বললে স্মৃতি টেকে না।”
লোকজ অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, সংস্কৃতিকে গল্পের মাধ্যমে ধরে রাখার এই প্রবণতা তাঁর গল্পকার সত্তাকে প্রকাশ করে।
অদ্ভুত যন্ত্রপাতি হাতে এক তরুণ পরীক্ষা করছে। সে যেন প্রফেসর শঙ্কু।
বলল, “পৃথিবী যতটা দেখা যায়, তার চেয়ে বেশি অদেখা।”
কৌতূহল, বিজ্ঞানমনস্কতা, সম্ভাবনার প্রতি আস্থা—এই মনন তাঁর সৃষ্টিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
কলেজ স্ট্রিটের রাস্তায় এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হলো—নিজের লেখা নিয়ে গর্বিত, অথচ স্নায়ুচাপা। তিনিই বোধহয় লালমোহন গাঙ্গুলি, জটায়ু।
তিনি বললেন, “আমি নিখুঁত নই, তবু আমাকেও জায়গা দেওয়া যায়।”
মানুষের দুর্বলতাকে বিদ্রূপ নয়, স্নেহের সঙ্গে দেখার এই দৃষ্টিই তাঁর মানবিক রসবোধ।
পথ চলতে চলতে দেখি একজন মহিলা মুখখানা ঠিক দেবী চলচ্চিত্রের দয়াময়ীর মত।
ফুটপাতে গাছের তলায় দাঁড়িয়ে অন্য এক সর্বাঙ্গ জ্বলে যাওয়া মহিলারকে খাবার দিচ্ছে।
আমি এগিয়ে বললাম কি হয়েছে ওনার?
মহিলাটি বলল," দেশ শিক্ষিত হয়েছে।"
আমি বললাম," মানে।"
মহিলাটি বলল ,"দেখুন, এই মহিলাকে লোকেরা ডাইনী বলে পুড়িয়ে দিয়েছে ,কোনো ভাবে প্রাণে বেঁচেছে কিন্তু নিজেকে মানুষ বলে ভাবতে ভুলে গেছে।"
আমি বললাম ,"আপনার নাম?"
উনি হেসে বললেন দয়াময়ী, কখনও এই সমাজ নিজেদের স্বার্থে আমাদের দেবী বানায় কখনও বা ডাইনী।
আজ থেকে প্রায় ১৩০বছর আগের সমাজ যে অন্ধবিশ্বাসে ছিল সেই জায়গাটি ৬০ বছর বাদেও যে একই রকম ভাবে বিদ্যমান ছিল সত্যজিৎ রায় সেইটি বুঝেছিলেন তাই দেবী চলচ্চিত্রের মাধ্যমে মানুষের অন্তর আত্মাকে জাগিয়ে মনুষত্বের জাগরণের কথা বোঝাতে চেয়েছেন।
তারপর বড় কাঁচের বিলডিংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো শ্যামলেন্দু চ্যাটার্জিকে দেখতে পেলাম ।
তার চোখে সাফল্য ভেতরে আপোষ। সাফল্যেরও একটা মূল্য আছে। উচ্চ আকাঙ্ক্ষা এবং মানবিক দ্বন্দ্ব।
আধুনিক কর্পোরেট জীবনের এই নৈতিক সংকট যেন সত্যজিৎ রায় অনেক আগেই ধরেছিলেন আর তার প্রতিফলন আমরা দেখেছি সীমাবদ্ধ চলচ্চিত্রতে।
বাসে পাশে বসে থাকা মানুষটিকে দেখলাম—হাজারো মানুষের ভিড়ে তিনি যেন আলাদা। অবৈধ পাহাড় খনন নিয়ে মানুষকে সচেতন করতে গিয়ে আজ তিনি দেশের উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের রোষানলে; প্রায় ‘দেশের শত্রু’ তকমা পেতে বসেছেন।
হঠাৎ মনে পড়ে গেল ডা. অশোক গুপ্ত-র কথা—গণশত্রু ছবিতে যিনি জলদূষণ থেকে মহামারির আশঙ্কার কথা কর্তৃপক্ষকে জানাতে গিয়ে নিজেই অন্যায়ের শিকার হন, আর মিথ্যে অপবাদে ‘গণশত্রু’ হয়ে ওঠেন।
এখানেই ধরা পড়ে সত্যজিৎ রায়-এর চরিত্রচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তিনি নায়ক তৈরি করেননি; তৈরি করেছেন নৈতিকভাবে দৃঢ়, একলা মানুষ—যারা সত্যের পাশে দাঁড়ায়, যদিও তার মূল্য দিতে হয় সামাজিক অপবাদ, একঘরে হয়ে যাওয়া, কিংবা প্রতিষ্ঠানের বিরাগভাজন হওয়া। তাঁর দৃষ্টিতে সাহস মানে উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদ নয়, বরং যুক্তি, সততা ও মানবকল্যাণের প্রতি দায়বদ্ধতা। তাই তাঁর চরিত্ররা ক্ষমতার বিরুদ্ধে নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়—আর সেই কারণেই তারা সময় পেরিয়ে আমাদের বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গেও মিলে যায়।
বাস থেকে নেমে বাসস্টান্ডেই মিললাম ক্লান্ত দৃঢ় এক নারী জয়িতার সঙ্গে। স্বাধীনতা মানে শুধু উপার্জন নয় আত্মসম্মান। নারীর স্বনির্ভরতার প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক।
আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগেও নারীর আত্মসম্মান এবং স্বনির্ভরতার প্রশ্নে সত্যজিৎ বাবু কতটা সমাজসচেতন ছিলেন তার তীক্ষ্ণ ও স্পষ্ট উদাহরণ তাঁর মহানগর ছায়াছবিতে আরতি মজুমদারের সাথে জয়িতার এত মিল।
এদিকে চায়ের দোকানের পাশে রকে বসে আড্ডায় হাসতে হাসতে তীক্ষ্ণ কথা বলছে হরি।যেন সেই পরিচিত রায় মহাশয়ের পরিচিত চরিত্র নাসিরুদ্দিন। রসিকতার আড়ালে সমাজের অসংগতিকে ধরার যে ক্ষমতা তার আধুনিক মননের পরিচয়।
সবার শেষে দেখা পেলাম উঁচু ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে একলা একটি শিশু। হয়ত বাবা-মায়ের অফিস থেকে ফেরার পথ চেয়ে কিন্ত তারা কি তার মনের সব কথা বোঝে?শিশুটির কল্পনার জগতে প্রবেশ করতে পারে?
এই বাচ্চাটি কি মুকুল?
সবার থাকে আলাদা কিন্তু আলাদা হওয়া কি তার স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার পথে বাঁধা।
সত্যজিৎ রায় সোনারকেল্লায় মুকুলের ভিতর শিশুমনের কল্পনা আর বিশ্বাস এগুলোকে কখনোই হালকা করে দেখেননি বরং একটি শিশুর স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে ওঠাকে মূল্য দিতে চেয়েছেন।
এই কথোপকথনের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে যে ভাবমূর্তি ফুটে ওঠে, তা এক বহুমাত্রিক স্রষ্টার—পর্যবেক্ষক, মনস্তত্ত্ববিদ, মানবতাবাদী, রসিক, বিজ্ঞানমনস্ক এবং নিঃশব্দ কারিগর।
তিনি চরিত্র সৃষ্টি করেননি, চরিত্র চিনে নিয়েছিলেন। আবেগ চাপিয়ে দেননি, পরিস্থিতিকেই কথা বলতে দিয়েছেন। তাই তাঁর সৃষ্ট জগতে সংযম আছে, স্বচ্ছতা আছে, আর আছে গভীর মানবিকতা।
আজও সেই মানুষগুলো আমাদের চারপাশেই আছে—নাম বদলেছে, সময় বদলেছে, কিন্তু মানুষ বদলায়নি। তাই তাঁকে আলাদা করে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না; তিনি ছড়িয়ে আছেন তাঁর সৃষ্ট মানুষের মধ্যে।
শেষে বুঝলাম, আমি কোনও প্রবন্ধ লিখিনি—শুধু সেই মানুষগুলোর সঙ্গে দেখা করার অভিজ্ঞতা লিখে রাখলাম, যাদের ভিতর দিয়ে একজন স্রষ্টা আজও বেঁচে আছেন।
10 Comments
অপূর্ব কল্পনা। সত্যজিতকে এভাবে আত্মীকরণ করা অপূর্ব। লেখিকাকে অভিনন্দন।
ReplyDeleteঅনেক ধন্যবাদ।🙏
Deleteঅন্যরকম। চরিত্রগুলির মুখের কথা গুলি অনবদ্য ।
ReplyDeleteঅনেক ধন্যবাদ।🙏
Deleteকল্প সাক্ষাৎকার এক অকল্পনীয় সৃষ্টির দরজা খুলে দিল।এ রকম ভাবে এত গভীর প্রসঙ্গ এত স্বল্প কথায় তুলে ধরা অচিন্তনীয়। বারবার পড়তে হয়। সুন্দর ঝরঝরে লেখা, সাবলীল ভাষায় ভাষার অংলঙ্কারে হাবুডুবু না খাইয়ে সহজেই আকাশ ছোঁয়া শিল্পীর সারা জীবনের বিরাট কাজের ছোট ছোট অ্্শের উদাহরণে তার শিল্পী মনের গভীর চিন্তা ভাবনা তুলে ধরতে কলমের জোর লাগে। অভিনন্দন।
ReplyDeleteঅনেক ধন্যবাদ।🙏
DeleteShakespeare তাঁর Hamlet নাটকে দেখিয়েছেন- Hamlet যখন তাঁর actor দের উদ্দেশ্যে necessary instructions দিচ্ছে তখন বলছে "hold, as it were,the mirror up to nature:to show virtue her feature,scorn her own image,and the very age and body of the time his form and pressure." আপনার এই নাটকীয় সংলাপ সেই কথার ই প্রতিধ্বনি।কাল্পনিক সংলাপ গুলি খুব সাবলীল ও সিনেমাটোগ্ৰাফিক হয়েছে।
ReplyDeleteভালো থাকবেন।
স্যার,আপনার এই মতামত আমার জন্য খুবই মূল্যবান।
ReplyDeleteপ্রণাম নেবেন।ভালো থাকবেন।
অসাধারণ খুব ভালো ভালো লাগলো
ReplyDeleteঅনেক ধন্যবাদ।🙏
Delete