মৌমিতা চ্যাটার্জী
মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল মাঝে”
ব্রহ্মান্ডব্যাপী তাঁর বিস্তৃতি। চরাচরব্যাপী তাঁর অবস্থান। তাঁর আদি নেই, নেই অন্ত। তিনি অনন্ত। সমগ্র মহাবিশ্বকে তিনি ধারন করে আছেন। আমরা মানব, তাঁর অস্তিত্বের ওপর বিশ্বাস রেখে সেই পবিত্র রশ্মির অনির্বাণ প্রবাহে বয়ে চলিমাত্র। রবীন্দ্রনাথ বহুবার তাঁর অনিন্দ্যসুন্দর লেখনীতে অনুভব করাতে চেয়েছেন পরমাত্মার মহিমা, বিশ্বব্যাপী সেই ধ্বন্যাত্মক, অক্ষয় শক্তিপুঞ্জ যাঁর অঙ্গুলিহেলনে দ্যোদুল্যমান এই দরবার।
মহাবিশ্বের সাথে সারসত্য হল ব্রহ্ম।
“অহং ব্রহ্মাস্মি’।
যজুর্বেদের বৃহদারণ্যক উপনিষদে পাওয়া উক্তিটি অদ্বৈত বেদান্তের মূল দর্শন। "অয়ং আত্মা ব্রহ্ম", "তৎ ত্বং অসি" ও "প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম" অর্থাৎ আত্মা শুধুমাত্র মন বা শরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সমগ্র সীমাহীন মহাবিশ্বকে প্রকাশ করে।
🍂
ব্রহ্মের স্বরূপকে উপলব্ধি করতে না পারলে জীবনের সমান্তরাল পথের অস্তিত্ব সন্ধানে ব্যর্থ হতে হয়। তাই বুঝতে হবে তার প্রকৃতিকে। বিশ্বকবির সৃষ্টিতে যে আবেশ , যে অন্তর্নিহিত শক্তি তাতে সবসময়ই স্বাতন্ত্র্যতা লক্ষণীয়, শুধু তাইই নয়, আধ্যাত্মিকতাও পূর্ণরূপে প্রকাশিত।
বর্তমান ভারতের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আমরা সর্বদা উপলব্ধি করি তাঁর জাজ্জ্বল্যমান উপস্থিতি। তাঁর কবিতা, গান, জীবনদর্শনে তৎকালীন সমাজের ফুটে ওঠা চিত্রকে অবলম্বন করেই আজও পদক্ষেপ নির্ধারণ করে বর্তমান সমাজ।
আমাদের দৈনন্দিন চেতনায়, সুখে,দুঃখে অন্তরাত্মা জুড়ে তাঁরই উজ্জ্বল উপস্থিতি। রবীন্দ্রনাথের রচনায় একদিকে প্রধান্য পেয়েছে প্রাচ্য, পাশ্চাত্যের শিক্ষা, ভাবনা অন্যদিকে আধ্যাত্মিকতার উদ্ভাস।
1906 সালে তাঁর রচিত “আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার তলে” শীর্ষক সংগীতটির ছত্রে ছত্রে উদ্ভাসিত হয়েছে মহাশক্তির পদতলে আত্মসমর্পণের বাণী। কী ভীষন শক্তিময় এই আবেদন! জীবনবোধের ধ্রুব সত্যই যেন ধ্বনিত হয়েছে বারবার। কবি মানবমুখী মতের প্রসারতা চেয়েছেন ধর্ম এবং আধ্যাত্মিক চেতনায়।
‘অহংবোধ’।
মানবের উন্নতি এবং কল্যাণসাধনের পথে অন্তরায়ের অন্যতম কারন। কুরুক্ষেত্রের পটভূমিতে রচিত হয় যে পবিত্র গীতার বাণী, তাতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে অহংকার দূর করার সম্যক জ্ঞান প্রদান করেন। গীতার দ্বাদশ অধ্যায়ের সূচনায় শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে সাকার ও সত্য স্বরূপের বিবরণ দেন।
কুরুক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই যুদ্ধের পনেরতম দিনে শ্রীকৃষ্ণ বীরযোদ্ধা মহারথী কর্ণের
শরনিক্ষেপের বারংবার প্রশংসায় মত্ত হন। ঘটনাটি এইরূপ, অর্জুন কর্ণের উপর একটি তীর অবতরণ করেন এবং তার আঘাতে কর্ণের রথ প্রায় দশ হাত দূরত্বে সরে যায় এবং যখন কর্ণ অর্জুনের উপর একটি ধনুক অবতরণ করেন তখন তার রথ মাত্র দুই হাত দূরত্বে সরে যায়। তখন ভগবান কৃষ্ণ উচ্চস্বরে মহারথীর প্রশংসা করেন। তখন অর্জুন ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে প্রশ্ন করলেন যে,-”আমার আক্রমণ এতই শক্তিশালী যে কর্ণকে প্রায় মাটি থেকে নিক্ষেপ করতে বাধ্য করে এবং তার আক্রমণে আমাদের রথ কয়েক হাত নিক্ষেপিত হয়েছে মাত্র। তারপরও আপনি ক্রমাগত কর্ণের প্রশংসা করছেন কেন?”
উত্তরে ভগবান জানান, “আমি নারায়ণ, রথের সম্মুখে অবস্থান করে, সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড সমান ওজন ধারণ করছি এবং ভগবান হনুমান ধ্বজায় অবস্থান করে রথকে সমস্ত আক্রমণ থেকে রক্ষা করছেন। এমতাবস্থায় আমাদের রথকে কয়েক হাত দূরে সরাতে সক্ষম হয়েছেন যিনি তাঁর চেয়ে বড় বীর আর কে হতে পারে! তীরন্দাজদের মধ্যে কর্ণই সর্বশ্রেষ্ঠ” এইভাবে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে অহংবোধ ত্যাগের ঈঙ্গিত প্রদান করেন।
জগতে ব্রহ্মই পরমসত্য। তাঁর থেকেই সমগ্র সৃষ্টির উৎপত্তি আবার তাতেই সমাহিত হয় সকল জাগতিক অস্তিত্ব। যথার্থ ‘ক্ষেত্রজ্ঞ’ অর্থাৎ ঈশ্বরের সঙ্গে জীবাত্মার একাত্ম হওয়ার জ্ঞানলাভ করতে পারলেই অহংবোধ জয় করা সম্ভব।বেদের ব্রহ্মসূত্রে ‘ক্ষেত্রজ্ঞ’ তত্ত্বের বিশদে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এছাড়াও ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বিষয়টির সম্যক ধারণা প্রদান করেছেন। একটু বর্ণনায় আসি। ‘ক্ষেত্র’হল বস্তু সমন্ধীয় যা ক্ষণস্থায়ী এবং সতত পরিবর্তনশীল।
ক্ষেত্রজ্ঞ ধারণাটি দেহ সম্পর্কিত ধারণার জ্ঞান অর্থাৎ আমাদের দেহ ক্ষণস্থায়ী, নশ্বর। কিন্তু আত্মা অবিনশ্বর।
অহংবোধ আমাদের মনকে স্পর্শ করে। যা অপবিত্র করে তোলে চিন্তনকে। অথচ যে অহংবোধের নাগপাশে আমরা জড়িয়ে থাকি সেটিও আমাদের নিজস্ব নয়, প্রকৃতির পাঁচটি আদি উপাদানের মধ্যেই সমাহিত। তাই অহংকার, দর্প নিরর্থক।
মনে সাথে কর্মের নিবিড় যোগাযোগ।
তাই তো কবি কথায়, “ রং যেন মোর মর্মে লাগে, আমার সকল কর্মে লাগে”
অর্থাৎ রঙ মানেই সহজ, সরল আনন্দ। সেই আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক মননে, চিন্তনে ও কর্মপরিসরে। নির্মল আনন্দ মুছে দিক সকল মালিন্য।
কখনও এই কর্মের মহানতাই অহংবোধের মায়াজালে আবদ্ধ হয়। আপন শ্রেষ্ঠত্বের অভিমানের প্রভাবে তখনই আত্মা দ্বেষ ও বিকারের সংস্পর্শে আসে। মানুষ তার অস্থায়ী অস্ত্বিত্বর ধ্রুবসত্যতা থেকে আত্মবিস্মৃত হয়। ফলস্বরূপ আত্মদর্পের চোরাবালিতে ডুবতে থাকে সৎচিন্তা, সৎকর্মের অমলতা।
“সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চক্ষের জলে”
কবি চান তাঁর উচ্চশির সর্বদা অবনমিত হোক সেই মহান সৃষ্টিকর্তা পরমেশ্বরের পাদপদ্মে। তাঁর সমগ্র রচনাটিতে ধ্বনিত হয়েছে জীবনাদর্শের চিরসত্য বাণীটি। অহং বা আমিত্বের ধারনা পরিত্যাগ করলেই পরমব্রহ্মের সঙ্গলাভ সম্ভব।আত্মচেতনা, সৎবিবেক উদ্ভুত হলেই পশ্চাতাপের অশ্রুধারায় বয়ে যায় আমিত্বের দম্ভ, আর তখনই আসে শরীর ও অন্তঃকরণের শুদ্ধি।
“ আমারে না যেন করি প্রচার আমার আপন কাজে,
তোমারি ইচ্ছা করো হে পূর্ণ আমার জীবনমাঝে।”
আমরা পরমব্রহ্মের ইচ্ছাধীন।
আত্ম তথা সামাজিক হিতসাধন আমাদের কর্তব্য। তাঁর ইচ্ছা ব্যতীত একটি পাতাও হেলে না। আমরা যে কর্ম আপন প্রচেষ্ঠায় সম্পাদন করি বলে মনে করি, তা বস্তুতঃ জগদীশ্বরেরই ইচ্ছা। তিনি তাঁর ইচ্ছাকৃত কর্মই আমাদের উপলক্ষ্যে পরিণত করে সম্পন্ন করেন। অতএব বলা যায় আমরা নিত্যযাপনে তাঁরই কাজ করি। তবে কীসের এত দর্প! একটি কাহিনী মনে পড়ছে,
একবার দেবরাজ ইন্দ্র ও অন্যান্য দেবগণ ক্ষমতার অহংকারে বিশ্বব্রহ্মান্ডে নিজেদের শ্রেষ্ঠজ্ঞান করা শুরু করেন। এই নিয়ে স্বর্গসভায় যখন তাঁরা আলোচনায় রত, হঠাৎ সেখানে আবির্ভূতা হয় এক অপূর্ব তেজরশ্মি। সেই জ্যোতির তীব্রতায় সমগ্র দেবলোক উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে ওঠে। তিনি একটি তৃণকে নির্দেশ করে জানান, যিনি ঐ তৃণকে স্বীয় তেজে ধ্বংস করতে পারবেন তাঁকেই শ্রেষ্ঠতম হিসেবে গণ্য করা হবে।এ কথা শোনার পর অগ্নি, বরুন,পবন এমনকী ইন্দ্র স্বয়ং শক্তি প্রদর্শন করেন। কিন্তু বলাই বাহুল্য তৃণকে ধ্বংস করা তো দুরস্ত, তৃণের একটি অংশেরও কোনো ক্ষতি হল না। দেবতারা হতাশ হলেন। অতঃপর সেই তেজরশ্মি পুনরায় ঘোষনা করে জানান যে, দেবতারা ব্যর্থ মহাশক্তিরই ইচ্ছায়, কারণ তিনিই চাননি। এই ঘটনা প্রমাণ করে পরমাপ্রকৃতি বা আদিশক্তি দেবতাদের দর্পও নাশ করেন।
“ সকলই তোমারই ইচ্ছা, ইচ্ছাময়ী তারা তুমি মা,
তোমার কর্ম তুমি কর মা, লোকে বলে করি আমি”- এই আপ্তসত্যের মুখোমুখি হতে পারলেই আমরা মোহরূপী আত্মদর্পের চোরাবালি থেকে উদ্ধার করতে পারব আপন আত্মাকে। মানুষ যেমনই হোক, আত্মম্ভরিতা যদি একবার প্রবেশ করে অন্তরাত্মায় তবে ধ্বংস অনিবার্য।
“ অতি দর্পে হত লঙ্কা” তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
কবিগুরুর ধীশক্তিকে যদি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা যায়, তবে বোঝা যায় তার বিশ্বমানবতাবোধ, দর্শন সমসাময়িক সময় থেকে বহুদূর বিস্তৃত ছিল।
তাঁর অগণিত সৃজনে আমরা উপনিষদের দার্শনিক অনুপ্রেরণার ছোঁয়া পাই। তাঁর মতে, মানুষ কর্মের মধ্যেই আপন অন্তরের অদৃশ্য ক্ষমতা, শক্তিকে বাস্তবে দৃশ্য করেছে এবং সমাজের নানা স্তরে নিজেকে খোঁজার চেষ্টা করেছে। কবি বিশ্বমানবের সাথে সংযুক্ত হয়েই পরমাত্মার সাথে মিলনের ইচ্ছা রেখেছেন। তিনি আরও চান, আপন গৌরবকে আমরা যেন তাঁর চরণকমলে অর্পন করতে পারি। তবেই উন্মোচিত হবে আমাদের মুক্তির পথ। সেখানে আর ‘ আমি’ আলাদা করে স্থান পাবে না। তিনি প্রার্থনা করেছেন সমগ্র জাতির হয়ে,
“ আমারে আড়াল করিয়া দাঁড়াও হৃদয়পদ্মতলে” মানবচিত্ত দূর্বল, দ্বিধাগ্রস্ত। আপন মাহাত্ম্যটুকুকে অবলম্বন করে শ্রদ্ধা অর্জনের চেষ্টায় নিমগ্ন। তাইতো সমগ্র বিশ্বজুড়ে এত অস্থিরতা। জটিলতার আবর্তে ঘূর্ণায়মান মানুষের তপ্তপ্রাণকে ক্ষণিকের শান্তিপ্রদানের জন্য তিনি প্রার্থনারত, -“বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি”
অতএব, অহমিকাকে জয় করে
কবির সুরে কন্ঠ মিলিয়ে এই হোক আমাদের শুভ আবেদন, হে জ্যোতির্ময়, আমার প্রাঞ্জল চিত্ত বিকশিত হোক তোমার জ্ঞানালোকে, আমার সত্তায় বিস্তৃত হোক তোমার সদিচ্ছা। আমি নিমিত্তমাত্র। এ জগতে তুমি ব্যতীত আমি অস্তিত্বহীন। আমার লৌকিক অলৌকিক সকল পার্থিব প্রতিভা তা তো তোমারই দান। দৈনন্দিন জীবনে উচ্চারিত হোক তোমারই জয়গান। তুমিই সত্য, তুমিই সুন্দর- তোমার এই নিত্যতার স্বরূপ আমি যেন অনুভব করি প্রাপ্ত বোধে। তোমার শ্রীচরনই হোক আমার নির্ভরতা ও পরম নিরুদ্বেগের আশ্রয়স্থল।
0 Comments