প্রয়াত 'শ্রীমান অনীক' দত্ত
পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী
নক্ষত্রপতন! চলে গেলেন বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম প্রতিভাবান পরিচালক সত্যজিতের 'শ্রীমান অনীক' দত্ত। কলকাতাতেই জন্ম এবং কলকাতাতেই বেড়ে ওঠা তাঁর।চলচ্চিত্রে জগতে আসার আগে প্রায় দু'দশক ধরে অত্যন্ত সফলভাবে বিজ্ঞাপন জগতের সাথে যুক্ত ছিলেন তিনি এবং এই সময়ে বহু বিজ্ঞাপনী ছবি তৈরি করেছিলেন। তাঁর তৈরি করা সেই ছবিগুলো হিউমার, বাস্তবধর্মী সংলাপ এবং অভিনব ভাবনার জন্য দর্শক মহলে দারুণ সাড়া ফেলেছিল।
বিজ্ঞাপন জগতে অনীক দত্তর এই দীর্ঘ ক্যারিয়ার তাঁর চলচ্চিত্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কেবল শক্তিশালী ভিত্তিই তৈরি করেনি, বিজ্ঞাপন থেকে রূপোলী পর্দা, এক অনন্য সৃজনশীল যাত্রার রূপকারও করে তুলেছিল তাঁকে।
অনীক দত্ত দীর্ঘদিন বাংলা চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছেন তাঁর চিন্তাশীল এবং আলাদা ধারার সিনেমার মাধ্যমে। বাংলা সিনেমার চেনা ছক ভেঙে তিনি এমন এক নতুন ধারার জন্ম দিয়েছেন, যা একাধারে অত্যন্ত বিনোদনমূলক এবং গভীরভাবে চিন্তাশীল। তাঁর সিনেমা কেবল প্রেক্ষাগৃহে দর্শকদের হাসায়নি, হল থেকে বেরোনোর পর সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে ভাবতেও বাধ্য করেছে। তাঁর কাজের মধ্যে ছিল সমাজ, ইতিহাস, স্মৃতি এবং বাঙালির সংস্কৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন।
২০১২ সালে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ ছবির মাধ্যমে রাতারাতি জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছিলেন অনীক দত্ত। ভৌতিক গল্পের আড়ালে সিনেমাটিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের যে উপস্থাপনা ছিল, সেটি বাংলা সিনেমায় এক ‘মাইলস্টোন’ হিসেবে বিবেচিত হয়। চমৎকার কমিক টাইমিং এবং সামাজিক বার্তা সম্বলিত এই ভূত-ভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক ছবিটি বক্স অফিসে ব্লকবাস্টার হিট হওয়ার পাশাপাশি কাল্ট ক্লাসিকের মর্যাদা পায়। এরপরে তিনি 'আশ্চর্য প্রদীপ', 'মেঘনাদবধ রহস্য', 'ভবিষ্যতের ভূত' , 'বরুণবাবুর বন্ধু' এবং সত্যজিৎ রায়ের 'পথের পাঁচালী' তৈরির নেপথ্য কাহিনী অবলম্বনে প্রশংসিত ছবি 'অপরাজিত' পরিচালনা করেন। 'অপরাজিত' ছবিটি সিনেমাটোগ্রাফার সুপ্রতীম ভোলের ক্যামেরায় সাদা-কালো ফ্রেমে শুট করা হয়েছিল। তাঁর এই ছবি দর্শককে সরাসরি ১৯৫০-এর দশকের কলকাতায় ফিরিয়ে নিয়ে যায় এবং 'পথের পাঁচালী'-র নস্টালজিয়াকে জীবন্ত করে তুলেছিল। এই 'ডকু-ফিচার'টি প্রমাণ করেছিল যে অনীক দত্ত কেবল সমসাময়িক ব্যঙ্গচিত্রেই পারদর্শী ছিলেন না, বরং ধ্রুপদী চলচ্চিত্র নির্মাণেও তাঁর দখল ছিল আন্তর্জাতিক মানের।
অনীক দত্ত চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সমসাময়িক রাজনীতি, সমাজের ভণ্ডামি এবং কর্পোরেট সংস্কৃতিকে হাসির ছলে তীব্র আক্রমণ করেছিলেন । তাঁর ছবির সংলাপগুলি ছিল অত্যন্ত চটজলদি এবং বুদ্ধিদীপ্ত শব্দচয়নে ঠাসা । ' ভূতের ভবিষ্যৎ'-এর সংলাপগুলো বাঙালির দৈনন্দিন আড্ডায় এবং মিম-এ দারুণ জনপ্রিয়ও হয়ে ওঠে। সিনেমাটিকে আপাতদৃষ্টিতে নিখাদ কমেডি মনে হলেও, গভীরে সেটি অত্যন্ত ধারালো রাজনৈতিক ও সামাজিক বার্তা বহন করেছিল।
২০১৯ সালে তাঁর তৈরি রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্র 'ভবিষ্যতের ভূত' সমকালীন রাজনীতির ওপর এতটাই তীব্র আঘাত করেছিল যে, মুক্তির মাত্র একদিন পরেই কলকাতার প্রেক্ষাগৃহগুলো থেকে সিনেমাটি রহস্যজনকভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল । পরবর্তীকালে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে ছবিটি আবার প্রদর্শিত হয় এবং এটি স্বাধীন মতপ্রকাশের পক্ষে এক বড় জয় হিসেবে গণ্য হয়েছিল।
🍂
বাংলা ভাষার বিভিন্ন রূপ এবং বিবর্তনকেও সংলাপে দারুণভাবে ব্যবহার করেছিলেন তিনি। বিজ্ঞাপনে তাঁর অল্প সময়ে গল্প বলার প্রভাবেই প্রভাবিত হয়েছিল তাঁর সিনেমার দৃশ্যগুলোও। সেখানে কোথাও অহেতুক কোনো দীর্ঘসূত্রতা ছিল না। তিনি বাণিজ্যিক ধারার সস্তা বিনোদন বা অতি-বৌদ্ধিক নীরস সিনেমা, কোনোটাতেই বিশ্বাসী ছিলেন না , বরং বিনোদনের মোড়কে সমাজকে আয়না দেখানোই ছিল তাঁর মূল দর্শন। দেবজ্যোতি মিশ্রর মতো গুণী সঙ্গীত পরিচালকদের সাথে কাজ করে তিনি চলচ্চিত্রে ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক্যাল বা ভারতীয় রাগ সঙ্গীতের একটি ক্লাসিক্যাল আবহ তৈরি করেছিলেন । বিশেষ করে 'অপরাজিত' ছবিতে সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্টির সেই আইকনিক আবহকে পুনর্নির্মাণ করা এবং দৃশ্যগুলোর টানটান উত্তেজনা ধরে রাখতে আবহসঙ্গীত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তাঁর 'মেঘনাদবধ রহস্য' ছবিতে অভিনেতাদের দিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়ানোর পরীক্ষণটিও দারুণ প্রশংসিত হয়েছিল। তাঁর কাজের মধ্যে ছিল সমাজ, ইতিহাস, স্মৃতি এবং বাঙালির সংস্কৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন।
অনীক দত্তের চলচ্চিত্র ভাবনা প্রথাগত দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের পক্ষে কথা বলেছিল। তাঁর চলচ্চিত্রে বারবার পুঁজিবাদের আগ্রাসন এবং সাধারণ মানুষের শোষণের চিত্রই উঠে এসেছিল।
তিনি কোনো নির্দিষ্ট দল বা রঙের সুবিধাভোগী ছিলেন না কিন্ত তিনি প্রগতিশীল বাম-ঘেঁষা আদর্শের মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাত্ত্বিক কমিউনিস্ট না হলেও তাঁর জীবনবোধ ও চলচ্চিত্রের পরতে পরতে তীব্র রাজনৈতিক চেতনা এবং বামপন্থী মনস্তত্ত্বের স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছিল। 'ভূতের ভবিষ্যৎ' এবং 'ভবিষ্যতের ভূত' ছবি দুটিতে কলকাতার পুরোনো ঐতিহ্যবাহী বাড়ি ভেঙে মাল্টিপ্লেক্স বা কর্পোরেট সাম্রাজ্য গড়ে তোলার যে তীব্র প্রতিবাদ দেখানো হয়েছিল, তা মূলত বামপন্থী ভাবাদর্শেরই একটি বাস্তব রূপ। বাস্তব জীবনেও তিনি ছিলেন একজন নির্ভীক প্রতিবাদী কন্ঠস্বরের প্রতিনিধি।'ভবিষ্যতের ভূত’ ছবিটিকে কেন্দ্র করে শাসকের রোষানলে পড়েও তিনি যেভাবে আইনি লড়াই লড়েছিলেন, তা ভারতের স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাছে বাক-স্বাধীনতার এক ঐতিহাসিক দলিল হয়ে থাকবে।
১৯৯৭ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি অনীক দত্ত সন্ধি দত্তের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তাঁদের দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের একটি কন্যা সন্তানও রয়েছে, যাঁর নাম রাই। বিবাহের ২৮ বছর পর তাঁরা ডিভোর্সের পথে হাঁটেন। তারপর থেকে দক্ষিণ কলকাতার বাসভবনে পরিচালক একাই থাকতেন ।
তবে, ২০২২ সালে বন্ধুদের জোরাজুরিতে নতুন করে বিয়ের শপথ ঝালিয়ে নিয়েছিলেন দুজনেই। সেই অনুষ্ঠানের ছবি ফেসবুকে শেয়ার করে নিজের স্বভাবসিদ্ধ রসিকতায় অনীক দত্ত লিখেছিলেন যে, নিছক বন্ধুদের অনুরোধেই তিনি এমন কিছু কাজ করেছেন যা নিজের আসল বিয়েতেও করেননি, যেমন মাথায় টোপর পরা এবং স্ত্রীর সিঁথিতে সিঁদুর দেওয়া । সমাজ সচেতন অনীকবাবু মজার ছলে টোপরকে 'জঘন্য টুপি' এবং সিঁদুরকে 'পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অংশ' বলেও মন্তব্য করেছিলেন।
1 Comments
মর্মান্তিক ঘটনা
ReplyDelete