জ্বলদর্চি

মৃত্যুঞ্জয় জানা (স্বাধীনতা সংগ্রামী, বিধায়ক, কেশিয়াড়ী) /ভাস্করব্রত পতি

মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২০৯
মৃত্যুঞ্জয় জানা (স্বাধীনতা সংগ্রামী, বিধায়ক, কেশিয়াড়ী) 

ভাস্করব্রত পতি

কেশিয়াড়ীর একজন দানশীল জমিদার পরিবারের সন্তান হয়েও বিধায়ক, সমাজসেবী তথা স্বাধীনতা সংগ্রামী মৃত্যুঞ্জয় জানা ছিলেন এক অন্য ধরনের মানুষ। সারা জীবন তিনি মেদিনীপুরের প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এলাকার অষ্ট্রিক জনগোষ্ঠীর আদিবাসী সাঁওতাল, লোধা, মুণ্ডা, মাহালি, কোড়া, শবরদের উন্নয়নে সামিল ছিলেন ওতপ্রোতভাবে। 

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার কেশিয়াড়ী থানার বাঘাস্তি গ্রামে ১৯০১ এর ১০ ই এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন প্রাক্তন বিধায়ক মৃত্যুঞ্জয় জানা। বাবা ছিলেন শ্রীনিবাস জানা এবং মা সারদামণি জানা। প্রথমে বড়মোহনপুর স্কুলে লেখাপড়া শেষ করে কিছু সময়ের জন্য বালানন্দ ব্রহ্মচারীর সান্নিধ্যে আসেন। বিহারের দেওঘরের বিখ্যাত ত্রিকূট পাহাড়ে গিয়ে বালানন্দ ব্রহ্মচারীর সাথে সাধন ভজনে মেতে ওঠেন। একটা অন্য ধরনের জগতে নিজেকে সঁপে দেন তিনি।

১৯৩০ নাগাদ গান্ধীজী যখন অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন, তখন তিনি সেই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। দেশের সেবায় নিজেকে যুক্ত করেন। পরবর্তীতে আইন অমান্য আন্দোলন এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল সামনের সারিতে। 

এভাবে ব্রিটিশবিরোধী বিভিন্ন আন্দোলনে সামিল হওয়ার দরুন ব্রিটিশ পুলিশের হাতে তিনি গ্রেপ্তার হন। বিচারে তাঁর জেলে যেতে হয়। প্রায় দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেল এবং খড়গপুরের হিজলী জেলের কারারন্তরালে তাঁকে অতিবাহিত করতে হয়। 

অবশেষে দেশ স্বাধীন হল। মুক্ত মৃত্যুঞ্জয় জানা এবার দেশ পুনর্গঠনের কাজে নিজেকে জড়িয়ে ফেললেন। স্বাধীনোত্তর ভারতের বুকে তখন দেশবাসীর স্বার্থে নানা গঠনমূলক কাজে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে শুরু করলেন।  

এরপর তিনি বিধায়ক হিসেবে সরাসরি জড়িয়ে পড়েন দেশের উন্নয়নের কাজে। প্রথমে ১৯৫৭-১৯৬২ পর্যন্ত কেশিয়াড়ী (তৎকালীন খড়গপুর) বিধানসভা কেন্দ্র থেকে  কৃষ্ণপ্রসাদ মণ্ডলের সাথে (Dual seat) এবং পরে ১৯৬২-১৯৬৭ পর্যন্ত খড়গপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিধায়ক হিসেবে জয়ী হন।

কেশিয়াড়ী থানায় কংগ্রেস সংগঠন প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে তাঁর ছিল মূল ভূমিকা। স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক জনসমর্থন তিনি অর্জন করেন। তাঁর উদ্যোগেই কুলবনী কেশিয়াড়ী রাজ্য সড়ক, বারবাটিয়া জামনা সংযোগকারী সড়ক তৈরি হয়। তাঁর সরাসরি সহযোগিতায় আলোর মুখ দেখে কেশিয়াড়ী সরকারি হাসপাতাল এবং শ্রীনিবাস স্মৃতি পাঠাগার। নিজের পিতামহ হরিচরণ জানার স্মৃতিতে স্থাপন করেন বাঘাস্তি ইউনিয়ন হরিচরণ এস সি হাইস্কুল (১৯৫৭)। ভারতের বিখ্যাত খড়াপুর আই. আই. টি. এর নির্মাণ সময়ে তাঁর ভূমিকা ছিল সদর্থক। নানাভাবে সহায়তা সহযোগিতা করেছিলেন মৃত্যুঞ্জয় জানা। ১৯৮৬ এর ৬ ই আগস্ট মৃত্যু হয় মেদিনীপুরের যথার্থ মানুষ রতন মৃত্যুঞ্জয় জানার।

🍂

Post a Comment

0 Comments