জ্বলদর্চি

ক্ষুদি জাম/ভাস্করব্রত পতি

বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১২৬
ক্ষুদি জাম

ভাস্করব্রত পতি

খুব একটা বড়সড় গাছ নয়। মোটামুটি ৩-৪ মিটার উচ্চতা। এদের কাণ্ড ও ডাল বেশ শক্ত। ঝোপের মধ্যেই জন্মায়। ছোট ছোট পাখিরা এসে এই গাছে বাসা বাঁধে। পাতাগুলো বয়ের কুলের পাতার মতো। কিন্তু গাছে কোনও কাঁটা থাকে না। বৈশাখ মাসে গাছে ফল ধরে। আর জৈষ্ঠ্য মাসে ফল পাকে। খুব ছোট ছোট ফল। গুচ্ছাকারে জন্মায়। বেরি জাতীয়। কাঁচা ফলের রঙ সবুজ। এরপর পাকলে লালচে থেকে কালো রঙের হয়। আসল জামকুলের মতো। খাওয়ার পর জিভ বেগুনি রঙের হয়ে যায়। খেতে খুব মিস্টি। বীজ সহ কুড়মুড় করে চিবিয়ে খায় চালভাজার মতো। 
ফল পেকেছে গাছে

পশ্চিমবাংলার গাঁয়ের মানুষজন আঞ্চলিক ভাষায় একে ক্ষুদি জাম বলেই চেনে। অর্থাৎ ছোট জাম। কিন্তু বড় জামকুলের চেয়ে আলাদা। মূলতঃ উত্তর অষ্ট্রেলিয়া, নিউ গিয়ানার বাসিন্দা এই গাছটি এখন পূর্ব ও পশ্চিম হিমালয়ান পার্বত্য অঞ্চল, ভারত, বাংলাদেশ, পাপুয়া নিউগিনি, থাইল্যান্ড, চিন, নেপাল, শ্রীলঙ্কাতে দেখা মেলে। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়াতে ইয়াংগু এবং পাপুয়া নিউগিনিতে সিগোরে নামে পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় অল্পবিস্তর দেখতে পাওয়া যায়। তবে এটি ক্রমশঃ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে আমাদের অপরিণামদর্শীতার জন্য। 
গাছ থেকে ক্ষুদি জাম পেড়ে খাচ্ছেন পাঁশকুড়ার সাহড়দা গ্রামের দুলাল কর

বাংলাদেশের কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরাতে ক্ষুদে জাম, ফরিদপুরে কায়োঠুটি ফল, কুমিল্লায় কাউয়া জাম, সিলেটে খইচোরা, বরিশালে হুয়াইরগা জাম, ফেনীতে অবোইন, খুলনায় আম জুম জুম, নোয়াখালিতে ওপোইন, আপিন, ময়মনসিংহে 'ছাগলের লেদা' নামে পরিচিত ক্ষুদি জাম। এছাড়াও এটিকে বনজাম, আমজাম, কাওয়া ফল, বোনযিলুও বলে কেউ কেউ। 

ক্লিক করে দেখে নিন 👇

ক্ষুদি জামকে ইংরেজিতে Black Currant Tree, Tassel Berries, অসমীয়াতে হেলচ, কন্নড়ে পুলিমপুরাসে, পুল্লামপুরাসে, হিন্দিতে আমটি, উমটোয়া, মালয়লামে চেরিয়াকোট্টাম, চেরিয়াননাটম, মারাঠিতে জোমড্রি, নেপালীতে চিপলি, ওড়িয়াতে জামুলা, সিনহালা, বুয়েমবিল্লা, তেলুগুতে জানা পালাশেরু, নাল্লাবেল্লি, লোনা, উর্দুতে নুনিয়ারি বলে। Phyllanthaceae (Amla family) পরিবারের ক্ষুদি জামের বিজ্ঞানসম্মত নাম -- Antidesma ghaesembilla। এছাড়াও আরও বেশ কিছু প্রজাতি রয়েছে। সেগুলি হল --
Antidesma ghaesembilla var. genuinum
Cansjera grossularioides 
Cansjera rheedei
Antidesma frutescens
Antidesma pubescens
Antidesma rhamnoides
Antidesma schultzii
Antidesma spicatum
Antidesma vestitum

১৭৮৮ সালে জার্মান উদ্ভিদবিজ্ঞানী যোশেফ গিয়ার্টনার (১৭৩২-১৭৯১) প্রথম এই গাছটির কথা লিখেছিলেন তাঁর De Fructibus et Seminibus Plantarum বইতে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক সংস্থা IUCN এটিকে Least Concern হিসেবে চিহ্নিত করেছে। 
পাতা সহ ক্ষুদি জামের ফল

এখন বিলুপ্তপ্রায় হয়ে যাওয়া এই ক্ষুদি জাম ঝোপঝাড় যুক্ত জঙ্গলে একদমই চোখে পড়ে না আজ! আসলে এর চাষ কেউ করে না এখন। বেশিরভাগ মানুষ এই গাছ দেখেইনি। এর ফল খাওয়া তো দূরের কথা, নামও শোনেনি বেশিরভাগ লোক। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে। ছোটদের খুব প্রিয় এবং পছন্দের গেঁয়ো ফল। ভারতের কিছু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ ব্যাথা উপশমকারী হিসেবে ব্যবহার করে। আর কেরালাতে মাছ এবং মাংসের নানা পদের রান্নাতে স্বাদ আনার জন্য এই ক্ষুদি জাম ব্যবহার করতে দেখা যায়। জ্যাম, জেলি, জুস তৈরি হয়।

🍂

Post a Comment

0 Comments