জ্বলদর্চি

তিনটি কবিতা /তুলসীদাস মাইতি



তিনটি কবিতা 
তুলসীদাস মাইতি


পিতামহের ঘর


পিতামহের চলে যাওয়ার পর তাঁর ঘরে এখনও নিয়ম করেই সন্ধে নামে।
দু এক ঘণ্টার জন্য আলো জ্বলে। ধূপের গন্ধও ছড়ায় প্রাত্যহিক নিয়মে। 
স্মরণকালের পথ বেয়ে এটুকুই এখন এ ঘরের সম্মান।


পিতামহের ঘরে প্রপিতামহেরদেরও স্পর্শ লেগে আছে। 
আধছেঁড়া রামায়ণের দু-একটি পাতা এসে পড়েছে ভাগবতের মলাটে। 
তেলচিটে পড়া শালুতে ঢাকা পুরোনো পঞ্জিকাগুলিও  আধভাঙা আলমারিতে এলোমেলো। 

গ্রহবিপ্র মানুষটির সুদীর্ঘ অতীত ছিল কাল নির্ণয়। 
শুভযোগ ও অশুভ সংকেত তিনি নাকি দেখতে পেতেন।

পিতামহের এই আপাত পরিত্যক্ত ঘরে এখন শুধুই মহাকালের চলাচল। 


রাইকিশোরী
 
চাঁদরাত্রির ভেতর দিয়ে উদাসীন নদীটি বয়ে যাচ্ছে টলমল করে । 
বিহ্বল জ্যোৎস্নায় এলোচুলে  দাঁড়িয়ে আছো
তুমি রাইকিশোরী। 

এই দৃশ্য  দেখতে চেয়েছি বলেই শ্রাবণে যেমন ঝুলন তেমনই হেমন্তে বসেছে রাস। 

নিঃসঙ্গ সন্ধ্যার  নগরপরিক্রমায়
তোমার চারিপাশে আজ  ছায়াময় ভিড়। হেঁটে যাওয়া মানুষের চলার শব্দ তুমি পাচ্ছ না। 
দারুণ ইশারায় তুমি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছো কোলাহল মুখর নির্জনতায়।  
নিষ্পাপ মুখ দিঘির মতো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। 
চমকে উঠছে গোশালার মাঠ! 
দেবতাহীন রাস মন্দির। 

প্রচলিত ধ্রুবসঙ্গীতের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছ। তোমার সজল চোখে ভিজে যাচ্ছি। 

তুমি মানবী। অনন্ত সীমায় গড়া ঈশ্বরী মানবী। 



কবির মৃত্যু

হঠাৎ কবির মৃত্যু সংবাদ পেলে ভাবি এক  আশ্চর্য মায়া-বৃক্ষ ডুবে গেল মহাকালের অতল ঘুমে। 
আর গুন গুন করে শুনিয়ে গেল অযুত স্বপ্নের কথা। 

কবির মৃত্যুতে এতকাল তার কবিতা ছুঁয়েই শোক ভুলতে চেয়েছি।
আর কবিতার মৃত্যু  দেখলে ভাবি কবির জন্য আর কিছুই নেই।

আসলে কবির মৃত্যু হলে শেষ যাত্রায় পা মেলায় কবিতারাও,
কবিতার মৃত্যু হলে পড়ে থাকে ছাই। শূন্য খোলস।

শাঁসহীন। অস্থিমজ্জাহীন কবিতার কালো দাগ।

🍂

Post a Comment

1 Comments