জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকার /পঞ্চম খণ্ড : পর্ব - অন্তিম /কমলিকা ভট্টাচার্য

বাঁচার উত্তরাধিকার 
পঞ্চম খণ্ড : পর্ব - অন্তিম 
কমলিকা ভট্টাচার্য 
 
চেতনার উত্তরাধিকার

হারগ্রিভের উচ্চকণ্ঠ হাসিতে আদর জেগে ওঠে।
হারগ্রিভ বলে, “Now you become a simple kid only… just your uncle’s boy.”
আদর তখনও আচ্ছন্ন। সে কিছু বলে না। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি লুকিয়ে রাখে। তারপর আবার অজ্ঞান হওয়ার ভান করে।
এদিকে অনির্বাণের জ্ঞান ফিরতে সময় লাগে।
চোখ খুলতেই সে বুঝতে পারে কিছু একটা বদলে গেছে। ল্যাবের আলো কম। চারপাশ নিস্তব্ধ।
তার সামনে স্ট্রেচারে শুয়ে আছে আদর। নিস্তেজ।
এই দৃশ্য দেখে তার বুকের ভেতরটা যেন ফাঁকা হয়ে যায়। সে ছুটে যায়। আদরকে জড়িয়ে ধরে—
“আদর! আদর!”
হঠাৎ আদরের চোখ কেঁপে ওঠে।
সে ধীরে বলে, “বাবা… আমি ঠিক আছি।”
অনির্বাণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
আদর উঠে বসে। তারপর একলাফে স্ট্রেচার থেকে নেমে দাঁড়ায়।
তার চোখে অদ্ভুত দৃঢ়তা। কোনো ভয় নেই। কোনো আতঙ্ক নেই।
সে সোজা হারগ্রিভের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
“আমার আঙ্কেলকে ফেরত দাও।”
হারগ্রিভ একটু থমকে যায়। তারপর হেসে বলে,
“চিনে নাও—কে তোমার রোবট আঙ্কেল।”
তিনজন ঋদ্ধিমান দাঁড়িয়ে।
আদর ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। খুব মন দিয়ে তাদের দেখে।
🍂
তারপর একজনের সামনে দাঁড়ায়।
তার হাত ধরে।
মুহূর্তের জন্য সময় থেমে যায়।
ঋদ্ধিমানের চোখে এক ঝলক বোধ জ্বলে ওঠে।
তিনি বুঝে যান।
তারা তিনজনে বাইরে বেরিয়ে আসে।
অনির্বাণ আদরকে জড়িয়ে বলে,
“এই ভালো হয়েছে—ওরা তোমার ব্রেন নিয়েছে নিক, আমি তোমাকে আর ঋদ্ধিমানকে ফেরত পেয়েছি—এই অনেক।”
আদর আর ঋদ্ধিমান দুজনেই জোরে হেসে ওঠে।
আদর বলে, “Illusion and tricks only.”
ঋদ্ধিমান ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়।
আদর ও অনির্বাণ বাড়ি ফিরে আসে।
এদিকে ঋদ্ধিমান বাড়িতে তাদের ওয়েলকাম করে।
ইরা, নাতাশা অবাক হয়ে শোনে কোথায় গিয়েছিল তারা, কিভাবে সব ঘটেছে।
ঋদ্ধিমান শুধু হেসে বলে,
“Just trying Tilakbaba’s replacement experiment.”
সবাই হেসে ফেলে।
তারপর নাতাশা ধীরে জিজ্ঞেস করে,
“কিন্তু একটা কথা বল… ওরা তো আদরের ব্রেন স্ক্যান করেছিল… তাহলে?”
আদর এবার হেসে বলে,
“আমি ওদের কিছুই বলিনি। বলবও না। কিন্তু তোমাদের বলছি।”
সবাই চুপ।
আদর খুব সহজ গলায় বলতে শুরু করে—
“আমাদের ব্রেইনের একটা আশ্চর্য ক্ষমতা আছে—neuroplasticity। মানে, ব্রেইন নিজের কাজ করার রাস্তা বদলাতে পারে।
আমি অনেকদিন ধরে প্র্যাকটিস করছিলাম—আমার কঠিন চিন্তা, দ্রুত হিসেব, জটিল ভাবনা—এসব সরিয়ে রেখে খুব সাধারণ ভাবে ভাবতে।
ধরো, একটা বড় রাস্তা আছে। সবাই সেই রাস্তা দেখছে।
আমি কী করেছি জানো? ওই বড় রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছি।
সব গাড়ি ঘুরিয়ে দিয়েছি ছোট ছোট গলির ভিতর।
বাইরে থেকে কেউ দেখলে ভাববে—এখানে তেমন কিছু চলছেই না।”
ইরা বলে ওঠে,
“তাহলে আমরা তোমাকে স্বাভাবিক রাখছিলাম না—তুমি নিজেকে স্বাভাবিক রাখার জন্য কৌশল শিখছিলে?”
আদর মাথা নাড়ে, “ঠিক তাই।”
“ওরা যখন আমার ব্রেইন স্ক্যান করছিল, ওরা আসলে দেখেছে আমার ‘সাধারণ’ চিন্তার অংশ।
কারণ আমি ইচ্ছে করে আমার আসল চিন্তাগুলোকে ব্রেইনের ভেতরের অন্য পথে চালাচ্ছিলাম।
এটাকে বলে functional rerouting।
আর একটা জিনিস করেছি—আমি মাথার ভেতরে খুব ধীরে ধীরে চিন্তা করছিলাম।
মানে, ইচ্ছে করে আমার ব্রেইনের গতি কমিয়ে দিয়েছিলাম।
যাতে স্ক্যানে দেখে মনে হয়—একদম সাধারণ বাচ্চা।”
অনির্বাণ, নাতাশা, ইরা, ঋদ্ধিমান—সবাই স্তব্ধ হয়ে শোনে।
আদর আবার বলে,
“আমাদের ব্রেইনে একসাথে অনেক লেয়ারে কাজ হয়। উপরের লেয়ার দেখে সবাই বুঝতে পারে আমরা কী ভাবছি।
আমি কী করেছি জানো? আসল ভাবনাগুলোকে নিচের লেয়ারে পাঠিয়ে দিয়েছি।
উপরের লেয়ারে রেখেছি একদম সহজ, সাধারণ, বাচ্চাদের মতো চিন্তা।
তাই ওরা যেটা নিয়েছে—সেটা আমার আসল ব্রেইন না।
ওরা নিয়েছে আমার ‘ভান করা’ ব্রেইন—full of confusing false data।
আর সেই ডেটা বিশ্লেষণ করে বুঝতেই ওদের দশ বছর লেগে যাবে।”
ঘরে নীরবতা নেমে আসে।
ঋদ্ধিমান ধীরে বলে,
“এই জন্যই—মানুষের চেতনা শুধু বুদ্ধি নয়… বাঁচার কৌশল, জীবনের সব কিছুর চাবিকাঠি।”
বিকেলের আলো পড়েছে বারান্দায়।
আদর বলে, “আমি বাইরে খেলতে যাচ্ছি।”
সবাই একসাথে বলে, “যাও।”
বারান্দায় দাঁড়িয়ে তারা দেখে—একটি শিশু মাঠের দিকে ছুটে যাচ্ছে।
সেই দৌড়ে নেই কোনো অস্বাভাবিকতা। নেই কোনো প্রতিভার ভার। নেই কোনো ভবিষ্যতের চাপ।
শুধু এক শিশু।
ইরা ধীরে বলে,
“ওকে দেখে একদম স্বাভাবিক মনে হচ্ছে… অথচ ওর মধ্যে লুকিয়ে আছে এক অকল্পনীয় ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানের সম্ভাবনা।”
ঋদ্ধিমান চুপচাপ তাকিয়ে থাকে।
তাদের চোখে গভীর শান্তি।
তারা জানে—এই শিশুই তাদের যোগ্য উত্তরাধিকারী।
তবে এ কোনো জিনের উত্তরাধিকার নয়।
চেতনায় গড়া যে সম্পর্ক—
সেই হলো বাঁচার আসল উত্তরাধিকার।

চলবে...

Post a Comment

2 Comments

  1. AnonymousMay 08, 2026

    পুরো পর্বের আইডিয়া অনবদ্য। বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে পড়ে আনন্দ পেয়েছি।

    ReplyDelete
  2. AnonymousMay 08, 2026

    চিন্তাটা বেশ মৌলিক ।ঘটনা টানটান।পাঠককে ধরে রাখে। পরের পর্বের অপেক্ষায়।

    ReplyDelete